ইতিহাস

কালিদাস রায়

কালিদাস রায় (Kalidas Roy) বাংলা সাহিত্যের একজন অন্যতম অগ্রগণ্য কবি যিনি রবীন্দ্রানুসারী কবি হিসেবে বিশেষ পরিচিত ছিলেন। কাব্য রচনার পাশাপাশি তিনি একজন সাহিত্য সমালোচকও ছিলেন।

১৮৮৯ সালে ২২ জুন পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার কড়ুই গ্রামে কালিদাস রায়ের জন্ম হয়। তাঁর বাবা যোগেন্দ্রনাথ রায় মুর্শিদাবাদের কাশিমবাজার রাজবাড়ীর এষ্টেটের কর্মচারী ছিলেন। কালিদাসের মায়ের নাম রাজবালা দেবী। চৈতন্যদেবের জীবনীকার লোচনদাস ঠাকুরের উত্তরাধিকারী ছিলেন বাবা মায়ের অষ্টম সন্তান কালিদাস। তাঁর আগের সাত ভাইবোন জন্মের পরেই মারা যায়। তিনিও ছিলেন খুবই রুগ্ন। কাশিমবাজারে বার বার ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ফলে তাঁকে গ্রামের বাড়ীতে রেখে আসা হয়। বর্ধমানের গ্রামে ফিরে এসে অসুস্থতার কারণে তাঁর শৈশবের একাংশ গৃহবন্দী হয়েই কাটে। পাঁচ বছর বয়সে তিনি কাশিম বাজারে ফিরে যান। কিন্তু রাজবাড়ীর বিত্তবানদের অবজ্ঞা তাঁকে প্রকৃতির প্রতি আকৃষ্ট করে তোলে। প্রকৃতিই হয়ে ওঠে তাঁর পরম বন্ধু ও কাব্যের প্রেরণা। ১৯১২ সালে ডালটনগঞ্জের ডিস্ট্রিক্ট ইঞ্জিনিয়ার ভূপেন্দ্রচন্দ্র মালিকের মেয়ে সুকৃতি দেবীকে বিবাহ করেন কালিদাস। বিয়ের পরের দিন কালিদাসের মাতৃবিয়োগ হয়। নিজের বিয়েতে তিনি নববধূর আগমন উপলক্ষ্যে ব্রজবুলি ভাষায় একটি কবিতাও লিখেছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁদের চার পুত্র ও তিন কন্যা হয়।

কালিদাস রায়ের লেখাপড়া শুরু হয় বর্ধমানের গ্রামে শশী দৈবজ্ঞের পাঠশালায়। এখানে তিনি ‘বন্দেমাতা সুরধনী’ কবিতাটি শুনে শুনে মুখস্হ করে ফেলেন। এই কবিতাটির সুর ও ছন্দ তাঁকে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে পরবর্তীতে তাঁর অনেক কবিতায় এই কবিতাটির প্রভাব দেখা যায়। সাত বছর বয়সে তিনি একটি মাইনর স্কুলে ভর্তি হন ও সেইসাথে আশুতোষ চতুষ্পাঠীতে তাঁর সংস্কৃত অধ্যয়ন চলতে থাকে।এরপর তিনি কাশিমবাজার খাগড়া লন্ডন মিশন স্কুলে ভর্তি হন ১৯০২ সালে। এই স্কুলে তিনি পরীক্ষায় প্রথম হয়ে শেক্সপীয়ার, কীটস্, কোলরীজ এই সমস্ত বিখ্যাত কবিদের বই উপহার পান। এই বইগুলি তাঁর শিল্পীসত্তাকে বিকশিত করতে এক গভীর ভূমিকা নেয়। ইংরেজি সাহিত্যের কবি ছাড়াও শৈশবে বঙ্কিমসাহিত্য ও রবীন্দ্রসাহিত্য দ্বারা প্রভাবিত হন তিনি। ১৯০৬ সালে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় বৃত্তিসহ উত্তীর্ণ হন। ১৯১১ সালে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে ডিষ্টিংশনসহ স্নাতক হন। এরপর কলকাতায় এসে স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে দর্শনে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হলেও বার্ষিক পরীক্ষার আগেই তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়ে যায়।

১৯১৩ সালে রংপুরের উলিপুর মহারাণী স্বর্ণময়ী হাইস্কুলে সহশিক্ষক হিসেবে কালিদাসের কর্মজীবন শুরু হয়। এর কিছুবছর পরে ১৯২০ সালে চব্বিশ পরগণার বড়িশা হাইস্কুলে শিক্ষক হিসেবে যুক্ত হন তিনি। ১৯৩১ সালে রায় বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেনের সহযোগিতায় ‘মিত্র ইনষ্টিটিউটিশনে’ কালিদাস প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৫২ সালে অবসরগ্রহণের সময়কাল অবধি তিনি ঐ ইনষ্টিটিউটিশনের প্রধান শিক্ষক ছিলেন।

উনিশ শতকের নতুন কাব্যধারায় সে সমস্ত কবি কাব্য সৃষ্টি করে গেছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কালিদাস।শিশু বয়স থেকেই কালিদাসের মধ্যে কাব্য রচনা শক্তির স্ফুরণ ঘটেছিল। রবীন্দ্রধারার বাহক হওয়া সত্ত্বেও তাঁর মধ্যে স্বতন্ত্রতা বজায় ছিল। তিনি মোট ১৯টি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর রচনায় আমরা মানব জীবনের সহজ সরল দিকগুলিকেই বেশি দেখতে পাই। গ্রামবাংলার প্রকৃতি, বৈষ্ণবপ্রাণতা ও তত্ত্ব কথা ছিল তাঁর কাব্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মানুষের প্রতি অটল বিশ্বাস, মানুষের মহত্ত্বের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও জীবনের সহজ সৌন্দর্যই ছিল তাঁর কবিতার বিষয় বস্তু। যা তাঁকে অন্যদের থেকে এক স্বতন্ত্রতা প্রদান করেছে।

১৯০৭ সালে বহরমপুর কলেজে পড়াকালীন কালিদাস রায়ের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কুন্দ’ প্রকাশিত হয় যেটি তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উৎসর্গ করেন। এই কলেজে পড়ার সময়ে তিনি অধ্যাপক ই.এম.হুইলারের সংস্পর্শে আসেন। কাব্যচর্চার ক্ষেত্রে অধ্যাপক হুইলার কাছে বহুভাবে ঋণী ছিলেন বলে স্বীকার করেছেন কালিদাস। ১৯১১ সালে তিনি কলেজ পাস করার পরে ঐ বছরই কলকাতায় এসে তিনি ইউরিভার্সিটি ইনষ্টিটিউটের সদস্য হন যেখানে তাঁর পরিচয় হয় সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, শিশিরকুমার ভাদুড়ী, শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত ব্যক্তিত্বদের সাথে। তাঁদের সাহচর্যে তাঁর কাব্যরচনার ব্যাপ্তির প্রসার ঘটে।

এইসময়ে সাহিত্য চর্চার কারণে তাঁর পড়ার ব্যাঘাত ঘটতে থাকে। কলকাতায় আসার পরে তাঁর ছোট ছোট কিছু কবিতা নিয়ে তিনি ‘কিশলয়’নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন যা তাঁকে লেখকমহলে পরিচিত করায়। ১৯১৩ সালে ভারতী পত্রিকায় ‘মেঘ ও ময়ূরী’ নামে একটি কবিতা প্রকাশ হয়। স্নাতকোত্তরে প্রথম পর্বের পরীক্ষার আগেই তিনি রংপুরের উলিপুরে শিক্ষকতার কাজে যোগ দেন। এখানে আসার পরে অফুরন্ত সময় ও প্রকৃতির সান্নিধ্য তাঁর কাব্যরচনায় অনুঘটকের কাজ করে। উলিপুরে থাকাকালীন তিনি চারটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন যার মধ্যে ১৯১৪ সালে তিনি ‘পর্ণপুট'(১ম) রচনা করেন যা তাঁর শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে অন্যতম।

কালিদাস ছোটবেলা থেকেই বৈষ্ণব ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। কাশিমবাজার রাজবাড়ির মহারাজা ছিলেন বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী। মহারাজের অণুপ্রেরণায় ও উদ্যোগে রাজবাড়ীতে দোল উৎসব, রাসযাত্রা উপলক্ষ্যে কীর্তন, যাত্রা, কবিগান, থিয়েটার প্রভৃতি অনুষ্ঠিত হত। কাশিমবাজারে থাকাকালীন কালিদাস কীর্তন ও কবিগানের প্রতি অনুরাগী হয়ে পড়েন এবং ব্রজবুলি ভাষায় কবিতা রচনা করার জন্য সচেষ্ট হন। উলিপুরে থাকাকালীন তিনি তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘বৃন্দাবন অন্ধকার’ সৃষ্টি করেন যেটি তাঁকে কবি হিসেবে প্রথম জনপ্রিয়তা এনে দেয়। তিনি ব্রজলীলা বিষয়ে আরও কিছু কবিতা এখানে থেকেই লেখেন।

১৯১৫ সালে মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্রের অর্থানুকুল্যে ‘ব্রজবেণু’ প্রকাশিত হয়। ১৯১৬ সালে ‘ঋতুমঙ্গল’ প্রকাশিত হয় প্রকৃতি ও প্রেমমূলক কবিতার সংগ্রহ নিয়ে। উলিপুরের মহারাজার সাথে মতানৈক্যের কারণে তাঁর প্রধান শিক্ষকের পদপ্রাপ্তি অধরা থেকে যায় এবং বিদ্যালয়ের ছাত্রদের পড়ার বই নিয়েও মতানৈক্য ঘটলে তিনি উলিপুর ছেড়ে আবার কলকাতায় ফিরে আসেন এবং এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়।

কলকাতায় ফিরে তিনি জীবিকার প্রয়োজনে পাঠ্যপুস্তক রচনা করতে থাকেন। ১৯২৪ সালে কলকাতায় ফেরার পরে ‘হৈমন্তী’ কাব্যগ্রন্হটি রচনা করেন কালিদাস। এরপর ক্রমান্বয়ে ‘বৈকালী’ প্রকাশিত হয় ১৯৩০ সালে ‘গীতগোবিন্দ’ এবং ১৯৩২ সালে ‘গীতা লহরী’ প্রকাশ হয়। ১৯৪২ সালে জীবন সায়াহ্নে এসে কিছু কাব্য সমালোচনা গ্রন্থও তিনি প্রকাশ করেন। প্রাচীন বঙ্গ সাহিত্য, সাহিত্য প্রসঙ্গ পদাবলী সাহিত্য ও শরৎ সাহিত্য যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

১৯১৩ সালে কাশিমবাজার রাজবাড়ীর সাহিত্যসভায় কালিদাস প্রথম রবীন্দ্রনাথের দর্শন পান সেখানেই রবীন্দ্রনাথের উপদেশানুসারে পরবর্তীতে তিনি অনুবাদ মূলক রচনায় হাত পাকান যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- মহাকবি কালিদাসের শকুন্তলা, কুমারসম্ভব, এবং মেঘদূতের সংস্কৃত থেকে বাংলায় অনুবাদ। ‘শিশুতোষ গল্পকাহিনীতে’ তিনি শিশুদের জন্য গল্প লিখেছেন। তাঁর শিশুসাহিত্যগুলির মধ্যে অন্যতম – ‘গাথাঞ্জলি’ (১৯৬১ ), ‘গাথাকাহিনী’ (১৯৬৪), ‘তৃণদল’ (১৯৭০) প্রভৃতি। তিনি ‘বেতালভট্ট’ ছদ্মনামে লিখতেন।

কালিদাস রায় শুধুই কবি ছিলেন না তিনি ছিলেন অসাধারণ পন্ডিত। তবে তাঁর পান্ডিত্য কখনও কাউকে হেয় করেনি। তিনি সকলের থেকেই সবরকম মতামত গ্রহণের পক্ষপাতী ছিলেন। সমাজ ব্যবস্থার সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন হাস্যরসের যার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় ‘পূর্ণাহুতি’, ‘দন্তরুচি কৌমুদি’ ইত্যাদির মধ্যে।

তিনি ‘রসচক্র’ নামে একটি সাহিত্য চক্র গড়ে তুলেছিলেন যেখানে সাহিত্য আলোচনা ছাড়াও বির্তক হত। তার সাথে চলত রঙ্গ রসিকতাও। এই সংগঠনটি ছিল নবীন ও প্রবীণ সাহিত্যিকদের মেলববন্ধনের একটি ক্ষেত্র। তিনি ‘বসুধারা’ নামে একটি মাসিক পত্রিকাও প্রকাশ করতেন সেই সময়।

১৯৫৯ সালে দিল্লিতে সাধারণতন্ত্র দিবসে আকাশবাণী আয়োজিত সর্বভারতীয় কবি সম্মেলনে বাংলার হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন কালিদাস রায়।

কালিদাস রায় তাঁর সারাজীবনের কৃতিত্বের জন্য বহু সম্মাননা লাভ করেছেন। ১৯২০ সালে রংপুর সাহিত্য পরিষদ তাঁকে সাহিত্যে অবদানের জন্য তাঁকে “কবিশেখর” উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯৫৩ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘দেশিকোত্তম’ উপাধি প্রদান করে। ঐ বছরই তিনি ‘সরোজিনী স্বর্ণপদক’ লাভ করেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘জগত্তারিণী’ পদক প্রদান করে। ১৯৬৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’ প্রদান করেন। ১৯৭১ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ ডিলিট’ ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৭৫ সালের ২৫ অক্টোবর টালিগঞ্জের নিজ বাসভবন ‘সন্ধ্যার কুলায়’ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কালিদাস রায়ের মৃত্যু হয়।

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

তথ্যসূত্র


  1. কবিশেখর কালিদাস রায় :জীবন ও কাব্য,লেখক. : সুদাম চন্দ্র অধিকারী,উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৯৬,পৃষ্ঠা নং : ১১, ১৩,১৫,১৬, ২০,২১,২২,২৩,২৫,২৫,২৬,২৭,২৮,৩২,৩৪,৩৬,৩৮,৩৯,৪১,৪৪,৩৬১,৩৬২,৩৬৩
  2. https://en.m.wikipedia.org/
  3. http://www.elearningbengali.in/
  4. https://m.wikidata.org/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

শুধুমাত্র খাঁটি মধুই উপকারী, তাই বাংলার খাঁটি মধু খান


ফুড হাউস মধু

হোয়াটস্যাপের অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন