বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস রচনা করতে হলে এমন অনেক রাজনীতিবিদের প্রসঙ্গ আসবে যাঁদের বাদ দিলে সেই ইতিহাস রচনা সম্পূর্ণতা পাবে না। তেমনই একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হলেন কাজী জাফর আহমেদ (Kazi Zafar Ahmed)। ছাত্র-রাজনীতির মাধ্যমে রাজনৈতিক রণক্ষেত্রের ময়দানে পা রাখেন তিনি। কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে ছিল তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। তারপর ক্রমে ন্যাশানাল আওয়ামী পার্টি, ইউনাইটেড পিপলস পার্টির মতো বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি। এরশাদের শাসনকালে বাংলাদেশের অষ্টম প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তবে এছাড়াও শিক্ষা, তথ্য, নৌ-পরিবহন ইত্যাদি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তিনি সামলেছিলেন। জাফর আহমেদের সঙ্গে চিনি দুর্নীতির ঘটনা ভীষণভাবে জড়িত রয়েছে। তাঁর প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে বিতর্কেরও শেষ নেই। সব মিলিয়ে একজন বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হলেন এই কাজী জাফর আহমেদ।
১৯৩৯ সালের ১ জুলাই ব্রিটিশ শাসনাধীন অবিভক্ত ভারতের কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বিখ্যাত চিওড়া কাজী পরিবারে কাজী জাফর আহমেদের জন্ম হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর তাঁদের অবস্থান ছিল পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ব শাখায়। জাফরের বাবা খুলনা জেলায় বসতি স্থাপন করেন এবং সেখানে তাঁর একটি সমৃদ্ধ ব্যবসা ছিল।
কাজী জাফর আহমেদ খুলনা জেলা স্কুল থেকে তাঁর পড়াশোনা শুরু করেন। একজন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন তিনি। সেই জেলা স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন জাফর। পরবর্তীকালে রাজশাহী কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন এবং উচ্চশিক্ষার জন্য প্রবেশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিষয় হিসেবে বেছে নেন ইতিহাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই অনার্স-সহ ইতিহাসে বি.এ এবং এম.এ পাশ করেন জাফর। তিনি ছিলেন ১৯৬১ সালের ব্যাচের ছাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হলে থাকতেন তিনি। পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে এম.এ এবং আরও পরে এল.এল.বি কোর্স সম্পন্ন করা সত্ত্বেও রাজনৈতিক সক্রিয়তার জন্য গ্রেপ্তার হওয়ার কারণে পরীক্ষা দিতে পারেননি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীনই বিভিন্নরকম গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্বে যেমন ছিলেন তেমনই সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েন জাফর। ১৯৫৯ থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস সমিতির সাধারণ সম্পাদকের পদে ছিলেন তিনি। তারমধ্যে ১৯৬০ সালে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন জাফর। তবে বিভিন্ন সময়ে ছাত্র ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ সব দায়িত্ব তিনি সামলেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর নির্বাচন এবং অন্যান্য বার্ষিক হল ইউনিয়ন ইভেন্টেও অংশ নেন তিনি। ১৯৬২-৬৩ সালে তিনি ইস্ট পাকিস্তান স্টুডেন্টস ইউনিয়ন বা ইপসু-এর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬২ সালে আবার সামরিক শাসন ও শরীফ শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন জাফর।
ছাত্রজীবন শেষ হয়ে গেলে কাজী জাফর আহমেদ শ্রমিক রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৬৬ সালে জাফর মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেছিলেন। ক্রমে একজন পরিচিত, প্রভাবশালী ও শক্তিশালী শ্রমিক নেতা হয়ে ওঠেন তিনি। বিশেষ করে টঙ্গী-তেজগাঁও শিল্প-এলাকায় শ্রমিকদের সংগঠিত করবার কাজে মনোনিবেশ করেন। এভাবেই তাঁর রাজনৈতিক খ্যাতি বৃদ্ধি পায়।
১৯৭১ সালে দেশজুড়ে যখন মুক্তিযুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে তখনও জাফর আহমেদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সক্রিয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুজিবনগর সরকারের হয়ে কাজ করেছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের গণহত্যার পর ভাসানীর নির্দেশে জাফর দেশের অভ্যন্তরে ও সীমান্তের ওপারে যুদ্ধ করেছিলেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর জাফর মওলানা ভাসানীর ন্যশানাল আওয়ামী পার্টিতে যোগদান করেছিলেন। মওলানা ভাসানীর ইসলামী সমাজতন্ত্রের আদর্শকে সমর্থন করেন তিনি। ১৯৭২ সালে এই মওলানা ভাসানী কাজী জাফর আহমেদকে ন্যাশানাল আওয়ামী পার্টির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন। ভাসানীর এই সিদ্ধান্তে বঙ্গবন্ধু সন্তুষ্ট ছিলেন কিন্তু পাশাপাশি দলের ভিতরকার অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে সেই পদে জাফরের মেয়াদ নিয়েও একইসঙ্গে চিন্তিত ছিলেন।
তবে ১৯৭৪ সালে ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম চৌধুরীর সঙ্গে ইউনাইটেড পিপলস পার্টি (ইউপিপি) তৈরি করেন। এটি ভাসানীর একটি দায়িত্বশীল বিরোধী দল। ১৯৭৪ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত প্রথমে তিনি ইউনাইটেড পিপলস পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও পরে চেয়ারম্যান হিসেবে সক্রিয়ভাবে দলের সাংগঠনিক দায়িত্ব ও রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এরপর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হলে, ১৯৭৮ সালে জিয়াউরের উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত হন জাফর। পরে তিনি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অধীনে পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির শিক্ষামন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন৷
জাফর অন্যদিকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকেও সমর্থন করতে শুরু করেন৷ ১৯৭৫ সালের পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতির যেমন পুনর্গঠন হল তেমনই বাংলাদেশ সাক্ষী থাকল নেতারা তাঁদের পুরোনো দল ছেড়ে নতুন দলে যোগদান করছেন। জাফর আহমেদও কিন্তু এই স্রোতেই গা ভাসালেন। ইউপিপি দলটি ভেঙে দিয়ে তিনি এরশাদের জাতীয় পার্টিতে যোগদান করেন। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির জন্মলগ্ন থেকে ২০১৩ পর্যন্ত জাফর এই দলের একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত যথাক্রমে তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বন্দর-জাহাজ ও নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসাবে যথাযথভাবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছিলেন। এরশাদ ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ প্রধানমন্ত্রী মওদুদ আহমদের অধীনে জাফর আহমদকে উপপ্রধানমন্ত্রী করেন। ১৯৮৮ সালের ৬ জুন ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম করার জন্য এরশাদের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন তিনি৷ অবশেষে ১৯৮৯ সালের আগস্ট মাসে এরশাদের শাসনকালে মওদুদ আহমেদের স্থলে বাংলাদেশের অষ্টম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন কাজী জাফর আহমেদ। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন ছিলেন জাফর। এরশাদ ক্ষমতা থেকে পদত্যাগ করার পরে জাফর ভারতে পালিয়ে গিয়েছিলেন।
১৯৮৬ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত জাতীয় পার্টির সংসদীয় দলের উপনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জাফর। ১৯৮৬ সালের তৃতীয়, ১৯৮৮ সালের চতুর্থ এবং ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মনোনীত সদস্য হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জাফর আহমেদ।
১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারে যোগদানের জন্য এরশাদের সমালোচনা করেন জাফর এবং জাতীয় দল নামে তাঁর নিজস্ব একটি দল তৈরি করেন, যা বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সঙ্গে যোগ দেয়। এরশাদ ক্ষমতা হারানোর পর থেকে কারাবন্দী ছিলেন এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৬ সালে তিনি মুক্তি পান।
কাজী জাফর আহমেদ ২০০৮ সালের বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনে কুমিল্লা-১১ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এটাই ছিল তাঁর রাজনীতিবিদ হিসেবে সর্বশেষ কর্মকাণ্ড।
২০১৩ সালের ৫ মে কাজী জাফর আহমেদ মতিঝিলে হেফাজত-এ-ইসলামের মঞ্চে উঠেছিলেন। সেই কারণে এরশাদ তাঁকে জাতীয় পার্টি থেকে বহিষ্কার করে দেন, আবার জাফরও কয়েক ঘন্টা পরে এই পার্টি থেকে এরশাদকে বহিষ্কারের চেষ্টা করেন। এরপরে জাফর নিজেই জাতীয় পার্টির নিজস্ব দল তৈরি করেন, যেটি জাতীয় পার্টি (জাফর) নামে পরিচিত। তাঁর তৈরি জাতীয় পার্টির সেই উপদলটি নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটে ২০১৪ সালে যোগদান করেন জাফর।
তবে জাফর আহমেদের কাজ নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়ে উঠেছে। বিশেষত চিনি দুর্নীতির ঘটনাটি তাঁর কেরিয়ারের সবচেয়ে কলঙ্কিত এক অধ্যায়। বাংলাদেশে বন্যা ও দুর্যোগে সহায়তার জন্য অনুদান হিসেবে দেওয়া লাখ লাখ ডলারের চিনি চুরি ও বিক্রি করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। অর্থ উপার্জনের জন্য অনেক লোভী ব্যবসায়ী চিনির সাথে ইউরিয়া (খুব সূক্ষ্ম ও সাদা সার) মিশিয়ে বিক্রি করে। ইউরিয়া কিডনির ক্ষতি করে বলে মানুষ কিডনির সমস্যায় ভুগতে শুরু করে। কাজী জাফরের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে কিডনি অকেজো হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণে। সাধারণ মানুষ তাঁকে এতটাই ঘৃণা করতেন যে তাঁকে ‘সুগার জাফর’ বলে ডাকতেন।
এছাড়াও ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাড়ানোর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। খুলনায় জাফরদের একশো একর পারিবারিক জমি ছিল। জাফর ক্যান্সার হাসপাতালের জন্য সেই জমি দান করবার ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সম্পত্তি হাসপাতালের কাছে হস্তান্তর না করে ব্যাপকভাবে জমিকে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় পরিণত করেন। বিদেশী সাহায্য ব্যবহার করে ক্যান্সার ইন্সটিটিউটের নামে অর্থোপার্জন করে নেন জাফর, এমনই অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। খালেদা জিয়ার শাসনকালে এরশাদের জাফর-সহ মন্ত্রীপরিষদের সব মন্ত্রীকে দুর্নীতির অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছিল। জাফর রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তাঁর বিচার অনির্দিষ্টকালের জন্য বিলম্বিত করেছিলেন।
অবশেষে চিনি দুর্নীতির অভিযোগের কারণে, ১৯৯৯ সালের নভেম্বরে ঢাকার আদালত তাঁর অনুপস্থিতিতে জাফরকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়। সেই সময় তিনি কিডনির চিকিৎসার জন্য অস্ট্রেলিয়ায় ছিলেন। খুলনার জমিকান্ডের জন্য তাঁকে আরও ৬ বছরের অতিরিক্ত কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ান সরকারের কাছে তখন আশ্রয় প্রার্থনা করেন জাফর।
কাজী জাফর আহমেদ কিন্তু শিক্ষকতা করবারও সুযোগ পেয়েছিলেন। ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্টার্ন সিডনি একজন বিশিষ্ট ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল জাফরকে। সেখানে তাঁকে নিয়মিত ছাত্র ও কর্মচারীদের সাথে আলাপ-আলোচনা করতে হতো। উপরন্তু, তিনি সেখানে দুটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। একটি বক্তৃতা ছিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতা আন্দোলন এবং অন্যটি ছিল আঞ্চলিক শক্তির ভূমিকা ও উপমহাদেশের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে।
শেষ বয়সে ডায়াবেটিস, কিডনীর অসুখসহ একাধিক শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন কাজী জাফর আহমেদ। ২০১৫ সালের ২৭ আগস্ট সকালে কাজী জাফরকে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া গেলে তৎক্ষণাৎ তাঁকে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে জাফরকে মৃত ঘোষণা করেন। ২০১৫ সালের ২৭ আগস্ট ৭৬ বছর বয়সে এই বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কাজী জাফর আহমেদের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান