ইতিহাস

কুশমন্ডি

ঐতিহ্যবাহী গমীরার মুখোশের জন্য বিখ্যাত কুশমন্ডি উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরের সাংস্কৃতিক পরম্পরার প্রাণকেন্দ্র। পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার গঙ্গারামপুর মহকুমার অন্তর্ভুক্ত এক সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক (Community Development Block) কুশমন্ডি(Kushmandi)। বর্ণাঢ্য মুখা-মেলা, পাল আমলের সুপ্রাচীন মহীপাল দীঘি, উনিশ শতকের নীলকুঠি, কংসব্রত পালন – ঐতিহ্য, ইতিহাস, মিথ সব যেন মিলেমিশে এক হয়েছে প্রসিদ্ধ এই জনপদকে ঘিরে।

কুশমন্ডি

ভৌগোলিক অবস্থানগত ভাবে কুশমন্ডি ২৫° ৩১′ ২০.৫″ উত্তর অক্ষাংশে এবং ৮৮° ২১′ ২৬.১৭″ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত। কুশমন্ডি ব্লকের আয়তন প্রায় ৩১০.৬৩ বর্গকিলোমিটার। ১টা পঞ্চায়েত সমিতি ও ৮টা গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে গঠিত এই ব্লকের ব্লক-সদরের নামও কুশমন্ডি। কুশমন্ডি থানার নিয়ন্ত্রনাধীন এই অঞ্চলের উত্তরে রয়েছে বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার বিরল উপজিলা, দক্ষিণে বংশীহারি ও হরিরামপুর ব্লক, পূর্বদিকে গঙ্গারামপুর ব্লক আর পশ্চিমে উত্তর দিনাজপুর জেলার কালিয়াগঞ্জ ব্লক। দক্ষিণ দিনাজপুরের জেলাসদর বালুরঘাট থেকে প্রায় ৬২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কুশমন্ডি; ভারত-বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সীমান্তের প্রায় ১৮ কিলোমিটার কুশমন্ডির অন্তর্গত।

কুশমন্ডি ব্লকের করঞ্জী গ্রামের সাথে জড়িয়ে আছে মহাভারতের গল্প। কথিত আছে, কৃষ্ণের সুদর্শন চক্রে কংসের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে তিন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তার একভাগ নাকি পড়েছিল এই করঞ্জীতে। প্রতিবছর মাঘ মাসের পূর্ণিমায় এখানে এখনও কংসব্রত পালনের রেওয়াজ আছে।

নদীমাতৃক জেলা দক্ষিণ দিনাজপুরে শুধু বড় নদী বা খাঁড়িই নয়, রয়েছে প্রচুর দীঘি। এরকমই এক বিখ্যাত দীঘি মহীপাল দীঘি যার সাথে জড়িয়ে আছে বাংলার পাল রাজবংশের স্মৃতি। চার কিমিলোমিটার দীর্ঘ, ০.৬ কিলোমিটার ব্যাসযুক্ত বিশাল এই দীঘি খনন করেছিলেন পাল রাজবংশের রাজা দ্বিতীয় মহীপাল। তাঁর নামানুসারেই দীঘির নামকরণ। শীতকালে প্রচুর পরিযায়ী পাখি ভিড় করে এই দীঘিতে। এই দীঘির আর একটা বড় আকর্ষণ হলো পদ্মফুল। একেকসময় প্রায় পুরো দীঘি ঢাকা পড়ে পদ্মফুলে। মহীপাল দীঘির উত্তরপাড়ে রয়েছে প্রাচীন নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ। উইলিয়াম কেরি (William Carey) এর বন্ধু জন টমাস (JohnThomas) ১৭৯৩ সালে এই নীলকুঠি তৈরি করেছিলেন বলে জানা যায়। উইলিয়াম কেরি পরে এই কুঠিতে বাংলা শেখাতে আসেন। জনশ্রুতি আছে, এই অঞ্চলের স্থানীয় এক পন্ডিতের স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে সহমরণে গিয়েছিলেন এবং তিনিই বাংলার প্রথম সতী।

কুশমন্ডির প্রসিদ্ধি মুখোশকে ঘিরে। গমীরা দিনাজপুরের অত্যন্ত প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্য। মুখোশ পরে এই নাচের মাধ্যমে গ্রামবাসীরা চায় দেবতাকে তুষ্ট করে শুভশক্তির আবাহন আর অশুভশক্তির বিনাশ। মুখোশ তৈরির জন্য খ্যাতি লাভ করেছে কুশমন্ডি ব্লকের মহিষবাথান গ্রাম, স্থানীয়ভাবে যা মুখোশ-গ্রাম নামে পরিচিত। ২০১৮ সালে জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন্স বা জিআই (Geographical Indications or GI) ট্যাগ পেয়েছে কুশমন্ডির কাঠের মুখোশ। মুখোশকে কেন্দ্র করে জীবনধারণ – এ রীতি কিন্তু এখানে খুব পুরোনো নয়। গত শতকের নয়ের দশকের আগে অব্দি তা ছিল অনেকটাই অসংগঠিত। পূর্বপপুরুষদের ঐতিহ্য বজায় রেখে এখানকার শিল্পীরা গামারি কাঠ বা বাঁশ দিয়ে চায়ের ট্রে, ধূপদানি, পেন-স্ট্যান্ড ইত্যাদির সাথে সাথে রাক্ষস, হনুমান, চামুন্ডা প্রভৃতি পৌরাণিক চরিত্রের মুখোশ বানাতেন, তবে বাজারের অভাবে নিয়মিত বিক্রির সুযোগ ছিল না। ১৯৯০ সাল নাগাদ মহিষবাথান গ্রামীণ হস্তশিল্প সমিতির উদ্যোগে মুখোশ-শিল্পীদের একত্ৰিত করার চেষ্টা শুরু হয়। ১৯৯৫ সালে সরকারিভাবে নথিভুক্ত হয়ে পথ চলা শুরু এই সমিতির, যার সদস্য এখন ২০০ ছাড়িয়েছে। গামারি, শাল, আম, পাকুড়, মেহগনি প্রভৃতি কাঠের তৈরি মুখোশ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় গমীরা নাচে। গমীরা শিল্পীরা মনে করেন এগুলো শুধু মুখোশ নয়, এ আসলে ‘মুখ’ বা ‘মুখা’। মুখোশ পরার সঙ্গে সঙ্গে সেই মুখ জীবন্ত হয়ে ওঠে শিল্পীদের আবহমান কালের বিশ্বাসে। সরকারী উদ্যোগে কুশমন্ডিতে গড়ে উঠেছে গমীরা-মুখোশ তৈরির কেন্দ্র। ২০১৪ সাল থেকে শুরু হয়েছে ‘মুখা মেলা’। এই মেলাকে কেন্দ্র করে প্রদর্শনী ও বিক্রির পাশাপাশি জমে ওঠে খনগান, ভাওইয়া গান সহ বিভিন্ন মুখা নাচের আসর।

কুশমন্ডি তথা পুরো দক্ষিণ দিনাজপুর জুড়েই সেভাবে বড় কোনো শিল্প গড়ে ওঠেনি। বেশিরভাগ মানুষই কৃষিজীবি। ২০১১ এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী শ্রমজীবি মানুষের প্রায় ৪২ শতাংশ কৃষক যাঁরা নিজেদের জমিতে অথবা সরকার-অধিকৃত জমিতে চাষবাস করেন। সমাজের এক বড় অংশ (প্রায় ৪৫%) কাজ করেন কৃষি-মজুর হিসেবে। কুটিরশিল্পের সাথে যুক্ত প্রায় ১.৩ শতাংশ শ্রমজীবি মানুষ।
২০১৩-১৪ সালের পরিসংখ্যান বলে কুশমন্ডিতে সবচেয়ে বেশি উৎপন্ন হয় আমন ধান – বছরে ১২৯,১৭৭ টন। উৎপাদনের নিরিখে তারপরে আসে বোরো ধান (৮৬৩০ টন) ও আউশ ধান (২১৮ টন)। ধান ছাড়া অন্যান্য ফসলের মধ্যে গম (৭৫০২ টন ), পাট (৬৮৭৩২ টন), আলু (৩১১৯৪ টন) উল্লেখযোগ্য।
২০১১ এর জনগণনার থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে কুশমন্ডিতে স্বাক্ষরতার হার ৬৫.৩%। হিন্দু-প্রধান (মোট জনসংখ্যার ৬০.৩৮%) কুশমন্ডি ব্লকে ১৪১টি প্রাইমারি স্কুল রয়েছে (২০১৩-১৪ সালের পরিসংখ্যান)। ২০১৫ সালে গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সরকারী কলেজ (Kushmandi Government College) প্রতিষ্ঠিত হয় কুশমন্ডিতে।

কুশমন্ডি ব্লকের অন্যান্য দর্শনীয় স্থানের মধ্যে ইন্দো-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী আয়ারা বনাঞ্চল উল্লেখযোগ্য। প্রাচীন গাছপালা ও পুকুরে ঘেরা এই অঞ্চলে শীতকালে বনভোজনের জন্য ভিড় করে বহু মানুষ। এই ব্লকেরই অন্তর্গত আমিনপুরে রয়েছে পঞ্চমুখী শিব মন্দির। পঞ্চমুখী শিব সারা ভারতেই অত্যন্ত বিরল। এই মন্দির আমিনপুরের জমিদারের তৈরি বলে জানা যায়। এর কাছেই আছে বিখ্যাত মাতিয়া মা কালী মন্দির

জিআই ট্যাগের জন্য কুশমন্ডি বাংলার মানচিত্রে এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। কুশমন্ডির মুখোশের খ্যাতি জেলা, রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে দেশে-বিদেশে। ঐতিহ্যকে শুধু ধরে রাখা নয়, তাকে কিভাবে সযত্নে লালনপালন করতে হয় তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত কুশমন্ডি।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।