ইতিহাস

উস্তাদ বিলায়েত খাঁ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতজগতের একজন অন্যতম বিখ্যাত সেতারবাদক হলেন উস্তাদ বিলায়েত হুসেন খাঁ (Ustad Vilayat Hussain Khan)। সেতারে গলার স্বরের অনুকরণে সুর ফুটিয়ে তোলার এক অনবদ্য কৌশল তিনি রপ্ত করেছিলেন, যাকে গায়কী অঙ্গ (Gayaki Ang) বলা হয়ে থাকে। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিভিন্ন রাগ তাঁর সেতারের সুরে নতুন ব্যাখ্যা পেয়েছে। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে তিনি তাঁর অনবদ্য প্রতিভাবলে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

১৯২৮ সালের ২৮ আগস্ট ময়মনসিংহের গৌরীপুরে (অধুনা বাংলাদেশ) উস্তাদ বিলায়েত খাঁর জন্ম হয়। তাঁর বাবা এনায়েত খাঁ ছিলেন একজন বিখ্যাত সেতারবাদক। দাদু ইমদাদ খানও ছিলেন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতজগতের একজন পরিচিত ব্যক্তিত্ব। বিলায়েত খাঁর জীবনে তাঁর মা বশিরন বেগমের বিশেষ অবদান ছিল। তাঁর দিদিমা বন্দে হুসেন খাঁ এবং মামা ওয়াহিদ খাঁ বিলায়েত খানের সঙ্গীতচর্চাকে প্রভাবিত করেছিলেন। তিনি ছোটবেলা থেকেই তাঁর পারিবারিক সঙ্গীত ঘরানা ইমদাদখানী ঘরানা বা এতাওয়া ঘরানায় সঙ্গীতের এবং সুরচর্চার পাঠ নিতে থাকেন।

মাত্র নয় বছর বয়সে বিলায়েত খাঁর বাবা মারা যান। তারপর থেকে মা, দিদিমা এবং মামার কাছেই তালিম নেওয়া শুরু করেন তিনি। তাঁর মায়ের বাড়ির সকলেই সঙ্গীত জগতের সাথে যুক্ত ছিলেন। বিলায়েত খাঁ নিজে গায়ক হতে চাইলেও তাঁর মা জোর করে তাঁকে সেতারের প্রতি আগ্রহী করে তোলেন। তিনি বলেছিলেন, “ অন্য কোনো মেয়ে হলে তোকে শ্বশুরবাড়ির প্রভাব থেকে দূরে সরিয়ে রেখে নিজের বাবার বাড়ির দিকে টেনে নিয়ে যেত। কিন্তু, এনায়েত খানকে আমি ঠকাতে পারব না। আমি গাইয়ে নয়, সেতার বাদক চাই।” সুতরাং, বিলায়েত খাঁর সেতারবাদক হয়ে ওঠার পিছনে তাঁর মা বশিরন বেগমের প্রভাব অনস্বীকার্য।

মাত্র আট বছর বয়সে তিনি তাঁর প্রথম ৭৮- আরপিএম ডিস্কটি রেকর্ড করেন। বিলায়েত খাঁর জীবনের প্রথম সঙ্গীতানুষ্ঠান বা কনসার্টটি হয়েছিল অল বেঙ্গল মিউজিক কনফারেন্সে। কলকাতায় ভূপেন ঘোষ দ্বারা আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বিলায়েত খাঁকে তবলায় সঙ্গত করেছিলেন আহমেদ জান থিরাকওয়া। ১৯৪৪ সালে মুম্বাইতে বিক্রমাদিত্য সঙ্গীত পরিষদ কর্তৃক আয়োজিত কনসার্টে তাঁর বাজানো সেতারের অংশটি প্রভূত প্রশংসিত হয়। ১৯৫০ এর দশকে তিনি বাদ্যযন্ত্র প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে খুব কাছ থেকে কাজ করা শুরু করেন। সেতারে আরও ভাল সুর তোলার জন্য তাঁর সেতারে সামান্য কিছু পরিবর্তন করে হয়। সেতারের আরও উন্নতির জন্য তিনি সেতার প্রস্তুতকারক কানাইলাল এবং হীরেন রায়ের সঙ্গে বিশেষভাবে যোগাযোগ করেন।

বিলায়েত খাঁ ভঙ্কর, জয়জয়ন্তীর মতো রাগের পুনর্ব্যাখ্যা করেন। পাশাপাশি তিনি এনায়াতখানি কানাড়া, সাঁঝ সারাভালি, কলাবন্তী, মন্ড ভৈরবের মতো রাগ আবিষ্কার করেন। ইমন, শ্রী, টোডি, দরবারী এবং ভৈরবীর মতো বিখ্যাত রাগকে তিনিই প্রথম পরম্পরাগতভাবে ব্যাখ্যা করেন। ৬৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি রেকর্ডিং করেন এবং প্রায় সমান সময় ধরে সর্বভারতীয় রেডিওতে তাঁর অনুষ্ঠান সম্প্রসারিত হয়। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি দেশ বিদেশে অনুষ্ঠান করতে থাকেন। ১৯৫১ সালে বিলায়েৎ খাঁ ইংল্যান্ডে যান একটি অনুষ্ঠানে। সম্ভবত তিনিই স্বাধীনতার পরে ইংল্যান্ডে গিয়ে অনুষ্ঠান করা প্রথম ভারতীয়। ১৯৯০ এর দশকে নিউ ইয়র্কে ইন্ডিয়া আর্কাইভ মিউজিকের জন্য কিছু বিশেষ সিডি রেকর্ড করার ফলে তাঁর রেকর্ডিং জীবন এক অন্য স্তরে পৌঁছায়।

উস্তাদ বিলায়েত খাঁ তিনটি ছবির জন্য সঙ্গীত পরিচালনার কাজ করেছিলেন যার মধ্যে একটি ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত সত্যজিৎ রায়ের বাংলা ছবি ‘জলসাঘর’, আরেকটি ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত মার্চেন্ট-আইভরি প্রোডাকশনসের ইংরেজি ছবি ‘দ্য গুরু’ এবং অন্যটি ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত মধুসূদন কুমারের হিন্দি ছবি ‘কাদম্বরী’। এছাড়াও, ডাঃ বারীন রায় দ্বারা প্রযোজিত ‘জলসাঘর’ নামে একটি স্বল্প-পরিচিত তথ্যচিত্রের জন্যও তিনি সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন।

বিলায়েত খাঁর প্রথমা স্ত্রীর নাম মনীষা হাজরা। তাঁদের দুই পুত্র এবং একজন কন্যা সন্তান ছিল। তাঁরা হলেন ইমন খাঁ, সুফি গায়ক জিলা খাঁ এবং সেতার বাদক সুজাত খাঁ। তাঁর দ্বিতীয় পক্ষের পুত্রের নাম হিদায়ত।

১৯৬৪ এবং ১৯৬৮ সালে যথাক্রমে তাঁকে পদ্মশ্রী এবং পদ্মভূষণ সম্মান দেওয়া হয়। কিন্তু, দুইবারই তিনি সম্মানদুটি প্রত্যাখ্যান করেন এই বলে যে, যে কমিটি তাঁকে এই সম্মান দিচ্ছে তাঁরা তাঁর সঙ্গীতচর্চার মর্যাদা করার অযোগ্য। ২০০০ সালে তঁকে পদ্মবিভূষণ সম্মানে ভূষিত করতে চাওয়া হলে তিনি আবার তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং এই সম্মান প্রদর্শনকে তিনি অপমান হিসেবে চিহ্নিত করেন। এই সময়েই তিনি বলেন যে, যে সম্মান তাঁর আগে অন্য কোনো কম যোগ্য সেতারবাদক পেয়ে গিয়েছেন, সেই সম্মান তিনি গ্রহণ করবেন না। একটি সংবাদপত্রকে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে “ভারতবর্ষে যদি সেতারের জন্য কোনো পুরস্কার থাকে, তবে তা সবার আগে আমার পাওয়া উচিৎ।”

তিনি এই অভিযোগও করেন যে পুরস্কারপ্রাপক নির্বাচন করার সময় সঙ্গীত নাটক আকাদেমি দল, রাজনীতি, স্বজনপোষণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে। তিনি সঙ্গীত নাটক আকাদেমির সম্মানও প্রত্যাখান করেছিলেন। এমনকি, সর্বভারতীয় রেডিওকেও কিছুদিনের জন্য বয়কট করেছিলেন তিনি। যে সামান্য স্বীকৃতি তিনি গ্রহণ করেছিলেন তা হল, আর্টিস্টস অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়ার তরফ থেকে দেওয়া ভারত সেতার সম্রাটের বিশেষ পুরস্কার এবং রাষ্ট্রপতি ফাকরুদ্দিন আলি আহমেদের থেকে পাওয়া ‘আফতাব-এ-সেতার’ উপাধি।

২০০৪ সালের ১৩ মার্চ ফুসুফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ৭৫ বছর বয়সে এই বিশ্ববরেণ্য শিল্পীর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক বর্ণময় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।