বিজ্ঞান

জন ন্যাশ

জন ন্যাশ (John Nash) একজন জগদ্বিখ্যাত আমেরিকান গণিতবিদ যিনি গেম থিওরিতে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন। তিনি এই অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৯৪ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান।

১৯২৮ সালের ১৩ জুন পশ্চিম ভার্জিনিয়ার ব্লু ফিল্ডে জন ন্যাশের জন্ম হয়।তাঁর বাবা জন ফোর্বস ন্যাশ ছিলেন ‘Appalachian Electric Power Company’-র একজন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। তাঁর মা মার্গারেট ভার্জিনিয়া ন্যাশ ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষিকা। তাঁর বোনের নাম ছিল মার্থা।

পাবলিক স্কুলে পড়ার পাশাপাশি জন ন্যাশ তাঁর বাবা এবং ঠাকুরদার কাছেও বই পড়তেন।
ছোটবেলা থেকেই তাঁর গণিতের প্রতি তীব্র আকর্ষণ ছিল। ১৯৪৮ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি গণিতে বি.এস এবং এম. এস ডিগ্রি পান। গণিতে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার জন্য স্কলারশিপ পেয়ে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে চলে যান তিনি। প্রিন্সটনে যাওয়ার সময় তাঁর শিক্ষা উপদেষ্টা রিচার্ড ডাফিন তাঁর জন্য সুপারিশ পত্রে লিখেছিলেন ‘He is a mathematical genius’। এই সময় জন ন্যাশ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়ার সুযোগ পান। কিন্তু প্রিন্সটনের গণিত বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের অনুরোধে তিনি প্রিন্সটনেই থেকে যান। সেখানে তিনি ‘ইকুইলিব্রিয়াম থিওরি’ নিয়ে কাজ করেছিলেন, যা পরবর্তীকালে ‘Nash Equilibrium’ নামে সবার কাছে পরিচিত হয়। ১৯৫০ সালে ‘Non-cooperative games’-এর ওপর গবেষণা করে তিনি পি.এইচ.ডি অর্জন করেন।

১৯৫১ সালে ‘দ্য ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’ (The Massachusetts Institute of Technology) বা এম.আই.টি তে গণিতবিদ হিসেবে যোগদান করেন জন ন্যাশ। এর এক বছর পর জন ন্যাশ এলানোর স্টিয়ার নামের এক নার্সের প্রেমে পড়েন। কিন্তু পরে তাঁর সাথে সম্পর্ক ছেদ করেন। স্টিয়ারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার অল্পদিনের মধ্যে তিনি আবার এম.আই.টি তে তাঁর ছাত্রী এলিসার প্রেমে পড়েন। ১৯৫৭ সালে তাঁরা বিয়ে করেন।

জন ন্যাশের মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ প্রথম দেখা দেয় ১৯৫৯ সালে। ন্যাশ খুব সন্দেহপ্রবণ হয়ে পড়েন। লাল টাই পরা কাউকে দেখলেই তিনি মনে করতেন কোন কমিউনিস্ট বোধহয় তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। তিনি ওয়াশিংটন ডিসির দূতাবাসে চিঠি পাঠাতেন এই সন্দেহ করে যে কমিউনিস্টরা আলাদা করে সরকার গঠনের চেষ্টা করছে। ন্যাশের এই মানসিক সমস্যা ধীরে ধীরে তাঁর পেশাগত জীবনেও প্রভাব ফেলতে শুরু করে। একদিন তিনি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘অ্যামেরিকান ম্যাথমেটিকাল সোসাইটি’ আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়েছিলেন ‘Riemann Hypothesis’ নিয়ে। কিন্তু সেখানে তিনি অদ্ভুত সব কথা বলেছিলেন, যা তাঁর বক্তৃতার বিষয়ের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এই ঘটনায় প্রথমবার তাঁর সহকর্মীরা বুঝতে পারেন যে, তিনি মানসিক সমস্যায় ভুগছেন।

১৯৫৯ সালের এপ্রিল মাসে তাঁকে ‘McLean Hospital’-এ ভর্তি করা হয়। মে মাস পর্যন্ত তিনি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তিনি প্যারানয়েড সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। Diagnostic and Statistical Manual of Mental Disorders(DSM) অনুসারে যেসব ব্যক্তিরা এই রোগে ভোগেন, তাঁদের ভেতর একটা ভ্রান্ত বিশ্বাস থাকে। তাঁদের এই ভ্রান্ত বিশ্বাস থেকে সরানো কঠিন হয়ে পড়ে। মানসিক সমস্যা ছাড়াও তাঁর শ্রবণগত বিভিন্ন সমস্যাও দেখা দিয়েছিল। এরপর ন্যাশ এম.আই.টি থেকে পদত্যাগ করে ইউরোপ চলে যান।

১৯৬১ সালে তাঁকে নিউ জার্সির ট্রেনটন স্টেট হসপিটাল -এ মানসিক রোগ বিভাগে ভর্তি করা হয়। এরপর কয়েক মাস তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেখানে তাঁকে ইনসুলিন শক থেরাপি দেওয়া হতো। কিন্তু তাঁর এই তীব্র মানসিক সমস্যার কারণে ১৯৬৩ সালে এলিসার সঙ্গে তাঁর ডিভোর্স হয়ে যায়। অসুস্থতার কারণে বেল মিয়েড শহরের ক্যারিয়ার ক্লিনিকে তিনি আবার ভর্তি হন। সেখানে তিনি পাঁচ মাস চিকিৎসাধীন ছিলেন, এবং তাঁকে থোরাজাইন (Thorazine – একটি অ্যান্টিসাইকোটিক ঔষধ) দেওয়া হয়। পরবর্তী ৯ বছর তিনি বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

১৯৭০ সালে তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর তিনি তাঁর স্ত্রী এলিসার বাড়িতে পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকতে শুরু করেন। তাঁর অবস্থার ক্রমশ উন্নতি হতে থাকে এবং তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন।
১৯৭০ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি আবার একাডেমিক কাজ করার অনুমতি পান। কিছুদিন কাজ করার পর তিনি আবার শিক্ষকতার কাজে নিযুক্ত হন এবং অঙ্ক নিয়ে চর্চা শুরু করেন। প্রিন্সটনে থাকাকালীন তিনি মাঝরাতে ম্যাথমেটিক্স বিল্ডিং-এর ব্ল্যাক বোর্ডে অঙ্ক করতেন, যার ফলে তাঁর নাম দেওয়া হয় ‘দ্য ফ্যান্টম অফ ফাইন হল’ । ১৯৯০ সালে দ্য ইকোনোমেট্রিক্স সোসাইটি থেকে তিনি ফেলোশিপ পান। মূলত ‘গেম থিওরি’-র ওপর জন ন্যাশের বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৯৪ সালে তাঁকে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। অর্থনীতিতে নোবেল পেলেও তিনি সেই অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করতে পারেননি। ১৯৯৬ সালে তিনি ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের সদস্যপদ পান। ১৯৯৯ সালে ‘Leroy P Steele Prize’ পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০১০ সালে পান ‘Double Helix Medal’। ২০১৫ সালে Nonlinear differential equations এর বিশেষ অবদানের জন্য তাঁকে Abel Prize এ ভূষিত করা হয়।

জন ন্যাশের জীবনী খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন সিলভিয়া নাসার তাঁর বিখ্যাত বই ‘আ বিউটিফুল মাইন্ড’-এ। পরবর্তীকালে এই বইটির অনুসরণে নির্মিত হয়েছে একটি চলচ্চিত্রও। চলচ্চিত্রটির নামকরণও করা হয়েছে ওই বইটির নামেই। এই চলচ্চিত্রে জন ন্যাশের চরিত্রটিতে অভিনয় করেছিলেন হলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা ‘রাসেল ক্রো’। চলচ্চিত্রটি সেরা ছবিসহ চারটি একাডেমী পুরস্কার পেয়েছিল।

২০১৫ সালের ২৩ মে নিউ জার্সি শহরে এক সড়ক দুর্ঘটনায় জন ন্যাশ ও তাঁর স্ত্রী এলিসা ন্যাশ নিহত হন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।