অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান

অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান

অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান (Atiśa Dīpankara Śrījñāna) ভারতীয় একজন প্রাচীন ভারতীয় পন্ডিত, দার্শনিক, বৌদ্ধ ভিক্ষুক এবং বৌদ্ধ ধর্মপ্রচারক। তিনি বৌদ্ধধর্মকে ভারত থেকে তিব্বত ও সুদূর মালশেয়িয়াতে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। বৌদ্ধ ধর্মের তিনটি শাখায় তিনি পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করেন এবং তিব্বতে বৌদ্ধধর্ম পুনরুদ্ধার করে তিনি সেখানে সম্মানের সাথে প্রতিষ্ঠিত হন। রাজা জাংচুপ দীপঙ্করকে ‘অতীশ’ উপাধি দিয়েছিলেন ,যার অর্থ ‘শান্তি’। জ্ঞান বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার কারণে তিনি বৌদ্ধধর্মালম্বীদের কাছে গৌতম বুদ্ধের পরেই স্হান পেয়েছেন।

অতীশ দীপঙ্করের জন্ম অধুনা বাংলাদেশের বিক্রমপুরে ৯৮২ সালে। তাঁর বাবার নাম কল্যাণশ্রী এবং মায়ের নাম প্রভাবতী দেবী। কল্যাণশ্রী ছিলেন বিক্রমপুরের রাজা। কল্যাণশ্রীর বাবা ছিলেন চন্দ্রবংশীয় রাজা শ্রীচন্দ্র।  কল্যাণশ্রী ও প্রভাবতী দেবীর  তিন ছেলের মধ্যে দীপঙ্কর ছিলেন মধ্যম সন্তান।  ছোটবেলায় অতীশ দীপঙ্করের নাম ছিল আদিনাথ চন্দ্রগর্ভ। বাকী দুই ভাইয়ের নাম ছিল পদ্মগর্ভ এবং শ্রীগর্ভ। ঐতিহাসিকদের মতে দীপঙ্করের পাঁচজন স্ত্রী ছিলেন। এবং এই সকল স্ত্রীদের গর্ভজাত দীপঙ্করের  নয়টি পুত্র ছিল। কিন্তু শুধুমাত্র পুণ্যশ্রী নামে একটি পুত্রের কথাই জানা যায়।

দীপঙ্করের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় তিন বছর বয়সে সংস্কৃত শিক্ষার মাধ্যমে তাঁর মায়ের কাছে। ছোটবেলা থেকেই তাঁর বিদ্যাশিক্ষার প্রতি প্রগাঢ় আর্কষন লক্ষ্য করা যায়। অসম্ভব মেধাবী ছিলেন তিনি । মাত্র দশ বছর বয়সেই তিনি বৌদ্ধ অবৌদ্ধ শাস্ত্রের মধ্যে পার্থক্য করতে সক্ষম হন। তাঁর বাবা কল্যাণশ্রী তাকে তন্ত্রশিক্ষা দান করেন। তাঁর প্রতিভা দেখে মহাবৈয়াকরণিক বৌদ্ধ পন্ডিত জেত্রি তাঁকে পরামর্শ দেন বিহারে নালন্দায় শাস্ত্র শিক্ষা অর্জন করার জন্য। মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করে  নালন্দা মহাবিহারে বিদ্যাশিক্ষা অর্জন করতে যান।  সেইসময়ে নালন্দা ছিল সারা পৃথিবীর মধ্যে শাস্ত্র শিক্ষা অর্জনের জন্য বিখ্যাত স্হান । এখানে আচার্য বোধিভদ্রের কাছে তিনি শ্রমণরূপে দীক্ষা লাভ করেন। আচার্য বোধিভদ্রের গুরুদেব অবধূতির কাছে বৈষ্ণব, শৈবধর্ম, বৌদ্ধ ও অবৌদ্ধ ধর্মের সমস্ত শাখায় শিক্ষা লাভ করেন তিনি।  শিক্ষাশেষে তিনি ‘শ্রীজ্ঞান’ উপাধি লাভ করেন। নালন্দায় শিক্ষা অর্জনের পরে তিনি বিক্রমশীলা মহাবিহারে নাঙপাদের কাছে বৌদ্ধতন্ত্রশিক্ষা লাভ করেন। এরপরে ২১ বছর বয়সে ওদন্তপুরী মহাবিহারে আচার্য শীলরক্ষিতের কাছে উপাসম্পদা দীক্ষা লাভ করেন । এরপরে আরও জ্ঞানার্জনের জন্য আরও পশ্চিমে গমন করেন দীপঙ্কর এবং  ধর্মীয় পন্ডিত রাহুল গুপ্তের কাছে বৌদ্ধ ধর্ম নিয়ে জ্ঞান অর্জন করে ‘গুহ্যজ্ঞানবজ্র’ উপাধি লাভ করেন। ভারতে শিক্ষা  শেষ হলে দীপঙ্কর আরও গভীর জ্ঞান অর্জনের জন্য পাড়ি দেন সুবর্ণদ্বীপে বর্তমানে যা ইন্দোদেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপ নামে পরিচিত। এখানে আচার্য ধর্মপালের কাছে বারো বছর বৌদ্ধ দর্শন নিয়ে জ্ঞান অর্জন করেন।

বারো বছর সুবর্ণদ্বীপে অধ্যয়ন করার পরে তিনি দেশে ফিরে আসেন বিহারের  ভাগলপুরের বিক্রমশীলা বিহারের আচার্য হিসেবে। তখন বাংলায় রাজত্ব ছিল পাল বংশীয় রাজা নয়াপালের। তিনি দীপঙ্করকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে বিক্রমবিহারে আচার্য নিযুক্ত করেন। প্রায় পনেরো বছর বিক্রমশীলা বিহারে অধ্যাপনা করার পর তিনি সোমপুরী ও ওদন্তবিহারেও অধ্যাপনা করেন।  তিব্বতের গুজ বংশের দ্বিতীয় রাজা লালমা ইয়েশে ওদ বৌদ্ধধর্মকে পুনরুদ্ধার করার জন্য  দীপঙ্করকে তিব্বতে আসার আমন্ত্রণ জানালে দীপঙ্কর সেই আমন্ত্রণ বিনীতভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু কারাখানী খানাতের শাসকের হাতে বন্দি হয়ে মুক্তিপণের বদলে দীপঙ্করকে ভারতে নিয়ে আসার শেষ অনুরোধ করেন লালমা ইয়েশে ওদ তাঁর নিজের পুত্রের কাছে। সেই অনুরোধ নিয়ে দীপঙ্করের কাছে লালমা ইয়েশে ওদের পুত্র পৌঁছালে তিনি তিব্বতে যেতে রাজী হন। তখন তাঁর বয়স ষাট বছর। তিনি  বিক্রমশীলা বিহারের সমস্ত দায়িত্ব ছেড়ে প্রথমে বুদ্ধগয়া পৌঁছান। সেখান থেকে চম্পারণ রক্সৌল হয়ে নেপাল হয়ে তিব্বতে পৌঁছান। নেপালে কিছুদিন অবস্থান করে যান সেখানকার রাজার একান্ত অনুরোধে। নেপালে থাকাকালীন তিনি থাম অঞ্চলে একটি বৌদ্ধবিহার নির্মাণ করেন। এটিই নেপালের সবচেয়ে প্রাচীন বিহার। নেপাল থেকে মানস সরোবর হয়ে  তিব্বতে গিয়ে পৌঁছান। সেখানে  তিনি বৌদ্ধধর্ম পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করেন। তিব্বতে সেই সময়ে বৌদ্ধ অনুরাগীর সংখ্যা ক্রমশ নিম্নগামী হচ্ছিল। দীপঙ্কর তিব্বতের দুর্গম প্রান্তে ভ্রমণ করে বৌদ্ধধর্মের সংস্কার  করেন। তিব্বতী বৌদ্ধধর্মকে তান্ত্রিক তন্ত্র থেকে মুক্ত করে শুদ্ধ  মহাযান পন্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান । তিব্বতী ধর্ম রাজনীতিতে অতীশ দীপঙ্করের প্রভাব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ঐকান্তিক চেষ্টায়  তিব্বত থেকে বৌদ্ধধর্মের প্রসার ঘটেছিল সুদূর চীন হয়ে জাপানে।

অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান ছিলেন এক মহান দার্শনিক। তাঁর জীবনের মুলমন্ত্র ছিল মানুষের কল্যাণ ও মুক্তিসাধন। সেই লক্ষ্যে তিনি রাজ পরিবার থেকে সাধারণ মানুষ সকলের মধ্যেই তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। সাধারণ মানুষের দুঃখ দুর্দশার কথা তাঁকে পীড়া দিত। তিনি যথাসাধ্য তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেন। তিনি চিকিৎসাবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। যখনই মানুষের রোগ, মহামারীর খবর পেয়েছেন  তিনি তাঁদের চিকিৎসা করেছেন । আবার যেখানে বাঁধ নির্মাণ করার প্রয়োজন হয়েছে সেখানে সকলকে একত্রিত করে বাঁধ নির্মাণ করেছেন। সারাজীবনে তিনি দুশোর বেশী বই রচনা করেছেন। অনুবাদের কাজও করেছেন। পালি ও সংস্কৃত ভাষার বই তিব্বতী ভাষায় অনুবাদ করেন। তিব্বতী সংস্কৃতি, রাজনৈতিক, সামাজিক  জীবন নিয়ে ‘স্তোত্রনামাসহ তাঞ্জুর’ নামে একটি গ্রন্থ সংকলন করেন। তিব্বতী ভাষায় অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চিকিৎসাশাস্ত্র, ধর্ম সহ বহু বিষয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। দীপঙ্করের রচনাগুলির মধ্যে অন্যতম হল ‘বোধিপদপ্রদীপ’। থোলিং মহাবিহারে অবস্হান করার সময়ে তিনি এই গ্রন্থটি রচনা করেন। এই গ্রন্থে তিনি গৌতম  বুদ্ধের সমগ্র বাণীগুলিকে একত্রিত করার চেষ্টা করেছেন।  বিবরণ দিয়েছেন বৌদ্ধ ধর্মের আচার, নিয়ম ও ধ্যান করার সঠিক ধাপগুলির। বুদ্ধের বাণীগুলি সঠিক পদ্ধতিতে মেনে চলার নির্দেশিকা ছিল এই ‘বোধিপদপ্রদীপ’। এই গ্রন্থটিতে বুদ্ধের  জ্ঞান ও তন্ত্র দুটি দর্শনেরই ব্যাখা রয়েছে। এটি আজও বৌদ্ধদের কাছে একটি পবিত্র গ্রন্থ। হাজার বছর আগে রচিত এই গ্রন্থ আজও দলাই লামা অনুসরণ করে চলেছেন। প্রাচীন ভারতে এই গ্রন্থ দীপঙ্করের শিষ্যদের দ্বারা প্রচারিত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল সাধারণ মানুষের মধ্যে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বৌদ্ধ তন্ত্র দর্শন থেকে বুদ্ধের অনন্ত মুক্তিলাভের পথ মহাযানের দর্শন ছড়িয়ে পড়েছিল। এতে বৌদ্ধ ধর্ম তন্ত্রের কলুষ  থেকে মুক্ত হয়ে শুদ্ধতা লাভ করেছিল। দীপঙ্করের লেখা চর্যাসংগ্রহপ্রদীপে রয়েছে কিছু কীর্তনের সংগ্রহ। এগুলি ছাড়াও  সত্যদ্বয়বতার,শরণাগতদেশ, কর্মবিভঙ্গ, বিমলরত্নলেখনা, হৃদয়নিশ্চিন্ত, বোধিস্বত্ত্বনামবলি, সংগ্রহগর্ভ, গুহ্যক্রিয়াকর্ম, মহাযানপদসাধনসংগ্রহীতা,  প্রজ্ঞাপারমিতাপিন্ডার্থপ্রদীপা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।

রাজকুমার  চন্দ্রগর্ভ থেকে অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান হয়ে  ওঠার সময়ে তিনি অর্জন করেছেন বহু সম্মাননা। তিনি বৌদ্ধ ধর্মের তিনটি শাখা মহাযান, হীনযান ও বজ্রযান শাখায় জ্ঞান অর্জন করে ‘শ্রীজ্ঞান’ উপাধি লাভ করেন। বৌদ্ধ দর্শনে আসাধারণ পান্ডিত্যের জন্য ‘গুহ্যজ্ঞানব্যজ্র’ উপাধি লাভ করেন। তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মের সংস্কার সাধন করে সেই দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ‘অতীশ’ উপাধি লাভ করেন। গৌতম বুদ্ধের পরে এই প্রথম কোন বৌদ্ধ ভিক্ষুক বৌদ্ধধর্মকে পুঃনস্হাপনে নিজের জীবন ব্যয় করেছিলেন। সেই কারণেই দীপঙ্করকে ‘দ্বিতীয় বুদ্ধ’ ও বলা হয়ে থাকে।

১০৫৪ সালে অত্যধিক পরিশ্রমে তিব্বতের নিয়েতাং এ লেথান গ্রামে অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের মৃত্যু হয়।

আপনার মতামত জানান