বিকানীরের মহারাজা কার্নি সিং (Maharaja Karni Singh) ভারতের শ্যুটিংয়ের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম। ইংরেজ-শাসিত ভারতে বিকানীর প্রদেশের শেষ রাজা ছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে বিকানীর কেন্দ্র থেকেই লোকসভার সদস্য হয়েছিলেন মহারাজা কার্নি সিং। গলফ, ক্রিকেট, টেনিস খেলার পাশাপাশি তিনি ছিলেন পাঁচটি অলিম্পিকে অংশগ্রহণকারী প্রথম ভারতীয়। অলিম্পিকে বিশ্ব-শ্যুটিং চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করে রৌপ্য পদকও পেয়েছিলেন তিনি। মহারাজা কার্নি সিং ছিলেন ভারতের প্রথম শ্যুটার যিনি ভারত সরকারের পক্ষ থেকে অর্জুন পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন ১৯৬১ সালে।
১৯২৪ সালের ২১ এপ্রিল রাজস্থানের বিকানীরে মহারাজা কার্নি সিংয়ের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম শ্রী শার্দূল সিংজী বাহাদুর এবং তাঁর ঠাকুরদার নাম শ্রী গঙ্গা সিংজী বাহাদুর। গঙ্গা সিংজী ছিলেন বিকানীরের তেইশতম মহারাজা। বাল্যকালে রাজপুত্র কার্নি সিং বাড়ির পরিমণ্ডলেই শিক্ষালাভ করা শুরু করেন।
বাড়ির পরিবেশেই প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় রাজপুত্র কার্নি সিংয়ের। এরপর দিল্লির সেন্ট স্টিফেন্স কলেজ থেকে ইতিহাসে স্নাতক উত্তীর্ণ হয়ে তিনি বম্বের সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি হন এবং বম্বে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণার জন্য পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের সঙ্গে বিকানীরের রাজ-পরিবারের সম্পর্ক (১৪৬৫-১৯৪৯)’।
তাঁর ঠাকুরদা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে এইচ. এইচ জেনারেল পদে আসীন ছিলেন এবং ঠাকুরদার সঙ্গেই কার্নি সিং বিশ্বযুদ্ধের ভয়াল রূপ প্রত্যক্ষ করেছেন। পরবর্তীকালে তাঁর বাবা মহারাজা স্যার শার্দূল সিংয়ের উত্তরসূরী হিসেবে ১৯৫০ সালে মহারাজা কার্নি সিং এইচ. এইচ. লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে আসীন হন। ১৯৫২ সালে তরুণ কার্নি সিং বিকানীর নির্বাচনী কেন্দ্র থেকে এককভাবে লোকসভার সদস্য হন এবং ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত এই পদে থেকে বিভিন্ন মন্ত্রকের বিভিন্ন বিভাগীয় কমিটির উপদেষ্টার কাজ করেন তিনি।
তবে তাঁর পরিচিতির আসল কারণ হল তাঁর শ্যুটিংয়ে অর্থাৎ বন্দুক চালানোতে অসামান্য দক্ষতা । বিশ্ববাসীর কাছে শ্যুটিংয়ের দক্ষতার কারণেই তিনি বিখ্যাত হয়েছেন। ‘ক্লে পিজিয়ন ট্র্যাপ অ্যাণ্ড স্কিট’ প্রতিযোগিতায় মোট সতেরো বার জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছেন মহারাজা কার্নি সিং। তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এমনকি অলিম্পিকেও ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত মোট পাঁচ বার প্রথম ভারতীয় হিসেবে অলিম্পিকে যোগদান করেন কার্নি সিং। ১৯৬০ সালে রোমে আয়োজিত গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে ক্লে পিজিয়ন শ্যুটিং-এ ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি। তারপর ক্রমান্বয়ে ১৯৬৪ সালের টোকিও অলিম্পিক, ১৯৬৮তে মেক্সিকোয়, ১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিক এবং ১৯৮০ সালে মস্কো অলিম্পিকে যোগ দিলেও ১৯৬০ সালে অষ্টম স্থান এবং ১৯৬৮ সালে দশম স্থান অর্জন করেন কার্নি সিং।
শ্যুটিংয়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় কখনো স্বর্ণপদক এবং কখনো রৌপ্য পদকেও সম্মানিত হয়েছেন তিনি। ১৯৬১ সালে অসলোতে আয়োজিত ওয়ার্ল্ড শ্যুটিং চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতের পক্ষ থেকে প্রতিনিধিস্বরূপ যোগদান করেন মহারাজা কার্নি সিং। ঠিক তার পরের বছর ১৯৬২ সালে কায়রোতে অনুষ্ঠিত আটত্রিশতম ওয়ার্ল্ড শ্যুটিং চ্যাম্পিয়নশিপে রৌপ্য পদক জয় করেন তিনি। যদিও সেই প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থানাধিকারীর জন্য টাই-ব্রেকার করা হলে তিনি পরাজিত হন। তারপর ক্রমান্বয়ে ১৯৬৬ সালে ওয়েসবাডেনে ওয়ার্ল্ড শ্যুটিং চ্যাম্পিয়নশিপ, ১৯৬৭ সালে বোলগ্নাতে, ১৯৬৯ সালে সান সেবাস্টিয়ানে যোগ দিয়েছিলেন কার্নি সিং দক্ষ শ্যুটার হিসেবে। এভাবে ক্রমশ সমগ্র বিশ্বে তাঁর পরিচিতি বাড়ছিল। ১৯৬৭ সালে টোকিওতে এবং ১৯৭১ সালে সিওলে এশিয়ান শ্যুটিং চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেন কার্নি সিং এবং স্বর্ণপদক লাভ করেন তিনি। এরপর ১৯৭৪ সালে তেহ্রানে আয়োজিত এশিয়ান গেমসে রৌপ্য পদক পান তিনি এবং ১৯৭৫ সালে কুয়ালালামপুরের এশিয়ান গেমসেও একইভাবে রৌপ্য পদকে ভূষিত হন কার্নি সিং।
সর্বোপরি ১৯৮১ সালে ইংল্যাণ্ডের নর্থ ওয়েলসে পরপর তিনটি প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করেন মহারাজা কার্নি সিং – নর্থ ওয়েলস কাপ, নর্থ ওয়েস্টার্ন কাপ এবং ওয়েলস গ্র্যাণ্ড প্রিক্স। এর পরের বছর ১৯৮২-তে দিল্লিতে আয়োজিত নবম এশিয়ান গেমসে ভারতের পক্ষ থেকে রৌপ্য পদকে ভূষিত হন তিনি। সবশেষে ১৯৮৫ সালে ইংল্যাণ্ডে ব্রিটিশ গ্র্যাণ্ড প্রিক্সে ভেটেরান’স গোল্ড মেডেল অর্জন করেন কার্নি সিং। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অভিযানের জন্য আফ্রিকা স্টার পদক পেয়েছেন তিনি ১৯৪৩ সালে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ১৯৬২ সালে ভারতের প্রথম শ্যুটার হিসেবে অর্জুন পুরস্কারে সম্মানিত হন মহারাজা কার্নি সিং।
ভারতের এশিয়াটিক সোসাইটি, ন্যাশনাল স্পোর্টস ক্লাব, বম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটি, দিল্লি গল্ফ ক্লাবের সদস্যপদ ছিল তাঁর। ক্লে পিজিয়ন শ্যুটিং অ্যাসোসিয়েশনের সম্মানীয় সহ-সভাপতির পদ আজীবন অলঙ্কৃত করেছেন তিনি। দিল্লির ঐতিহাসিক তুঘলকাবাদ দূর্গের কাছে তাঁরই নামে স্থাপিত হয়েছে ড. কার্নি সিং শ্যুটিং রেঞ্জ। তবে শুধুই শ্যুটিং নয়, গল্ফ-ক্রিকেট-টেনিস ইত্যাদি খেলাতেও কার্নি সিংয়ের দক্ষতা ছিল অনস্বীকার্য। শ্যুটিংয়ের জগতে নানাবিধ অভিজ্ঞতার কথা কার্নি সিং তাঁর উত্তর-প্রজন্মের উদ্দেশ্যে ধরে রেখে গেছেন দুই মলাটের আত্মজীবনী ‘ফ্রম রোম টু মস্কো’ তে।
১৯৮৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর মহারাজা কার্নি সিংয়ের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান