বিশ্বের চিত্রকলার ইতিহাস রচনা করলে সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে উঠে আসবে ইতালীয় রেনেসাঁসের কথা। শিল্প-সংস্কৃতির বিভিন্ন ঘরানায় সেই নবজাগরণ এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল। চিত্রকলাও বাদ ছিল না তাতে। সেই ইতালীয় রেনেসাঁসের প্রথমদিককার একজন গুরুত্বপূর্ণ চিত্রশিল্পী ছিলেন সান্দ্রো বত্তিচেল্লি (Sandro Botticelli)। পৌরাণিক বিভিন্ন বিষয় যেমন তাঁর ছবিতে উঠে এসেছে তেমনি প্রচুর প্রতিকৃতিও অঙ্কন করেছিলেন তিনি। সিস্টিন চ্যাপেলে ছবি আঁকার সময়টি বত্তিচেল্লির কর্মজীবনের এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায় ছিল। তাঁর শেষদিকের কাজগুলি রেনেসাঁর বিখ্যাত শিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির থেকে শৈলীগত দিক থেকে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেক সময় প্রাচীনকালের চিত্রভাষাকে অবলম্বন করেছিলেন বত্তিচেল্লির মত শিল্পীরা। ‘দ্য বার্থ অব ভেনাস’ চিত্রকর্মটির জন্য তিনি সর্বাধিক পরিচিতি লাভ করেছিলেন।
আনুমানিক ১৪৪৫ সালে ফ্লোরেন্সের বোরগো ওগোনিসান্তি রাস্তায় অবস্থিত একটি বাড়িতে আলেসান্দ্রো ডি মারিয়ানো ডি ভ্যানি ফিলিপেপি (Alessandro di Mariano di Vanni Filipepi) ওরফে সান্দ্রো বত্তিচেল্লির জন্ম হয়। তাঁর জন্ম সাল নিয়ে অবশ্য ধন্দ রয়ে গেছে। তবে ১৪৪৭ সালে তাঁর বাবার ট্যাক্স রিটার্নের কাগজপত্রে বত্তিচেল্লির বয়স লেখা ছিল দুবছর এবং ১৪৫৮ সালের কাগজে লেখা ছিল ১৩ বছর। এর থেকে অনুমান করা হয়, বত্তিচেল্লি ১৪৪৪ এবং ১৪৪৬ সালের মধ্যেই জন্মেছিলেন। তাঁর পিতা মারিয়ানো ডি ভানি ডি’আমেডিও ফিলিপেপি (Mariano di Vanni d’Amedeo Filipepi) ছিলেন একজন চর্ম ব্যবসায়ী এবং তাঁর মায়ের নাম স্মেরালদা ফিলিপেপি (Smeralda Filipepi)। বেশ কয়েকটি সন্তান ছিল এই দম্পতির কিন্তু এমন চারজন সন্তান যাঁরা পরিণত বয়স পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন, তাঁদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ হলেন বত্তিচেল্লি।
১৪৬০ সালে বত্তিচেল্লির বাবা চর্ম ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে অন্য এক সন্তান আন্তোনিওর সঙ্গে গোল্ড-বিটার হয়ে ওঠেন। এই পেশার ফলে তাঁদের পরিবার অনেক শিল্পীর সংস্পর্শে এসেছিল, যা হয়তো পরোক্ষে বত্তিচেল্লিকেও প্রভাবিত করেছিল। সূত্র থেকে জানা যায় যে, বত্তিচেল্লিরা প্রাথমিকভাবে ছিলেন একজন স্বর্ণকার। বত্তিচেল্লিরা যে পাড়ায় থাকতেন তাঁতি এবং অন্যান্য শ্রমিক সম্প্রদায়ের যেমন বসবাস ছিল, তেমন অনেক ধনী ব্যক্তিও সেখানে থাকতেন। বিশেষত ধনী ব্যাংকার রুসেলাই পরিবারের সঙ্গে তাঁদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। জানা যায় আমেরিগো ভেসপুচি নাকি বত্তিচেল্লিদের প্রতিবেশী ছিলেন।
বত্তিচেল্লির প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে অবশ্য খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না৷ তবে জানা যায় যে, ১৪৬১ বা ১৪৬২ সালে তিনি একজন বিখ্যাত ফ্লোরেন্টাইন চিত্রশিল্পী ফ্রা ফিলিপ্পো লিপ্পির কাছে চিত্রকলার শিক্ষানবিশি করেছিলেন। তাঁর কাছে বত্তিচেল্লি আলো-ছায়ার বৈপরীত্যের সাহায্যে কীভাবে সুন্দর মূর্তিগুলির মধ্যে অন্তরঙ্গতা ফুটিয়ে তোলা যায় তা শিখেছিলেন। সম্ভবত লিপ্পির সঙ্গে বত্তিচেল্লি হাঙ্গেরির এজটারগমে গিয়েছিলেন একটি ফ্রেস্কো তৈরির কাজে।
১৪৬৪ সালে বত্তিচেল্লির বাবা নিকটবর্তী ভায়া নুওভাতে একটি বাড়ি কিনেছিলেন। ১৪৭০ থেকে ১৫১০ সালে তাঁর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সেখানে বত্তিচেল্লি বসবাস করেছিলেন।
সম্ভবত ১৪৬৭ সালে বত্তিচেল্লি সেই ফিলিপ্পো লিপ্পির ওয়ার্কশপ ছেড়েছিলেন। তবে এরপরে পোলাইয়ুলো ব্রাদার্স বা আন্দ্রেয়া দেল ভেরোকিও-এর ওয়ার্কশপে তিনি গিয়েছিলেন কিনা তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
১৪৬৯ সালে লিপ্পির মৃত্যু হয়। ১৪৭০ সাল থেকে সম্ভবত বত্তিচেল্লির নিজস্ব ওয়ার্কশপ ছিল। সেই বছর জুন মাসে ফ্লোরেন্সের পালাজ্জো ডেলা সিগনোরিয়ার ট্রাইব্যুনাল হলকে সাজানোর একটি কমিশন লাভ করেন এবং সেই উদ্দেশ্যেই বত্তিচেল্লি সৃষ্টি করেছিলেন ‘ফরটিটিউড’ যেটিকে বলা যেতে পারে তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্ম। ১৪৭২ সালে বত্তিচেল্লি তাঁর গুরু ফিলিপ্পো লিপ্পির তরুণ পুত্র ফিলিপিনো লিপ্পিকে শিক্ষানবিশ হিসেবে গ্রহণ করেন। এই সময়ে তাঁদের দুজনের আঁকা অনেকগুলি ‘ম্যাডোনা এবং তাঁর শিশু’র ছবি একে অপরের থেকে আলাদা করাই ছিল দুষ্কর।
বত্তিচেল্লির সবচেয়ে পুরাতন সৃষ্টি যা এখনও টিকে রয়েছে তা মূলত ১৪৭০-৭২ সালের মধ্যে তৈরি একটি বেদী, যা, ‘স্যাক্রা কনভারসাজিওন’ নামে পরিচিত। সেই সৃষ্টির কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল ভার্জিন মেরী এবং যীশু। এই সময়কার তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল ‘সেন্ট সেবাস্তিয়ান’, যেটি ফ্লোরেন্সের সান্তা মারিয়া ম্যাগিওর চার্চের একটি স্তম্ভের জন্য অঙ্কিত। ১৪৭৪ সালের শুরুতে পিসা কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পোসান্টোর ফ্রেস্কোর কাজে যোগ দিতে বলেছিল বত্তিচেল্লিকে। ফ্লোরেন্সের বাইরে থেকে এই যে ডাক আসা, তা বত্তিচেল্লির ক্রমবর্ধমান খ্যাতিকেই তুলে ধরে। সান্তা মারিয়া নোভেলা চার্চের জন্য অঙ্কিত ‘অ্যাডোরেশন অব দ্য ম্যাগি’ কাজটির জন্য তাঁর নাম দারুণভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই চার্চে প্রচুর ভক্তের সমাগমও হত।
১৪৮২ সালে বত্তিচেল্লি রোম থেকে ফিরে এসেছিলেন। ১৪৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বত্তিচেল্লি ফিলিপিনো লিপ্পি, পেরুগিনো এবং ডোমেনিকো ঘিরল্যান্ডাইওর সাথে লরেঞ্জো দ্য ম্যাগনিফিসেনের জন্য ফ্রেস্কো চক্র তৈরি করেছিলেন। ১৪৮১ সালে তৎকালীন পোপ চতুর্থ সিক্সটাস বত্তিচেল্লি-সহ আরও বিশিষ্ট কয়েকজন শিল্পীকে ভ্যাটিকানের সিস্টিন চ্যাপেলের দেওয়ালগুলিকে ফ্রেস্কোর সাহায্যে সাজিয়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ১৪৮১ থেকে ১৪৮২ সালের মধ্যে সিস্টিন চ্যাপেলে আঁকা বত্তিচেল্লির ছবিগুলি হল: ‘সেন্ট সিক্সটাস টু’, ‘পানিশমেন্ট অব কোরাহ, দাথান অ্যান্ড আবিরাম’, ‘দ্য টেম্পটেশন অব ক্রাইস্ট’ এবং ‘দ্য ট্রায়ালস অব মোজেস’। ১৪৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়তেই, সম্ভবত ১৪৮৫ সালে বত্তিচেল্লি তাঁর বিখ্যাত ছবি ‘দ্য বার্থ অব ভেনাস’ অঙ্কন করেন। এই ছবিটি ইতালীয় রেনেসাঁসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক সৃষ্টি ছিল। পৌরাণিক কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে এই ১৪৮০-এর দশকেই অঙ্কিত বত্তিচেল্লির আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ হল ‘ভেনাস অ্যান্ড মার্স’। আশির দশকেরই শেষদিকে তাঁর আঁকা আরও দুটি কাজ যা প্রভূত সমাদর লাভ করেছিল, সেদুটি হল ‘বারদী আলটারপিস’ এবং ‘সান বার্নাবা আলটারপিস’। তবে বত্তিচেল্লির আঁকা বৃহত্তম বেদীটি হল ‘সান মার্কো আলটারপিস’।
১৪৯১ সালে ফ্লোরেন্সের ক্যাথিড্রালের সম্মুখভাগ বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য নির্মিত কমিটির অংশ ছিলেন বত্তিচেল্লি। এমনকি তিনি ক্যাথিড্রালের অভ্যন্তরীন ছাদে কিছু মোজাইকের কাজ করবার কমিশন পেলেও পরে তা বাতিল হয়ে যায়। ১৪৯৩ বা ১৪৯৫ সালের পর বত্তিচেল্লি আর কোনও ধর্মীয় চিত্র আঁকেননি বলেই মনে করা হয়। যদিও ম্যাডোনাসকে নিয়ে কাজ তাঁর অব্যাহত ছিলই। আসলে এই নব্বইয়ের দশক থেকেই সমাজজীবনে নানারকম অশান্তির সূত্রপাত হয়েছিল। প্লেগ, বিদেশি শক্তির আক্রমণ ইত্যাদি নানা সমস্যার মাঝে দাঁড়িয়ে পূর্বের সেই শোভাময় চিত্রগুলি থেকে সরে এসে নিষ্ঠুর ও কঠোর রেখার দিকে ঝুঁকেছিল বত্তিচেল্লির তুলি।
১৫০২ সালে বত্তিচেল্লিকে যৌনতার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল, যদিও পরবর্তীকালে সেইসব অভিযোগ বাতিল করে দেওয়া হয়। ১৫০৪ সালে, রেনেসাঁর সময়কার এক বিখ্যাত ভাস্কর্য ‘ডেভিড’, যা মাইকেলঅ্যাঞ্জেলোর অমূল্য সৃষ্টি, সেটি কোথায় রাখা হবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য নিযুক্ত কমিটির সদস্য ছিলেন বত্তিচেল্লি। পরবর্তীকালে সেন্ট জেনোবিয়াসের জীবনের ওপরে একটি সিরিজ এঁকেছিলেন তিনি।
১৫০০ সাল থেকেই বত্তিচেল্লি সাভোনারোলার দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তবে তাঁর ছবিতে সাভোনারোলার প্রভাব কতখানি রয়েছে সেবিষয়ে খুব বেশি নথিপত্র কিছু নেই। প্রচলিত আছে যে, একটি বনফায়ারে (বনফায়ার অব দ্য ভ্যানিটিস) নিজের কিছু চিত্রকর্ম পুড়িয়ে দিয়েছিলেন, তবে এই ঘটনার সত্যতা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
কখনই বিবাহ করেননি বত্তিচেল্লি বরং বিবাহ ধারণাটির প্রতিই সম্ভবত তিনি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করেছিলেন। তবে মনে করা হয় তিনি সিমোনেটা ভেসপুচি নামক একটি মেয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে আবদ্ধ ছিলেন এবং ‘বার্থ অব ভেনাস’ ছবির মডেল নাকি ছিলেন সেই মেয়েটিই। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েছিলেন ফলে খুব বেশি ছবি আঁকার কাজ করতে পারেননি।
১৫১০ সালের ১৭ মে ৬৪-৬৫ বছর বয়সে নিজের শহর ফ্লোরেন্সেই ইতালীয় রেনেসাঁসের এই মহান শিল্পী সান্দ্রো বত্তিচেল্লির মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান