খেলা

খো খো খেলা

খো খো খেলা

ভারতের প্রাচীনতম ঐতিহ্যবাহী আউটডোর খেলাগুলির মধ্যে অন্যতম হল খো খো খেলা (Kho Kho Games)। দুটি দলের মধ্যেই এই খেলাটি অনুষ্ঠিত হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের সবথেকে জনপ্রিয় খেলাগুলির মধ্যে কবাডির পরেই খো খো-র স্থান। তবে ভারতে উৎপত্তি হলেও বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে ব্যাপকভাবে খো খো খেলা হয়, এমনকি দক্ষিণ আফ্রিকা, পাকিস্তান এবং ইংল্যান্ডেও এই খেলাটি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। শিশু ও কিশোরদের মানসিক বিকাশে এই প্রতিযোগিতামূলক খেলাটি আজও সমানভাবে জনপ্রিয়।

অনেক ক্রীড়া ইতিহাসবিদ মনে করেন যে ‘ট্যাগ’ বা ‘ক্যাচ’ থেকেই সম্ভবত খো খো খেলার উৎপত্তি হয়েছে। সহজভাবে বলতে গেলে এই ট্যাগ বা ক্যাচ হল কোনো একজন ব্যক্তিকে তাড়া করা এবং তাঁকে ধরে ফেলার খেলা। তামিলনাড়ুতে এই খো খো খেলা বহু প্রাচীনকালে রথের মধ্যে খেলা হত আর তাই এটি ‘রাথেরা’ নামে পরিচিত ছিল। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময় থেকে এই খেলার বিবর্তিত আধুনিক রূপটি তৈরি হয়। লোকমান্য বালগঙ্গাধর তিলক এবং তাঁর ভাই নারোরকারের প্রতিষ্ঠিত মহারাষ্ট্রের পুনেতে অবস্থিত ‘ডেকান জিমখানা ক্লাব’-এই প্রথম এই খেলার নিয়ম-কানুন ও সংবিধানের একটি খসড়া করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে মাঠের সীমাবদ্ধতা ছিল, মাঝ মাঠের লাইন চিহ্নিতকারী একটি খুঁটির অভাব ছিল সেই সময়। তুলনামূলকভাবে কম অভিজ্ঞ খেলোয়াড়েরা মাঠের একেবারে শেষ প্রান্তে হাঁটু মুড়ে পৌঁছে যেত এবং অনুসরণকারীদের ধরার জন্য পুনরায় মাঝ মাঠে ফিরে আসত। এই খেলার মধ্য দিয়ে খেলোয়াড়দের স্নায়বিক সক্ষমতা, সহনশীলতা, শক্তি ও সামর্থ্য এবং নমনীয়তার পরীক্ষা হয় যা সেই সময়কার ক্রীড়াবিদদের আকৃষ্ট করেছিল। বম্বে প্রেসিডেন্সির গভর্নর এইচ. ই. লর্ড উইলিংডনও এই খেলার প্রশংসা করেছিলেন। ১৯২৩-২৪ সাল নাগাদ আন্তঃবিদ্যালয় ক্রীড়া সংস্থার ভিত্তি স্থাপিত হয় এবং একেবারে প্রাথমিক স্তরে এই খো খো খেলার সূত্রপাত হয়। ফলত ঐতিহাসিকদের মতে ডেকান জিমখানা ক্লাব এবং হিন্দ বিজয় জিমখানা ক্লাবের উদ্যোগেই এই খেলার প্রচলন হয় ভারতে। ১৯৩৮ সালে মহারাষ্ট্রের ‘অখিল মহারাষ্ট্র শারীরিক শিক্ষন মণ্ডল’-এর উদ্যোগে আকোলায় একটি আঞ্চলিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজিত হয় যা উদীয়মান খো খো খেলোয়াড় আর ক্রীড়া সংগঠকদের যথেষ্ট উৎসাহিত করেছিল। ১৯৪৩ সাল থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে খো খো-র এই রূপ আরো বিবর্তিত হয়। ১৯৪৯ সালে সুইডেন ও ডেনমার্কেও খো খো খেলা প্রদর্শিত হয়। কিন্তু বিদেশি দর্শকদের কাছে এই খেলা খুব একটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি সেই সময়। ১৯৫৫ সালে ‘অখিল ভারতীয় খো খো মণ্ডল’ স্থাপিত হয়। ১৯৫৯-৬০ সালে ভারতীয় খো খো ফেডারেশনের পক্ষ থেকে অন্ধ্রপ্রদেশের বিজয়ওয়াড়াতে সর্বপ্রথম ভারতীয় খো খো প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৬০-৬১ সাল নাগাদ মহারাষ্ট্রের কোলাপুরে প্রথম মহিলাদের খো খো প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৬৩ সাল থেকে ভারতে খো খো খেলার জন্য পৃথক পৃথক প্রতিযোগীদের জন্য পুরস্কার প্রদানের রীতি চালু হয়। ভারতের প্রথম ‘ম্যান অফ দ্য টুর্নামেন্ট’ হিসেবে বিশ্বনাথ মায়েকার ‘একলব্য পুরস্কার’-এ ভূষিত হন এবং প্রথম ওম্যান অফ দ্য টুর্নামেন্ট হিসেবে মহীশূরের উষা অনন্তম অর্জন করেন ‘রানি লক্ষ্মীবাঈ পুরস্কার’। ১৯৬৯-৭০ সালে অনুর্ধ্ব ১৮ এবং অনুর্ধ্ব ১৬ বছর বয়সী প্রতিযোগীদের জন্য টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়দের ‘অভিমন্যু পুরস্কার’ দেওয়ার রীতি চালু হয়। ১৯৭৪ সালে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াসে জুনিয়র গার্লস খো খো টুর্নামেন্টে অনুর্ধ্ব ১৪ বছর ও অনুর্ধ্ব ১২ বছরের প্রতিযোগীদের জন্য ‘ভারতবালা’ ও ‘বীরবালা’ পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়। এরপরে ১৯৮২ সালে ভারতীয় খো খো ফেডারেশন পুরুষ ও মহিলাদের জন্য পৃথকভাবে বার্ষিক চ্যাম্পিয়নশিপ হিসেবে ‘ফেডারেশন কাপ’ চালু করে। ঐ বছরই নয়া দিল্লিতে আয়োজিত এশিয়ান গেমসে প্রথমবার খো খো প্রদর্শিত হয়। এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলিও এই খেলাকে যথেষ্ট প্রশংসা করেছিল। ২০১৬ সালে আসামের গৌহাটিতে আয়োজিত দ্বাদশ সাউথ এশিয়ান গেমসে প্রদর্শিত অন্যতম সেরা খেলাগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল খো খো। ১৯৯৬ সালে প্রথম খো খো খেলার এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজিত হয় পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা শহরে। তারপরে ২০০০ সালে দ্বিতীয় এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপটি আয়োজিত হয়েছিল বাংলাদেশের ঢাকায় এবং তৃতীয় এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের স্থান ছিল মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে। ১৯৯৯ সালে দ্য এশিয়ান খো খো ফেডারেশন স্থাপিত হয় এবং এই সংস্থার সদস্য দেশগুলি ছিল ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও মালদ্বীপ। ক্রমে এই খেলা ভারত ছাড়িয়ে ইংল্যান্ডের মাটিতেও ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৩ সালে ব্রিজ হালদানিয়া নামে এক রাজস্থানি খো খো খেলোয়াড় প্রতিষ্ঠা করেন ‘দ্য খো খো ফেডারেশন অফ ইংল্যান্ড’ এবং ক্রমে আন্তর্জাতিক স্তরে এই খেলাটিকে ছড়িয়ে দিতে ২০১৮ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল খো খো ফেডারেশন’ স্থাপিত হয়।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

খো খো খেলা সাধারণভাবে তিন প্রকারে খেলা হয়, যেমন সাধারণ খো খো, অত্যাধুনিক খো খো এবং পোল খো খো। প্রত্যেকটি খেলার মত এই খেলারও বিশেষ কিছু নিয়ম-নীতি রয়েছে। খো খো খেলার প্রত্যেক ম্যাচে দুটি করে ইনিংস থাকে। প্রত্যেক ইনিংসে নয় মিনিটের তাড়া (Chasing) ও দৌড়ের (Running) পালা থাকে। মাঠের মাঝখানে একটি দলের আট জন খেলোয়াড় একটি সারিতে হাঁটু গেঁড়ে বসে, অপর দলের খেলোয়াড়েরাও ঠিক একইভাবে মুখোমুখি বসে। এদের মধ্যে তিন জন দৌড়বাজ থাকে যাদের মধ্যে মাঠে দৌড়ে সবথেকে কম সময়ে বিপক্ষের সকল প্রতিযোগীকে ছুঁয়ে আসতে পারবে, তিনিই খো খো খেলায় জেতেন। মাঠের প্রত্যেক প্রান্তে একটি করে খুঁটি থাকে এবং দৌড়বাজরা দুজন খেলোয়াড়ের মধ্যে দিয়ে দৌড়াতে পারলেও ধাওয়াকারীরা (Chaser) দৌড়ানোর সময় পিছন ফিরতে বা দুজন খেলোয়াড়ের মাঝখান দিয়ে দৌড়ে যেতে পারেন না। ধাওয়াকারীরা একেবারে একটি নির্দিষ্ট দিকে দৌড়াতে পারেন যতক্ষণ না পর্যন্ত তিনি মাঠের কোনো একটি খুঁটিকে ছুঁয়ে বিপরীত দিকে ফিরে আসছেন। এই ধাওয়াকারীরা খুঁটির কাছে গিয়ে যখন বিপরীত পথে ফিরে আসে, সে চাইলে ঐ সময় অন্যদিকে খুঁটিটি পার করেও যেতে পারে। প্রতিটি ম্যাচে কে ধাওয়াকারী হবে আর কে দৌড়বাজ হবে তা একটি টসের মাধ্যমে স্থির হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ধাওয়াকারীদের দলের অধিনায়ক তাঁদের পালা শেষ করতে পারেন। যে দল বেশি পয়েন্ট অর্জন করবে, সেই দলই এই খেলায় জিততে পারে। খেলার দৌড়বাজ কিংবা ধাওয়াকারীরা বাদে বাকি খেলোয়াড়দের বলা হয় রক্ষক (Defender)। এই রক্ষকদের মধ্যে কেউ আউট হলে, তারা তখন লবি থেকে সিটিং বক্সে চলে আসে। যদি কোনো কারণে ম্যাচ অসম্পূর্ণ থাকে, তাহলে ঐ একই সেশনে একই খেলোয়াড় ও একই কর্মকর্তা ও ক্রীড়া পরিচালকদের নিয়ে এই খেলাটি অনুষ্ঠিত হয়। এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ পালাটির স্কোর ধরা হয়, কিন্তু অসম্পূর্ণ পালার ক্ষেত্রে একেবারে নতুন করে ম্যাচ শুরু হয়। যদি একান্তই অসম্পূর্ণ পালাটি একই সেশনে আর খেলা না হয়, সেক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ম্যাচটিই পুনরায় নতুন করে খেলতে হয় প্রতিযোগীদের। এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় মাথায় রাখতে হয়, ধাওয়াকারীরা তাঁদের দলের অন্য খেলোয়াড়দের পিঠে হাত দিয়ে চাপড়ে এবং ‘খো’ বলে নিজের পালা হস্তান্তর করতে পারে। খেলার নিয়ম-কানুন ছাড়াও মাঠের কিছু বৈশিষ্ট্য এখানে লক্ষ্যণীয়। খো খো খেলার মাঠ সর্বদা আয়তাকার হওয়া উচিত এবং তা দৈর্ঘ্যে ২৭ মিটার ও প্রস্থে ১৬ মিটার হওয়া দরকার। দুটি এই মাপের আয়তাকার জমির মাঝখানে দুটো কাঠের খুঁটি পোঁতা থাকে। মাঝের যে অংশ তা দৈর্ঘ্যে ২৪ মিটার এবং প্রস্থে ৩০ সেমি হয়ে থাকে। এই কেন্দ্রীয় লাইনের উপর দিয়ে আটটি ছেদক রেখা চলে গেছে যারা আরো কিছু কিছু ক্ষুদ্র আয়তাকার জমি তৈরি করেছে। সমগ্র খেলায় আয়তাকার মাঠের দুটি দিকে দুজন রেফারি হাতে স্টপওয়াচ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন যারা মূলত তাঁদের বিপরীত দিকের খেলোয়াড়দের সময় পরিমাপ ও খেলার নিয়ম-কানুনের রীতি পর্যবেক্ষণ করেন।

আগে মাঠের মাঝে কোনো খুঁটি ছাড়াই প্রতি দলে মোট নয় জন খেলোয়াড় নিয়ে এই খো খো খেলাটি আয়োজিত হত। ম্যাচের শুরুতে প্রত্যেক কোর্টের একটি খুঁটি থেকে অপর খুঁটিতে তিন রাউণ্ড দৌড়তে হত প্রতিযোগীদের। কিন্তু ১৯৪৯ সালের পরেই এই খেলায় মাঝ মাঠে খুঁটি বসানো শুরু হয় এবং খেলার একেবারে শুরুতে প্রতিযোগীদের তিন রাউণ্ড দৌড়ের বদলে এক রাউণ্ড দৌড়নো স্থির হয়। ১৯৫১ সালে এই নিয়মটিও বাতিল হয়ে যায়।

বর্তমানে ভারতের খো খো ফেডারেশন এই খেলার সমস্ত প্রতিযোগিতা আয়োজন করে থাকে। ভারতের অন্যতম সেরা খো খো খেলোয়াড়দের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মহীশূরের প্রবীণ কুমার, ওড়িশার মন্দাকিনী মাঝি, জম্মু ও কাশ্মীরের পঙ্কজ মালহোত্রা, মহারাষ্ট্রের সারিকা কালে এবং সতীশ রাই প্রমুখ।   

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন