ভূগোল

দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা

আমাদের পশ্চিমবঙ্গ ২৩টি জেলাতে বিভক্ত। বেশীরভাগ জেলাই স্বাধীনতার আগে থেকে ছিল, কিছু জেলা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে গঠিত, আবার কিছু জেলা একটি মূল জেলাকে দুভাগে ভাগ করে তৈরি হয়েছে প্রশাসনিক সুবিধের কারণে। প্রতিটি জেলাই একে অন্যের থেকে যেমন ভূমিরূপে আলাদা, তেমনি ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকেও স্বতন্ত্র। প্রতিটি জেলার এই নিজস্বতাই আজ আমাদের বাংলাকে সমৃদ্ধ করেছে। সেরকমই একটি হল দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা।

১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট ভারতবর্ষ দুভাগে বিভক্ত হয়ে গঠিত হয় স্বাধীন ভারতবর্ষ এবং পাকিস্তান। বাংলাভাগের সময় দিনাজপুরও দু ভাগে বিভক্ত হলে দিনাজপুরের পূর্বাংশ বর্তমান বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং অপর অংশ পশ্চিমবঙ্গে থেকে যায় যা পশ্চিম দিনাজপুর নামে পরিচিত হয়ে যায়৷ পরবর্তী কালে ১৯৯২ সালের ১লা এপ্রিল পশ্চিম দিনাজপুর জেলা দুভাগে ভাগ হয়। নামের সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে উত্তর অংশ হয় উত্তর দিনাজপুর এবং দক্ষিণ অংশ দক্ষিণ দিনাজপুর৷ দিনাজপুর নামকরণ কিভাবে হল জানতে এখানে দেখুন। ।

ভৌগলিক দিক থেকে দেখলে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার উত্তরাংশে রয়েছে মহানন্দা নদী ও দার্জিলিং জেলা, দক্ষিণ ভাগে রয়েছে মালদা জেলা ও বাংলাদেশের রাজশাহী জেলা, পূর্ব দিকে রয়েছে বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলা ও পশ্চিম দিকে অবস্থান করছে বিহার রাজ্যের পূর্ণিয়া, কাটিহার ও কিষাণগঞ্জ জেলা এবং মালদার উত্তরাংশ৷ এই জেলার সদর দপ্তর বালুরঘাটে অবস্থিত৷ এই জেলার দুটি উপবিভাগ হল- বালুরঘাট এবং গঙ্গারামপুর৷ ভূ-প্রকৃতির দিক থেকে এটি পশ্চিমবঙ্গের সমভূমির অন্তর্গত। সমতল এই জেলাটি ক্রমশ দক্ষিণ দিকে ঢালু হয়ে গেছে। এই জেলায় কোন পাহাড় পর্বত না থাকলেও ছোটো বড় মাঝারি মাপের মাটির ঢিপি স্থানে স্থানে দেখা যায়। কোন প্রাকৃতিক অরণ্য তেমন লক্ষ্য করা না গেলেও বনবিভাগ দ্বারা সৃষ্ট বনভূমি চোখে পড়ে৷ দক্ষিণ দিনাজপুর নদীমাতৃক জেলা, ছোটো বড় নদ নদী পরিলক্ষিত হয় এই জেলায়৷ এখানকার উল্লেখযোগ্য নদীগুলি হল, টাঙ্গন, পুনর্ভবা, আত্রাই, ইছামতী, যমুনা, প্রভৃতি৷ টাঙ্গন নদী বাংলাদেশের উত্তর পূর্ব অংশ থেকে উৎপন্ন হয়ে উত্তর দিনাজপুরের মধ্য থেকে ভারতে প্রবেশ করে৷ তারপর দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কুশমন্ডি ও বংশিহারি থানার মধ্য দিয়ে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে মালদা জেলায় প্রবেশ করেছে৷ এই জেলার আরেকটি উল্লেখযোগ্য নদী হল পুনর্ভবা। এই নদীর তীরেই ইতিহাসখ্যাত ‘দেবকোট’ বা ‘বাণগড়’ অবস্থিত। আত্রেই নদী দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার অন্যতম উল্লেখযোগ্য নদী৷ বর্ষাকালে নদীটি প্রচুর জল বহন করে৷

এটি মূলত কৃষিপ্রধান জেলা হলেও মৎসচাষের ক্ষেত্রে এর গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে৷ তবে এখানে প্রাকৃৃতিক ও খনিজ সম্পদের ঘাটতি জেলাটির অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলে ৷ জেলাটি শিল্পন্নত নয়৷ ২২১৯ বর্গকিলোমিটার আয়তন জুড়ে জেলাটি অবস্থান করছে৷ আয়তনের বিচারে জেলাটি পশ্চিমবঙ্গে আঠারোতম স্থান অধিকার করে৷ এই জেলায় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করলেও হিন্দু ও মুসলমানের পরিমান সর্বাধিক। তুলনায় কম হলেও বুদ্ধ জৈন শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ থাকেন৷ ২০১১ সালের জনগননা অনুসারে প্রায় ১৬৭০৯৩১ জন লোক এখানে বসবাস করেন৷ জনসংখ্যার বিচারে দক্ষিণ দিনাজপুরের স্থান পশ্চিমবঙ্গে একুশতম৷

এই জেলার বেশীর ভাগ মানুষ বাংলায় কথা বলেন৷ এছাড়া সাঁওতালী ভাষাভাষী মানুষের উপস্থিতি লক্ষণীয় এখানে৷ ” খাঁ/খান ” গান এখানকার সংস্কৃতির অঙ্গ।  স্থানীয় উপভাষায় কিছু গান গাওয়া হয়৷ গ্রামের লোকের নবান্নের মাসের পর ঘরে মনোরঞ্জনের জন্য এই গানের আসর বসায়। এই জেলা পর্যটকদের জন্যও অনেক কিছু সাজিয়ো রেখেছে। বাংলাদেশের অনেকটা সীমানা এই জেলা ভাগ করে নেয়। ইতিহাস প্রসিদ্ধ স্থান বাণগড় এখানকার উল্লেখযোগ্য ভ্রমণের স্থান৷ মৌর্য ও ইসলামিক যুগের নানান নিদর্শন এখান থেকে পাওয়া গেছে৷ বাংলার এক প্রাচীন শহর দেবকোটও এই জেলায় অবস্থিত৷ এই অঞ্চলটি পুনর্ভবা নদীর তীরে অবস্থিত। ভোলা কালী মন্দির, ঢলদীঘি, আর সারংবাড়ি জঙ্গল এখানকার উল্লেখযোগ্য পর্যটন স্থান৷ 

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top
error: Content is protected !!

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন