সববাংলায়

ঢাকুরিয়ার জাপানী বুদ্ধ মন্দির | নিপ্পনজান মায়োহোজি বৌদ্ধ মন্দির

বিভাগঃ , ,

বাংলার বুকে হিন্দু ও মুসলিম ধর্মের সঙ্গে প্রায় পাশাপাশি নিজের প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল আরও যেসব ধর্ম, তাদের মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মের কথাই আসবে সর্বাগ্রে। আজ এই ধর্মের প্রভাব একেবারেই ক্ষীণ হয়ে পড়লেও, এই বঙ্গদেশে, আরও বিশেষ করে বললে এই কলকাতার বুকেই অসংখ্য মন্দির-মসজিদের পাশাপাশি বেশ কিছু বৌদ্ধ মন্দির স্বমহিমায় বিরাজ করছে। সেইসব বৌদ্ধ উপাসনালয়গুলির মধ্যে একটি হল নিপ্পনজান মায়োহোজি বৌদ্ধ মন্দির (Nipponzan Myohoji Buddhist temple) যা লোকমুখে ঢাকুরিয়া বুদ্ধ মন্দির বা জাপানী বুদ্ধ মন্দির নামেও পরিচিত।

খুব বেশি জনপ্রিয় না হলেও জাপানীদের তৈরি বলে এই বৌদ্ধ মন্দিরটির একটু বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কলকাতার ঢাকুরিয়া অঞ্চলে লেক রোডে এই মন্দিরটির অবস্থান বলে ঢাকুরিয়ার বৌদ্ধ মন্দির নামেও অনেকের কাছে এটি পরিচিত। বিশ শতকের প্রথমভাগে নির্মিত এই বৌদ্ধ মন্দিরের সঙ্গে জড়িত হয়ে রয়েছে বিশেষ এক বৌদ্ধ ধর্ম সম্প্রদায়ের নাম। বৌদ্ধ পদ্মসূত্রের দর্শনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল এই বৌদ্ধ মন্দির। এর অনবদ্য জাপানী স্থাপত্যশৈলী সহজেই পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। কলকাতায় বৌদ্ধদের অস্তিত্বের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই বৌদ্ধ মন্দিরটির গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না।

কলকাতা শহরে নানা ধর্ম সম্প্রদায়ের পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান লক্ষ করা যায়। মন্দির-মসজিদ-গির্জার এই শহরে জৈন ও বৌদ্ধ মন্দিরের জন্যও স্থানের অভাব হয়নি। বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষ গা ঘেঁষাঘেঁষি করে এখানে বাস করে এবং নিজের নিজের ধর্মীয় উপাসনার প্রয়োজনে তাঁরা গড়ে নিয়েছে নিজেদের উপাসনালয়। এই ধর্মীয় সম্প্রীতি কলকাতা শহরের প্রাচীন ঐতিহ্য। আমাদের আলোচ্য এই নিপ্পনজান মায়োহোজি বৌদ্ধ মন্দিরটিও সেই ঐতিহ্যেরই একটি অংশ। কলকাতার ঢাকুরিয়া অঞ্চলের রবীন্দ্র সরোবরের নিকটে এই জাপানি বৌদ্ধ মন্দিরটির অবস্থান। মন্দিরটি নিচিরেন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অনুসারী নিচিদাতসু ফুজি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নিচিরেন ছিলেন একজন জাপানি বৌদ্ধ ধর্মযাজক ও দার্শনিক যিনি বৌদ্ধ পদ্মসূত্রের অনুসারী ছিলেন। এই পদ্মসূত্র হল গৌতম বুদ্ধের জীবনের শেষদিকে প্রদান করা শিক্ষার একটি সংগ্রহ। নিচিরেন বিশ্বাস করতেন এই সূত্রে বৌদ্ধ শিক্ষার সর্বোচ্চ সত্য রয়েছে এবং এটিই জ্ঞান অর্জনের একমাত্র উপায়। নিচিরেনের এই দর্শনই নিচিরেন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মূল ভিত্তি। এই পদ্মসূত্র ভারতবর্ষে প্রচার করবার স্বপ্ন দেখেছিলেন নিচিরেন।

তাঁর মৃত্যুর প্রায় ৬৫০ বছর পর নিচিরেন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের একনিষ্ঠ অনুগামী নিচিদাতসু ফুজি ১৯৩১ সালে তাঁর শিষ্যদের নিয়ে ভারতে আসেন। ১৯১৭ সালে এই নিচিদাতসু ফুজি সেই নিচিরেন বৌদ্ধ দর্শনের ওপর ভিত্তি করে নিপ্পনজান মায়োহোজি বা নিপ্পনজান মায়োহোজি দাইসাঙ্গা নামক বৌদ্ধ ধর্মের এক শাখা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা ছিল এক ধর্মীয় আন্দোলনস্বরূপ। নিচিরেনের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করবার জন্য নিচিদাতসু ফুজি পদ্মসূত্রের দর্শনকে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই কলকাতায় বৌদ্ধ মন্দির তৈরি করেন এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত সেই ধর্মীয় সম্প্রদায়টির নামেই মন্দিরটি নিপ্পনজান মায়োহোজি বৌদ্ধ মন্দির নামে পরিচিত।

বলদেও দাস বিড়লার পুত্র শিল্পপতি যুগল কিশোর বিড়লার দান করা জমিতে নিচিদাতসু ১৯৩৫ সালে মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। তবে ১৯৫৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে মন্দিরের দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল। উল্লেখ্য যে এই নিচিদাতসুর সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীরও খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। নিচিদাতসু ফুজি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনেও সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন।

ঢাকুরিয়া অঞ্চলে অবস্থিত এই নিপ্পনজান মায়োহোজি বৌদ্ধ মন্দিরটি নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীর জন্যও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ছিমছাম অথচ মনোহারি জাপানি স্থাপত্যকর্মের এক নিদর্শন এই বৌদ্ধ মন্দিরটি। একটি সুদৃশ্য কম্পাউন্ডের মধ্যে অবস্থিত এই মন্দিরটি দুধ সাদা রঙের এবং তারই মধ্যে সোনালি রঙের রেখা, নকশা ইতস্তত ছড়ানো। মন্দিরের প্রবেশপথেই দেখা যায় লেখা আছে, ‘না-মু-মায়ো-হো-রেন-জি-কিয়ো’, যার অর্থ হল, “পদ্মসূত্রের এই জগতে নিজেকে আত্মসমর্পণ করলাম”। মন্দিরের শীর্ষদেশে সাঁচী স্তুপের মতো গম্বুজ দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়াও প্রতিটি স্তরের কোণে ছোট ছোট স্তুপ দেখা যায়। মন্দিরের বাইরে সুদৃশ্য বাগানও চোখে পড়ে। সেই বাগানে শান্তির বার্তা বহনকারী জাপানি শিলালিপি খোদিত একটি স্তম্ভ রয়েছে এবং সেই স্তম্ভটির কাছে অনেকটা পাহারাদারের মতো রয়েছে দুটি সোনালি সিংহের মূর্তি। মূল মন্দিরটি দ্বিতল বিশিষ্ট। প্রথম তলায় রয়েছে প্রার্থনা কক্ষ। বাইরে থেকে ছোট ছোট ধাপের সিঁড়ি পৌঁছে দেয় সেই কক্ষ পর্যন্ত। সেখানে বিরাট বেদীতে বুদ্ধদেবের শ্বেতপাথরের একটি ধ্যানরত মূর্তি রয়েছে। সেই মূর্তিতেও জাপানি শিল্পকলার ধাঁচটি স্পষ্টতই লক্ষ করা যায়। মন্দিরের দ্বিতীয় তলে রয়েছে ধ্যানকক্ষ এবং একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার। জাপানি ভাষার উৎকৃষ্ট সব সাহিত্য সেই লাইব্রেরিতে খুঁজলে পাওয়া যাবে।

মন্দিরের অভ্যন্তর সুদৃশ্য জাপানি ক্যালিগ্রাফি এবং রঙিন অনেক ল্যাম্পশেড দিয়ে সজ্জিত। এছাড়াও মন্দিরের ভিতরে প্রতিষ্ঠাতা নিচিদাতসু ফুজির ছবিও দেখতে পাওয়া যায়।

এই নিপ্পনজান মায়োহোজি বৌদ্ধ মন্দিরে বৌদ্ধদের বিভিন্ন উৎসব যথাবিহিত নিয়ম মেনে উদযাপিত হয়ে থাকে। বিশেষভাবে বলতে হয় বুদ্ধ পূর্ণিমার কথা। বুদ্ধদেবের জন্মতিথি হিসেবেই বুদ্ধ পূর্ণিমা উদযাপন করা হয়। এই সময় মন্দিরটি দারুণ সাজে সেজে ওঠে। গোটা মন্দির চত্বরই উৎসবের সাজে, মেজাজে ঝলমল করে। এইসময় অবাধে মন্দিরে প্রবেশ করতে পারেন দর্শনার্থীরা। বুদ্ধের মূর্তির সম্মুখে জড়ো হয়ে অসংখ্য ভক্ত প্রার্থনায় অংশগ্রহণ করেন। এমন বিশেষ দিন ছাড়া নিয়মিত দুইবেলা প্রার্থনা হয়ে থাকে এখানে। খুব বেশি জনপ্রিয় না হলেও বছরের বিশেষ উৎসবের দিনে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে ভক্তের দল ভিড় জমান এখানে। এছাড়াও অন্যান্য সময়ে সংখ্যায় তুলনামূলকভাবে কম হলেও ইতিহাসের টানে বেশ কিছু পর্যটকও ঘুরতে আসেন এই জাপানি বৌদ্ধ মন্দিরটিতে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading