সববাংলায়

লরি বেকার

ব্রিটিশ-ভারতীয় স্থপতি হিসেবে অর্থ ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী স্থাপত্য নির্মাণের জন্য বিখ্যাত লরি বেকার (Laurie Baker)। মহাত্মা গান্ধীর প্রভাবে হিমালয়ের কোলে বাড়ি নির্মাণের আঞ্চলিক পদ্ধতিকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে উদ্যোগী হয়েছিলেন তিনি। স্থানীয় উপলব্ধ উপাদান দিয়ে স্থাপত্য নির্মাণের চেষ্টা করেছিলেন লরি বেকার। টেকসই স্থাপত্য বা জৈব স্থাপত্যের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন এক অন্যতম পথপ্রদর্শক। বৃষ্টির জল সংগ্রহ করে তা কাজে লাগানো এবং শক্তিক্ষয়কারী বাড়ি নির্মাণের উপাদান বাতিল করে চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিশে যায় এমন উপাদান ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে স্থাপত্য শিল্পে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন লরি বেকার। স্থাপত্য ও বিন্যাসের বিষয়টিকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য করে তুলতে তাঁর সামাজিক ও মানবিক প্রচেষ্টা, বিশেষ বিশেষ উপাদানের ব্যবহার, বিন্যাসের ক্ষেত্রে সারল্য বজায় রাখার পাশাপাশি অহিংস মতবাদে বিশ্বাসী হওয়ায় তাঁকে ‘স্থাপত্য জগতের গান্ধী’ বলা হয়ে থাকে। ১৯৪৫ সালে তিনি ভারতে আসেন এবং তারপর থেকে দীর্ঘ ৫০ বছর তিনি ভারতেই কাটিয়েছেন। ১৯৮৯ সালে ভারতের নাগরিকত্ব পান তিনি এবং ১৯৬৯ সাল থেকে ত্রিবান্দ্রমে থাকতে শুরু করেন। ‘সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যাণ্ড টেকনোলজি ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট’ সংস্থার ডিরেক্টরের পদে আসীন ছিলেন লরি বেকার। এই সংস্থার মূল লক্ষ্যই মানুষকে কম খরচে বাড়ি বা অন্যান্য স্থাপত্য নির্মাণে সহায়তা করা। তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে এমন বৈপ্লবিক কাজ করার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮১ সালে নেদারল্যাণ্ডের রয়্যাল ইউনিভার্সিটি লরি বেকারকে সম্মান জানায়। ১৯৮৩ সালে বাকিংহাম প্যালেসে ‘মেম্বার অফ দ্য অর্ডার অফ দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার’ সম্মান লাভ করেন তিনি আর ১৯৯০ সালে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। ১৯৯২ সালে রাষ্ট্রসংঘের পক্ষ থেকে ‘রোল অফ অনার’-এর সম্মান অর্জন করেন তিনি।

১৯১৭ সালের ২ মার্চ ইংল্যাণ্ডের বার্মিংহামে এক খ্রিস্টান মেথোডিক পরিবারে লরি বেকারের জন্ম হয়। তাঁর আসল নাম লরেন্স উইলফ্রেড বেকার। তাঁর বাবা চার্লস ফ্রেডারিক বেকার বার্মিংহাম গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন অথরিটির মুখ্য কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। তাঁর মায়ের নাম মিলি বেকার। তাঁর দুই দাদা যথাক্রমে লিওনার্ড এবং নর্ম্যান, এছাড়া এডনা নামে তাঁর এক দিদিও ছিল। লরি বেকারের বাবা চাইতেন লরি বিজ্ঞান বিষয়েই নিজের কেরিয়ার গড়ে তুলুক।

১৯৩২ সালে ইংল্যাণ্ডের অ্যাস্টনে কিং এডওয়ার্ড গ্রামার স্কুলে ভর্তি হন লরি বেকার। ছোটবেলা থেকেই ধর্ম সম্পর্কে নানাবিধ প্রশ্ন করতেন বেকার এবং একজন কোয়েকারপন্থী অর্থাৎ প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টান হতে চাইতেন তিনি। তাঁর স্কুলের প্রধান শিক্ষক তাঁর বাবাকে বুঝিয়েছিলেন যে বিজ্ঞান কিংবা বাণিজ্য নিয়ে এগোনো তাঁর পক্ষ ভাল হবে না, কলাবিদ্যাতেই কেবল বেকার তাঁর দক্ষতা প্রমাণ করতে পারবেন। ‘বার্মিংহাম ইনস্টিটিউট অফ আর্ট অ্যাণ্ড ডিজাইন’-এ স্থাপত্যকলার বিষয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। ১৯৩৭ সালে কুড়ি বছর বয়সে এই সংস্থা থেকে স্নাতক উত্তীর্ণ হন তিনি। এই সময়টাতেই সমগ্র ইউরোপ চলে একতি রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা চলছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে লরি বেকার সামরিক বিভাগে কাজ করতে অস্বীকৃত হন এবং তার বদলে ফ্রেণ্ডস অ্যাম্বুলেন্স ইউনিটে কাজ করতে শুরু করেন। চিন ও জাপানের যুদ্ধে আহত সৈনিকদের চিকিৎসার জন্য প্রশিক্ষিত অ্যানাস্থেসিস্ট হিসেবে তাঁকে এরপরে চিনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তিনি সেখানে গিয়ে লক্ষ করেন বেশিরভাগ সৈনিকই কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত। একটি জার্মান-পরিচালিত হাসপাতালে এরপর তিনি কিছুদিন চিকিৎসা করেছিলেন। তারপর ১৯৪৩ সাল নাগাদ পুনরায় ইংল্যাণ্ডে তাঁকে ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু বম্বেতে যাওয়ার জন্য একটি নৌকার সন্ধান করায় তাঁর ফিরতে আরও তিন মাস সময় বেশি লেগে যায়। এই সময়ের মধ্যে তাঁরই এক কোয়েকারপন্থী বন্ধুর সঙ্গে থাকতেন লরি বেকার যিনি মহাত্মা গান্ধীর একজন অনুরাগী ভক্ত ছিল। গান্ধীজির বহু সভায়, বহু অভিযানে সামিল থেকেছেন লরি বেকার। ফলে গান্ধীর সঙ্গে তাঁর এক প্রকার সখ্যতা গড়ে ওঠে। ভারতে যখন মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারত ছাড়ো আন্দোলন চলছে, সেই সময়ে লরি বেকার ভারতে আসতে চাইলে একটি বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন তিনি। সেই সময় কোনো ভারতীয়ই বিদেশিদের ভারতে আসার ব্যাপারে সম্মতি দিচ্ছিল না এবং সাধারণভাবে সকল ব্রিটিশকেই ভারত ছেড়ে যাওয়ার জন্য বাধ্য করছিল। কিন্তু গান্ধী বেকারের ঐকান্তিক আগ্রহ দেখে জানান যে ভারত থেকে ব্রিটিশকে চলে যেতে হবে একথা যেমন সত্য, তেমনি যে সকল ইংরেজ সহানুভূতি নিয়ে ভারতীয়দের সঙ্গে কাজ করতে চাইবেন তাঁদের সাদরে আমন্ত্রণ জানানো হবে।

১৯৪৫ সালে ভারতে এসে ওয়ার্ল্ড লেপ্রোসি মিশনের হয়ে কাজ করতে শুরু করেন লরি বেকার। এই সংস্থাটির একজন দক্ষ স্থপতি ও টেকনিশিয়ান প্রয়োজন ছিল। এই সময় কুষ্ঠ রোগ নিরাময়ের নতুন ওষুধগুলি আবিষ্কৃত হয়। ফলে লরি বেকারের উপর দায়িত্ব পড়ে মানসিক হাসপাতালগুলিকে কুষ্ঠ রোগীর চিকিৎসার উপযোগী বাড়িতে পরিণত করার। এরপর থেকেই সমস্ত ভারত জুড়ে লেপ্রোসি সেন্টার বিল্ডিং তৈরির কাজ শুরু করেন বেকার। এই সময় উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদের কাছাকাছি অঞ্চলে থাকতেন তিনি। মিশনারীদের জীবনযাপন খুব কাছ থেকে লক্ষ করেছিলেন তিনি-  তাদের বিলাসবহুল জীবন, জাঁকজমকপূর্ণ বাংলো, ঘরভর্তি অনুগত চাকরদের মধ্যে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না তিনি। তাই ডাক্তার পি. জে. চাণ্ডির সঙ্গে থাকতে শুরু করেন তিনি। তাঁর দেখভাল করতেন যিনি তার বোন এলিজাবেথ জ্যাকবও একই মিশনের হয়ে কাজ করতেন হায়দ্রাবাদে। এলিজাবেথ তাঁর ভাইয়ের অস্ত্রোপচারের জন্য ফৈজাবাদে আসেন। এই সময় বেকার এবং জ্যাকব উভয়েই পরস্পরের সঙ্গে মতাদর্শের বিনিময় করেন, একে অপরের মানসিকতা বোঝার চেষ্টা করেন। অবশেষে দুজনে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তাঁদের উভয়ের পরিবার থেকেই কিছু বাধা ছিল বলে তাঁদের অনেক অপেক্ষা করতে হয়। এর মাঝে কাজের সূত্রেই একত্রে বহু জায়গায় যেতেন তাঁরা। ১৯৪৮ সালে তাঁদের বিবাহ সম্পন্ন হয়। এর কিছুদিন পরেই পিথোরাগড়ে মধুচন্দ্রিমা কাটাতে যাওয়ার সময় স্থানীয় উপজাতিদের মধ্যে সেই একইরকম কুষ্ঠ রোগের বাড়বাড়ন্ত দেখে তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন সেখানেই পাহাড়ের ঢালে একটি বাড়ি বানিয়ে তাকে হাসপাতালে পরিণত করবেন এবং সেইসব মানুষদের চিকিৎসা করবেন। পরবর্তী ১৬ বছর পিথোরাগড়েই থাকলেন তাঁরা। ১৯৬৩ সালে ভাগামনে এবং তারপর ত্রিবান্দ্রমে চলে আসেন লরি বেকার এবং এলিজাবেথ জ্যাকব। ১৯৮৮ সালে ভারতের নাগরিকত্ব লাভ করেন তিনি।

পিথোরাগড়ে থাকাকালীনই বেকার লক্ষ করেছিলেন তাঁর ব্রিটিশ স্থাপত্য শিক্ষার বদলে সেখানকার স্থানীয় স্থাপত্য বিদ্যার উপরেই জোর দেওয়া উচিত। তিনি ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন যে এখানকার স্থানীয় সমস্যা নিরসনের জন্য একেবারে ভূমিজ স্থাপত্য শিক্ষাকেই কাজে লাগাতে হবে। স্থানীয় কারুশিল্প, ঐতিহ্যবাহী কৌশল এবং উপকরণ সংগ্রহ করে সেটিকে আধুনিক নকশায়, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে নতুন ও পুরাতনের মিশেলে এক অভিনব পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন। বাড়ি বা অন্য কোনো স্থাপত্য তৈরির ক্ষেত্রে অর্থ সাশ্রয়ের বিষয়টি তিনি সবার আগে মাথায় রাখতেন এবং বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে ইট ও চুন-সুরকির ব্যবহারে জোর দেন। পাহাড়ের উপরেই বেশ কয়েকটি স্কুল, ধর্মস্থান এবং হাসপাতাল তৈরি করেন লরি বেকার। তাঁর অর্থ-সাশ্রয়ী স্থাপত্যের ধারণা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ায় সমতলের বহু মানুষ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বহু স্বাস্থ্য দপ্তরের কর্মী তাঁর সাহায্যে দুর্গম এলাকায় হাসপাতালা নির্মাণের পরিকল্পনা করেন।

স্থাপত্য ও বিন্যাসের বিষয়টিকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য করে তুলতে তাঁর সামাজিক ও মানবিক প্রচেষ্টা, বিশেষ বিশেষ উপাদানের ব্যবহার, বিন্যাসের ক্ষেত্রে সারল্য বজায় রাখার পাশাপাশি অহিংস মতবাদে বিশ্বাসী হওয়ায় তাঁকে ‘স্থাপত্য জগতের গান্ধী’ বলা হয়ে থাকে। তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে এমন বৈপ্লবিক কাজ করার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮১ সালে নেদারল্যাণ্ডের রয়্যাল ইউনিভার্সিটি লরি বেকারকে সম্মান জানায়। ১৯৮৩ সালে বাকিংহাম প্যালেসে ‘মেম্বার অফ দ্য অর্ডার অফ দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার’ সম্মান লাভ করেন তিনি আর ১৯৯০ সালে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। ১৯৯২ সালে রাষ্ট্রসংঘের পক্ষ থেকে ‘রোল অফ অনার’-এর সম্মান অর্জন করেন তিনি।

২০০৭ সালের ১ এপ্রিল ৯০ বছর বয়সে লরি বেকারের মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading