সববাংলায়

ইছাই ঘোষের দেউল

বিভাগঃ ,

বঙ্গদেশের প্রাচীন ইতিহাসের নিদর্শন হিসেবে কিছু কিছু স্থাপত্য আজও বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে রয়েছে বাংলার বিভিন্ন জেলায়। পুরনো সেইসব স্থাপত্যের অধিকাংশই লক্ষ করলে দেখা যাবে ধর্মীয় স্থাপত্য। এইসব স্থাপত্যগুলির মধ্যেও আবার নানারকম ধরণ রয়েছে। এরকমই একই পুরনো মন্দির ইছাই ঘোষের দেউল (Ichhai Ghosher Deul) যার প্রাচীনত্ব সন্দেহাতীত।

পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম বর্ধমান জেলার গৌরাঙ্গপুর নামক স্থানে অজয় নদের প্রায় তীরবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত ইছাই ঘোষের দেউল বা মন্দিরটি। প্রাচীন বাংলার ধর্মের ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গেলে এই নিদর্শনগুলির যেমন গুরুত্ব থাকবে তেমনই সেই সময়ে বঙ্গদেশে যে কত উচ্চমানের উৎকৃষ্ট স্থাপত্যকর্ম তৈরি হয়েছে, তার ইতিহাসও এরই সঙ্গে জুড়ে থাকবে। ইছাই ঘোষের দেউল ঠিক কোন সময়ে তৈরি হয়েছিল তা নিয়ে নানা পণ্ডিতের নানারকম মত প্রচলিত রয়েছে। এমনকি এই দেউল নির্মাণের নেপথ্য ইতিহাস নিয়েও বিবিধ মত রয়েছে। মন্দিরটির সঙ্গে জড়িত যে ইছাই ঘোষ, তাঁর গল্প পাওয়া যায় ধর্মমঙ্গল কাব্যে। প্রাচীন এই অমূল্য স্থাপত্য আজ প্রত্নবিভাগ দ্বারা সংরক্ষিত।

ইছাই ঘোষের দেউল ঠিক কোন সময়ে নির্মিত হয়েছে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না, এই বিষয়ে নানারকম মত প্রচলিত আছে। তবে অধিকাংশ গবেষকই মনে করেন যে এই ইছাই ঘোষের দেউল কখনই ষোড়শ-সপ্তদশ শতাব্দীর আগে তৈরি নয়। কেউ আবার একে আঠারো শতকের মাঝামাঝি নির্মিত বলে মনে করেন। অন্যদিকে আবার বিনয় সামন্তের মতে, এই দেউলটি খ্রিস্টীয় সপ্তম থেকে একাদশ শতাব্দীর মধ্যে নির্মিত হয়েছিল। কেউ কেউ আবার পঞ্চম শতাব্দীতে গুপ্ত শাসনামলে ইছাই ঘোষের দেউলটির নির্মাণ করা হয়েছিল বলে মনে করে থাকেন।

বাংলার বিরল রেখা-দেউলের অন্যতম নিদর্শন ইছাই ঘোষের দেউলটির নির্মাণের নেপথ্যের ইতিহাসও নানারকম অনুমানের উপর নির্ভর করে রয়েছে। আসলে দেউলটির ধারেকাছে এমন কোনও শিলালিপি বা ভিত্তিপ্রস্তর কিছু পাওয়া যায় না যা থেকে এর নির্মাণকাল এবং নির্মাতা সম্পর্কে একটা সঠিক ও যথাযথ ধারণা করা যায়। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুসারে, ইছাই ঘোষ ছিলেন দেবী ভগবতীর ভক্ত এবং সেই দেবীকে উৎসর্গ করেই এই দেউল তিনি নির্মাণ করেছিলেন, কেউ আবার বলেন পরবর্তীতে তাঁর সম্মানে এই মন্দির নির্মিত হয়েছিল। স্থানীয় বেশ কিছুজন মনে করে থাকেন যে, মন্দিরটি রাজা চিত্র সেন রায় যাঁর রাজত্বকাল ছিল ১৭৪০ থেকে ১৭৪৪ পর্যন্ত, অথবা বর্ধমান রাজপরিবারের মহারাজ বাহাদুর তিলক চাঁদ রায়ের (রাজত্বকাল ১৭৪৪-১৭৭০) যৌবনবতী বিধবা রানী বিষ্ণুকুমারী নির্মাণ করেছিলেন। এখানে প্রশ্ন ওঠে তাহলে এটি কেন ইছাই ঘোষের দেউল নামে পরিচিত। এর নেপথ্যে একটি কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। যে-কাহিনি ধর্মমঙ্গল কাব্যের মধ্যেও পাওয়া যায়।

জানা যায় যে, ১০৩৮ থেকে ১০৫৮ সালের মাঝামাঝি পাল রাজা নয়া পালের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ইছাই ঘোষ, জনশ্রুতি অনুসারে যিনি নাকি ঈশ্বর ঘোষ নামে পরিচিত ছিলেন এককালে। ধর্মমঙ্গলে পাওয়া যায় তিনি পাল রাজাদের দ্বারা নির্বাচিত শাসক কর্ণসেনকে পরাজিত করেন এবং পরাস্ত হয়ে কর্ণসেন গৌড়ে পলায়ন করেছিলেন। কর্ণসেনের গড় দখল করে নেন ইছাই। পরবর্তীকালে ইছাই বর্ধমানের আশেপাশের আরও অঞ্চল দখল করেন এবং অবশেষে স্বাধীন গোপভূমি রাজ্যের রাজা হিসেবে তার কর্তৃত্ব সুদৃঢ় করেন। কর্ণসেনের পর যখন রাজা ধর্মপালের আত্মীয় সেনাপতি মহামদ এলেন ইছাইয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করতে, দেবী চন্ডীর আশীর্বাদে বলীয়ান ইছাইকে তখনও পরাস্ত করা গেল না।

এরপর কর্ণসেন আর তাঁর স্ত্রী রঞ্জাবতীর এক পুত্র হয় ধর্মঠাকুরের কৃপায়। পুত্রের নাম লাউসেন, কোথাও কোথাও বলা হয়েছে লু সেন। ধর্মঠাকুরের আশীর্বাদ নিয়ে লাউসেন যুদ্ধযাত্রা করলেন। লাউসেন তাঁর পিতার রাজ্য উদ্ধার করতে, অজয় নদের তীরবর্তী স্থানীয় ডোম বীর – কালু ডোমের সাহায্য প্রার্থনা করেন।

অবশ্য স্থানীয় নিম্ন বর্গের অধিবাসীদের মধ্যে আরেকটি প্রচলিত লৌকিক বিশ্বাস হচ্ছে, কালু বীরের নাকি আদতে নাম ছিল কালু সেন, লাউসেনের বৈমাত্রেয় সম্পর্কিত ভাই ছিলেন তিনি। পরে লক্ষ্যা নামক এক সাহসিনী, অস্ত্র চালনায় পটু ডোমের মেয়ের প্রেমে পরে, তাঁকে বিবাহ করে, পরিচিত হন কালু ডোম বলে। যুদ্ধক্ষেত্রে কালু বীরের সঙ্গে লক্ষ্যাও সমানে অংশগ্রহণ করতেন।

রাঢ় বঙ্গের এই অঞ্চলে বাউড়ি, বাগদী, দুলে, ডোম, গোপ, সদগোপ অধিবাসীদের মধ্যে ধর্মরাজ ঠাকুর অত্যন্ত জনপ্রিয় দেবতা। এদিকে ইছাই ঘোষ ছিলেন হিন্দু তান্ত্রিক এবং চণ্ডী দেবীর একনিষ্ট ভক্ত। শুরু হয়, মা চন্ডীর ভক্ত ইছাই ঘোষ এবং তাঁর সেনাদের সঙ্গে , ধর্ম ঠাকুরের ভক্ত লাউসেন ও তাঁর সৈন্যদের মধ্যে ঘোরতর যুদ্ধ। যুদ্ধে প্রথম লাউসেনের মুখ্য সেনাপতি কালু ডোম নিহত হন। তারিখটি ছিল নাকি বাংলা সনের ১৩ বৈশাখ। তাই এই দিনটির স্মরণে এখনও কালু বীরের পুজো ও মেলা বসে। শেষ অবধি ইছাই ঘোষ যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হন।

ঘনরাম চক্রবর্তীর ধর্মমঙ্গল কাব্য অনুসারে মা শ্যামরুপা চণ্ডী নাকি দেবী পূজা সমাপ্ত না করে, যুদ্ধে যেতে ইছাইকে মানা করেছিলেন। –
” সম্মুখে সপ্তমী শনিবার বারবেলা।
আজি রণে যেওনারে ইছাই গোয়ালা।”

লাউসেন নাকি দেবীর এই ইচ্ছার কথা জানতেন, তাই পুন: পুন: ইছাইকে কাপুরুষ সম্বোধন করে, যুদ্ধে যাবার জন্য উত্তেজিত করেন। কাপুরুষ সম্বোধনে ক্ষিপ্ত হয়ে, চন্ডিপুজো অসমাপ্ত রেখেই মহা মান্ডলিক ঈশ্বর ঘোষ যুদ্ধ যাত্রা করেন এবং নিহত হন।

এই স্থানটির নামই হয়ে যায় কাঁদুনি ডাঙ্গা, কারণ ইছাই এর মৃত্যুতে নাকি স্বয়ং মা ভবানী কেঁদে উঠেছিলেন।
” আর না শুনিব স্তুতি ও চাঁদ বদনে।
কান্দেন করুণাময়ী অঝোর নয়নে।”

রাঢ়ের এই বিখ্যাত ঘটনা বহুদিন ধরে লোকমুখে প্রচলিত ছিল। ক্রমে ক্রমে এই ঘটনাটি হয়ে দাঁড়ায় ধর্মমঙ্গল কাব্যের প্রধান বিষয় বস্তু ।

ইছাই ঘোষের এই প্রতিপত্তির কারণেই আমাদের আলোচ্য দেউলটির নাম তাঁর নামে হয়েছে তা অনুমান করা যেতে পারে। তবে এই যে ইছাই ঘোষ, লাউসেন কিংবা কর্ণসেন, এঁদের অস্তিত্বের ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। তবে ঈশ্বর ঘোষ যে রক্তমাংসের মানুষ সে বিষয়ে কিছু ঐতিহাসিক প্রমাণের সূত্র পাওয়া গেছে।

১৮৩৩ সালে বর্তমানের বাংলাদেশের দিনাজপুরের, রামগঞ্জ নামক গ্রামে ইছাই ঘোষের নামাঙ্কিত একটি অতি মূল্যবান তাম্রশাসন আবিষ্কার হয়েছিল। এটিই বিখ্যাত ” রামগঞ্জ তাম্রশাসন ” । পাল যুগের সমসাময়িক এত বিখ্যাত ঐতিহাসিক দলিল আর দুটি নেই। এই লিপিতে ইছাই ঘোষের বংশলতিকা পাওয়া যায়। বংশের শুরু দেখানো হয়েছে ধূর্ত ঘোষের হাতে। তাঁর পুত্র বালা ঘোষ ছিলেন এক অসাধারণ যোদ্ধা। এঁঁর পুত্র ধবল ঘোষ এবং পুত্র বধূ সদ্ভবার পুত্রই হচ্ছেন মহামান্ডলিক ইছাই ঘোষ।

এছাড়া, ইছাই ঘোষের দেউলের ২১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে আরেকটি রেখ-দেউলের সন্ধান পাওয়া গেছে যা জটার দেউল নামে পরিচিত। এরপর ১৮৭৫ সালে জঙ্গল পরিষ্কারের সময় প্রাপ্ত এক তাম্রলিপি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী জটার দেউল ৯৭৫ সালে রাজা জয়ন্ত চন্দ্র চন্দ্র দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। উল্লেখ্য যে এই তাম্রলিপিতেই ঈশ্বর ঘোষ নামে একজন ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়।

একদম সাম্প্রতিক সময়ে অনেকেরই বিশ্বাস যে, এই টাওয়ারটি আসলে শিকারের জন্য ব্যবহার করা হত। এমনকি এও বলা হয় যে, ২০০ বছর আগে ব্রিটিশরা গ্রামাঞ্চলের জরিপ ও মানচিত্র নির্মাণের জন্য জিটিএস (Great Trigonometrical Survey) টাওয়ার হিসেবে এটিকে ব্যবহার করেছিল।

ইছাই ঘোষের দেউলের নেপথ্যে থাকা এত বিচিত্র কাহিনির সমাহার যেমন এই স্থাপত্য সম্পর্কে আমাদের কৌতুহলী করে তোলে তেমনই এর অনবদ্য নির্মাণশৈলীও উৎসাহী মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য। এটি বাংলার রেখ-দেউল স্থাপত্যের অন্যতম এক নিদর্শন। এতে অবশ্য ওড়িশার স্থাপত্যরীতির চিহ্নও বিদ্যমান। এমনকি হিন্দু ও বৌদ্ধ উভয় ধরনেরই স্থাপত্যশৈলীর ব্যবহার মন্দিরে লক্ষ করা যায়। মন্দিরটির প্রায় ১৮ মিটার উঁচু শিখর (রেখ-দেউল) এবং তাতে একটি ছত্রীও দেখতে পাওয়া যায়। মূলত ইঁট দ্বারা নির্মিত এই মন্দিরের নীচের অংশে তেমন কোন অলঙ্করণ চোখে পড়ে না তবে মিনারের মাঝামাঝি অংশ থেকে নানারকম অসাধারণ অলঙ্করণ লক্ষ করা যায়। মন্দিরগাত্রের সেইসব নকশা, দেবদেবীর মূর্তি আজ কালের গ্রাসে অনেকটাই ক্ষয়ে গিয়েছে তবু দেখলে মনে হয়, নটরাজ, নৃসিংহের মূর্তি সেখানে রয়েছে এমনকি মানবমূর্তি সম্ভবত সঙ্গীতজ্ঞ এবং নর্তকের মূর্তিও দেখতে পাওয়া যায়। দেওয়ালের গায়ে কুলুঙ্গির মতো খাঁজকাটা জায়গায় এইসব মূর্তির অবস্থান। সেই কুলুঙ্গির মতো দেখতে অংশগুলির অলঙ্করণও দেখবার মতো। এছাড়াও ফুলের নকশাও দেখতে পাওয়া যায় মন্দিরগাত্রে। মন্দিরের প্রবেশদ্বারটি গোলাকার খিলানযুক্ত। আঠারো শতকের ধাঁচের গর্ভগৃহটি জানালাবিহীন। নীচের বেসমেন্টটি বর্গাকার। গর্ভগৃহে প্রথমদিকে কোন বিগ্রহ না থাকলেও এখন কালো পাথরের শিবলিঙ্গ দেখতে পাওয়া যায়। মন্দিরটি আর্কিওলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া দ্বারা সুরক্ষিত।

ইছাই ঘোষের দেউল মূলত একটি ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেই অধিক পরিচিত। দেউল হলেও প্রথমদিকে যেহেতু কোন বিগ্রহ ছিল না, তাই এই দেউলে কোন ধর্মীয় উৎসবেরও কথাও তেমন জানতে পারা যায় না। তবে বর্তমানে যেহেতু একটি শিবলিঙ্গ রয়েছে, তাই নিত্যপূজার ব্যবস্থা রয়েছে এবং শিবরাত্রির মত বিশেষ দিনে নিশ্চয়ই যথাযথ আচার-সংস্কার মেনে পুজো করা হয়ে থাকে৷ মূলত ইছাই ঘোষের দেউলের সঙ্গে জড়িত বঙ্গদেশের প্রাচীন ইতিহাস এবং সেসময়কার এত উচ্চমানের স্থাপত্যশিল্প দেখবার কারণেই মানুষ এসে ভিড় করেন এখানে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading