সববাংলায়

মওদুদ আহমেদ

বিভাগঃ , ,

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গেলে যেসব রাজনীতিবিদদের কথা উপেক্ষা করা যায় না, তাঁদের মধ্যে একজন হলেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মওদুদ আহমেদ (Moudud Ahmed)। তবে পেশায় তিনি ছিলেন একজন আইনজীবী। বিদেশ থেকে পড়াশোনা করে এসেছিলেন, পরে সক্রিয় রাজনীতির ক্ষেত্রে পদার্পণ করে বাংলাদেশের প্রশাসনিক স্তরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদ সামলেছিলেন। মুজিবর রহমানের সঙ্গে একসময় ঘনিষ্ঠতা ছিল তাঁর। পরবর্তীকালে বিএনপি দল গঠনের একজন মুখ্য সহায়ক ছিলেন। এরশাদের আমলে উপ-রাষ্ট্রপতির পদ পেয়ে সেই গুরুদায়িত্বও সামলেছিলেন মওদুদ। মুক্তিযুদ্ধের সময়তেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন তিনি। রাজনীতির পাশাপাশি একাধিক মননশীল গ্রন্থও রচনা করেন মওদুদ।

১৯৪০ সালের ২৪ মে ব্রিটিশ শাসনাধীন অবিভক্ত ভারতে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির নোয়াখালীর অন্তর্ভুক্ত মানিকপুর গ্রামে একটি বাঙালি মুসলিম ভুঁইয়া পরিবারে মওদুদ আহমেদের জন্ম হয়। তাঁর পিতা মৌলানা মমতাজউদ্দিন আহমেদ (Maulana Momtazuddin Ahmed) ছিলেন ইসলামী হাদিস বিষয়ে সুপন্ডিত এবং কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা, প্রেসিডেন্সি কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন। মওদুদের মায়ের নাম বেগম আম্বিয়া খাতুন (Begum Ambia Khatun)। মওদুদ ছিলেন পিতামাতার চতুর্থ সন্তান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বিএ এবং এমএ ডিগ্রি সম্পূর্ণ করেন মওদুদ। ১৯৬৬ সালে তাঁকে লন্ডনের লিঙ্কনস ইন-এর ইংলিশ বারে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তিনি হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়েরও ফেলো ছিলেন। ১৯৯৭ সালে তিনি জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এলিয়ট স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের ব্ল্যান্ড ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন। এছাড়াও এলিয়ট স্কুলের আন্তর্জাতিক কাউন্সিলের সদস্যও ছিলেন মওদুদ।

যুক্তরাজ্যে থাকাকালীন, পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রদের মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের কল্পনা জাগিয়ে তোলবার জন্য যে বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, মওদুদ তার অংশ ছিলেন।

বিদেশ থেকে ঢাকায় ফিরে আসবার পরেই একরকম বলা যায় যে, সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন মওদুদ। ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচারের সময় তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আইনি দলে যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের সঙ্গে রাওয়ালপিন্ডি গোলটেবিল সম্মেলনে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাঙালি প্রতিনিধি দলের সাথেও তিনি গিয়েছিলেন। এখানে উল্লেখ্য যে, বঙ্গবন্ধুর খুবই ঘনিষ্ঠ হলেও মওদুদ কখনই আওয়ামী লীগ সরকারের অংশ ছিলেন না, তবে লন্ডনে থাকাকালীন তিনি এই বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন যে, আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে। যাই হোক, এরপর ক্রমশ পূর্ব পাকিস্তান উত্তাল হয়ে উঠতে শুরু করে। চতুর্দিকে মুক্তিযুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় মওদুদ কলকাতায় বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারে যোগদান করেছিলেন। এই সরকারের বহিরাগত প্রচার বিভাগের হয়ে কাজ করেছিলেন তিনি।

যেসব বাঙালি গণহত্যার শিকার হয়েছিলেন তাঁদের জন্য মওদুদ অনেক সমাবেশে মানবিক বক্তব্যও রেখেছিলেন।

মওদুদ ছিলেন নাগরিক স্বাধীনতা ও আইনি সহায়তার জন্য ৩৩ জন সদস্যের কমিটির একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য যা বিরোধী রাজনীতিবিদ এবং নাগরিক সমাজের সদস্যদের রক্ষা করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৭৪ সালের ৩১ মার্চ তারা সরকারের রোষানলে পড়ে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের প্রথম পোস্টমাস্টার জেনারেল হয়েছিলেন মওদুদ আহমেদ। ১৯৭৪ সালেরই ডিসেম্বর মাসে স্বাধীন বাংলাদেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল। সেই সময়তেই কয়েক ঘন্টার মধ্যে মওদুদকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে বন্দী করা হয়েছিল। তবে খুব শীঘ্রই জানা গিয়েছিল যে, বঙ্গবন্ধু নিজেই মওদুদকে গ্রেপ্তার করবার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই ঘটনাই আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে মওদুদের সখ্যতার অবসান ঘটিয়েছিল।

১৯৭৫ সালে সামরিক বাহিনী দ্বারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হলে, জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন মওদুদ। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি গঠনে সহায়তা করেছিলেন মওদুদ। ১৯৭৯ সালে বিএনপি দলের হয়ে প্রথমবার সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন মওদুদ এবং এই জিয়াউর রহমানের শাসনামলেই ১৯৭৯ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ১৯৮০ সালের ২ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি উপ-প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। উপ-প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমানের সঙ্গে ক্রমাগত বিরোধের কারণে জিয়াউর রহমান মওদুদকে বহিষ্কার করে দিয়েছিলেন।

এরপর জিয়াউর রহমানের হত্যার পর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের উত্থানের শুরু। ১৯৮৫ সালে লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুহম্মদ এরশাদের নবগঠিত জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন মওদুদ। এই এরশাদের শাসনকালে পুনরায় উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদে বহাল হন তিনি। ১৯৮৬ সালের ৯ জুলাই থেকে ১৯৮৮ সালের ২৭ মার্চ পর্যন্ত এই পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন তিনি। তবে সেই সঙ্গে শিল্প মন্ত্রণালয় এবং যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও সামলেছিলেন তিনি।

রাষ্ট্রপতি এরশাদের আমলে ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হয়েছিলেন মওদুদ আহমেদ। সেই বছরে বাংলাদেশের ভয়াবহ বন্যার সময় ত্রাণ কার্যক্রম দক্ষভাবে তদারকি করেছিলেন তিনি। তাঁকে  ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে মার্গারেট থ্যাচার সহ বেশ কয়েকজন পশ্চিমা নেতার সাথে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ১৯৮৯ সালে এরশাদ মওদুদের জায়গায় বামপন্থী কাজি জাফর আহমেদকে প্রধানমন্ত্রীর পদে বসিয়েছিলেন। তবে সেই বছরই সেপ্টেম্বর মাসে মওদুদ উপরাষ্ট্রপতির পদে উন্নীত হয়েছিলেন। তবে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হওয়ার পথ করে দেওয়ার জন্য তিনি ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর মাসে পদত্যাগ করেছিলেন।

এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হলে মওদুদকে কারাগারে বন্দী করা হয়। এরপর খালেদা জিয়া ১৯৯৬ সালে মওদুদকে বিএনপিতে পুনরায় ফিরে যেতে আমন্ত্রণ জানান। ১৯৯৬ সালেই কারাগারে থাকা অবস্থাতেই সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। এরপর ২০০১ সালেও আরও একবার সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। নোয়াখালী-১ এবং নোয়াখালী-৫  আসন থেকে মোট পাঁচবার তিনি  জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। খালেদা জিয়া মওদুদকে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রীসভার দায়িত্ব দিয়েছিলেন।

২০০৭ সালে সামরিক বাহিনী-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার অবৈধ মদ রাখার অভিযোগে মওদুদকে গ্রেপ্তার করেছিল। তবে ২০০৮ সালে সুপ্রিম কোর্টে মামলাটি খারিজ হয়ে গিয়েছিল। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর আহমেদ নোয়াখালীতে তাঁর নির্বাচনী এলাকায় একটি উচ্ছ্বসিত সংবর্ধনা পান। তিনি ২০০৮ সালে সংসদে পুনর্নির্বাচিত হন। ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করে। তাঁর পরিবার ‘দ্য গার্ডিয়ান’ সংবাদপত্রকে জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে দেশ কারাগারে পরিণত হচ্ছে। ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচন বয়কট করেন মওদুদ।

আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ঢাকার গুলশান এলাকায় মওদুদ ও তাঁর ভাই মঞ্জুরের নামে অবৈধভাবে সম্পত্তি দখল করবার অভিযোগ ওঠে এবং আদালতও সেই অভিযোগপত্র গ্রহণ করে। মওদুদ জানান, এটি রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ২০১৭ সালের ৮ জুন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ মওদুদকে তাঁর গুলশানের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে দেয়। এই উচ্ছেদকে আওয়ামী লীগ সরকারের ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন মওদুদ। ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই বাড়িতে বসবাস করছিলেন তিনি৷

এখানে উল্লেখ্য যে, মওদুদ আহমেদের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের পল্লীকবি জসীমউদ্দিনের মেয়ে হাসনা জসীমউদ্দিনের (Hasna Jasimuddin) বিবাহ হয়েছিল। এই হাসনা জসীমউদ্দিনও সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রচনা করেছিলেন মওদুদ, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল, ‘সংসদে যা বলেছি’, ‘সাউথ এশিয়া : ক্রাইসিস অব ডেভেলপমেন্ট–দ্য কেস অব বাংলাদেশ’, ‘ডেমোক্রেসি অ্যান্ড দ্য চ্যালেঞ্জ অব ডেভেলপমেন্ট: এ স্টাডি অফ পলিটিক্স অ্যান্ড মিলিটারি ইন্টারভেনশনস ইন বাংলাদেশ’, ‘চলমান ইতিহাস’, ‘বাংলাদেশ : এরা অফ শেখ মুজিবুর রহমান’ ইত্যাদি।

২০২০ সালের ৩০ ডিসেম্বর হিমোগ্লোবিনের মাত্রা হ্রাসের কারণে ঢাকায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন মওদুদ। এরপর একটি স্ট্রোকের শিকার হন এবং কয়েক সপ্তাহ পরে তাঁর বুকে একটি পেসমেকার বসানো হয়।

২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পালমোনারি কনজেশন এবং কিডনির সমস্যা নিয়ে মওদুদ সিঙ্গাপুরে একটি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। অবশেষে একমাস পরে ২০২১ সালের ১৬ মার্চ ৮০ বছর বয়সে এই আইনজীবী এবং প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ মওদুদ আহমেদের মৃত্যু হয়। ২০২২ সালের ১২ মার্চ মওদুদের স্ত্রী অবশ্য দাবি করেছিলেন যে, তাঁর স্বামীকে ষড়যন্ত্র করে হত্যা করা হয়েছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading