উত্তরবঙ্গের চতুর্দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য বৌদ্ধ বিহার। পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত সেই শান্ত, নির্জন মঠগুলি পর্যটকদের কাছে স্বভাবতই খুবই আকর্ষণীয়। কালিম্পং শহরে অবস্থিত তেমনই একটি মনাস্ট্রি হল লাভা মনাস্ট্রি বা লাভা মঠ, যেটি কাগিউ থেকচেন লিং মঠ নামেও পরিচিত। লাভা মঠ খুব শান্ত এবং পবিত্র গন্তব্য যা দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।
স্থানীয় মানুষদের মতে, এই জায়গাটি প্রাচীনকাল থেকেই আধ্যাত্মিক শক্তিতে পরিপূর্ণ ছিল। জনশ্রুতি অনুসারে কয়েক শতাব্দী আগে তিব্বত থেকে আসা কিছু যাযাবর সন্ন্যাসী এই অঞ্চলে ধ্যানমগ্ন হন এবং বিশ্বাস করেন যে এই স্থান অবলোকিতেশ্বরের আশীর্বাদপ্রাপ্ত। তাঁরা এই জায়গাকে “শান্তি ও প্রজ্ঞার কেন্দ্রে” রূপান্তরিত করার কথা ভাবেন। যদিও লিখিত রূপে এই কাহিনিগুলির যথাযথ প্রমাণ নেই, তবে স্থানীয়রা এখনও বিশ্বাস করেন যে লাভার পাহাড়ের নির্জনতাই এই মনাস্ট্রিকে অলৌকিক শক্তির আধার করে তুলেছে।
তিব্বত থেকে নির্বাসিত হয়ে আসা বৌদ্ধ ধর্মগুরুদের একাংশ কালিম্পঙ অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন এবং ১৯৮৭ সালে এই মঠের প্রতিষ্ঠা করেন। এই মনাস্ট্রি মূলত ‘কাগ্যু’ (Kagyu) বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অনুসারী, যা তিব্বতীয় বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম একটি শাখা। বিশিষ্ট ধর্মগুরু গারচেন রিনপোচে ও অন্যান্য গুরুদের প্রচেষ্টায় এই মনাস্ট্রির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। সময়ের সাথে সাথে এটি লাভা ও তার আশেপাশের অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
বর্তমানে এখানে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী বহু সন্ন্যাসী, বিশেষত শিশু সন্ন্যাসীরা, শিক্ষা ও ধর্মচর্চায় নিয়োজিত আছেন। স্থানীয় মানুষ এবং পর্যটকদের জন্য মনাস্ট্রিটি উন্মুক্ত। এটি কেবল উপাসনার স্থান নয়, বরং একটি জীবন্ত আশ্রম—যেখানে ধর্ম, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবতাবোধ একত্রে প্রবাহিত হয়।
লাভা মনাস্ট্রির স্থাপত্যরীতিতে রয়েছে তিব্বতীয় ও হিমালয়ান বৌদ্ধ স্থাপত্যের সংমিশ্রণ। মনাস্ট্রিটি পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত হওয়ায় এর নির্মাণে স্তরাভিত্তিক পরিকল্পনা লক্ষ্য করা যায়। বহিরাংশে উজ্জ্বল লাল, হলুদ, সাদা রঙের ব্যবহার এবং ছাদের কারুকার্য দেখলেই তিব্বতীয় শিল্পধারার প্রভাব বোঝা যায়। প্রবেশপথে রয়েছে বিশাল একটি প্রার্থনার চাকা যা ঘোরাতে ঘোরাতে দর্শনার্থীরা ভেতরে প্রবেশ করেন।
প্রধান হলঘরের বাইরে রয়েছে প্রার্থনার পতাকা যা হাওয়ায় ক্রমাগত নড়তে থাকে এবং বিশ্বাস করা হয় যে এই পতাকা থেকে আশীর্বাদ ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। মনাস্ট্রির ভিতরে রয়েছে ধ্যানের ঘর, পাঠশালা এবং সন্ন্যাসীদের থাকার ঘর। মনাস্ট্রির মূল ভবনের ছাদ থেকে দেখা যায় দূরবর্তী কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্বতমালা দেখা যায়।
মঠের উপাসনাকক্ষে জটিল দেয়ালচিত্র এবং মূর্তি দ্বারা সজ্জিত, যা একটি শান্তিপূর্ণ এবং ধ্যানমূলক পরিবেশ তৈরি করে। এখানে দর্শনার্থীরা ধ্যান অধিবেশনে অংশগ্রহণ করতে পারেন অথবা কেবল নীরবে বসে শান্ত পরিবেশকে উপভোগ করতে পারেন। মনাস্ট্রির প্রধান উপাসনাকক্ষে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে বিশাল বুদ্ধ মূর্তি, যেটি সোনালি রঙে অঙ্কিত ও অলংকৃত। এই মূর্তিটি ধ্যানমগ্ন অবস্থায় বসে আছেন এবং তার চারপাশে রয়েছে অসংখ্য ছোট ছোট মূর্তি ও থাংকা (Thangka) পেইন্টিং। থাংকা হলো বৌদ্ধ ধর্মীয় চিত্রকর্ম, যা ধর্মীয় আচার ও শিক্ষায় ব্যবহৃত হয়।
মূর্তির নিচে রয়েছে বাটির মতো পাত্রে রাখা পানীয় জল, ধূপকাঠি ও অন্যান্য পূজার সামগ্রী। বিভিন্ন পদের উপাস্য মূর্তিও রয়েছে এখানে, যেমন পদ্মসম্ভব, চেনরেজিগ এবং গ্রীন তারা। মন্দিরে মন্ত্রোচ্চারণ, ঘণ্টা বাজানো ও ধুপের গন্ধ এই জায়গাকে এক ঐশ্বরিক পরিবেশে পরিণত করে।
লাভা মনাস্ট্রিতে বছরে বেশ কয়েকটি বৌদ্ধ উৎসব পালিত হয়, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো লোসার (Losar)—তিব্বতীয় নববর্ষ। এটি সাধারণত ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হয় এবং এই সময় মনাস্ট্রি আনন্দমুখর পরিবেশে ভরে ওঠে। এই উৎসবে বিশেষ প্রার্থনা, ঐতিহ্যবাহী মুখোশ নৃত্য লাভা মনাস্ট্রি শুধু একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়; এটি এক অন্তরযাত্রার কেন্দ্র, যেখানে মানুষ নিজের আত্মার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে শেখে। পাহাড়ের কোলে প্রার্থনার নিঃশব্দ ধ্বনি, প্রাচীন মন্ত্র, এবং তিব্বতীয় শিল্পের ছোঁয়া এই জায়গাটিকে করে তোলে অনন্য। ধর্মপ্রাণ মানুষের পাশাপাশি সাধারণ পর্যটকরাও এখানে এসে খুঁজে পান এক নিরালার শুদ্ধতা।
যে কেউ একবার লাভা মনাস্ট্রিতে আসেন, তিনি শুধুই স্থাপত্যের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হন না—তিনি কিছুটা ধ্যান, কিছুটা দৃষ্টিভঙ্গি এবং অনেকটা শান্তি নিয়েই ফিরে যান।, ও সন্ন্যাসীদের বৌদ্ধ সংগীত পরিবেশন হয়ে থাকে।
এছাড়াও বুদ্ধ পূর্ণিমা (Buddha Jayanti) অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে পালিত হয়। বুদ্ধদেবের জন্ম, বোধিপ্রাপ্তি ও মহাপরিনির্বাণের স্মরণে এই দিনটিতে বিশেষ পূজা ও প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়। ভক্ত ও পর্যটকরা এই সময় দূরদূরান্ত থেকে এসে অংশগ্রহণ করেন।
আরও একটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান হলো খামসুম ইয়ুলে চেনমো—একটি ধ্যান ও প্রার্থনাভিত্তিক রিট্রিট যা বিশেষ সময়ে আয়োজিত হয় এবং তিব্বতীয় বৌদ্ধ দর্শনের গভীরতাকে তুলে ধরে।
মঠটি সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে।
লাভা মঠ একটি আধ্যাত্মিক আশ্রয়স্থল যা সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য মিশ্রণ প্রদান করে। আপনি একজন ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধ হোন বা কেবল শান্তিপূর্ণ বিশ্রামের সন্ধানে থাকুন না কেন, এই মঠটি কালিম্পং-এর একটি অবশ্যই পরিদর্শনযোগ্য গন্তব্য। অত্যাশ্চর্য স্থাপত্য, শান্ত পরিবেশ এবং মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের কারণে, লাভা মঠ এমন একটি জায়গা যা আপনাকে শান্তি এবং অনুপ্রাণিত করবে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান