সববাংলায়

বেলুড় মঠ

বেলুড় মঠ (Belur Math) হুগলি নদীর পশ্চিম পাড়ে হাওড়া জেলার বেলুড় নামক স্থানে অবস্থিত। এই মঠ হল রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনের সদর দপ্তর। বেলুড় মঠ নির্মাণের নেপথ্য কারিগর ছিলেন রামকৃষ্ণ পরমহংসের প্রিয় শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ। এই মন্দিরটির দিকে তাকিয়ে দেখলে আশ্চর্য হতে হয়। এর গড়নের মধ্যেই সর্বধর্ম সমন্বয়ের ইঙ্গিতটি স্পষ্টভাবে ফুটে রয়েছে। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের উদ্দেশ্যও তো তাই। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের সেবা করে চলা, বিবেকানন্দের ভাষায় বললে জীবে প্রেমই এই মিশনের মূল লক্ষ্য। সেই বিশাল কর্মযজ্ঞের কেন্দ্রবিন্দুই হল এই বেলুড় মঠ মন্দির। এই বেলুড় মঠ মন্দির প্রাঙ্গনে আবার স্বামী বিবেকানন্দ, মা সারদা দেবী এবং এই মঠ ও মিশনের প্রথম সভাপতি স্বামী ব্রহ্মানন্দের জন্যও রয়েছে স্বতন্ত্র মন্দির। সারা বছরই অসংখ্য ভক্তের দল ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের দরবারে মাথা ঠেকাতে আসেন।

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের মানবকল্যাণের মহান আদর্শকে পাথেয় করে তাঁর অন্যতম প্রধান শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের পরিকল্পনা ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৮৯৭ সালের শুরুতে স্বামীজি তাঁর পাশ্চাত্যদেশীয় শিষ্যদের নিয়ে কলম্বো থেকে কলকাতার বরানগরে ফিরে এসেছিলেন। ফিরে এসে তাঁরা মোট দুটি মঠ প্রতিষ্ঠা করেন, একটি বেলুড়ে এবং অপরটি উত্তরাখণ্ডের চম্পাবত জেলায় হিমালয়ের মায়াবতীতে, যেটি অদ্বৈত আশ্রম নামে পরিচিত৷ বেলুড়ের মঠটি রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সদর দপ্তরে পরিণত হয়েছিল৷ এই মঠগুলি ছিল এমন যুবকদের জন্য যাঁরা যথাযথ প্রশিক্ষণের দ্বারা সন্ন্যাসী হয়ে উঠবেন এবং নিঃস্বার্থে জনহিতকর কাজ করবেন। বেলুড়ে যেখানে মঠ স্থাপন করেছিলেন স্বামীজি সেই জমিতেই পরবর্তীকালে মন্দির তৈরি হয়েছিল। ১৮৯৭ সালের ১ মে স্বামী বিবেকানন্দের নেতৃত্বে উত্তর কলকাতায় বলরাম বসুর বাড়িতে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করা হয়। তাই ওই দিনটিকেই রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের প্রতিষ্ঠা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

এই মন্দির তৈরির পিছনেও রয়েছে কিছু চমকপ্রদ ইতিহাস। শিকাগোর ধর্মসভায় যাওয়ার আগে বিবেকানন্দ একজন পরিব্রাজক হিসেবে ভারতবর্ষের নানা স্থানে ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি তাজমহল, ফতেহপুর সিক্রি প্রাসাদ, দিওয়ান-ই-খাস, রাজস্থানের বিরাট প্রাসাদগুলির মতো বেশ কয়েকটি প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শন পরিদর্শন করেছিলেন। এমনকি  মহারাষ্ট্র, গুজরাট, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু এবং অন্যান্য বেশ কিছু স্থানের প্রাচীন মন্দিরগুলিও খুব মনোযোগ দিয়ে দেখেছিলেন। কেবলমাত্র ভারতবর্ষই নয়, আমেরিকা ও ইউরোপ জুড়ে সফরের সময় আধুনিক, মধ্যযুগীয়, গথিক ও রেনেসাঁ শৈলীর স্থাপত্যের নিদর্শনগুলি খুঁটিয়ে দেখেছিলেন। বিভিন্ন ধর্মের, বিভিন্নরকম স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন থেকে কিছু কিছু উপাদান বেলুড় মঠের মন্দিরের গড়নের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন। এর ভিতর দিয়ে সর্বধর্ম সমন্বয়ের ইঙ্গিতটিকেই স্পষ্ট করে তুলতে চেয়েছিলেন তিনি।

বিবেকানন্দ তাঁর সেই চিন্তার কথা স্বামী বিজ্ঞানানন্দকে জানিয়েছিলেন, যিনি তাঁর প্রাক-সন্ন্যাস জীবনে একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। বিবেকানন্দ এবং শিবানন্দের কাছ থেকে ধারণা নিয়েই স্বামী বিজ্ঞানানন্দ বেলুড় মঠের মন্দিরের নকশা নির্মাণ করেছিলেন।

১৮৯৮ সালে রামকৃষ্ণদেবের মৃতদেহের ভস্মাবশেষের পাত্রটিকে পূজা করে মঠের মৃত্তিকাকে পবিত্র করে তুলেছিলেন।

বিবেকানন্দের মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পর ১৯২৯ সালের ১৩ মার্চ রামকৃষ্ণের জন্মদিনের দিন শিবানন্দ বেলুড় মঠ মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। স্বামী বিজ্ঞানানন্দ আবার ১৯৩৫ সালে প্রথম ভিত্তিপ্রস্তরের ৩০ মিটার দক্ষিণে বর্তমান স্থানে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। কলকাতার তৎকালীন বিখ্যাত স্থাপত্য নির্মাতা মার্টিন বার্ন অ্যান্ড কোম্পানির সহায়তায় ১৯৩৮ সালে বেলুড় মঠ মন্দিরের নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়েছিল।

বেলুড় মঠের মন্দিরের স্থাপত্যশৈলীটি যেমন আকর্ষণীয় তেমনি অর্থপূর্ণ। স্বামী বিজ্ঞানানন্দ এই মন্দিরের নকশা তৈরি করেছিলেন। মন্দিরটির গড়ন লক্ষ করলে মসজিদ, মন্দির এবং গীর্জার স্থাপত্যশৈলীর মেলবন্ধন সহজেই চোখে পড়বে। এছাড়াও বৌদ্ধ স্থাপত্যশৈলীও চোখে পড়ে। এর মাধ্যমে ভারতবর্ষে ধর্মীয় বৈচিত্র্যের দিককে স্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়াও মন্দিরের বিভিন্ন জায়গায় দেশ-বিদেশের বিখ্যাত সব স্থাপত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সব নকশা কিংবা মোটিফ চোখে পড়ে। মন্দিরের উচ্চতা ১১২.৫ ফুট। মন্দিরটি চুনার পাথর অর্থাৎ লাল দাগযুক্ত বেলেপাথর দ্বারা নির্মিত এবং এর সামনের কিছু অংশ সিমেন্ট দিয়ে তৈরি।

মন্দিরের সামনে দাঁড়ালে তার সম্মুখভাগ দক্ষিণ ভারতীয় গোপুরম গেটের কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে দক্ষিণ ভারতের গোপুরমগুলি মূল মন্দির থেকে বিচ্ছিন্ন থাকত, কিন্তু এক্ষেত্রে সেটি হয়নি। মন্দিরের প্রবেশদ্বারে এমন অনেক উপকরণ লক্ষ করা যায় যা প্রাচীন ভারতীয় বেশ কিছু স্থাপত্যের কথা মনে পড়ায়। মন্দিরের সম্মুখভাগে একেবারে উর্দ্ধে যে তিনটি চূড়া দেখা যায়, তাদের সঙ্গে রাজপুত-মোঘল শৈলীতে নির্মিত যোধপুর এবং উদয়পুরের প্রাসাদের ছাদগুলির সামঞ্জস্য রয়েছে। তাছাড়া প্রবেশদ্বারের বৃত্তাকার অংশটির সঙ্গে নাসিক, কোন্দান বা অজন্তা গুহা মন্দিরের শৈলীর সামঞ্জস্যও লক্ষিত হয়। এমনকি সাঁচি স্তুপের গেটে ব্যবহৃত শাস্ত্রের প্রতীকের অনুরূপ নকশাও বেলুড় মন্দিরের সম্মুখভাগে রয়েছে। এছাড়াও সেখানে রামকৃষ্ণ মিশনের যে প্রতীক সেটি তো খোদাই করা আছেই, সেইসঙ্গে নন্দলাল বসু দ্বারা নির্মিত হাতি, পদ্ম এবং শিবলিঙ্গ, যা হিন্দু ধর্মের চিহ্ন, সেগুলিরও প্রতিকৃতি মন্দিরের প্রবেশদ্বারেই দেখতে পাওয়া যাবে। প্রবেশদ্বারের দুই পাশের জানালায় মোগল ও রাজপুত প্রাসাদের অনুরূপ নকশার ইঙ্গিত রয়েছে।

প্রবেশদ্বার দিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করলেই বিশাল টানা বারান্দা, তার দুদিকে সারি সারি নকশাযুক্ত খিলান এবং উপরে বাঁকা সিলিং লক্ষ করা যাবে। এই দৃশ্য বৌদ্ধ চৈত্য হলগুলির কথা মনে করিয়ে দেয়। বিশেষত বেলুড় মন্দিরের অভ্যন্তরীণ সারি সারি কলামগুলির পাথর-কাটা নকশা এবং বৃত্তাকার ছাদের সঙ্গে বৌদ্ধ চৈত্য হলগুলির দারুণ মিল রয়েছে। খ্রিস্টানদের চার্চের মতোই এখানে নাটমন্দির গর্ভগৃহের সঙ্গে সংযুক্ত, বিচ্ছিন্ন নয়। নাটমন্দির থেকে গর্ভগৃহ পর্যন্ত প্রশস্ত এই হলটি কেবল বৌদ্ধ চৈত্য নয়, রোমের সেন্ট পিটার চার্চের কথাও মনে করায়। এই প্রশস্ত হলটির উভয় পাশে সারিবদ্ধ স্তম্ভগুলির নকশাতে ডরিক বা গ্রীক শৈলীর সুস্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। স্তম্ভের বিস্তৃত নকশাটি উড়িষ্যা শৈলীরও অনুরূপ। উপরের বিমটি তামিলনাড়ুর মাদুরাইয়ের মীনাক্ষী মন্দিরের কথাও স্মরণ করায়। নাটমন্দিরের উপরে ঝুলন্ত ব্যালকনি এবং জানালাগুলিতে ফতেপুর সিক্রিতে ব্যবহৃত মোগল স্থাপত্যের প্রভাব স্পষ্ট। নাটমন্দিরের মাঝবরাবর পূর্বে ও পশ্চিমেও মন্দিরে প্রবেশ করবার দুটি দ্বার রয়েছে। পূর্বদিকের প্রবেশদ্বারে একটি গণেশের মূর্তি এবং পশ্চিমদিকের প্রবেশদ্বারে একটি হনুমানের মূর্তি লক্ষ করা যায়।

প্রবেশদ্বার থেকে সোজা তাকালে মূল গর্ভগৃহে স্থাপিত সাদা মার্বেলে নির্মিত শ্রীশ্রীরাকৃষ্ণ পরমহংসদেবের মূর্তি দেখা যাবে। মূল মন্দিরের উপরে কেন্দ্রীয় গম্বুজটি ফ্লোরেন্সের সান্তা মারিয়া দেল ফিওরে গম্বুজের মতো। ছোট ছোট গম্বুজগুলি কেন্দ্রীয় গম্বুজেরই প্রতিরূপ এবং সংখ্যায় মোট বারোটি। গর্ভমন্দিরের চারদিকে প্রদক্ষিণ করার জন্য যে প্রশস্ত পরিক্রমা পথটি রয়েছে তা বৌদ্ধ চৈত্য এবং খ্রিস্টান গীর্জাগুলির কথাই মনে করায়। এই প্রদক্ষিণ পথে নন্দলাল বসু কৃত নবগ্রহের মূর্তি দেওয়ালে ছোট খুপরিতে জালের নকশার ওপরে খোদিত দেখা যাবে।

এই বেলুড় মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত সাদা মার্বেলের শ্রীরামকৃষ্ণের মূর্তিটি বিখ্যাত ভাস্কর প্রয়াত গোপেশ্বর পাল নির্মাণ করেছিলেন। লক্ষ করা যায়, যে, শ্রীরামকৃষ্ণের মূর্তিটি একটি একশোটি পাপড়িযুক্ত পদ্মের ওপর উপবিষ্ট। এই মন্দিরের অলঙ্করণ করেছিলেন কিংবদন্তী শিল্পী নন্দলাল বসু। দেবতার ওপরের ছাউনি এবং মন্দিরের সব দরজা-জানলা মায়ানমার থেকে আমদানি করা নির্বাচিত সেগুন কাঠ দিয়ে নির্মিত হয়েছিল।

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের মন্দির ছাড়াও এই বেলুড় মন্দির চত্বরে রয়েছে স্বামী বিবেকানন্দ, মা সারদা এবং স্বামী ব্রহ্মানন্দের স্বতন্ত্র মন্দির৷ যেখানে বিবেকানন্দের মৃতদেহ দাহ করা হয়েছিল বিবেকানন্দের মন্দিরটি সেখানেই নির্মিত হয়েছিল। সারদা মা এবং স্বামী ব্রহ্মানন্দের মন্দিরের ক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটেছিল। যেখানে মা সারদার মৃতদেহ পোড়ানো হয়েছিল, সেখানে মা সারদার মন্দির এবং যেখানে ব্রহ্মানন্দের মৃতদেহ দাহ করা হয়েছিল সেখানে ব্রহ্মানন্দের মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল।

বছরের বিভিন্ন সময়ে বিশেষ বিশেষ উৎসবের দিনে বেলুড় মঠে অসংখ্য মানুষের ভিড় লেগে থাকে।

রামকৃষ্ণদেব, মা সারদা এবং স্বামী বিবেকানন্দের জন্মতিথির সময়ে মন্দির প্রাঙ্গনে প্রচুর পরিমাণে ভক্ত সমাগম হয়। বিশেষ ভোগের আয়োজন তো হয়ে থাকেই, সেই সঙ্গে বিশেষ পূজো অর্চনারও ধুমধাম করে আয়োজন করা হয়।

বেলুড় মঠে দুর্গাপুজা বিশেষভাবে আকর্ষণীয় হয়ে থাকে। দুর্গাষ্টমীর দিন এখানে কুমারী পূজার প্রচলন রয়েছে। সেই কুমারী পূজা দেখতে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে মানুষ ভিড় করেন এখানে। উল্লেখ্য যে, কেবল দুর্গাপূজা, লক্ষ্মী পূজা, সরস্বতী পূজার মতো হিন্দু উৎসবই নয়, খ্রিস্টানদের ক্রিসমাস ইভও একইরকম ধুমধামের সঙ্গে পালিত হয় এখানে, এমনকি সেই সময় বাইবেল পাঠও হয়। এছাড়াও শ্রীচৈতন্য, গৌতম বুদ্ধের জন্মদিনও পালিত হয় এখানে।

এছাড়াও গুরুপূর্ণিমায় বহু সংখ্যক ভক্তের সমাগম হয় বেলুড়ে। মহারাজদের কাছে যাঁরা দীক্ষাগ্রহণ করেন তাঁরা এসে নিজের গুরুকে প্রণাম জানিয়ে যান।

১ মে বেলুড় মঠের বার্ষিক প্রতিষ্ঠা দিবসও খুব ধুমধাম করে এখানে পালিত হয়৷ অসংখ্য ভক্তের সমাগম হয়, বিশেষ ভোগের আয়োজনও থাকে।

সর্বধর্ম সমন্বয়ের বার্তাবাহক, মানবকল্যাণের কর্মকান্ডে ব্রতী এই বেলুড় মঠ আসলে মানবতাবাদেরই প্রচারক। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এমনকি দেশের বহু নামজাদা ব্যক্তিত্বও বেলুড় মঠ পরিদর্শন করে গেছেন।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading