প্রফুল্লকুমার দে সরকার (Prafulla Kumar De Sarkar) ছিলেন একজন জনপ্রিয় ইংরেজি শিক্ষক, লেখক ও সমাজসংস্কারক। পাঠ্যপুস্তকের জগতে তিনি পিকে দে সরকার নামেই অধিক পরিচিত। কর্মজীবনের শুরুর দিকে, ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে কৃষ্ণবর্ণ বাঙালি হওয়ার জন্য অপমানিত হয়ে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। কিন্তু তাতে তিনি ভেঙে পড়েননি বরং দক্ষতার সঙ্গে বাংলার ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য তিনি রচনা করেন জনপ্রিয় একটি ইংরেজি ব্যাকরণ বই, যা বহু বছর ধরে বাঙালি শিক্ষার্থীদের কাছে ইংরেজি শেখার অন্যতম প্রধান অবলম্বন হয়ে রয়েছে। এই ব্যাকরণ বই গ্রাম-মফস্বল-শহরের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে হয়ে উঠেছে একেবারে ‘বাইবেল’, যার তথ্যের সত্যতা নিয়ে কোনও রকম সন্দেহ নেই শিক্ষার্থীদের মনে। তাঁর ওই বই পড়েই প্রজন্মের পর প্রজন্মের ছাত্র-ছাত্রীরা অনায়াসে পেরিয়ে গেছে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি। আর এই ইংরেজি ব্যাকরণ পাঠ্যপুস্তক লেখার জন্য প্রফুল্লকুমার দে সরকার বাংলার শিক্ষামহলে পিকে দে সরকার নামে পরিচিতি লাভ করেছেন। বাঙালি পড়ুয়াদের কাছে কেশবচন্দ্র নাগ (Keshab Chandra Nag) বা কে.সি.নাগ তাঁর বাংলা গণিত বইয়ের জন্য, সি.আর.ডি.জি বা চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্ত (Chittaranjan Dasgupta) তাঁর পদার্থবিদ্যার বইয়ের জন্য আর প্রফুল্লকুমার দে সরকার মূলত তাঁর ইংরাজি ব্যাকরণ বইয়ের জন্য বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। বাংলা পাঠ্য পুস্তকের জগতে এই তিন মহারথীকে অনেকে ‘ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর’ বলে অভিহিত করেন।
প্রফুল্লকুমার দে সরকারের জন্ম হয় ১৮৯২ সালে ব্রিটিশ ভারতের পূর্ব বাংলার রংপুরের নীলফামারীতে। ১৯১১ সালে তিনি রাজশাহী কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন, এরপর ইংরেজি ভাষার উপর বিশেষ দক্ষতা থাকার জন্য মেধাবী পড়ুয়া প্রফুল্লকুমার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ পড়ার সুযোগ পান। তিনি ইংরেজি ভাষা নিয়ে পড়াশোনা করলেও তাঁর ছেলেমেয়েরা সেই পথ অবলম্বন করেননি। তাঁর দুই ছেলে ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার, আর দুই মেয়ে ছিলেন অণুজীববিজ্ঞানী।
এছাড়া পিকে দে সরকার ছিলেন একজন উদারমনস্ক ও সমাজ সংস্কারক মানুষ। ছেলে-মেয়ের মধ্যে তিনি কখনও কোন ভেদাভেদ করেননি, মেয়েদের উচ্চশিক্ষিত করার জন্য তাদের প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি করেন। এছাড়া তৎকালীন সমাজের নিষেধকে উপেক্ষা করে তিনি নিজের মেয়েদের বাড়ির বাইরে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করার অনুমতি দেন।
প্রফুল্লকুমার দে সরকার নিজের এমএ পড়ার খরচ চালানোর জন্য কলকাতার রিয়েল এস্টেট সংস্থা মার্টিন বার্ন লিমিটেড (Martin Burn Limited) কোম্পানিতে প্রথম কাজ শুরু করেন। এখানে তিনি কয়েক বছর কাজ করেছিলেন। এই কোম্পানি তাঁর জীবনে নতুন এক সূচনা করে, মার্টিন বার্ন কোম্পানির অফিসে সাহেবদের জন্য একটি সংরক্ষিত লাইব্রেরি ছিল, যাতে ভারতীয় কর্মচারীদের প্রবেশের কোনও অধিকার ছিল না। অথচ একদিন বিশেষ প্রয়োজনে ওই লাইব্রেরিতে যান পিকে দে সরকার। একজন ভারতীয় হয়ে ইংরেজদের লাইব্রেরীতে ঢুকে পড়ার অপরাধে তাঁকে অপমান করে লাইব্রেরি থেকে বের করে দেওয়া হয়। একটি বই পড়তে যাওয়ার জন্য এইরকম ব্যবহার সহ্য করতে পারেননি তিনি, আর এই কারণে তিনি ওই চাকরি ছেড়ে দেন।
চাকরি ছাড়ার পর প্রফুল্লকুমার দে সরকার গ্রামে ফিরে যান এবং শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৩০ সালে তিনি রাজশাহীর ভোলানাথ বিশ্বেশ্বর হিন্দু অ্যাকাডেমিতে প্রধান শিক্ষক হিসেবে কাজে যোগ দেন। এই বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত হওয়ার পর তিনি ছাত্রদের ‘মাস্টার মশাই’ নামে জনপ্রিয় হতে থাকেন, আর তারপর থেকেই ছোট এই স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও দিনদিন বাড়তে থাকে। এই বিদ্যালয়ে তিনি ১৯৪৮ সালের আগস্ট মাস অব্দি শিক্ষকতা করেছেন। তাঁর পরিচালনায় এই বিদ্যালয়টির সুনাম বৃদ্ধি পেতে থাকে। সেই সময় এই বিদ্যালয়ের ছাত্র সংখ্যা ১১০০ ছাড়িয়ে যায়। শিক্ষা, ক্রীড়া ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই বিদ্যালয়টি সুনাম অর্জন করে। এই সময়কালটিকে বিদ্যালয়টির স্বর্ণময়যুগ বলা হয়ে থাকে।
ব্রিটিশ সরকার ভারতে নিজেদের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করার পর, ভারতীয় বিশেষত বাঙালিদের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষাগ্রহণ করার বিষয় তুমুল আগ্রহ দেখা যায়। এইসময় ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম শিক্ষাবিদ জন নেসফিল্ডের (John Nesfield) ‘ম্যানুয়াল অফ ইংলিশ গ্রামার অ্যান্ড কম্পোজিশন’ (Manual Of English Grammar And Cmposition) নামক ইংরেজি ব্যাকরণ বই খুব জনপ্রিয় ছিল। তবে বিদেশি লেখকের দ্বারা রচিত ওই বইয়ের ইংরাজি ব্যাকরণ বাংলার সাধারণ ছাত্রদের কাছে দুর্বোধ্য মনে হত। প্রফুল্লকুমার দে সরকার শিক্ষকতা শুরু করার পর ওই বই পড়ানোর সময় লক্ষ করেন যে, বিদেশি ভাষা শেখার জন্য সাধারণ বাঙালি ছাত্রদের পক্ষে এই বইটি একটু দুর্বোধ্য। এই কারণে তিনি নিজে শিক্ষকতার ফাঁকে ফাঁকে বাঙালি ছাত্রদের উপযোগী করে একটি নতুন ইংরাজি ব্যাকারণ বই লেখা শুরু করেন। অবশেষে ১৯২৬ সালে সরস্বতী প্রেস থেকে ‘এ টেক্সট বুক অফ হায়ার ইংলিশ গ্রামার, কম্পোজিশন অ্যান্ড ট্রান্সলেশন’ (A Text Book of Higher English Grammar, Composition and Translation) নামক বইটি প্রকাশ করেন, যার প্রকাশক ছিলেন পি ঘোষ অ্যান্ড কোং (P Ghosh & Co)। তবে বর্তমানে ‘বুক সিন্ডিকেট প্রাইভেট লিমিটেড’ (Book Syndicate Private Limited) এই বইটি প্রকাশ করেন। এই বইতে ‘অ্যাংলো বেঙ্গলি এডিশন’ অর্থাৎ ইংরাজি ও বাংলা উভয় ভাষার ব্যবহার করা হয়েছে। এই বইটি প্রকাশের পর তা দারুণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং ধীরে ধীরে এই বইয়ের জনপ্রিয়তা নেসফিল্ডের ব্যাকরণ বইকেও ছাপিয়ে যায়।
পিকে দে সরকারের ব্যাকরণ বইয়ের বিশেষত্ব হল যে তিনি চেনা বিষয়গুলিকে আরও নতুন করে ব্যবহার করেছেন, তবে এই কাজ করার সময় তিনি অন্য কোনও গ্রন্থ থেকে কোন রূপ অনুকরণ করেননি। এছাড়া এই ব্যাকরণ বইয়ের লেখার রচনা কৌশল, অনুবাদের বিভিন্ন নিয়মাবলী ও উপযুক্ত অনুশীলনীর মাধ্যমে সহজে শিক্ষার্থীরা ইংরাজি ভাষা শিখতে পারেন। মূলত নবম-দশম শ্রেণির ছাত্রদের জন্য এই বইটি লেখা হলেও অন্যান্য শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও এই বইটি পড়তে পারেন। প্রফুল্লকুমার দে সরকারকে একদিক থেকে বিপ্লবীও বলা যায়, কারণ তিনি কলমের জোরে অনবরত লড়ে গেছেন ইংরেজদের ব্যাকরণ বইগুলির সাথে। তিনি কেবলমাত্র তাঁর এই ব্যাকরণ বইয়ের জন্য বাংলা শিক্ষা জগতে অবিস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন। তবে এই বইটি একবার প্রকাশ করেই তিনি থেমে যাননি বরং তিনি সারা জীবন ধরে এই বইটি উন্নতি সাধন করার চেষ্টা করে গেছেন, সময় উপযোগী নতুন জিনিস তিনি যুক্ত করেছেন, আবার কখনও কোনও বিষয় বাদও দিয়েছেন বই থেকে, কয়েক বছর পর পরই পাল্টে দিতেন তাঁর বইয়ের সংস্করণ। পরবর্তীকালে এই বইটিতে আইএএসের বিগত বছরের ইংরাজি প্রশ্ন-উত্তর যুক্ত করা হয়। এখনও অব্দি পঞ্চাশেরও বেশি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে এই বইটির। এই বইটি বাংলার পাশাপাশি অসম, মেঘালয়, মণিপুরেও দারুণ জনপ্রিয়।
১৯৪৮ সালে নিজের গ্রাম, স্কুল ছেড়ে তিনি কলকাতায় এসে পরিবার নিয়ে কলোনি সংলগ্ন এলাকায় বসবাস শুরু করেন। তবে এপার বাংলায় তিনি আর কোনও চাকরি নেননি বরং মাঝে মাঝে তিনি বিভিন্ন পাবলিশিং হাউসের হয়ে কখনও লেখক বা সম্পাদকের কাজ করে দিতেন,পরিবর্তে অর্থ নয়, নিতেন শুধুমাত্র ক্রিকেট ম্যাচের টিকিট। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তাঁর জীবিকার প্রধান উৎস ছিল ওই ব্যাকরণ বইয়ের পাঠ্যবইয়ের স্বত্বমূল্যের অর্থ। অনাড়ম্বর জীবনযাত্রায় ওই অর্থ দিয়ে সংসার চালাতে তাঁর কোনও অসুবিধা হয়নি। এখনও পর্যন্ত প্রতি বছর এই বইয়ের প্রায় ২০০০০ কপি বাজারে বিক্রি হয়। তিনিই বাঙালি ছাত্রদের দেখিয়েছিলেন যে ব্যাকরণের জটিলতায় ভয় না পেয়ে, কীভাবে সমস্যার মোকাবিলা করে ভাষাকে পুরোপুরি ভাবে আত্মস্থ করতে হয়।
বর্তমানে পিকে দে সরকারের ‘এ টেক্সট বুক অফ হাইয়ার ইংলিশ গ্রামার, কম্পোজিশন অ্যান্ড ট্রান্সলেশন’ বইটি পশ্চিমবঙ্গ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ দ্বারা সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ২০২৬ সালে এই বইটি ১০০ বছর পূর্ণ হবে, অথচ এখনও এই বইয়ের জনপ্রিয়তা অটুট রয়েছে।
১৯৭৪ সালে কলকাতায় প্রফুল্লচন্দ্র দে সরকারের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান