ইতিহাস

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Bandopadhyay) একজন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ যিনি ২০১১ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গের অষ্টম মুখ্যমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতের প্রাক্তন রেলমন্ত্রীও ছিলেন একসময়। তাঁর হাত ধরেই সর্ব ভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস নামক রাজনৈতিক দলটির প্রতিষ্ঠা হয়। তিনি ‘দিদি’ নামেই বেশি পরিচিত।

১৯৫৫ সালে ৫ জানুয়ারি কলকাতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম প্রমীলেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মায়ের নাম গায়ত্রী দেবী। তাঁর মাত্র সতেরো বছর বয়সেই বাবার মৃত্যু হয়।

১৯৭০ সালে দেশবন্ধু শিশু শিক্ষালয় থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে তিনি যোগমায়া দেবী কলেজ থেকে ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করেন। এরপর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  ইসলামিক ইতিহাস নিয়ে তাঁর স্নাতকোত্তর করেন। তিনি শ্রীশিক্ষায়তন কলেজ থেকে শিক্ষা তত্ত্ব (education) নিয়ে এবং যোগেশচন্দ্র কলেজ থেকে আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন।

মাত্র পনেরো বছর থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। যোগমায়া দেবী কলেজে পড়াকালীন তিনি ছাত্র পরিষদ গঠন করেন। তিনি প্রথম থেকেই সর্বভারতীয় কংগ্রেস পার্টির সদস্য ছিলেন। ১৯৭৫ সালে প্রখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জয়প্রকাশ নারায়ণের গাড়ির উপরে উঠে প্রতিবাদ জানানোর জন্য তিনি সংবাদমাধ্যমের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এরপর থেকে খুব দ্রুত বেগে তাঁর রাজনৈতিক উত্থান হতে থাকে। ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত তিনি পশ্চিমবঙ্গের মহিলা কংগ্রেস পার্টির সাধারণ সম্পাদক (general secretary) ছিলেন। ১৯৮৪ সালে তিনি কলকাতার যাদবপুর কেন্দ্র থেকে সাধারণ নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে হারিয়ে জয়ী হন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতীয় সংসদের অন্যতম কনিষ্ঠ সদস্য ছিলেন। ১৯৮৯ সালে  কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য মালিনী ভট্টাচার্যের কাছে তিনি এই আসনটি হারান এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচনে দক্ষিণ কলকাতা কেন্দ্র থেকে জয়ী হন। এরপর পর পর তিনি ১৯৯৬ সালে, ১৯৯৮ সালে, ১৯৯৯ সালে, ২০০৪ সালে এবং ২০০৯ সালে সাধারণ নির্বাচনে দক্ষিণ কলকাতা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়ে এসেছেন।

১৯৯১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিমা রাও তাঁকে মানব সম্পদ উন্নয়ন, ইয়ুথ অ্যাফেয়ার্স এন্ড স্পোর্টস (youth affairs and sports) এবং মহিলা ও শিশু বিকাশের জন্য কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে ক্রীড়া উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর মত বিরোধ হওয়ায় তিনি ক্রীড়া মন্ত্রীর দায়িত্ব ত্যাগ করেন। ১৯৯৬ সালে কংগ্রেসের সাথে তাঁর মতবিরোধ চরম পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায়। এরপর ১৯৯৭ সালে প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির প্রেসিডেন্ট সৌমেন মিত্রের সাথে বিরোধ হওয়ায় তিনি কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে আসেন এবং তাঁর নিজস্ব নতুন দল সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি করেন। এই কাজে তার অন্যতম সহকারি ছিলেন মুকুল রায়। খুব তাড়াতাড়ি  তৃণমূল কংগ্রেস পার্টি বাংলার শাসক দল কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান বিরোধী দল হয়ে দাঁড়ায়।

১৯৯৯ সালে তিনি ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স(NDA)’ সরকারের সাথে যোগ দেন এবং প্রথমবারের জন্য ভারতের রেলমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০০ সাল অব্দি তিনি রেলমন্ত্রী ছিলেন। ২০০০ সালে তিনি প্রথম রেল বাজেট (rail budget) পেশ করেন। সেখানে তিনি পশ্চিমবঙ্গকে দেওয়া অনেক প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে সক্ষম হন। তিনি নতুন দিল্লি – শিয়ালদা রাজধানী এক্সপ্রেস চালু করেন। এছাড়াও তিনি পশ্চিমবঙ্গের জন্য আরও বেশকিছু ট্রেন চালু করেন যেমন হাওড়া  -পুরুলিয়া রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস, শিয়ালদা- নিউ জলপাইগুড়ি পদাতিক এক্সপ্রেস, শালিমার- আদ্রা আরণ্যক এক্সপ্রেস, শিয়ালদা- আজমির সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস এবং শিয়ালদা- অমৃতসর অকাল তখ্ত সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস ইত্যাদি। এছাড়াও তিনি পর্যটক আকর্ষণ করার জন্য দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের ( Darjeeling Himalayan Railway) উন্নয়ন করেন। তাঁরই উদ্যোগে ২০০০ সাল থেকে ২০০১ সালের মধ্যে সারাদেশে উনিশটি নতুন ট্রেন চালু করা হয়। পেট্রোলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে তিনি এবং অজিত কুমার পাঁজা মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেন।

২০০১ সালে তাঁর নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস সর্বভারতীয় কংগ্রেস পার্টির সাথে জোট বাঁধে। ২০০৪ সালের জানুয়ারি মাস থেকে  মে মাস অব্দি তিনি কয়লা ও খনি মন্ত্রী (Coal and Mines Minister) ছিলেন। ২০০৪ সালের পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস সদস্যদের মধ্যে তিনিই একমাত্র জয়ী হন। ২০০৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে (Assembly Election) তৃণমূল কংগ্রেস হেরে যায়।

২০০৫ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে হওয়া বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের সাথে তিনি জড়িয়ে পড়েন। তার মধ্যে অন্যতম ছিল সিঙ্গুরের টাটা ন্যানোর কারখানা তৈরীর বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং নন্দীগ্রামে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার বিরুদ্ধে আন্দোলন। এই দুটি ক্ষেত্রেই তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার সেখানকার কৃষকদের জমি কেড়ে নিয়ে কারখানা তৈরীর পরিকল্পনা করলে স্থানীয় কৃষকরা সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দল এই কৃষকদের সমর্থন করে।

২০০৯ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বিতীয়বারের জন্য রেলমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন। রেলমন্ত্রী হিসেবে তিনি এবারও বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন যার মধ্যে অন্যতম- দুরন্ত এক্সপ্রেসের সংখ্যা  বাড়িয়ে দেওয়া, শুধু মহিলাদের জন্য ট্রেন চালু করা এবং বড় বড় শহরগুলিকে যুক্ত করার জন্য প্রচুর সংখ্যক ট্রেন চালু করা ইত্যাদি। এছাড়াও তিনি কলকাতা মেট্রো রেলের (Kolkata Metro Rail) উন্নয়নও করেন।

 ২০১০ সালে নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস কলকাতা পুরসভা থেকে জয়ী হয়। এর পাশাপাশি তৃণমূল কংগ্রেস বিধাননগর পুরসভা থেকেও জয়ী হয়। অবশেষে ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ নির্বাচনে সিপিআইএম দলের চৌত্রিশ বছরের শাসনকালের সমাপ্তি ঘটিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসে। সেই বছরের ২০ মে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রথমেই তিনি সিঙ্গুরের চাষীদের তাঁদের থেকে ৪০০ একর জমি ফিরিয়ে দেন। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি বাংলার স্বনামধন্য শিল্পীদের বঙ্গবিভূষণ এবং বঙ্গভূষণ সম্মান দিয়ে সম্মানিত করেন।
পশ্চিমবঙ্গের পাহাড়ি অঞ্চলে গোর্খাল্যান্ডে (Gorkha Land) সংক্রান্ত সমস্যা এবং জঙ্গলমহলের মাওবাদীদের সমস্যার তিনি খুব তাড়াতাড়ি সমাধান করেন। এছাড়াও তিনি স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি করার জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প গ্রহণ করেন। তিনি শিক্ষকদের সঠিক সময়ে বেতন দেওয়া এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ঠিক সময় পেনশন (pension) দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

কলকাতার নতুন মেট্রো স্টেশনের নাম তিনি বাঙালি মনীষীদের নামে রাখেন যেমন মাস্টারদা সূর্যসেন, কবি সুভাষ, কবি নজরুল ইত্যাদি। বাংলায় তিনি প্রচুর নতুন সাংস্কৃতিক সম্মেলনের আয়োজন করে থাকেন। এর পাশাপাশি তিনি লেখালেখি করেন এবং ছবি আঁকেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হয়ে আসার পর ধর্মঘটের সংস্কৃতি বন্ধ করেন। এছাড়াও তিনি পশ্চিমবঙ্গে বিদ্যুৎ  উৎপাদনের দিকে মনোযোগ দেন এবং লোডশেডিং (load shading) অনেকটাই বন্ধ করতে সক্ষম হন। ২০১৬ সালে তিনি দ্বিতীয়বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন। 

২০১২ সালে  টাইমস ম্যাগাজিন (Times Magazine) সেই বছরের বিশ্বের একশো জন প্রভাবশালী মানুষদের মধ্যে তাঁকে স্থান দেয়। সেই বছরই ব্লুমবার্গ মারকেটস (Bloomberg Markets Magazine) ম্যাগাজিন তাঁকে পৃথিবীর পঞ্চাশ জন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম হিসেবে স্থান দেয়। ভুবনেশ্বরের কলিঙ্গ ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডাস্ট্রিয়াল টেকনোলজি (Kalinga Institute of Industrial Technology) থেকে তাঁকে ডক্টরেট (Doctorate) উপাধি দেওয়া হয় এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে ডিলিট (D.Lit) সম্মানে সম্মানিত করা হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে শিক্ষিত ব্যক্তি


শ্রীকান্ত জিচকর
শ্রীকান্ত জিচকর

এনার সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন