সব

মহাদেব গোবিন্দ রানাডে

মহাদেব গোবিন্দ রানাডে

ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মহাদেব গোবিন্দ রানাডে (Mahadev Govind Ranade)। উনিশ শতকের ভারতের এক বিশিষ্ট সমাজসংস্কারকও ছিলেন তিনি। একাধারে সুপণ্ডিত, বিচারপতি এবং লেখক গোবিন্দ রানাডে বম্বে আইন পরিষদ এবং কেন্দ্রীয় অর্থ কমিটির সদস্য ছিলেন। বম্বে আদালতের অন্যতম বিচারক হিসেবেও তিনি সুপরিচিত ছিলেন। ‘প্রার্থনা সমাজ’ নামে বিখ্যাত একটি সংগঠন তৈরি করার পাশাপাশি রানাডে গড়ে তোলেন ‘পুনা সার্বজনিক সভা’, ‘মহারাষ্ট্র গ্রন্থোত্তেজক সভা’ এবং ‘বক্ত্রুত্তত্তেজক সভা’। ‘দ্য ইন্দুপ্রকাশ’ নামে বম্বের একটি অ্যাংলো-মারাঠি দৈনিক পত্রিকা সম্পাদনা করতেন তিনি। সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কার সাধনের আদর্শেই তিনি এই পত্রিকাটি প্রকাশ করতেন। ব্রিটিশদের কাছ থেকে ‘রায়বাহাদুর’ উপাধি লাভ করেন তিনি।

১৮৪২ সালের ১৮ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের নাসিক জেলার নিফর তালুকে একটি মহারাষ্ট্রীয় চিতপাবন ব্রাহ্মণ পরিবারে মহাদেব গোবিন্দ রানাডের জন্ম হয়। তাঁর তিরিশ বছর বয়সে তাঁর প্রথম স্ত্রী মারা গেলে, তিনি দ্বিতীয়বার রমাবাঈকে বিবাহ করেন। সেই সময় তাঁর সংস্কারপন্থী বন্ধুরা তাঁকে বিধবা বিবাহে প্রণোদিত করে কারণ রানাডে তার আগেই ১৮৬১ সালে স্থাপন করেছেন ‘বিধবা বিবাহ সমাজ’। কিন্তু পূর্ব বিবাহিতা নারীর সন্তানাদি থাকলে সেই বিধবা বিবাহের পরে সমাজে সেই নারীর পূর্বপক্ষের সন্তানের স্থান কী হতে পারে তা ভেবে বিধবা বিবাহের পথে পা বাড়াননি তিনি। মূলত তাঁর প্রথম স্ত্রীর কোন সন্তানাদি না হওয়াতেই তাঁর পরিবার রানাডেকে দ্বিতীয়বার বিবাহের জন্য চাপ দিতে থাকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত দ্বিতীয় স্ত্রী রমাবাঈয়েরও কোনো সন্তানাদি হয়নি।

ছয় বছর বয়সে কোলহাপুরে একটি মারাঠি স্কুলে ভর্তি হন তিনি। পরে ১৮৫১ সালে তিনি ভর্তি হন একটি ইংরেজি-মাধ্যম স্কুলে। ১৪ বছর বয়সে তাঁর বাবা তাঁকে বম্বের এলফিনস্টোন কলেজে পড়তে পাঠান। বম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের একেবারে প্রথম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন তিনি। ১৮৬২ সালে বি.এ ডিগ্রি অর্জন করেন রানাডে এবং তার চার বছর পরে ১৮৬৬ সালে গভর্নমেন্ট ল’ স্কুল থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক হয়ে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর শিক্ষাজীবনের সব পরীক্ষাতেই ডিস্টিংশান নিয়ে পাশ করেছেন রানাডে এবং সবসময় বৃত্তি লাভ করেছেন পড়াশোনার জন্য।

১৮৭১ সালে প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন মহাদেব গোবিন্দ রানাডে। বম্বের নিম্ন আদালতে চতুর্থ শ্রেণির পদ ছিল এটি। ১৮৭৩ সালে পুনেতে একজন ফার্স্ট ক্লাস সাব-অর্ডিনেট বিচারপতির পদে উন্নীত হন তিনি। ১৮৮৪ সালে পুনের নিম্ন আদালতে বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি। ১৮৮৫ সাল থেকে তিনি বম্বের আইন পরিষদের সদস্য হন এবং ১৮৯৩ সালে বম্বে উচ্চ আদালতের বিচারপতি হওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি এই পদেই বহাল ছিলেন। রানাডের রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপের জন্য বম্বে আদালতে দু বছর অর্থাৎ ১৮৯৫ সাল পর্যন্ত তাঁর পদোন্নতি আটকে দেয় ব্রিটিশ সরকার। ১৮৯৭ সাল থেকে ডেকান এগ্রিকালচারিস্টস রিলিফ অ্যাক্ট-এর অধীনে বিশেষ বিচারপতি হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন তিনি। এছাড়াও বম্বের এলফিনস্টোন কলেজে ইতিহাসের একজন শিক্ষক হিসেবেও নিযুক্ত হয়েছিলেন রানাডে। এই সময় মারাঠাদের ইতিহাস প্রসঙ্গে খুবই উৎসাহী হয়ে পড়েন। ১৯০০ সালে এই বিষয়ে পড়াশোনা করে রানাডে লিখে ফেলেন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রবন্ধ ‘রাইজ অফ মারাঠা পাওয়ার’।

১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় মুখ্য ভূমিকা নেন মহাদেব গোবিন্দ রানাডে। সমাজ সংস্কারের দিকে এই দলের মানসিকতা ও অভিমুখ গড়ে তুলতে বিশেষ অবদান ছিল রানাডের। ১৮৮৭ সালে ইণ্ডিয়ান সোশ্যাল কনফারেন্সের এক মুখ্য নেতৃত্ব ছিলেন তিনি। এই কনফারেন্সের সঙ্গে প্রাথমিক পর্বে জাতীয় কংগ্রেসের সম্পর্ক ছিল। বিখ্যাত ঐতিহাসিক ডেভিদ ম্যাকেঞ্জি মনে করেন যে রানাডে বিশ্বাস করতেন ব্রিটেন এবং ভারতের এই সম্পর্ক আসলে উভয়পক্ষেরই উন্নতিসাধন করবে। শিক্ষা লাভের মধ্য দিয়ে উভয়ই নিজেদের সব সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক শাসনের খারাপ দিকগুলিকে মুছে দেবে। তাঁর ধৈর্য ও সহনশীলতা অন্যান্য কংগ্রেস নেতাদের অনুপ্রাণিত করেছিল এবং স্বাধীনতার জন্য কংগ্রেসের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে প্রভাবিত করেছিল। বিখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব গোপালকৃষ্ণ গোখলের জীবনেও মহাদেব গোবিন্দ রানাডের এই মনোভাব যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল। বম্বের ‘প্রার্থনা সমাজ’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি যা আসলে সেকালের হিন্দু রক্ষণশীলতা ও কুসংস্কারের বিরোধিতার মধ্য দিয়ে সমাজ সংস্কারের কাজ করত। তাছাড়া এই সংগঠন হিন্দু পুনর্জাগরণের এক অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছিল সেকালের সমাজে। ভারতীয় সমাজকেঅধ্যাত্ম চেতনায় সিক্ত করতে চেয়েছিলেন তিনি। এক রক্ষণশীল ছিটপবন ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম হলেও, নিজের সেই অস্তিত্ব তথা জাত-পাতকে প্রশ্ন করেন রানাডে। সমাজে নারীর অবস্থানের উন্নতি করতে এবং বিধবা বিবাহ চালু করতে যথেষ্ট উদ্যোগী হয়েছিলেন তিনি। রানাডে এও বলেন যে পুরুষদেরই নারী এবং অন্যান্য অনগ্রসর সম্প্রদায়ের উন্নতির জন্য এগিয়ে আসতে হবে। ১৮৬৯ সালে বম্বেতে প্রার্থনা সমাজের প্রথম বৈঠকে বহু সংস্কারপন্থী মানুষকে সম্মিলিত করতে পেরেছিলেন তিনি। হিন্দুধর্মের জাত-পাতের বৈষম্য, বাল্যবিবাহ এবং অস্পৃশ্যতার মতো কুপ্রথাকে বিলুপ্ত করতে চেয়েছিলেন তিনি। তাই এই প্রার্থনা সমাজের পক্ষ থেকে প্রথমে শিক্ষা সংস্কারের চেষ্টা করেন রানাডে। তারপরে তরুণ হিন্দু বিধবাদের পুনর্বিবাহ করতে উৎসাহিত করেন তিনি। বম্বেতে তিনিই প্রথম বিধবা বিবাহ দেন। ১৮৭০ সালের ২ এপ্রিল পুনের সার্বজনিক সভার দায়িত্ব নেন মহাদেব গোবিন্দ রানাডে, পরবর্তীকালে গোপালকৃষ্ণ গোখলে এর দায়িত্ব নেন। গোখলের সহায়তাতেই রানাডে পুনা সার্বজনিক সভার পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রকার সংস্কারের জন্য ভারতের গভর্নর, ভাইসরয় এবং ব্রিটিশ হাউস অফ কমন্সের কাছে আবেদন করেন।

রানাডেকে ভারতীয় অর্থনীতির জনক বলা হয়। তিনি মনে করতেন ভারতের অত্যধিক কৃষি নির্ভরতাই তার অর্থনীতির সমস্যার মূলে রয়েছে। কৃষি অপেক্ষা শিল্প ও বাণিজ্যের উন্নয়নের মধ্য দিয়েই তিনি অর্থনীতির সামগ্রিক উন্নয়ন ঘটাতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে প্রত্যেক জাতিকে একটা বিষয় নজরে রাখতে হবে যাতে নাগরিক ও গ্রামীণ মানুষের সংখ্যার অনুপাত সর্বদা এক বা কাছাকাছি থাকে। ডেকান কলেজের ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখার সময় ‘পশ্চাদমুখী আন্দোলন’ নামে একটি শব্দবন্ধের উপর জোর দিয়েছিলেন তিনি। কারণ তিনি প্রমাণ সহ দেখিয়েছিলেন যে ১৮৭১ থেকে ১৮৯১ সালের মধ্যে কৃষিভিত্তিক শ্রমিকের সংখ্যা ৫৬ থেকে ৬৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং শিল্প ও বাণিজ্যে জড়িত শ্রমিকের সংখ্যা ৩০ শতাংশ থেকে কমে হয়ে গেছে ২১ শতাংশ। পরবর্তীকালে রবার্ট গালাঘের তাঁর ‘এম. জি রানাডে অ্যাণ্ড দ্য ইণ্ডিয়ান সিস্টেম অফ পলিটিক্যাল ইকোনমি’ বইতে গোবিন্দ রানাডের মতামতকে সমর্থন করে জানিয়েছেন যে, এই পশ্চাদমুখী আন্দোলনের কারণ ছিল মূলত বিভিন্ন পেশার মানুষ শহরে পাশ্চাত্য পণ্যের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে নিজের গ্রামে ফিরে এসে চাষবাস করতে শুরু করতেন এবং অবধারিতভাবে অভাব এবং দূর্ভিক্ষের কবলে পড়তেন। কিন্তু রানাডে যে ভারতে রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করতে সমর্থ হয়েছিলেন বিশ শতকের আগে, সে কথা ঐতিহাসিক গালাঘের বিশ্বাস করতেন। এই ধারণার প্রধান বিষয়ই ছিল সুস্থ ও উন্নত অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভ হিসেবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা। ১৮৭১ থেকে ১৮৯১ সালের মধ্যে বম্বের অর্থনৈতিক অবনমনের বিষয়ে ব্রিটিশদের চিঠি লিখে জানাতেন রানাডে। কৃষি ও শিল্প-বাণিজ্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারকে কম সুদে ধার দেওয়ার কথা প্রথম বলেন তিনি।

নারীশিক্ষার জন্য প্রচার চালিয়েছিলেন রানাডে। হিন্দু সমাজে প্রচলিত পর্দা প্রথার বিরোধিতাও করেছিলেন তিনি। নারীশিক্ষার বিস্তারের জন্য ১৮৮৫ সালে ভামান আবাজি মোদক এবং ঐতিহাসিক ড. ভাণ্ডারকরের সঙ্গে মহাদেব গোবিন্দ রানাডে তৈরি করেন মহারাষ্ট্র গার্লস এডুকেশন সোসাইটি এবং হুজুরপাগা গার্লস হাই স্কুল যা কিনা মহারাষ্ট্রের সবথেকে প্রাচীন বালিকা বিদ্যালয়।

মহাদেব গোবিন্দ রানাডের স্ত্রী রমাবাঈ রানাডের লেখা একটি বই অবলম্বনে ২০১২ সালে জি মারাঠি চ্যানেলে একটি টেলিভিশন ধারাবাহিক সম্প্রচারিত হয় ‘উঞ্চ মাজা জকা’ নামে যেখানে মূলত রমা বাঈ এবং তাঁর স্বামী মহাদেব গোবিন্দ রানাডের সম্মিলিতভাবে নারী শিক্ষা ও নারীর উন্নতিসাধনের কাহিনীই বিধৃত হয়েছিল। সেখানে মহাদেব গোবিন্দ রানাডের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন বিক্রম গোয়ারিকর।

ভারতীয় অর্থনীতির উপর তাঁর লেখা ‘এসেস অন ইণ্ডিয়ান ইকোনমিক্স’ বইটি একটি মূল্যবান গ্রন্থ। ‘দ্য ইন্দুপ্রকাশ’ নামে বম্বের একটি অ্যাংলো-মারাঠি দৈনিক পত্রিকা সম্পাদনা করতেন তিনি। সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কার সাধনের আদর্শেই তিনি এই পত্রিকাটি প্রকাশ করতেন। ব্রিটিশদের কাছ থেকে ‘রায়বাহাদুর’ উপাধি লাভ করেন তিনি।

১৯০১ সালের ১৬ জানুয়ারি ৫৮ বছর বয়সে পুনেতে মহাদেব গোবিন্দ রানাডের মৃত্যু হয়।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়