সববাংলায়

জ্যোতির্লিঙ্গ মহাকালেশ্বর 

মহাকালেশ্বর মন্দিরটি মধ্যপ্রদেশের প্রাচীন শহর উজ্জয়িনীতে অবস্থিত। পবিত্র শিপ্রা নদীর তীরে এই মন্দিরের অবস্থান। হিন্দুদের কাছে এই মন্দির খুবই তাৎপর্যপূর্ণ কারণ, শিবের বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে এই মন্দির অন্যতম। ভগবান শিব এখানে স্বয়ম্ভূ লিঙ্গাকারে বিরাজ করছেন। শুধু তাই নয় এই মন্দির ৫১টি সতীপীঠের একটি পীঠ এবং একে সতীপীঠ ভৈরব পর্বত নামে অভিহিত করা হয়। ভক্তরা বিশ্বাস করেন যে, যদি কেউ এই মন্দিরে শুদ্ধ মনে কিছু চায় তবে তার আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়। প্রতি বছর প্রায় লক্ষাধিক ভক্ত এবং সাধু-সন্ন্যাসীর দল এই মন্দির পরিদর্শনে যান।

শিবপুরাণ অনুযায়ী একদা ব্রহ্মা এবং বিষ্ণুর মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ তা নিয়ে দুজনের তুমুল বিবাদ উপস্থিত হয়। সেই বিবাদ সন্তোষজনক পরিণতিতে না পৌঁছে চলতেই থাকলে মহাদেব তখন একটি আলোকরশ্মির স্তম্ভ রূপে তাঁদের দুজনের মাঝখানে প্রকট হন। ব্রহ্মা এবং বিষ্ণু কেউই সেই আলোকস্তম্ভের আদি ও অন্ত খুঁজে পাননি। শেষমেশ তাঁরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, এই দিব্য জ্যোতিই শ্রেষ্ঠতম। এভাবেই জ্যোতির্লিঙ্গের ধারণাটির উদ্ভব হয়।

কিংবদন্তি অনুসারে, উজ্জয়িনীর শাসক শিবভক্ত চন্দ্রসেন সর্বদা শিবের উপাসনা করত। একদিন শ্রীকর নামে এক কৃষকের ছেলের খুব ইচ্ছে হয়, সে-ও শিবের উপাসনা করবে। সে শিবলিঙ্গের মূর্তি তৈরি করে শিবের আরাধনা শুরু করে। তারপর সে রাজার কাছে ছুটে গিয়ে তার সঙ্গে উপাসনায় যোগ দিতে চাইলে রাজরক্ষীরা তাকে বাধা দেয়। তারা এবং অন্যান্য প্রজারা তাকে শহরের বাইরে শিপ্রা নদীর তীরে রেখে আসে। এমনই এক সময়ে উজ্জয়িনীর প্রতিদ্বন্দ্বী পার্শ্ববর্তী রাজ্যের রাজা রিপুদমনা এবং রাজা সিংহাদিত্য উজ্জয়িনী আক্রমণ করে সেখানকার ধনসম্পদ লুঠ করবার পরিকল্পনা করছিল। তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিল ব্রহ্মার বরে পুষ্ট শক্তিশালী এক রাক্ষস দুশন। এই খবর শুনতে পেয়ে শ্রীকর ভগবান শিবের কাছে প্রার্থনা শুরু করে এবং সেই তার প্রার্থনা শুনে বৃদ্ধি নামক এক ব্রাহ্মণ রাজ্যের আসন্ন বিপদের কথা বুঝতে পারে। তখন সেই ব্রাহ্মণও শিপ্রা নদীর তীরে গিয়ে শিবের নিকট প্রার্থনা করতে থাকে। দুশন বাকিদের সাথে উজ্জয়িনী আক্রমণ করে এবং বহু ব্রাহ্মণকে তারা হত্যা করতে থাকে। তখন অসহায় ভক্তদের কাতর প্রার্থনা শুনে ভগবান শিব মহাকালরূপে সেখানে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং চন্দ্রসেনের শত্রুদের ধ্বংস করেছিলেন। এরপর সেই ছোট্ট বালক শ্রীকর এবং ব্রাহ্মণ বৃদ্ধির অনুরোধে মহাকাল সেই শহরে থাকতে রাজি হয়েছিলেন। কথিত আছে সেই থেকে মহাকাল শিব সেখানে মহাকালেশ্বর রূপে বিরাজ করছেন।

প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে ব্রহ্মা স্বয়ং এই মহাকালেশ্বর মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। ইতিহাস থেকে যেটুকু তথ্য পাওয়া যায় তাতে জানা যায় খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে উজ্জয়িনীর প্রাক্তন রাজা চাঁদ প্রদ্যোতের পুত্র কুমারসেন এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তীকালে দ্বাদশ শতাব্দীতে রাজা উদয়াদিত্য এবং রাজা নরবর্মনের সময় মন্দিরটির আরও কিছু অংশ নির্মিত হয়েছিল। তবে ১২৩৪ থেকে ১২৩৫ সালের মধ্যে ইলতুতমিস উজ্জয়িনী অভিযানের সময় এই মন্দিরটি ধ্বংস করেন। এমনকি জ্যোতির্লিঙ্গটিও ভেঙে পার্শ্ববর্তী পুকুর কোটিতীর্থ কুন্ডে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে ১৭৩৪ সালে বর্তমান মন্দিরটি নতুন করে নির্মিত হয়। প্রথম পেশোয়া বাজিরাও যখন মারাঠা সেনাপতি রনোজি শিন্ডেকে মালওয়া অঞ্চলে কর আদায়ের জন্য নিযুক্ত করেন তখন রনোজি শিন্ডে এই মন্দিরটিকে পুনরায় নির্মাণ করেছিলেন। রনোজি শিন্ডের দেওয়ান সুখতানকার রামচন্দ্র বাবা শেনাভি আঠারো শতকের চতুর্থ এবং পঞ্চম দশকে এই মন্দিরের সংস্কার করেন। পরবর্তীকালে মহাদজি শিন্ডে, দৌলত রাও শিন্ডের স্ত্রী বাইজা বাই প্রমুখ এই মন্দিরের নানাবিধ সংস্কার করেছিলেন। জয়াজিরাও শিন্ডের শাসনকালে তৎকালীন গোয়ালিয়র রাজ্যের বিভিন্ন অনুষ্ঠান এই মন্দিরে অনুষ্ঠিত হত। ভারতের স্বাধীনতার পরে মহাকালেশ্বর দেবস্থান ট্রাস্টের বদলে উজ্জয়িনীর মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছিল। বর্তমানে এই মন্দিরের দায়িত্ব উজ্জ্বয়িনীর কালেক্টরেট অফিসের ওপর রয়েছে।

মহাকালেশ্বর মন্দিরটি একাধারে মারাঠা, ভূমিজা এবং চালুক্য স্থাপত্য শৈলীর মিশ্রণে তৈরি। এটি একমাত্র জ্যোতির্লিঙ্গ যেখানে মন্দিরের লিঙ্গটি দক্ষিণমুখী। মন্দিরভবনটি চারদিক থেকে একটি সুুউচ্চ প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত। সেই সুবিশাল প্রাচীরের গায়ে ভগবান শিবের প্রশস্তি মন্ত্র, স্তোত্র এমনকি গানও খোদাই করা রয়েছে। মন্দির চত্বরে রয়েছে একটি পুকুর যা কোটিতীর্থ কুন্ড নামে পরিচিত।মন্দিরটি পাঁচটি স্তরে নির্মিত, যার একটি স্তর মাটির তলায় নির্মাণ করা হয়েছে। গর্ভগৃহে মহাকালেশ্বর লিঙ্গ রয়েছে। তার উপরের তলায় ওমকারেশ্বর লিঙ্গ রয়েছে এবং তিনতলায় রয়েছে নাগচন্দ্রেশ্বরের মূর্তি। শুধুমাত্র নাগপঞ্চমীর সময় দর্শনার্থীরা নাগচন্দ্রেশ্বরের মূর্তি দর্শন করতে পারে। কোটিতীর্থ কুন্ডের পূর্বদিকে একটি বড় আকারের বারান্দা রয়েছে, যেখানে গর্ভগৃহে যাওয়ার প্রবেশপথ রয়েছে। সেই বারান্দার উত্তরদিকের একটি কক্ষে শ্রী রাম ও দেবী অবন্তিকার মূর্তি রয়েছে। গর্ভগৃহের ছাদের দিকে তাকালে দেখা যাবে সেখানে অপূর্ব এক রুপোর পাত শোভা পাচ্ছে। এছাড়াও গর্ভগৃহের উত্তরে, পশ্চিম এবং পূর্বদিকে যথাক্রমে পার্বতী, গণেশ এবং কার্তিকের মূর্তি খোদাই করা আছে। দক্ষিণদিকে নন্দীর মূর্তি রয়েছে। বর্তমানে এই মহাকালেশ্বর মন্দিরের সম্প্রসারণ, সৌন্দর্যয়ানের জন্য মন্দিরের চারপাশে মহাকাল লোক করিডর নির্মাণ করা হয়েছে। এই করিডোরের দৈর্ঘ্য ৯০০ মিটারেরও বেশি এবং এখানে রয়েছে ১০৮টি স্তম্ভ, প্রায় ২০০টি মূর্তি এবং দেওয়ালে শিবের বিভিন্ন গল্প খোদাই করা রয়েছে।

মহাকালেশ্বর মন্দিরে নানারকম উৎসব, অনুষ্ঠান, আচারবিধি পালিত হয়ে থাকে। এরমধ্যে প্রথমেই যে নিত্যরীতির কথাটির উল্লেখ করা প্রয়োজন তা হল ভস্ম আরতি। প্রতিদিন  সূর্যোদয়ের আগে সাধারণত ভোর চারটে থেকে এই ভস্ম আরতি শুরু হয়। অগণিত ভক্ত এই আরতি দেখতে ভীড় করে। বিভিন্ন ঘাট থেকে আনা ছাইভস্ম দিয়ে এই আরতি করা হয়। মহাকালেশ্বর মন্দিরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হল মহাশিবরাত্রি। মোট নয়দিন ধরে মহাশিবরাত্রি ধুমধাম করে পালিত হয়ে থাকে। ভক্তদের বিশ্বাস যে, মহাশিবরাত্রির সময় যারা এই মহাকালেশ্বরের উপাসনা করে থাকেন তাদের কখনও দুঃখ স্পর্শ করতে পারে না এবং তারা মোক্ষলাভের পথে এগিয়ে যায়। নাগপঞ্চমীর সময়েই একমাত্র ভক্তরা মন্দিরের তিনতলায় বিরাজমান নাগচন্দ্রেশ্বরের দর্শন লাভ করতে পারে। এছাড়া বৈকুন্ঠ চতুর্দশী, দশেরা ইত্যাদি দিনে মহাকালের শোভাযাত্রা বেরোয়। শ্রাবণ মাসে অনুষ্ঠিত সওয়ারী উৎসবে মহাকালের মূর্তি নিয়ে ভক্তেরা শিপ্রা নদীর পাড়ে আসে। এছাড়াও অন্যান্য উৎসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল অন্নকূট, উমা-সাঁঝি উৎসব, হোলি ইত্যাদি।

এই মন্দির ভক্তদের কাছে খুবই পবিত্র। কেবল ভারত নয়, সমগ্র বিশ্ব থেকে ভক্তরা মহাকালেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শন করতে আসে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading