ইতিহাস

জোসেফ ফুরিয়ে

জোসেফ ফুরিয়ে

গণিতবিদ্যার ইতিহাসে যেসমস্ত গণিতবিদ তাঁদের মেধা এবং অধ্যবসায়ের সাহায্যে গণিতশাস্ত্রের বৈচিত্র্যপূর্ণ ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ফরাসি গণিতবিদ জোসেফ ফুরিয়ে (Joseph Fourier)। অবশ্য কেবল গণিতবিদ হিসেবে নয়, একজন পদার্থবিদ হিসেবেও তাঁর পরিচিতি বিশ্বজোড়া। গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানের একজন বিশেষজ্ঞ বলা যায় তাঁকে। তাপীয় পরিবহনের গাণিতিক তত্ত্ব প্রদানের জন্য এবং ত্রিকোণমিতিক ফাংশনগুলির সিরিজ ব্যবহারের জন্য তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন। কীভাবে কঠিন দেহে তাপের পরিবাহিতাকে অসীম গাণিতিক ধারার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে, তাই-ই ফুরিয়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য গবেষণা যা ‘ফুরিয়ে সিরিজ’ নামে পরিচিত। বিজ্ঞানের জগতে যা কিনা ‘গ্রিন হাউস এফেক্ট’ নামে পরিচিত, সে বিষয়ক প্রস্তাবেরও নেপথ্য কাণ্ডারি ছিলেন তিনি। ফরাসি বিপ্লবের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে রাজনীতিতে যোগদান করেছিলেন তিনি। ফরাসি বিপ্লবের প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন জোসেফ ফুরিয়ে। বহুবার কারাবাস এমনকি মৃত্যুদণ্ড থেকেও অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছিলেন তিনি। নেপোলিয়নের মিশর অভিযানের অংশ ছিলেন ফুরিয়ে। প্যারিসের বিখ্যাত আইফেল টাওয়ারে তাঁর নাম আজও খোদাই করা আছে।

১৭৬৮ সালের ২১ মার্চ ফ্রান্সের ইয়োন ডিপার্টমেন্টের অক্সেরেতে জোসেফ ফুরিয়ের জন্ম হয়। তিনি এক দর্জির সন্তান ছিলেন। তাঁর বাবার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী-এর সন্তান ছিলেন জোসেফ। এই দ্বিতীয় পক্ষের সর্বমোট বারোটি সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন নবম সন্তান। যখন তাঁর নয় বছর বয়স, সেই সময় ফুরিয়ের মায়ের মৃত্যু হয় এবং ঠিক তার পরের বছর তাঁর পিতৃবিয়োগ ঘটে।

অনাথ জোসেফ অক্সেরের ক্যাথিড্রাল থেকে মিউজিক মাস্টার দ্বারা পরিচালিত প্যালেইস স্কুল থেকে তাঁর শিক্ষা শুরু করেছিলেন। সেখানে জোসেফ লাতিন এবং ফরাসি ভাষা অধ্যয়ন করেছিলেন। মাত্র দশ বছর বয়সে বাবা-মা উভয়কেই হারানোর পরে তিনি কাকা-কাকির কাছে বেড়ে ওঠেন। পড়াশোনায় নিজের অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করেন এবং বিশপের সুপারিশে ও কাকা-কাকির প্রচেষ্টায় ১৭৮০ সালে জোসেফ সেন্ট মার্কের ‘বেনেডিক্টাইন অর্ডার অফ দ্য কনভেন্ট’ দ্বারা পরিচালিত একটি সামরিক স্কুল অক্সেরের ইকোলে রয়্যাল মিলিটেয়ারে অধ্যয়নের জন্য তিনি প্রবেশের সুযোগ লাভ করেন। সাহিত্যের প্রতি তাঁর অগাধ ভালবাসা লক্ষ্য করা গেলেও ১৭৮১ সালের মধ্যে গণিতের প্রতি প্রবল আকর্ষণ ও গভীর আগ্রহ তৈরি হয়ে গিয়েছিল তাঁর মধ্যে। ১৩ বছর বয়সেই উচ্চতর গণিতের সঙ্গে পরিচিত হন তিনি। বলা হয় যে, তাঁর উৎসাহ এতখানিই ছিল যে, তিনি মোমবাতি সংগ্রহ করে রাখতেন যাতে সারা রাত পড়াশোনা করতে পারেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি বেজউটের ‘কোর্স ডি ম্যাথমেটিক্স’-এর ছয়টি খণ্ডের অধ্যয়ন সম্পূর্ণ করেন। ১৭৮৩ সালে বোসুটের মেকানিক এন জেনারেলের অধ্যয়নের জন্য প্রথম পুরস্কার লাভ করেছিলেন তিনি।

ফুরিয়ে সামরিক বাহিনীতে যোগদানের কথা ভাবলেও, তাঁকে প্রত্যাখান করা হয়েছিল এই বলে যে তিনি মহৎ জন্মের অধিকারী নন। এরপর তিনি বেনেডিক্টাইন পুরোহিত হিসাবে জীবনযাপন করার জন্য প্রস্তুত হন। সেই উদ্দেশ্যেই ১৭৮৭ সালে স্কুল পাশ করার পরে পুরোহিত হওয়ার অভিপ্রায়ে সেন্ট বেনোইট-সুর-লোয়ারের বেনেডিক্টাইন অ্যাবেতে প্রবেশ করেন। কিন্তু তিনি পুরোহিত হতে চান কিনা সে বিষয়ে তাঁর নিজেরই সংশয় ছিল। ফলত ১৭৮৯ সালে দীক্ষা বা ব্রত না নিয়েই মঠ ত্যাগ করেন ফুরিয়ে। গণিত চর্চা তখন সমানে চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। অক্সেরের গণিতের অধ্যাপক সিএল বোনার্ডের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিলেন জোসেফ ফুরিয়ে। সেই সময় অ্যাকাডেমি রয়্যালে দেস সায়েন্সে বীজগণিতের সমীকরণের ওপর একটি গবেষণাপত্র পড়তে তিনি প্যারিস যান। এসময় বোনার্ডকে লেখা তাঁর চিঠিগুলি থেকেই জানতে পারা যায়, জোসেফ ফুরিয়ে গণিতশাস্ত্রে একটি বড়সড় প্রভাব ফেলতে চেয়েছিলেন। সামরিক কর্মক্ষেত্র থেকে প্রত্যাখাত হয়ে যাজকত্বের প্রস্তুতি ছেড়ে দিয়ে ১৭৯০ সালে তিনি নিজেরই পূর্বতন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অক্সেলের ইকোলে রয়্যাল মিলিটেয়ারে গণিতের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এরপর কলেজ ন্যাশনালে জোসেফ কুরিয়ে সিএল বোনার্ডের সহকারী শিক্ষক হিসেবেও কাজ করেন।

ফ্রান্সে তখন ফরাসি বিপ্লব চলছিল। এই বিপ্লবের সমতাবাদী আদর্শের প্রতি ভীষণভাবে আকৃষ্ট হন তিনি। এই সময় ধীরে ধীরে রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন জোসেফ। রাজা এবং পুরোহিতদের শাসন থেকে দেশকে মুক্ত করার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। ১৭৯৩ সালে জোসেফ ফুরিয়ে স্থানীয় এক বিপ্লবী কমিটিতে যোগদান করেন। কিন্তু যখন সারা ফ্রান্সে সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসের রাজত্ব শুরু হয়, তখন নিজেকে এর থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেন তিনি, কিন্তু পারেন না। বিপ্লবের প্রথম চার বছর অক্সেরেই থাকেন তিনি। সেসময় তাঁকে অরলিন্সে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে থাকাকালীন একটি দলের সদস্যদের রক্ষা করেছিলেন জোসেফ ফুরিয়ে। তারপর পুনরায় অক্সেরে ফিরে এসে শিক্ষকতা করা শুরু করেন তিনি, কিন্তু ততদিনে তাঁর শত্রুর সংখ্যা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। ফরাসি বিপ্লবে সক্রিয় সমর্থন ও প্রচার এবং অরলিন্সের ঘটনার জন্য ১৭৯৪ সালের জুলাই মাসে তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং প্রায় নিশ্চিত ছিল যে তাঁকে গিলোটিনের সম্মুখীন হতে হবে অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত। রোবসপিয়ারের শিরশ্ছেদ হওয়ায় অবশ্য সে যাত্রায় বেঁচে গিয়েছিলেন জোসেফ।

বিপ্লব এবং সন্ত্রাসের কালে ফ্রান্সে শিক্ষকদের যথাযথভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য একটি কলেজ নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। এই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করেই ‘ইকোলে নরমাল’ নামে একটি শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান তৈরি হয় ১৭৯৪ সালে। সেবছরেই সেই প্রতিষ্ঠানের প্রথম ছাত্র হিসেবে মনোনীত হন জোসেফ ফুরিয়ে। ১৭৯৫ সালে এই প্রতিষ্ঠানটি খোলা হয়। সেখানে ল্যাগ্রেঞ্জ, ল্যাপ্লেস এবং মঙ্গের মতো বিশিষ্ট শিক্ষকদের কাছে অধ্যয়নের সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। এই ইনস্টিটিউটে প্রচারিত শিক্ষার ধরণ ছিল স্বৈরাচার বিরোধী। কোর্স শেষ হওয়ার পরেই জোসেফ ইকোলে নরমাল-এ একজন শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন, কিন্তু তারপরেই ইকোলে সেন্ট্রালে ডেস ট্রাভাক্স পাবলিকসে চলে যান তিনি এবং সেখানেই শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এই শেষোক্ত প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তীকালে ‘ইকোলে পলিটেকনিক’ নামে পরিচিত হয়। এসময় গ্যাসপার্ড মঙ্গের মতো বিশিষ্ট গণিতবিদদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে শুরু করেন তিনি। এসময় পুরোনো কারণের জন্যই তাঁকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, কিন্তু ততদিনে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, পরিবেশ বদলে গিয়েছিল। ফলে, বিশিষ্ট পণ্ডিতদের পাশাপাশি ছাত্ররাও তাঁর মুক্তির দাবি করেছিল। ১৭৯৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি মুক্তি পান এবং ইকোলে পলিটেকনিকে শিক্ষকতায় ফিরে যান। ১৭৯৭ সালে ল্যাগ্রেঞ্জের স্থলাভিষিক্ত হয়ে অ্যানালিসিস ও মেকানিকসের চেয়ারে নিযুক্ত হন তিনি। খুব অল্প সময়েই একজন অসামান্য প্রভাষক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন জোসেফ।

১৭৯৮ সালে মিশর অভিযানে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সেনাবাহিনীতে বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হিসেবে গিয়েছিলেন জোসেফ ফুরিয়ে। তাঁকে গণিত বিভাগে নিযুক্ত করা হয়েছিল যাতে স্বয়ং নেপোলিয়নও ছিলেন। দুর্দান্ত কৌশলে ও কূটনৈতিক বুদ্ধির সাহায্যে নেপোলিয়নের একজন প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন তিনি৷ সেই মিশর অভিযান প্রথম পর্যায়ে সাফল্য লাভ করেছিল। ১৭৯৮ সালের ১০ জুন মাল্টা দখল করে নেন নেপোলিয়ন। মিশর দখলের সঙ্গে সঙ্গে জোসেফ ফুরিয়ে ইনস্টিটিউট ডি’ইজিপ্টের সচিব নিযুক্ত হন। নীলনদের ব-দ্বীপও প্রথমে হাতের মুঠোয় এসে গেলেও ১৭৯৮-এর ১ আগস্ট নীলনদের যুদ্ধে নেলসনের নৌ-বহর, ফরাসি নৌবহরকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়৷ সেসময় জোসেফ ফুরিয়ে ফরাসি সৈন্যদের জন্য কর্মশালা গঠন করতে সময় ব্যয় করেছিলেন। এছাড়াও সেদেশে শিক্ষাগত সুবিধার জন্য বেশ কিছু প্রচেষ্টা এবং প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান চালাতে সহায়তা করেছিলেন তিনি। কায়রোতে থাকাকালীন জোসেফ কায়রো ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছিলেন এবং সেই প্রতিষ্ঠানের গণিত বিভাগের বারোজন সদস্যের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন। সেই ইনস্টিটিউটের সেক্রেটারিও নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি এবং যতদিন মিশরে ফরাসি দখল কায়েম ছিল ততদিন এই পদ ধরে রেখেছিলেন তিনি।

সেনাবাহিনী ত্যাগ করে ১৭৯৯ সালে নেপোলিয়ন প্যারিসে ফিরে আসেন এবং শীঘ্রই ফ্রান্সে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দখল করেন। জোসেফ ফুরিয়ে ১৮০১ সালে সেনাবাহিনীর অবশিষ্টাংশ নিয়ে ফ্রান্সে ফিরে আসেন এবং ইকোলে পলিটেকনিকের অ্যানালিসিসের অধ্যাপক হিসেবে পুনরায় কাজ শুরু করেন। পাশাপাশি তাঁকে মিশরে সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ কাগজপত্র প্রকাশের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কাজটি পরবর্তীতে ‘ডেসক্রিপশন ডি ল’ইজিপ্টে’ নামে প্রকাশিত ও পরিচিত হয়। সেখানে প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক ভূমিকা তিনি যুক্ত করে দেন।

১৮০২ সালে নেপোলিয়ন জোসেফকে ইসেরে বিভাগের ‘প্রিফেক্ট’ হিসেবে নিযুক্ত করেন। যদিও চাকরিতে আগ্রহ ছিল না তাঁর, কিন্তু নেপোলিয়নকে প্রত্যাখান করতে পারেননি তিনি৷ এই কাজের জন্য গ্রেনোবলে স্থানান্তরিত হতে হয় তাঁকে এবং ১৮১৪ সাল পর্যন্ত এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি। গ্রেনোবলে দুর্দান্ত প্রশাসনিক ক্ষমতা দেখিয়েছিলেন জোসেফ। সেখানে তাঁর উল্লেখযোগ্য দুটি কৃতিত্ব হল বুরগোইনের জলাভূমির নিষ্কাশন এবং গ্রেনোবল থেকে তুরিন পর্যন্ত একটি নতুন হাইওয়ে নির্মাণ। এছাড়াও যুদ্ধরত রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে শান্তি আনয়নের চেষ্টা করেছিলেন তিনি। এসময় একই সঙ্গে গণিতের উপর কাজ চালিয়ে যান জোসেফ। গ্রেনোবলে থাকাকালীনই ১৮০৪ সালে তিনি তাপের প্রসারণের উপরে তাঁর গবেষণা শুরু করেছিলেন। ১৮০৭ সালের ২১ ডিসেম্বর ফ্রেঞ্চ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সে ‘অন দ্য প্রোপাগেশন অফ হিট ইন সলিড বডিস’ শিরোনামে প্রথম গবেষণাপত্র জমা দেন তিনি। কঠিন দেহে তাপের প্রসারণ বিষয়ক গবেষণা ছিল সেটি। নিউটনের শীতলতার সূত্রের ওপর ভিত্তি করে নিজস্ব যুক্তির সাহায্যে তিনি দেখান যে, দুটি সন্নিহিত কণার মধ্যে তাপের প্রবাহ তাপমাত্রার পার্থক্যের সমানুপাতিক। তিনি একটি মৌলিক সমীকরণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যার সাহায্যে তাপের প্রসারণ বা ছড়িয়ে পড়াকে নির্ণয় করা যায় এবং ত্রিকোণমিতিক ফাংশনের অসীম সিরিজ ব্যবহারের সমাধানও করেছিলেন তিনি। এটিই বর্তমানে ‘ফুরিয়ে সিরিজ’ নামে পরিচিত। কিন্তু এই গবেষণাটিকে সেসময়ের নেতৃস্থানীয় গণিতবিদ ল্যাগ্রেঞ্জ এবং ল্যাপ্লেস  সমালোচনা করেছিলেন। তা সত্ত্বেও প্যারিস ইনস্টিটিউট যখন ১৮১১ সালে কঠিন শরীরে কীভাবে তাপের সম্প্রসারণ ঘটে, সেই বিষয়ের ওপর একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করে তখন জোসেফের স্মৃতিকথাধর্মী গবেষণাপত্রটি পুরস্কৃত হয়।

প্রথমবারের মতো ক্ষমতাচ্যুত হয়ে আলবাতে নির্বাসনের জীবন যখন কাটাচ্ছিলেন, তখন নেপোলিয়ন নিজে সেনা গঠন করে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। ১৮১৫ সালের মার্চ মাসে জোসেফকে গ্রেপ্তার করে নেপোলিয়ন তাঁর সদর দফতরে নিয়ে আসেন। জোসেফের ওপর খুব হতাশ হয়েছিলেন তিনি, কারণ তাঁর ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পক্ষে সায় দেননি জোসেফ। গ্রেনোবলের পদ থেকে তাঁকে অপসারণ করে ছয় হাজার ফ্রাঙ্কের বার্ষিক বেতন দিয়ে রোনের প্রিফেক্ট হিসাবে একটি নতুন পদে নিয়োগ করেছিলেন নেপোলিয়ন। খুব শীঘ্রই আবার ক্ষমতাচ্যুত করা হয় বোনাপার্টকে, তখন জোসেফকে সেইনের পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিচালক হিসেবে প্যারিসে আনা হয়। ১৮১৭ সালে ফ্রান্সের অ্যাকাডেমি ডেস সায়েন্সে নির্বাচিত হন এবং পরবর্তীকালে এর সেক্রেটারির পদও অলঙ্কৃত করেন। অনেক নিন্দা সমালোচনার জন্য প্রকাশে সমস্যা হলেও অবশেষে ১৮২২ সালে জোসেফ তাঁর তাপীয় পরিবহনের তত্ত্ব ‘থিওরি অ্যানালাইটিক দে লা চালেউর’ (The Analytic Theory of Heat) প্রকাশিত হয়।

জোসেফ ফুরিয়ে হলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি গাণিতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পৃথিবীর তাপমাত্রা অধ্যয়ন করেছিলেন। তিনি দিন ও রাতের মধ্যে এবং গ্রীষ্ম ও শীতের মধ্যে তাপমাত্রার তারতম্য পরীক্ষা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে পৃথিবী শুধু বিকিরণের দ্বারা উত্তপ্ত হলে আরও ঠাণ্ডা হওয়া উচিত ছিল। ১৮২৭ সালে তিনি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের নিরোধক ক্ষমতার কথা বলেন। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের কিছু গ্যাস সূর্য থেকে আগত রশ্মির ধরে রেখে পৃথিবীপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এই ঘটনা পরবর্তীকালে ‘গ্রিন হাউজ এফেক্ট’ নামে পরিচিত হয়। এছাড়াও ফুরিয়ের উপপাদ্য, বীজগণিত, তাপ সঞ্চালনের সূত্র, ফুরিয়ে অপটিক্স, ফুরিয়ে সংখ্যা, ফুরিয়ে ট্রান্সফর্ম স্পেকট্রোস্কোপি ইত্যাদি পদার্থবিদ্যা ও গণিতেও তাঁর অবদানকে মনে করায়। ১৮৩০ সালে মৃত্যুর কিছুদিন আগে জোসেফ ফুরিয়ে ‘রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস’-এর একজন বিদেশি সদস্য নির্বাচিত হন।

১৮৩০ সালের ১৬ মে প্যারিসে জোসেফ ফুরিয়ের মৃত্যু হয়।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়