ইসলামের বর্ণনা অনুযায়ী কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর সব মানুষের ভাল কর্ম ও অপকর্মের বিচার করবেন। সেই বিচারের ভিত্তিতেই কোন ব্যক্তির চিরদিনের জান্নাত বা জাহান্নাম নসিব হবে। এই দিনটিকে কেয়ামতের দিন বলেও উল্লেখ করা হয়।
ইসলামে বলা হয়েছে মানুষের জীবনে মৃত্যু যেমন নিশ্চিত, তেমনই সকলের জীবনেই কিয়ামতের দিনও নিশ্চিত করা আছে। এই পৃথিবী সেদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। সকলকেই উপস্থিত হতে হবে মহান রাব্বুল আলামীন আল্লাহর কাছে। তারপর কেউ যাবে জান্নাতে, কেউ যাবে জাহান্নামে, যেখানে তারা স্থায়ীভাবে বাস করবে। কেউ কিয়ামতের দিনের বিচার এড়িয়ে যেতে পারবে না। যারা মারা গেছে তাদের কবর থেকে তুলে আনা হবে। সবাইকে তুলে এনে সাদা পোড়ামাটি রংয়ের উদ্ভিদহীন একটি জায়গায় দাঁড় করানো হবে। সেইদিনে পৃথিবীতে অবস্থিত সব মানুষদের বিচার হবে। সবার পাপ ও পুণ্যের হিসাব হবে। সেই হিসাব অনুযায়ী পাপীদের জাহান্নামে পাঠানো হবে এবং সেখানে শাস্তি প্রদান করা হবে। আর যারা পুণ্যবান ব্যক্তি তাদের জান্নাতে পাঠিয়ে পুরস্কার দেয়া হবে।
এদিন কেউ কাউকে চিনতে পারবে না। মা সন্তানদের চিনবে না, স্বামী স্ত্রী পরস্পর পরস্পরকে চিনবে না, প্রতিবেশী একে অপরকে চিনবে না। পবিত্র কোরানের সূরা আবাসার আয়াত ৩৪ থেকে ৩৭-এ বলা হয়েছে, “আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, সেদিন মানুষ নিজের সন্তানকে রেখে পালিয়ে যাবে। তাদের মধ্যে প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর সেদিন এমন বিপদ নেমে আসবে যে- তখন নিজেকে ছাড়া আর কারও দিকে তাকানোর মত অবস্থা থাকবে না।” হজরত মহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “কিয়ামতের দিন মানুষ উলঙ্গ হয়ে খতনাহীন অবস্থায় কবর থেকে উঠে হাশরের ময়দানে এসে দাঁড়াবে।” এই কথা শুনে হজরত আয়েশা (রা.) তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! নারী-পুরুষ সবাই কি উলঙ্গ থাকবে? এমন হলে তো খুবই লজ্জার ব্যাপার।” উত্তরে হজরত মহাম্মদ (সা.) বলেছিলেন, “হে আয়েশা! সে দিনের পরিস্থিতি এতই ভয়ঙ্কর হবে, কেউ কারও দিকে তাকানোর কথা কল্পনাও করতে পারবে না।”
একজন মানুষের যখন মৃত্যু হয়, তখনই ছোট কিয়ামত তার ওপর কায়েম হয়ে যায়। মৃত ব্যক্তিকে কবর দেওয়ার পর প্রতিদিন সকালে ও বিকেলে তাকে তার অন্তিম ঠিকানা দেখানো হয়। যদি সে জাহান্নামী হয় তবে তাকে জাহান্নাম দেখানো হয় এবং যদি সে জান্নাতী হয়, তাহলে তাকে জান্নাত দেখানো হয়। তাকে কবরস্থ করা থেকে কিয়ামতের দিনে তাকে ওঠানো পর্যন্ত সময়টা হল বরযখী জীবন। মৃত্যুর পর তাঁকে তিনটি প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। এ বিষয়ে হাদিস শরিফে আছে, “দেহ হয়তো বিলীন হয়ে যাবে, নয়তো সুরক্ষিত থাকবে। এখানে প্রশ্ন হবে: তোমার রব কে? তোমার দ্বীন কী? তোমার নবী কে?” এই প্রশ্নগুলির সঠিক উত্তর দিতে হবে। একজন খাঁটি মুসলিম এবং আল্লাহ তায়ালার ওপর বিশ্বাসকারী ব্যক্তি সঠিক উত্তর দিয়ে বলবেন “আমার রব আল্লাহ, আমার দ্বীন ইসলাম এবং আমার নবী হজরত মহম্মদ (সা.)।”
যখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নির্ধারিত সময় আসবে তখনই হবে কিয়ামতের দিন। তিনি কিয়ামত ঘটানোর জন্য ফেরেশতাকে শিঙায় ফুঁ দিতে বলবেন। ফেরেশতা সেই কথামত যেই শিঙায় ফুঁ দেবে, তখন পৃথিবীর সবকিছু চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে এবং আকাশও টুকরো টুকরো হয়ে যাবে, গ্রহ-নক্ষত্র সব খসে পড়বে। শুরু হবে শেষ বিচার। ইমাম ইবনে তাইমীয়া (রঃ) হাদিসে কিয়ামতের দিন সম্পর্কে বিশদে বর্ণনা করেছেন যে সেই দিন কী কী হবে।
সূর্য নিকটবর্তী হবে – কিয়ামতের দিন সূর্য মানুষের একদম মাথার কাছে চলে আসবে। এইদিন সূর্যের তাপে মানুষের শরীর থেকে নির্গত ঘামে চারিদিক ভরে যাবে। সেই ঘামের জলে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষেরা নাক ও মুখ পর্যন্ত ডুবে থাকবে। মানুষ তখন কথা বলতে পারবে না। অধিকাংশ মানুষই সূর্যের এই প্রচণ্ড তাপ অনুভব করবে। তবে আল্লাহ তায়ালা যাদেরকে এর বাইরে রাখতে চান, তারা এর বাইরে থাকবে। । যেমন নবীরা এই প্রখর তাপে থাকবেন না।
সহীহ মুসলিমে মিকদাদ (রাঃ) বলেছেন, “আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি যখন কিয়ামতের দিন আসবে, তখন সূর্যকে বান্দাদের নিকটবর্তী করা হবে। এত নিকটবর্তী করা হবে যে, তাদের মাঝে এবং সূর্যের মাঝে মাত্র এক বা দুই মাইলের ব্যবধান থাকবে।”
আমলসমূহ মাপার জন্য দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করা হবে – কিয়ামতের দিন দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করা হবে। এই দাঁড়িপাল্লা দ্বারা মানুষের ভাল ও মন্দ আমলসমূহ ওজন করা হবে। আর এই দাঁড়িপাল্লার দু’টি পাল্লা এবং একটি কাঁটা থাকবে। যাদের ভাল কর্মের পাল্লা ভারী হবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যাদের খারাপ কর্মের পাল্লা ভারী হবে তাদেরকে জাহান্নামে ছুঁড়ে ফেলা হবে।
আমলনামা উন্মুক্ত করা হবে – কিয়ামতের দিন প্রতিটি মানুষের আমলনামা সকলের সামনে উন্মুক্ত করা হবে। প্রতিটি মানুষেরই ডান ও বাঁ কাঁধে দুজন ফেরেস্তা রয়েছেন, যাঁরা প্রতি মুহুর্তে মানুষের ভাল ও মন্দ কর্মের আমল লিখছেন। যখন মানুষটির মৃত্যু হয়, তখন তাঁর আমল লেখা বন্ধ হয়ে যায়। কিয়ামতের দিন হিসাব নেয়ার সময় খোলা হবে সেই আমলনামা। যাতে প্রত্যেক মানুষ তার আমলনামা দেখতে পারে এবং তাঁর পাপ ও পুণ্যের কাজ সম্পর্কে জানতে পারে।
এ বিষয়ে সূরা বানী ইসরাঈল এর আয়াত ১৩ থেকে ১৪ তে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “প্রত্যেক মানুষের ভালমন্দ কাজের আমলনামা আমি তার গলায় ঝুলিয়ে দেব এবং তার জন্য একটি কিতাব দেব যেটা সে খোলা অবস্থায় পাবে। তাকে বলা হবে, নিজের আমলনামা নিজেই পড়। আজ নিজের হিসাব করার জন্য তুমি নিজেই যথেষ্ট।” এই আমলনামা কেউ নেবে ডান হাতে আর কেউ নেবে বাঁ হাতে। এ বিষয়ে উল্লেখ করা আছে যে, ডান হাতে আমলনামা গ্রহণ করবে মুমিন ব্যক্তিরা আর বাঁ হাতে অথবা পিছন দিক থেকে আমলনামা হাতে নেবে কাফেররা।
মানুষের হিসাব নেওয়া হবে – কিয়ামতের দিন প্রতিটি ব্যক্তিকে তাঁর ভাল ও মন্দ কাজের ব্যাপারে স্মরণ করিয়ে দেওয়াই হল হিসাব। যাদের ভাল কর্মের হিসাব বেশি হবে, তাদের জান্নাত দেওয়া হবে। যাদের মন্দ কর্ম বেশি হবে, তাদের দেওয়া হবে জাহান্নাম। তবে দুইটি হিসাব ভিন্নভাবে হবে। প্রথমত মুমিন ব্যক্তিরা বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। কাফেরদের কিয়ামতের দিন কোন ভাল আমলই থাকবে না। দুনিয়ায় তারা যে পাপ কাজ করেছে সেই আমলের জন্য শাস্তি দেওয়া হবে।
কিয়ামতের দিন প্রত্যেক মানুষকে প্রশ্ন করা হবে পাঁচটি। জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী ছিল? যৌবনকাল সে কীভাবে কাটিয়েছে? কীভাবে আয়-উপার্জন করেছে? কোন পথে ব্যয় করেছে? জ্ঞান বা বিবেক অনুসারে কর্ম করেছে কি না? জাহান্নামের শাস্তি থেকে নিজেকে বাঁচাতে হলে, এই প্রশ্নের উত্তর যথাযথভাবে দিতে হবে। তাই পৃথিবীতেই সেই ভাল কর্মগুলি করে রাখতে হবে। কারণ মনে রাখতে হবে ইসলামের বর্ণনা অনুযায়ী কিয়ামতের দিন কিন্তু তার বিচার হবে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান