হিন্দুধর্মের অন্যতম প্রধান দেবতা হলেন সূর্যদেব। শাস্ত্রমতে, তিনি আলো ও শক্তির দেবতা। বৈদিক যুগ থেকেই ভারতবর্ষে সূর্য পূজা এবং সূর্য মন্দিরের বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে। এই রকমই এক জনপ্রিয় সূর্য মন্দির হল ওড়িশার কোনারক সূর্য মন্দির (Konark Sun Temple)। ১৯৮৪ সালে ইউনেস্কো এই মন্দিরটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করেছে। ভারতীয় দশ টাকার নোটেও এই মন্দিরের ছবি রয়েছে। এছাড়াও মন্দির প্রাঙ্গণে থাকা যোদ্ধা ও ঘোড়ার মূর্তিকে ওড়িশা সরকার রাজ্যের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছে।
কৌতূহলের বিষয় হল — কোনারক সূর্য মন্দিরে কোনো রকম পূজার্চনা করা হয় না। তবুও প্রতিদিন বহু মানুষ ভিড় করেন এই মন্দিরের অনন্য নকশা, কারুকার্য এবং স্থাপত্যশৈলী দেখার জন্য। মন্দিরের শৈল্পিক ভাবনায় মুগ্ধ হন সাধারণ দর্শক থেকে শুরু করে গবেষক এবং স্থপতিরাও। এই মন্দিরের অপর নাম সূর্যদেউলা, সূর্যদেউল বা সূর্যদেবালয়। ইউরোপীয় নাবিকেরা একে ‘কালো প্যাগোডা’ বলে ডাকতেন। প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন এই মন্দির।
পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পুত্র শাম্ব ছিলেন অত্যন্ত সুন্দর সুপুরুষ। শাম্ব একদিন এক জ্ঞানী ঋষিকে ব্যঙ্গ করেছিল। তখন ওই ঋষি প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য শাম্বকে প্রলুব্ধ করে কৃষ্ণের স্ত্রীদের স্নানরত একটি পুকুরে নিয়ে যান আর নিজে পালিয়ে যান। ওই স্থানে কৃষ্ণ একা শাম্বকে দেখে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। সৎ মায়েদের প্রতি শাম্বের এইরূপ অশোভন আচরণের জন্য কৃষ্ণ তাঁকে নিজের রূপ হারিয়ে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হওয়ার অভিশাপ দেন। বিনা অপরাধে শাস্তি পেয়ে শাম্ব চন্দ্রভাগা নদী ও কোনারকের সমুদ্রের উপকূলের সঙ্গমস্থলে গিয়ে পৌঁছান। সেখানে তিনি দীর্ঘ ১২ বছর ধরে কঠোর তপস্যা করেন। অবশেষে সূর্যদেবের কৃপায় আরোগ্য লাভ করেন। এই কারণে শাম্ব কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ওই স্থানে একটি সূর্যমন্দির নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেন। পরের দিন নদীতে স্নান করার সময় শাম্ব সূর্যের দেহাংশ দ্বারা নির্মিত একটি মূর্তি খুঁজে পান। শাম্ব মূর্তিটিকে ওই মন্দিরে স্থাপন করেন। সেই কারণে এই স্থানটিকে পবিত্র বলে মনে করা হয়।
ভারতীয় পণ্ডিতদের মতে ১২৫০ সালে পূর্ব গঙ্গা রাজবংশের রাজা প্রথম নরসিংহদেব (Narasingha Deva I) চন্দ্রভাগা নদীর মোহনায় কোনারক সূর্য মন্দিরটি স্থাপন করেন। বর্তমানে কোনারক মন্দিরের কাছে এই নদীটির চিহ্ন আর বিশেষ কিছু অবশিষ্ট নেয়। সম্ভবত মুসলিম আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে সফল অভিযানের পর রাজা এই মন্দিরটি নির্মাণ করান। রাজা নরসিংহদেব ১২০০ কারিগরকে ১২ বছরের মধ্যে মন্দির নির্মাণ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই মন্দির নির্মাণের প্রধান কারিগর ছিলেন বিশু মহারাণা। কথিত আছে যে, সময়ের মধ্যে মন্দির নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ না হলে শ্রমিকদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আদেশ দিয়েছিলেন রাজা । সেইসময়ই ধর্মপদ নামক বারো বছরের এক শিশু আবির্ভূত হয় এবং সে নিজেকে বিশু মহারাণার ছেলে বলে দাবি করেন। ওই শিশুটিই পরবর্তীকালে ১২০০ কর্মচারীর প্রাণ বাঁচান ও রাজার অহঙ্কারকে বিনাশ করার জন্য মন্দিরের উপর থেকে চন্দ্রভাগা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। জনশ্রুতি আছে যে, ওই শিশুটি ছিলেন স্বয়ং সূর্যদেব। সেই থেকেই এই মন্দিরে পূজার্চনা নিষিদ্ধ করা হয়। মন্দিরটি বিভিন্ন সময়ে বিদেশীদের আক্রমণ ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। এরপর এই মন্দিরটি দীর্ঘদিন বালির নীচে চাপা পড়ে ছিল। প্রায় ১১৮ বছর ধরে মন্দিরের দরজা পুরোপুরি বন্ধ ছিল। বিংশ শতাব্দীর প্রত্নতত্ত্ববিদরা এই মন্দির পুনরায় আবিষ্কার করেন। তবে বর্তমানে দর্শনার্থীরা মূল মন্দিরে প্রবেশ করতে পারেন না। তারা কেবল নাটমন্দির ও সূর্য মন্দিরের বাইরের অপরূপ কারুকার্যই দেখতে পারেন।
সংস্কৃত শব্দ ‘কোণ’ আর ‘অর্ক’এর সংমিশ্রণে হয় কোনারক। এখানে কোণ বলতে সম্ভবত মন্দিরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণকে আর অর্ক বলতে সূর্যকে বোঝানো হয়েছে। আর এই সূর্যদেবের পূজিত স্থান বা কোণকেই কোনারক বলা হয়। এই মন্দিরে কলিঙ্গ স্থাপত্যেশৈলীর অসাধারণ নিদর্শন রয়েছে। প্রায় একশো ফুট বা ৩০ মিটারের কোনারক সূর্য মন্দিরটি একটি বিশাল চলমান রথের মতো দেখতে। তবে মনে করা হয় যে, একসময় মন্দিরটির উচ্চতা ছিল প্রায় ২০০ ফুট। এই রথটিতে রয়েছে বারো জোড়া চাকা, যা বছরের বারো মাসকে নির্দেশ করে। আর বারো জোড়া চাকা অর্থাৎ মোট চব্বিশটি চাকা দ্বারা প্রতি মাসের কৃষ্ণপক্ষ ও শুক্লপক্ষকে বোঝান হয়। এখানে প্রতিটি চাকার ব্যাস প্রায় ১২ ফুট বা ৩.৭ মিটার। এই বিশাল রথটিকে টেনে চলেছে সাতটি ঘোড়া। এই সাতটি ঘোড়া সপ্তাহের সাতটি দিনকে নির্দেশ করে। রথের চাকার আটটি দাড়ি মানে একদিনের অষ্টপ্রহর।
কথিত আছে যে, এই চাকার সাহায্যে একসময় নিখুঁত সময় নির্ণয় করা যেত। অনেক ভারতীয় মন্দিরের মতো এই মন্দিরেরও কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কোনারকের প্রধান মন্দিরকে স্থানীয়ভাষায় দেউল বলা হয়, যা মন্দিরের
ছাদের উপরে ছিল। মন্দিরের একেবারে উঁচু অংশকে বলা হয় শিখর যা বর্তমানে লুপ্ত হয়ে গেছে। জনশ্রুতি আছে যে পর্তুগিজ দস্যুরা এই মন্দিরের শিখরের শক্তিশালী চুম্বকটিকে নষ্ট করে দিয়েছিল। এর সামনে রয়েছে পিরামিড আকৃতির জগমোহন বা দর্শক হল। আর তার সামনে রয়েছে নাটমন্দির। ছাদবিহীন নাটমন্দিরটিতে রয়েছে উঁচু উঁচু স্তম্ভ। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী দেবতার উদ্দেশ্যে নর্তক-নর্তকীরা এই স্থানে নৃত্য পরিবেশন করতেন। এছাড়া ছিল ভোগমন্ডপ। মূল মন্দিরে প্রবেশ পথে ছিল মনোলিথিক ক্লোরাইড পাথরের একটি অরুণ স্তম্ভ, যা সূর্যের সারথি অরুণের উদ্দেশে নির্মাণ করা হয়েছিল। এই স্তম্ভটির উচ্চতা ছিল প্রায় ৩৩ ফুট ৮ ইঞ্চি। এই স্তম্ভটি পরবর্তীকালে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের সামনে স্থাপন করা হয়।
কোনারক সূর্য মন্দিরের প্রবেশপথের দুদিকে রয়েছে বিশাল দুটি সিংহের মূর্তি যারা লড়াই করছে দুটি রণহস্তীর সঙ্গে। আর এই রণহস্তীরা পিষে মারছে মানুষকে। এখানে সিংহ শক্তি ও ক্ষমতার প্রতীক আর হাতি সম্পত্তির প্রতীক। এই দুইয়ের চাপে মানুষ ক্রমশই পিষে মরছে। এই মন্দিরটি ত্রয়োদশ শতাব্দীর তিন ধরনের পাথর দ্বারা নির্মাণ করা হয়েছিল। মন্দিরের দরজার লিন্টেল, ফ্রেম ও কিছু স্থাপত্য তৈরীর জন্য ক্লোরাইড ব্যবহার করা হয়েছিল। এছাড়া মন্দিরের অন্যান্য অংশের জন্য খোন্ডালাইট পাথর, বেলেপাথর ব্যবহার করা হয়। আর মন্দিরের সিঁড়ির জন্য ল্যাটেরাইট মাটির ব্যবহার করা হয়েছিল। এই পাথরগুলি এমন সুন্দরভাবে পালিশ করা হয়েছিল যে পাথরের মাঝখানের দাগগুলি দেখাই যেত না। এছাড়া এই মন্দিরটি এমন ভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে সূর্যোদয়ের প্রথম রশ্মি সর্বপ্রথম মূল মন্দিরের সামনে পড়ে। এই মন্দিরের গায়ে খোদাই করা আছে কারুকার্যমন্ডিত নানা চিত্র। সারা বিশ্বজুড়ে এই মন্দিরের খ্যাতি মূলত মন্দিরের শিল্পকর্ম, মূর্তি ও অপরূপ থিমের জন্য। কোনারক সূর্য মন্দিরের পাথরের ভাষা যেন মানুষের ভাষাকেও পরাজিত করে দেয়। মন্দিরের গায়ে খোদাই করা নানা দেবতা এবং মানুষের চিত্র, নর্তকী, সংগীতজ্ঞ, প্রেমিক-প্রেমিকার যুগল মূর্তির অপরূপ স্থাপত্য দর্শনার্থীদের বিস্মৃত করে। এছাড়া শিকার এবং সামরিক যুদ্ধ থেকে শুরু করে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা চিত্র, নানা পশু-পাখি, উদ্ভিদের মূর্তিও কোনারক মন্দিরের দেওয়ালে খোদাই করা আছে। এই সকল মূর্তি হয়ে উঠেছে মানুষ ও দেবতার সামগ্রিক জীবনের প্রতিচ্ছবি। তাছাড়া কোনারক সূর্য মন্দির বিখ্যাত তার অপরূপ মৈথুন স্থাপত্য শিল্পের জন্য। তবে বর্তমানে এই মন্দিরের অনেক স্থাপত্যশিল্পকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য বিভিন্ন স্থানে সংরক্ষিত করে রাখা হয়েছে।
কোনারক মন্দিরের ভিতরে বর্তমানে কোন মূর্তি নেই। এই মন্দিরের সূর্য মূর্তিটি বর্তমানে কোনারক মিউজিয়ামে রাখা আছে। ওই মূর্তিটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হল যে, হিন্দু দেবতা সূর্য এখানে বুট পড়ে আছেন। মূর্তিটি উজ্জ্বল ও দণ্ডায়মান যে রথে রয়েছে সেই রথটি সাতটি ঘোড়া টানছে। সমগ্র স্থাপত্যটি একটা ক্লোরাইডের পাথরের পাদদেশের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এই মূর্তিটির দৈর্ঘ্য ৩.৩৮ মিটার আর প্রস্থে ১.৮ মিটার। এছাড়া মূর্তিটি ৭১ সেন্টিমিটার পুরু। এখানে সূর্যদেবকে একটি ছোট পোশাক ও অনেক অলংকার পড়ে থাকতে দেখা যায়, যেমন- তার কোমরে রয়েছে কোমর বন্ধন, মাথায় রয়েছে মুকুট, কানে আছে দুল। নিজের দুই হাতে সে দুটি পদ্ম ধরে আছে। এছাড়া সূর্যের দুই পাশে রয়েছে ঊষা ও প্রত্যুষা নামক দুই দেবী। অনুমান করা হয় যে, চুম্বকীয় আকর্ষণের কারণে এই মূর্তিটি একসময় বাতাসে ঝুলে থাকত।
প্রতি বছর বহু দর্শক কোনারক সূর্য মন্দির দেখতে আসেন। তবে মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের সপ্তমী তিথিতে কোনারক মন্দিরের কাছে চন্দ্রভাগা সমুদ্র সৈকতে সূর্যদেবকে উৎসর্গ করে চন্দ্রভাগা মেলাতে প্রচুর লোকের সমাগম হয়। এছাড়া এখানে ডিসেম্বর মাসে পাঁচদিন ধরে চলে নৃত্যানুষ্ঠান। এইসময় মন্দিরের নাটমন্দির প্রাঙ্গণে ভারতের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী শাস্ত্রীয় নৃত্য প্রদর্শিত হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান