ধর্ম

পাণ্ডবরা বনবাসে থাকাকালীন কোন সময় কোন জায়গায় ছিলেন

পাণ্ডবরা বনবাসে থাকাকালীন কোন সময় কোন জায়গায় ছিলেন

মহাভারতের তৃতীয় পর্ব অর্থাৎ বনপর্বে পান্ডবদের বনবাসে যাওয়ার কথার উল্লেখ আছে। মহারাজ যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞ উপলক্ষ্যে পান্ডবদের রাজধানী খান্ডবপ্রস্থে নিমন্ত্রিত হয়ে দুর্যোধন তাঁদের অতুল ধনসম্পত্তি ও প্রবল প্রতাপ দেখে হিংসায় জ্বলতে থাকেন। পান্ডবদের রাজ্যছাড়া করে এই অতুল সম্পত্তি কিভাবে একা ভোগ করা যায় সেই পরিকল্পনা করতে থাকেন তিনি। তাঁর এই ষড়যন্ত্রে যোগ দেন মামা শকুনিও। দুজনে পরামর্শ করে স্থির করেন যুধিষ্ঠিরকে পাশা খেলায় হারিয়ে দিয়ে তাঁর রাজ্য দখল করবেন দুর্যোধন।

সেইমতো কৌরবদের দূত গিয়ে পান্ডবদের নিমন্ত্রণ করে আসে। তাঁরা এসে পৌঁছালে পাশা খেলা শুরু হয় এবং পূর্ব পরিকল্পনা মতো ছলের আশ্রয় নিয়ে একে একে পান্ডবদের সমস্ত সম্পত্তি জিতে নেন শকুনি ও দুর্যোধন। বাদ পড়েন না পান্ডবদের পাঁচ ভাই ও পান্ডব-ঘরণী দ্রৌপদীও। প্রকাশ্য জনসভায় তাঁকে জোর করে টেনে এনে বিবস্ত্র করার এক ঘৃণ্য চেষ্টা করেন দুর্যোধন ও বাকি কৌরবেরা। কিন্তু কৃষ্ণের কৃপায় দ্রৌপদীর সম্মান রক্ষিত হয়।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

এরপর সভাসদেরা কৌরবদের নিন্দা করতে শুরু করলে ভীত রাজা ধৃতরাষ্ট্র লাঞ্ছিতা দ্রৌপদীকে বর প্রার্থনা করতে বলেন। দ্রৌপদী স্বামীদের মুক্তি প্রার্থনা করলে মুক্ত হন পান্ডবরা। কিন্তু এই ব্যবস্থা দুর্যোধনের পছন্দ হয়নি। স্নেহে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রকে বুঝিয়ে পুনরায় পাশাখেলার আয়োজন করেন তিনি। এবারের পণ বারো বছরের বনবাস ও এক বছরের অজ্ঞাতবাস। এই খেলাতেও পান্ডবরা হেরে যান ও তাঁদের বনবাসে যেতে হয়।

মা কুন্তীকে বিদূরের কাছে রেখে পান্ডবরা বনে যাত্রা করেন। যাওয়ার আগে সূর্যদেবের পুজো করলে তিনি যুধিষ্ঠিরকে একটি আশ্চর্য থালা উপহার দেন, দ্রৌপদীর খাওয়া শেষ হওয়ার আগে পর্যন্ত যে থালা কখনোই খালি হতনা। এরপর পান্ডবরা কাম্যক বনে এসে বাস করতে শুরু করেন। এখানেই ভীমের সাথে বকরাক্ষসের ভাই কীর্মির যুদ্ধ হয়। ঘোরতর যুদ্ধের পর ভীম কীর্মিকে হত্যা করেন। এইসময় ব্যাসদেব এসে অর্জুনকে ‘প্রতিস্মৃতি’ বিদ্যা শেখান এবং স্বর্গের দেবতাদের তপস্যায় তুষ্ট করে অস্ত্রলাভ করার উপদেশ দেন। তাঁর কথা শুনে অর্জুন তপস্যা করতে হিমালয়ে চলে যান। সেখানে গিয়ে প্রবল তপস্যা করে তিনি সকল দেবতাকে সন্তুষ্ট করে অনেক আশ্চর্য অস্ত্র লাভ করেন। তারপর দেবরাজ ইন্দ্র এসে নিবাতকবচ নামক অসুরদের বধ করার উদ্দেশ্যে অর্জুনকে স্বর্গে নিয়ে যান। সেখানে গিয়ে ভয়ানক যুদ্ধের পর দেবতাদের সকল শত্রুদের ধ্বংস করেন অর্জুন।

এদিকে অর্জুনকে ছাড়া পান্ডবরা কাম্যক বনে খুবই মনোকষ্টের সঙ্গে দিন কাটাচ্ছিলেন। সেই সময় অনেক মুনি-ঋষিগণ এসে পান্ডবদের সাথে বাস করতেন। কিছুদিন পর স্বর্গ থেকে লোমশ মুনি এসে পান্ডবদের অর্জুনের সংবাদ দিলে তাঁদের মন কিছুটা ভালো হয় ও তাঁরা ঋষির সঙ্গে তীর্থভ্রমণে বেড়িয়ে পড়েন।

এক এক করে ভারতের প্রায় সকল তীর্থই তাঁদের দেখা হয়ে গেলে পান্ডবরা কৈলাস পর্বতের কাছে বদ্রিকাশ্রম তীর্থে এসে অর্জুনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। এইসময় ভীমের সাথে পবনপুত্র হনুমানের দেখা হয় ও তাঁর দেখিয়ে দেওয়া পথ অনুসরণ করে ভীম যক্ষরাজ কুবেরের সৈন্যদলকে পরাজিত করে দ্রৌপদীর জন্য কুবেরের সরোবর থেকে সোনার পদ্মফুল এনে দেন। রাক্ষস জটাসুর এইসময়েই ভীমের হাতে মারা পড়ে।

আস্তে আস্তে অর্জুনের স্বর্গ থেকে ফিরে আসার সময় চলে আসে। নির্দিষ্ট সময়ে গন্ধমাদন পর্বতে অপেক্ষারত পান্ডবদের কাছে ইন্দ্রের রথে চড়ে ফিরে আসেন অর্জুন। তাঁকে সঙ্গে করে পান্ডবরা আবার কাম্যক বনে ফিরে আসেন। ফিরে আসার পথে দুর্বাসা মুনির অভিশাপে অজগর সাপে রূপান্তরিত মহারাজ নহুষের শাপ দূর করেন যুধিষ্ঠির।

কাম্যক বনে ফিরে এলে একদিন ধৃতরাষ্ট্রের একমাত্র কন্যা দুঃশলার স্বামী সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ দ্রৌপদীকে অপহরণ করার প্রচেষ্টা করেন, কিন্তু পান্ডবদের হাতে তাঁকে উচিত সাজা পেতে হয়। এরপর পান্ডবরা কাম্যক বন ছেড়ে দ্বৈত বনে চলে আসেন। এই সংবাদ পেয়ে কৌরবেরা তাঁদের ধনসম্পত্তি দেখাবার জন্য গোরু দেখার ছল করে দ্বৈত বনে আসেন। সেখানে চিত্রসেন নামে এক গন্ধর্বের সাথে কৌরবদের যুদ্ধ বাধে। কৌরবরা যুদ্ধে হেরে বন্দি হলে যুধিষ্ঠিরের আদেশে ভীম ও অর্জুন এসে তাঁদের মুক্ত করেন।

এই অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য দুর্যোধন একদিন দুর্বাসা মুনিকে অনুরোধ করেন দ্রৌপদীর খাওয়া হয়ে যাওয়ার পর দশহাজার শিষ্য নিয়ে পান্ডবদের আশ্রমে অতিথি হওয়ার জন্য। মহর্ষি দুর্বাসা তাই করলে চিন্তায় পড়ে যান পান্ডবরা। কারণ সূর্যদেব প্রদত্ত সেই আশ্চর্য থালাটিতে তখন আর কোনো খাবার নেই। শেষে দ্রৌপদীর প্রার্থনায় কৃষ্ণ এসে এই বিপদ থেকে পান্ডবদের উদ্ধার করেন। এই ঘটনার পর একদিন ধর্মদেব পান্ডবদের পরীক্ষা নেওয়ার জন্য দ্বৈত বনে আসেন। তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারার জন্য একে একে চার পান্ডবের মৃত্যু ঘটে। শেষে যুধিষ্ঠির এসে ধর্মের সকল প্রশ্নের উত্তর দিয়ে চার ভাইকে বাঁচিয়ে তোলেন। আর এরপরেই পান্ডবদের বারো বছরের বনবাস শেষ হয়।

সময় আসে এক বছরের অজ্ঞাতবাসের। এই সময়ের কথার উল্লেখ পাওয়া যায় মহাভারতের বিরাটপর্বে। এই সময়টুকু এমন ভাবে কাটাতে হবে যেন কেউ পান্ডবদের কোনোরকম খোঁজ না পায়, পান্ডবদের খুঁজে পেলেই আবার বারো বছরের জন্য বনবাসে যেতে হবে তাঁদের। এই সব কথা চিন্তা করে পান্ডবরা ঠিক করলেন তাঁরা ছদ্মবেশ নিয়ে মৎস্য দেশের অত্যন্ত ধার্মিক রাজা বিরাটের আশ্রয়ে থাকবেন। যুধিষ্ঠিরের নাম হবে ‘কঙ্ক’, তিনি বিরাটরাজার সভাসদ হয়ে থাকবেন। ভীম ‘বল্লভ’ নাম নিয়ে রাঁধুনির কাজ নেবেন। অর্জুন নেবেন রাজকন্যাদের নাচ-গান শেখানোর কাজ ও তাঁর নাম হবে ‘বৃহন্নলা’। নকুলের নাম হবে ‘গ্রন্থিক’ ও তিনি থাকবেন ঘোড়াশালের পরিচালক হয়ে। সহদেব ‘তন্ত্রিপাল’ নাম নিয়ে গোশালা দেখাশুনার কাজ করবেন এবং দ্রৌপদী ‘সৈরিন্ধ্রী’ নাম নিয়ে মহারাজ বিরাটের রাণী সুদেষ্ণার দাসী হয়ে থাকবেন। সেইমত তাঁরা তাঁদের সকল অস্ত্রশস্ত্র বিরাটনগরের কাছে একটি শ্মশানের শমী গাছে বেঁধে রেখে সকলের জন্য এক-একটি গোপন নাম ঠিক করলেন। যুধিষ্ঠিরের নাম হল ‘জয়’, ভীমের নাম ‘জয়ন্ত’, অর্জুনের নাম ‘বিজয়’, নকুলের নাম ‘জয়ৎসেন’ ও সহদেবের নাম হল ‘জয়দ্বল’। এইসমস্ত নাম শুধু পান্ডবরা ও দ্রৌপদী ছাড়া কেউই জানবে না। এইভাবে প্রস্তুতি নিয়ে তাঁরা নগরে প্রবেশ করে যে যার নিজের কাজে ব্যস্ত হলেন। কৌরবরা হাজার খোঁজ করেও তাঁদের কোনো খবর পেলেন না।

কিন্তু বিরাট রাজের সেনাপতি ও রাণী সুদেষ্ণার ভাই কীচক দাসীবেশে দ্রৌপদীর সৌন্দর্য্য দেখে অত্যন্ত মুগ্ধ হয়ে দ্রৌপদীকে শয্যাসঙ্গিনী করার জন্য উন্মাদ হয়ে ওঠে। তার অত্যাচার সইতে না পেরে দ্রৌপদী ভীমের শরণাপন্ন হন ও একদিন গভীর রাতে সকলের অজান্তে ভীম কীচককে বধ করেন। এদিকে প্রবল পরাক্রমী কীচকের মৃত্যুর কথা জানতে পেরে উল্লসিত ত্রিগর্তরাজ সুশর্মা কৌরবদের সাহায্যে মৎস্যদেশ আক্রমণ করে বসেন। মহারাজ বিরাট যুদ্ধযাত্রা করলে অর্জুন ছাড়া বাকি চার পান্ডবও তাঁকে সাহায্য করার জন্য যুদ্ধে যান। অর্জুন অন্তঃপুরে থাকার জন্য যেতে পারেন না। উভয়পক্ষে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়।

এদিকে এইসময় কৌরবসৈন্যরা এসে বিরাটরাজের গোশালা আক্রমণ করে অসংখ্য গোরুকে ধরে নিয়ে যায়। বাধ্য হয়ে বৃহন্নলাবেশী অর্জুনকে সারথি করে রাজপুত্র উত্তর কৌরবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যান। কিন্তু কৌরবদের বিশাল সৈন্যবাহিনী দেখে ছেলেমানুষ উত্তর ভয় পেয়ে গেলে অর্জুন নিজের পরিচয় দিয়ে যোদ্ধার বেশে উত্তরকে সারথি করে নিজে যুদ্ধ করতে যান। উত্তর সেই শমী গাছ থেকে অস্ত্র নামিয়ে আনেন এবং তারপর কৌরবদের সঙ্গে অর্জুনের যুদ্ধ শুরু হয়। প্রবল যুদ্ধ হওয়ার পর কৌরবরা হেরে গিয়ে পালিয়ে যান ও গোরুগুলি নিয়ে অর্জুন আবার বৃহন্নলা বেশ ধারণ করে উত্তরকে নিয়ে রাজপুরীতে ফিরে আসেন।

এইভাবে পান্ডবদের একবছরের অজ্ঞাতবাস সফলভাবেই শেষ হয়। অজ্ঞাতবাসের শেষে পান্ডবদের আসল পরিচয় পেয়ে মহারাজ বিরাট অত্যন্ত খুশি হন ও রাজকন্যা উত্তরার সঙ্গে অর্জুনের বিবাহ দেওয়ার প্রস্তাব করেন। কিন্তু অর্জুন এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তাঁর পুত্র অভিমন্যুর সাথে উত্তরার বিবাহ দেওয়ার কথা বলেন। সর্বসম্মতিক্রমে অভিমন্যু ও উত্তরার বিবাহ সম্পন্ন হয়। সারা ভারত জানতে পারে পান্ডবদের কথা।

তথ্যসূত্র


  1.  ‘মহাভারত’, শ্রী কালীপ্রসন্ন সিংহ, বনপর্ব ও বিরাটপর্ব, পৃষ্ঠা ৩৯১-৮৯০
  2. ‘উপেন্দ্রকিশোর রচনাসমগ্র’,উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, ‘ছেলেদের মহাভারত’, বসাক বুক স্টোর প্রাইভেট লিমিটেড, তৃতীয় সংস্করণ, বনপর্ব ও বিরাটপর্ব, পৃষ্ঠা ২২৫-২৫৫

1 Comment

1 Comment

  1. Pingback: দেউরি মন্দির | সববাংলায়

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

মনোরথ দ্বিতীয়া ব্রতকথা নিয়ে জানতে


মনোরথ দ্বিতীয়া

ছবিতে ক্লিক করুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন