সববাংলায়

জেমস ওয়াট

বিজ্ঞানের যে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটি ইউরোপ তথা বিশ্বে শিল্প বিপ্লব সংঘটিত হতে সাহায্য করেছিল তা হল বাষ্প ইঞ্জিন আবিষ্কার। বাষ্প ইঞ্জিন নতুনভাবে ডিজাইন করে অষ্টাদশ শতকে বিজ্ঞান চর্চার এক আমূল পরিবর্তন করেছিলেন জেমস ওয়াট (James Watt)। তিনি একজন স্কটিশ উদ্ভাবক, যান্ত্রিক প্রকৌশলী এবং রসায়নবিদ। বিজ্ঞানী জেমস ওয়াটের বাষ্প ইঞ্জিন আবিষ্কারের পর থেকেই সমগ্র পৃথিবীতে শিল্পক্ষেত্রে জোয়ার আসে।

১৭৩৬ সালের ৩০ জানুয়ারি (পুরনো দিনপঞ্জী অনুসারে ১৯ জানুয়ারি) স্কটল্যান্ড-এর গ্রীনক (Greenock) শহরে জেমস ওয়াটের জন্ম হয়। তাঁর বাবা সিনিয়র জেমস ওয়াট ছিলেন একজন জাহাজ নির্মাতা এবং ঠিকাদার। তাঁর মায়ের নাম অ্যাগনেস মুইরহেড (Agnes Muirhead)। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি সকলের বড় ছিলেন।

এক নজরে জেমস ওয়াট-এর জীবনী:

  • জন্ম: ৩০ জানুয়ারি (পুরনো মতে ১৯ জানুয়ারি), ১৭৩৬
  • মৃত্যু: ২৫ আগস্ট, ১৮১৯
  • কেন বিখ্যাত: বাষ্প ইঞ্জিনকে নতুনভাবে ডিজাইন করে ইঞ্জিনের সক্ষমতা বাড়িয়ে তুলেছিলেন। এই উদ্ভাবনের ফলে ইউরোপ তথা বিশ্বে শিল্প বিপ্লবের সূচনা হয় এবং এর ফলে মানবসভ্যতার ইতিহাসে আমূল পরিবর্তন ঘটে।
  • পুরস্কার ও স্বীকৃতি: রয়াল সোসাইটি থেকে কোপলি পদক, রামফোর্ড পদক ইত্যাদি। শক্তির আন্তর্জাতিক একক ‘ওয়াট’ তাঁর নামে রাখা হয়েছে।

১৭৬৪ সালে ২৮ বছর বয়সে জেমস ওয়াট বিয়ে করেন মার্গারেট মিলারকে। ১৭৭৩ সালে মার্গারেট তৃতীয় সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান। এরপর ১৭৭৫ সালে তিনি দ্বিতীয় বিবাহ করেন। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম ছিল অ্যান ম্যাকগ্রেগর। দ্বিতীয় স্ত্রী অ্যান আমৃত্যু জেমস ওয়াটের সঙ্গে ছিলেন। জেমস ওয়াটের চারটি সন্তান ছিল।

অল্প বয়স থেকেই পড়াশোনা শুরু করেছিলেন জেমস ওয়াট, তবে ছোট থেকেই অসুস্থ ছিলেন বলে প্রাথমিক পড়াশোনা বাড়িতেই মায়ের কাছে করেছিলেন। তাঁর প্রথাগত শিক্ষা শুরু হয় গ্রীনক গ্রামার স্কুলে। সেখানে তিনি গণিতে দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। তবে ল্যাটিন এবং গ্রীক ভাষা সেই সময়ে শাস্ত্রীয় শিক্ষার জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচিত হলেও এই বিষয়গুলি তাঁর ভাল লাগত না। ছোট থেকেই যন্ত্রপাতি সম্পর্কে তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। গ্রীনক গ্রামার স্কুলের পর তিনি গ্লাসগো ও লন্ডনে যন্ত্রপাতি নির্মাণের প্রশিক্ষণ নেন।

পড়াশোনা শেষ হলে জেমস ওয়াট তাঁর বাবার কর্মশালায় কাজ করতে শুরু করেন। তবে বাবার ব্যবসা ফল না করায় তিনি গ্লাসগো এবং লন্ডনে কাজের সন্ধানে যান। ১৭৫৭ সালে, জেমস ওয়াট গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে যন্ত্রপাতি নির্মাতা হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখানে তিনি বাষ্প ইঞ্জিন নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। ১৭৬৪ সালে, তিনি একটি নিউকোমেন বাষ্প ইঞ্জিন মেরামত করার সময় লক্ষ করেন যে এই যন্ত্রের অধিকাংশ তাপশক্তি যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত না হয়ে অপচয় হচ্ছে। এর ফলে যন্ত্রটির দক্ষতা অনেক কম হচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি একটি পৃথক কনডেন্সার ডিজাইন করেন, যা বাষ্পের অপচয় রোধ করে এবং ইঞ্জিনের দক্ষতা বৃদ্ধি করে। ১৭৬৯ সালে, তিনি তাঁর বিখ্যাত পৃথক কনডেন্সার সহ বাষ্প ইঞ্জিনের জন্য পেটেন্ট পান।

ওয়াটের উদ্ভাবন বাষ্প ইঞ্জিনের দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে। তিনি বার্মিংহামের সোহো ফাউন্ড্রির মালিক ম্যাথিউ বোল্টনের সঙ্গে একত্রে কাজ করতে শুরু করেন। এই অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ওয়াটের বাষ্প ইঞ্জিন প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত এবং বিক্রি হয়। ওয়াটের বাষ্প ইঞ্জিন খনি, কারখানা এবং রেলওয়ে সহ বিভিন্ন শিল্পে বিপ্লব ঘটায়।

জেমস ওয়াট শুধু বাষ্প ইঞ্জিনের উন্নয়নেই নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তিনি কপিয়ার মেশিন, রোটারি ইঞ্জিন এবং চাপ পরিমাপক যন্ত্র-সহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করেন। এছাড়াও, তিনি রসায়ন এবং পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণা চালিয়েছেন।

জেমস ওয়াটের উদ্ভাবনগুলি শিল্প এবং পরিবহনে বিপ্লব ঘটিয়েছে, যার ফলে তিনি অসংখ্য পুরস্কার এবং প্রশংসা অর্জন করেছেন। ওয়াট প্রাপ্ত সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরষ্কারগুলির মধ্যে একটি হল কোপলি পদক (Copley Medal), ১৭৮৫ সালে রয়্যাল সোসাইটি প্রদান করে। এই পদকটিকে বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ সম্মানগুলির মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচনা করা হয় এবং অসামান্য বৈজ্ঞানিক কৃতিত্বের জন্য পুরস্কৃত করা হয়। স্টিম ইঞ্জিনে ওয়াটের যুগান্তকারী কাজ, বিশেষ করে এর দক্ষতা এবং শক্তিতে তার উন্নতি, তাকে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের একজন যোগ্য প্রাপক করে তুলেছে।

কোপলি পদক ছাড়াও, ওয়াট ১৭৯২ সালে রয়্যাল সোসাইটি থেকে রামফোর্ড পদকও পেয়েছিলেন। এই পদকটি তাপ এবং আলোতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার বা উন্নতির জন্য দেওয়া হয়। ওয়াট রয়্যাল সোসাইটি অফ এডিনবার্গের একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন এবং ১৮০৪ থেকে ১৮১৩ সাল পর্যন্ত এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এই মর্যাদাপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সমাজে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান এবং বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের অগ্রগতির প্রতি তার প্রতিশ্রুতিকে স্বীকৃতি দেয়।

এই আনুষ্ঠানিক পুরস্কারের বাইরে, ওয়াটের উত্তরাধিকার বিভিন্ন স্মারক এবং সম্মান লাভ করেন। গ্রিনক, স্কটল্যান্ডের ওয়াট ইন্টারন্যাশনাল স্টিম ইঞ্জিন মিউজিয়াম, শিল্প বিপ্লবে ওয়াটের উদ্ভাবন এবং অবদান সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের জন্য নিবেদিত। এছাড়াও, ইন্টারন্যাশনাল সিস্টেম অফ ইউনিটস (SI) এ ব্যবহৃত শক্তির (পাওয়ারের) একক ‘ওয়াট ’, তাপগতিবিদ্যায় তাঁর অগ্রণী কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁর নামেই নামকরণ করা হয়েছে।

১৮১৯ সালের ২৫ আগস্ট ইংল্যান্ডের বার্মিংহামের হ্যান্ডসওর্থে জেমস ওয়াটের মৃত্যু হয়। হ্যান্ডসওর্থের সেন্ট মেরিজ চার্চে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading