ইতিহাস

জুলিয়াস সিজার

জুলিয়াস সিজার (Julius Caesar) ছিলেন একজন বিখ্যাত রোমান রাজনীতিবিদ, সেনাপতি ও জনপ্রিয় রোমান সম্রাট। রোম প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ও রোম সাম্রাজ্যের বিস্তারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন একমাত্র রোমান জেনারেল যিনি রোমান সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন ইংলিশ চ্যানেল, রাইন নদী থেকে সুদূর তিনি ইংল্যান্ড অবধি।

খ্রিষ্টপূর্ব ১০০ অব্দে ১৩ জুলাই প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের সম্ভ্রান্ত পরিবারে জুলিয়াস সিজারের  জন্ম হয়। বলা হয় তিনি ছিলেন ট্রোজান রাজকুমার ঈয়েনেয়াস-এর বংশধর। তাঁর বাবা গাইয়ুস জুলিয়াস সিজার (Gaius Julius Caesar) ছিলেন রোমান সিনেটর। মায়ের নাম ছিল অরেলিয়া কোট্টা (Aurelia Cotta)। 

জুলিয়াস সিজারের প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয় গৃহশিক্ষক অ্যান্টোনিওর কাছে৷ তিনি ৬ বছর বয়স থেকে রোমান আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন। ১৬ বছর বয়সে তাঁর বাবা মারা গেলে তিনি পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন।

জুলিয়াস সিজারের কর্মজীবন বলতে তাঁর রাজ্যজয় এবং রোমান সম্রাট হিসেবে খ্যাতির কথা বলতে হয়। ১৭ বছর বয়সে রোমের একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদের মেয়ে কর্নেলিয়াকে বিয়ে করেন সিজার। সেই সময় রোমের শাসক ছিলেন সুলা যার সঙ্গে সিজারের পরিবারিক শত্রুতা ছিল। শাসক সুলার প্রভাব থেকে দূরে থাকতে তরুন বয়সেই সিজার সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং রোম ছেড়ে চলে যান। জুলিয়াস সিজার এই সময় সিভিক ক্রাউন পুরস্কার লাভ করেছিলেন৷  সুলারের মৃত্যুর পর সিজার রোমে ফিরে আসেন। সিজার দ্রুত সেনাবাহিনীর উচ্চপদে পদোন্নতির সাথে সাথে এবং রোম সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে সুনাম অর্জন করেন।

ধীরে ধীরে পম্পেই ও ক্রেটা সহ রোমের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তিনি বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন। সিজার খুব ভালো বক্তৃতা দিতে পারতেন। তাঁর বক্তৃতা জনগনকে উচ্ছ্বসিত করত ৷  ৪০ বছর বয়সে তিনি রোম সরকারের দ্বারা রোম প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ পদ ‘কনসাল’-এ নির্বাচিত হন। ‘কনসাল’ হিসেবে দায়িত্বপালনের পর তিনি গল প্রদেশের গভর্নর নিযুক্ত হন। গল জাতি পো নদীর অববাহিকায় বসতি স্থাপন করেছিল। গলদের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠিগুলো পরস্পরের শত্রু ছিল। সিজার যখন গল-এর শাসনকর্তা হন, তার আগে পর্যন্ত  কেবলমাত্র পো নদীর অববাহিকা আর ভূ-মধ্য সাগরীয় উপত্যকার কিছু অংশ রোমানদের অধিকারে ছিল। তিনি গলদের অন্তর্দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে গল প্রদেশ অধিকারে আনার চেষ্টা করেন। যুদ্ধের শুরুতে রোমান বাহিনী Battle of Magetobriga  যুদ্ধে পরাজিত হয়। পরে সিজার নতুন কৌশলে এদের পরাজিত করেছিলেন।

এরপর থেকে রোমান বাহিনী গলদের সঙ্গে এক দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পরে। তারপরেও রোমান বাহিনী গলদের দমন করতে সমর্থ হন এবং রোমান সেনাবাহিনী গলদের পবিত্র স্থানের অর্থভাণ্ডার লুট করেন। সিজার ঐ লুটের মাল দিয়ে সেনাদের বেতন বাড়িয়ে দিলেন এবং একই সঙ্গে তিনি তাদেরকে ভূ-সম্পত্তি বণ্টন করার প্রতিশ্রুতিও দান করলেন। এভাবে সিজারের একটি সম্পূর্ণ আজ্ঞানুবর্তী এক শক্তিশালী সেনাবাহিনী তৈরি হয়ে যায়। গভর্নর হিসেবে রোমের চারটি বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করতেন সিজার। তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতেন এবং গলের জনগণের মন জয় করেন। ফলে পম্পের পাশাপাশি সিজারকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ রোমান সেনাপতি হিসেবে সম্মান জানায় রোমানরা। খ্রিষ্টপূর্ব ৭৫ অব্দের একবার ভ্রমণ শেষে গ্রীসে ফেরার সময় এজিয়ান সাগরে জলদস্যুরা সিজারকে বন্দী করে নেয় এবং মুক্তিপণ দাবি করে। শোনা যায় যে, নিজের সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণকারী সিজারকে যখন বলা হয় যে তাকে ২০ ট্যালেন্টস (প্রাচীন মুদ্রার মাপ) এর বিনিময়ে মুক্তি দেওয়া হবে, তিনি জলদস্যুদের বলেন যে তাঁর দাম অন্তত ৫০ ট্যালেন্টস। জলদস্যুদের হাতে বন্দী থাকাকালীন সময়ে জলদস্যুদের সঙ্গে তাঁর সখ্যতা গড়ে ওঠে। শোনা যায় যে তিনি প্রায়ই জলদস্যুদের বলতেন, মুক্তি পাওয়ার পর তিনি তাঁর ও তাঁর পরিবারের সম্মান ক্ষুণ্ণ করার জন্য জলদস্যুদের ধরে ক্রুশবিদ্ধ করবেন। কিন্তু জলদস্যুরা তাঁর কথা কৌতুক ভেবে উড়িয়ে দিতেন। তবে মুক্তির পর তিনি সত্যি সত্যিই তাঁর কথা রেখেছিলেন। তবে তাঁর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করার জন্য দয়া বশত তিনি ক্রুশবিদ্ধ করার আগে জলদস্যুদের গলা কেটে দেন।

এরই মধ্যে পম্পেই বলকান উপদ্বীপে বিরাট এক বাহিনী গঠন করেন৷ খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮ অব্দে পম্পেইয়ের সঙ্গে লড়াইয়ে সিজারের জয় হয়৷ কিন্তু এই জয় সহজে হয় নি। পম্পেই পালিয়ে মিশর চলে যান। তাঁকে ধরতে মিশর যান সিজার। সেখানে মিশরের রাজা পম্পেইকে হত্যা করে তাঁর খন্ডিত মাথা সিজারকে উপহার হিসেবে দেন। মিশরে থাকাকালীন তিনি সেখানকার সহ-শাসক ক্লিওপেট্রার প্রেমে পড়েছিলেন। সিজারের সহায়তায় ক্লিওপেট্রা মিশরের সিংহাসন জয় করেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮ অব্দে পুনরায় তিনি রোমের একনায়ক হিসাবে দশ বছরের জন্য নির্বাচিত হন। সিজার ছিলেন বিশ্বের সবেচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একজন। নিজ হাতে শাসনভার নেওয়ার পর সিজার সম্পূর্ণ রোম শহরের রূপ বদলে দেন। তিনি রোমে অসংখ্য বড় বড় অট্টালিকা ও গির্জা নির্মাণ করেন। একই সঙ্গে তিনি রোমান ক্যালেন্ডার পরিবর্তন করে ৩৬৫ দিনে বছর গণনা করে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার ও লিপ ইয়ারের প্রবর্তন করেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৪ অব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি আমরণ একনায়ক পদ লাভ করেন। যদিও এবার তিনি বেশীদিন রাজত্ব করতে পারেননি৷ 

৪৪ খ্রিস্টপূর্বের ১৫ মার্চ জুলিয়াস সিজারের মৃত্যু হয়৷ খুব কম সময়ে তিনি খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছে গেছিলেন৷ সিজারের খ্যাতির কারণে তাঁর বিরুদ্ধে শুরু হয় ষড়যন্ত্র। ক্যাসিয়াস ও ব্রুটাসের নেতৃত্বে তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। ৪৪ খ্রিস্টপূর্বের ১৫ মার্চ তারিখে সিজার সিনেটে প্রবেশ করা মাত্রই তাঁকে এলোপাথাড়ি ছুরিকাঘাত করা হয়। প্রায় ২৩টি ছুরিকাঘাতের পর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন সম্রাট, শেষ হয় রোম সাম্রাজ্যের এজটি অধ্যায়ের৷  মৃত্যুর আগেই তিনি তাঁর সিংহাসনের উত্তরাধিকার করে গিয়েছিলেন অগাস্টাস-কে।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন