মল্লিকার্জুন মন্দিরটি ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের শ্রীশৈলমে অবস্থিত। এই মন্দিরকে শ্রী ভ্রমরম্বা মল্লিকার্জুন মন্দির নামেও অভিহিত করা হয়। কৃষ্ণা নদীর তীরে নল্লামালা পাহাড়ের চূড়ায় এই মন্দিরটি অবস্থিত। মন্দিরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪৫৭ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। ভগবান শিব ও পার্বতী এখানকার আরাধ্য দেবতা। হিন্দুদের কাছে এই মন্দির খুবই তাৎপর্যপূর্ণ কারণ, শিবের বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে এই মন্দির অন্যতম। শিব এখানে লিঙ্গ রূপে এবং পার্বতী ভ্রমরম্বা রূপে পূজিত হয়ে থাকেন। ভক্তরা বিশ্বাস করেন যে, এই মন্দির দর্শন করলে জীবন সুখ-সমৃদ্ধিতে ভরে যায়।
শিবপুরাণ অনুযায়ী একদা ব্রহ্মা এবং বিষ্ণুর মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ তা নিয়ে দুজনের তুমুল বিবাদ উপস্থিত হয়। সেই বিবাদ সন্তোষজনক পরিণতিতে না পৌঁছে চলতেই থাকলে মহাদেব তখন একটি আলোকরশ্মির স্তম্ভ রূপে তাঁদের দুজনের মাঝখানে প্রকট হন। ব্রহ্মা এবং বিষ্ণু কেউই সেই আলোকস্তম্ভের আদি ও অন্ত খুঁজে পাননি। শেষমেশ তাঁরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, এই দিব্য জ্যোতিই শ্রেষ্ঠতম। এভাবেই জ্যোতির্লিঙ্গের ধারণাটির উদ্ভব হয়।
মল্লিকার্জুনকে ঘিরে নানারকম কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। কথিত আছে যে, অমাবস্যার দিন ভগবান শিব এখানে অর্জুন রূপে এবং পূর্ণিমার দিন দেবী পার্বতী এখানে মল্লিকা রূপে আবির্ভূত হন, সেকারণেই এই মন্দিরের মল্লিকার্জুন নামকরণ হয়েছে। অন্য কিংবদন্তি অনুযায়ী, এখানে জুঁইফুল, যাকে তেলেগুতে মল্লিকা নামে ডাকা হয়, তা দিয়ে শিবলিঙ্গের পূজা করা হয় বলে এই মন্দির মল্লিকার্জুন নামে খ্যাত হয়েছে। এই জুঁইফুল দিয়ে পূজার নেপথ্যেও একটি কাহিনী রয়েছে। চন্দ্রাবতী নামে এক রাজার কন্যা পিতার কাছ থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। পাহাড়ের ওপর যেখানে চাকরদের সঙ্গে তিনি থাকতেন, সেখানে তিনি লক্ষ করেছিলেন যে, তাঁর এক গাভী একটি নির্দিষ্ট পাথরের উপরে দাঁড়িয়ে নিয়মিত দুধ দিয়ে যায়। ভগবান শিব এরপর চন্দ্রাবতীকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেন যে সেই শিলাটি আসলে একটি স্বয়ম্ভু শিবলিঙ্গ। এরপর থেকে প্রতিদিন চন্দ্রাবতী সেই শিলাকে জুঁইফুল অর্থাৎ মল্লিকা দিয়ে সাজিয়ে পূজা করতেন।
শিবপুরাণ অনুসারে শিব ও পার্বতীর পুত্র গণেশ এবং কার্তিক এর মধ্যে কার বিবাহ আগে দেওয়া হবে সেই নিয়ে শিব ও পার্বতী চিন্তিত ছিলেন। এই সমস্যার সমাধানের জন্য শিব ও পার্বতী তাঁদের বলেন – যে সর্বপ্রথম গোটা পৃথিবী ভ্রমণ করে আসবে আগে তাঁরই বিবাহ হবে। কার্তিক ময়ুর নিয়ে বিশ্বভ্রমণে বেরোলেন কিন্তু গণেশ নিজের পিতামাতাকে সাতবার প্রদক্ষিণ করে নিলেন, শাস্ত্রানুসারে যা-কিনা একবার পৃথিবী ভ্রমণেরই সমতুল্য। ফলে কার্তিকের আগে গণেশের বিবাহ দিয়ে দেওয়ায় কার্তিক ক্ষুব্ধ হয়ে কুমার ব্রহ্মচারী নামধারন করে ক্রৌঞ্চ পর্বতে গিয়ে একা একা দিনযাপন করতে থাকেন। তাঁকে বুঝিয়ে শান্ত করবার জন্য পিতামাতাকে সেই স্থানে আসতে দেখে কার্তিক সেখান থেকে চলে যান। শিব এবং পার্বতী সেই স্থানে অবস্থান করেন এবং সেখানে তাঁদের মন্দির স্থাপিত হয়।
অন্য এক কিংবদন্তি অনুসারে, সিলদা মহর্ষির পুত্র পর্বতের অনুরোধে শিব তাঁর শরীরে থাকবার প্রস্তাবে সম্মতি দান করেন। সিলদা মহর্ষির পুত্র পর্বত তখন একটি পাহাড়ের আকার ধারন করেন এবং শিব শ্রী মল্লিকার্জুন হিসেবে সেই পাহাড়ে অবস্থান করতে থাকেন। অগ্নিপুরাণে বলা আছে যে, দানবরাজা হিরণ্যকশ্যপ এখানে তপস্যা করেছিলেন এবং মল্লিকার্জুনের কাছে প্রার্থনা জানিয়েছিলেন। স্কন্দপুরাণ অনুসারে ত্রেতাযুগে ভগবান রাম এবং সীতাও এই স্থানে এসেছিলেন। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে দ্বাপর যুগে বনবাসের সময় নাকি অর্জুন ও অন্যান্য পান্ডবেরা এখানে কিছু সময় কাটিয়ে প্রার্থনা করেছিলেন। কিংবদন্তি অনুযায়ী দেবী পার্বতী নিজেকে ভ্রমরে রূপান্তরিত করে নিয়ে মহিষাসুরের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন। ভক্তদের বিশ্বাস যে, তাঁরা এই মন্দিরের গর্ত দিয়ে সেই ভ্রমরের গুঞ্জন আজও শুনতে পান।
মল্লিকার্জুন মন্দিরের ইতিহাস খুবই প্রাচীন। এই মন্দিরের উল্লেখ যেসব শিলালিপি এবং ঐতিহাসিক অনুসন্ধানে পাওয়া যায় সেগুলি থেকে বিশেষত সাতবাহন রাজবংশের শিলালিপি থেকে অনুমান করা যায় যে, দ্বিতীয় শতাব্দীর শুরু থেকে এই মন্দিরটি বিদ্যমান রয়েছে। চালুক্য রাজবংশ এবং কাকাতিয়া রাজবংশ এই মন্দিরের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তবে বিজয়নগর সাম্রাজ্যের রাজা হরিহরের শাসনকালে এই মন্দিরের প্রধান সংস্কারগুলি হয়েছিল। বিজয়নগর সাম্রাজ্যের শাসনকালেই মন্দিরের মুখ মন্ডপম এবং গোপুরম নির্মিত হয়েছিল। আবার শ্রী কৃষ্ণদেবরায়ের শাসনকালে, সালু মন্ডপ এবং রাজাগোপুরমও নির্মিত হয়েছিল, যা এই প্রাচীন মন্দিরে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। পরবর্তীকালে ১৬৭৪ সালে মারাঠা রাজা ছত্রপতি শিবাজি মন্দিরের বিভিন্ন সংস্কার করবার পাশাপাশি মন্দিরে বিভিন্ন উৎসব পুনরায় শুরু করেছিলেন। পরে মুঘল নবাব এবং তারপর ব্রিটিশরা এলাকাটি দখল করে নেয় এবং মন্দিরের প্রশাসনও তাদের অধীনে আসে। ১৯২৯ সালে ব্রিটিশরা মন্দির পরিচালনার জন্য একটি কমিটি গঠন করেছিল। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে মন্দিরটি এনডাউমেন্টস বিভাগের (Endowments Department) প্রশাসনের অধীনে স্থানান্তরিত করা হয়। বর্তমানে এই মল্লিকার্জুন মন্দিরটি অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচালনা করে।
এই মল্লিকার্জুন মন্দিরটি অনেকখানি জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। চারদিকে পাথরের তৈরি প্রায় ২৮ ফুট লম্বা পাঁচিল রয়েছে এবং সেই পাঁচিলের চারদিকে মন্দিরের মোট চারটি দ্বার রয়েছে। পূর্বদিকের প্রবেশদ্বারকে মহাদ্বারম বলা হয়ে থাকে। ভিতরের প্রাঙ্গণটি নবব্রহ্ম মন্দির নামে পরিচিত নয়টি মন্দির নিয়ে গঠিত। ভগবান মল্লিকার্জুন এবং ভ্রমরম্বা দেবীর জন্য এখানে দুটি পৃথক মন্দির রয়েছে। এছাড়াও বিজয়নগর আমলে নির্মিত মুখ মন্ডপম (রাজকীয় স্তম্ভসহ বিরাট হলঘর) তো রয়েছেই সেইসঙ্গে বৃদ্ধ মল্লিকার্জুন, সহস্র লিঙ্গেশ্বর, অর্ধনারীশ্বর, বীরভদ্র, উমা মহেশ্বরদের জন্য অন্যান্য ছোট মন্দির রয়েছে। উত্তর, পূর্ব এবং দক্ষিণদিকে প্রায় ৪২টি স্তম্ভ এবং বারান্দা-সহ বিশাল মন্ডপ রয়েছে। এই মণ্ডপের কেন্দ্রে নন্দীর একটি বিশাল ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে; এটি ভগবান মল্লিকার্জুনের ঠিক মুখোমুখি অবস্থিত। নন্দী মন্ডপ নামেও আরেকটি মন্ডপ রয়েছে এবং তার পশ্চিমদিকে রয়েছে ভিরাইয়া মন্ডপ। ভিতরের প্রাঙ্গণের কেন্দ্রে রয়েছে শ্রী মল্লিকার্জুন স্বামীর মন্দির। মন্দিরটি পূর্বমুখী এবং মুখ মন্ডপ, অন্তরলা এবং গর্ভগৃহের মতো কয়েকটি অংশ নিয়ে গঠিত। বীরসরো মণ্ডপের পশ্চিম দিকে মুখ মণ্ডপ আছে, যা মহা মণ্ডপ নামেও পরিচিত। এছাড়াও গড়বালয় নামক ৬০ বর্গফুটের একটি চিত্তাকর্ষক প্রবেশদ্বার রয়েছে এবং এর কেন্দ্রে রয়েছে স্বয়ম্ভু জ্যোতির্লিঙ্গ।
মল্লিকার্জুন মন্দিরে বছরের বিভিন্ন সময়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উৎসব পালিত হয়ে থাকে। প্রথমেই যে উৎসবের কথা উল্লেখ করতে হয় তা হল মহাশিবরাত্রি উৎসব। সাধারণত ফেব্রুয়ারি বা মার্চ মাসে মহাশিবরাত্রির সময় এই উৎসবের সূচনা হয় এবং প্রায় সাতদিন ধরে উদযাপন চলে। পরবর্তী যে উৎসবটির কথা বলতে হয়, তা হল, শ্রাবণ মহোৎসব। সাধারণত শ্রাবণ মাসে অর্থাৎ জুলাই-আগস্ট মাসে এটি পালিত হয়। এই উৎসব উপলক্ষে সারা মাস জুড়ে চব্বিশ ঘন্টা শিবনাম সঙ্কীর্তন হয়ে থাকে। মল্লিকার্জুনে পালিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হল উগাদি অর্থাৎ তেলেগু নববর্ষ। পাঁচ দিন ধরে এই উৎসব চলে। হাজার হাজার মানুষ এই সময়ে মন্দিরে যান । কার্তিক মহোৎসব এই মন্দিরে অনুষ্ঠিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। এই উৎসবের সময় ভক্তেরা মন্দির প্রাঙ্গনে শতাধিক দীপ প্রজ্জ্বলন করেন। এগুলি ছাড়াও আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উৎসব হল কুম্ভোৎসব, সংক্রান্তি উৎসব, অরুদ্রোৎসব ইত্যাদি।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


Leave a Reply to সতীপীঠ ভ্রমরম্বা | সববাংলায়Cancel reply