সববাংলায়

করবা চৌথ

বিভাগঃ ,

বিখ্যাত সেই হিন্দি ছবির কথা মনে আছে? শাহরুখ খান আর কাজল অভিনীত ‘দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে যায়েঙ্গে’ কিংবা অমিতাভ বচ্চন ও হেমা মালিনী অভিনীত ‘বাগবান’? মনে পড়ছে কাজল আর হেমা মালিনীর চালুনি দিয়ে রাতের আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ দেখার দৃশ্যটি। পিছনে দাঁড়িয়ে তাঁদের স্বামী। অভূতপূর্ব এক লৌকিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে স্বামী-স্ত্রীর অপার প্রেম ফুটে উঠেছিল দৃশ্যে। ঐ লৌকিক উপচারটিই করবা চৌথ (Karwa Chauth) নামে পরিচিত। স্বামীর মঙ্গলকামনায় ভারতের হিন্দু নারীরা এই ব্রত পালন করে থাকেন। চলুন জেনে নেওয়া যাক এই ব্রত পালনের নানা দিক সম্পর্কে।

কার্তিক মাসের পূর্ণিমার পরের চতুর্থ দিনে পালিত হয় করবা চৌথ ব্রত। মূলত দিল্লি, হরিয়ানা, রাজস্থান, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশে অর্থাৎ সার্বিকভাবে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের রাজ্যগুলিতে হিন্দু নারীরা এই ব্রত পালন করে থাকেন। সেই বিশেষ দিনে তারা সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উপবাস পালন করেন। কার্তিক পূর্ণিমার সময় থেকেই এই ব্রতের আয়োজন শুরু হয়ে যায়। গয়না, করবা প্রদীপ, হেনা, সজ্জিত পূজার থালা ইত্যাদি কেনাকাটা করেন মহিলারা। পাঞ্জাবের দিকে মহিলারা সূর্যোদয়ের আগে খেয়ে নেন যাতে উপবাসের সময় কষ্ট না হয়। এই উপবাসের সময় জলও পান করেন না মহিলারা। পাঞ্জাবে উপবাসের সঙ্গে জড়িত একটি বিশেষ অংশ হল ‘সার্গি’। কী এই সার্গি? করবা চৌথের দিন ভোরে উঠে সূর্যোদয়ের আগে যে খাবার খান ব্রত পালনকারী মহিলারা, তাকেই সার্গি বলা হয়। শুকনো ফল, মিষ্টির সঙ্গে রান্না করা অনেক খাবার থাকে এই সার্গিতে যা শাশুড়ি ও বৌমা একত্রেই খেয়ে থাকেন। পরিবারে শাশুড়ি এই সার্গি বৌমাকে খেতে দেন, এমনটাই রীতি রয়েছে। শাশুড়ি মায়ের সঙ্গে একত্রে থাকলে এই সার্গি ভোরবেলা উঠে শাশুড়িরাই তৈরি করেন বৌমার জন্য। ঐতিহ্যবাহী শাড়ী বা চুড়িদারে অসামান্য রূপে সেজে ওঠেন এই দিনে ব্রত পালনকারিনীরা।

‘করবা’ আর ‘চৌথ’ এই দুটি শব্দের সমাহারে গড়ে উঠেছে করবা চৌথ শব্দবন্ধটি। ‘করবা’ কথার অর্থ হল – মাটির ছোটো পাত্র আর ‘চৌথ’ মানে হল চতুর্থ। সংস্কৃত পুঁথিতে কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের পূর্ণিমার পরের চতুর্থদিনে এই করবা চৌথকে ‘করক চৌথ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অনেকে মনে করেন ‘করবা’ কথার অর্থ হল কড়াই। এই ব্রত পালনের সময় মহিলারা ব্রত উপলক্ষে নতুন কড়াই কেনেন এবং তাতে নতুন কাপড়, কাচের চুড়ি, মুখরোচক খাবার ও মিষ্টি রেখে দেন। এমনকি আত্মীয়-পরিজনদের মধ্যে সেই কড়াই আদান-প্রদানের রীতিও অনেক জায়গায় লক্ষ করা যায়। প্রাচীনকালে সৈন্যদের স্ত্রীরা এই ব্রত পালন করতেন কেবল। যুদ্ধ লাগলে সৈন্যরা স্ত্রী-সন্তানকে ঘরে রেখে চলে যেতো বহু বহু দূরে। তাই তাদের মঙ্গলকামনায় সৈন্যদের স্ত্রীরা এই করবা চৌথ পালন করতেন বলে জানা যায়। কার্তিক মাসের ঠিক এই সময়েই কৃষকরা রবি শস্যের চাষ শুরু করেন মাঠে মাঠে। গমের দানা বপন করা হয় আর গমের দানা যে পাত্রে রাখা হয় তাকেও ‘করবা’ বলা হয়ে থাকে। ফলে ‘করবা চৌথ’ ব্রতের সঙ্গে কৃষি সভ্যতার অনুষঙ্গও জড়িয়ে আছে ব্যুৎপত্তিগতভাবে।

করবা চৌথের সন্ধ্যায় মূল উৎসব শুরু হয় যেখানে ব্রত পালনকারী মহিলারা সকলে মেহেন্দি পরে, লাল,হলুদ বা সোনালি রঙের উজ্জ্বল শাড়ি পরে এক আসরে সমবেত হন। একত্রে করবা চৌথের গান গাওয়া হয়। এই সময়ের ঠিক আগে আকাশে যখন চতুর্থীর চাঁদ ওঠে তখন চালুনি দিয়ে তা দেখেন মহিলারা। তারপর সঙ্গে প্রদীপ নিয়ে চন্দ্রদেবতার কাছে স্বামীর মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করেন তারা। সেই ঘরে মুখোমুখি বসে অন্ধকারে প্রদীপের আলোয় স্বামীর মুখ দেখেন তারা। সজ্জিত বরণডালা থেকে জলের পাত্র নিয়ে মুখের সামনে তুলে ধরেন স্বামী আর তারপর সেই জল খেয়ে উপবাস ভঙ্গ করেন তারা। অনেকক্ষেত্রে জলভর্তি পাত্রে চাঁদের প্রতিফলনও দেখে থাকেন মহিলারা। চালুনির বদলে ওড়না মেলে ধরেও চাঁদ দেখার রীতি রয়েছে।

এই করবা চৌথকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে বহু পৌরাণিক কাহিনী। রানি বীরবতী নাকি একবার তাঁর বাপের বাড়িতে থাকার সময় এই ব্রত পালন করেন। উপবাসের সময় তাঁর কষ্ট হচ্ছে দেখে বীরবতীর সাত দাদা দূরে অশ্বত্থ গাছে উঠে কয়েকটি আয়না লাগিয়ে দেন যাতে মনে হয় চাঁদ উঠে গেছে আকাশে। আয়নাকে চাঁদ ভেবে ভ্রমবশত বীরবতী উপবাস ভঙ্গ করলে কিছুক্ষণের মধ্যেই যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর স্বামীর মৃত্যুসংবাদ পান। শোকগ্রস্ত রানি বীরবতী আবার এই ব্রত পালন করে স্বামীর প্রাণভিক্ষা চাইলে যমরাজ তাঁর প্রাণ ফিরিয়ে দেন। মহাভারতের কাহিনিতেও দেখা যায় একবার নীলগিরিতে অর্জুন যাত্রা করলে এবং বহুদিন যাবৎ ফিরে না এলে দ্রৌপদী যখন কৃষ্ণের শরণাপন্ন হন, তখন কৃষ্ণ তাঁকে এই করবা চৌথ ব্রত পালন করার পরামর্শ দেন। তিনি এও বলেন যে পার্বতী নাকি শিবের জন্যে এই ব্রত পালন করেছিলেন এবং শিব সেই সময় পার্বতীকে সেই রানি বীরবতীর গল্প বলেছিলেন। এছাড়াও আরো একটি জনশ্রুতি আছে এই ব্রতকে কেন্দ্র করে। শোনা যায় করবা নামে এক পতিব্রতা নারী যমরাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর স্বামীর প্রাণ ফিরিয়ে নিয়ে আসেন আর তাই সেই নারীর নামেই নাকি করবা চৌথ ব্রতের নামকরণ হয়েছে।

সবথেকে বড়ো কথা হল অবাঙালিদের মধ্যে স্বামীর মঙ্গলকামনায় পালিত এই করবা চৌথ ব্রত আগে তেমন জনপ্রিয় ছিল না। শুধুমাত্র বলিউডের বিখ্যাত সিনেমার দৌলতে তা আজ ঘরে ঘরে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading