ইতিহাস

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের একজন শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক ও বাস্তববাদী লেখক হলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (Manik Bandopadhyay )। তাঁর লেখনীতে তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার এক নিপুণ চিত্র পাওয়া যায়।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯০৮ সালের ১৯ মে অবিভক্ত বাংলার বিহারের সাঁওতাল পরগনা জেলার দুমকা শহরে হয়। তবে তাঁর পৈতৃক বাড়ি পূর্ববঙ্গের ঢাকা’র বিক্রমপুরে। তাঁর বাবা নাম হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় ও মায়ের নীরদাসুন্দরী দেবী। জন্মের পর ঘুটঘুটে কালো গায়ের রং দেখে আঁতুর ঘরেই আদর করে তাঁর নাম দেওয়া হয়েছিল কালোমানিক। তবে বামুনের ঘরে জন্মানোয় পণ্ডিত ডেকে জন্মকুষ্টিতে নামকরণ করা হয় অধরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বাবা ভালোবেসে নাম রেখেছিলেন প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে বাড়িতে সবাই তাঁকে কালোমানিক বলেই ডাকতেন এবং বড় হওয়ার সাথে সাথে কালোমানিক  থেকে মানিক  নামেই তিনি সর্বত্র পরিচিত হলেন।

বাবার বদলি চাকরির সূত্রে ছোট্ট মানিকের শৈশব ও স্কুল জীবন কেটেছে নানা জায়গায় এবং স্কুলও বদলি হয়েছে অনেকবার। মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৯২৬ সালে মানিক  প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে উর্ত্তীণ হন। বাঁকুড়ার ওয়েসলিয়ান মিশনারি কলেজ থেকে ১৯২৮ সালে আই.এস.সি পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হন। এরপরে বাবার ইচ্ছায় গণিতশাস্ত্রে অনার্স নিয়ে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন।

ছোটবেলায় মানিক অত্যন্ত দুরন্ত প্রকৃতির ছিলেন এবং কল্পনায় ভর করে নিজের অজান্তেই অচেনা জায়গায় গিয়ে উপস্থিত হতেন। এই সব ঘটনা মানিককে পরবর্তীকালে অস্থির করে তুলতো। একটি ঘটনা থেকে জানা যায়, চার বছর বয়সে মানিক একবার খেলার ছলে খালের কাদাজলে কাঁকড়া ধরতে বেরিয়েছিলেন। কিণ্তু কাদা মাটিতে তিনি ক্রমশ ডুবে যাচ্ছিলেন। নিজেকে কিছুতেই কাদা থেকে টেনে তুলে আনতে পারছিলেন না। এর পরে কি ঘটেছিলো তা আর কিছুতেই মনে করতে পারেননি তিনি। অনেক বছর পর এই ঘটনার কথা বাড়ির লোকের কাছে জানতে চাইলে তারা মানিকের প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি। অশান্ত মানিক এর উত্তর খুঁজে বের করতে সেই খালের ধারে গিয়ে হাজির হন। এত বছরে খালের চারপাশের পরিবেশ অনেকটাই বদলে গিয়েছিল। খালের ধারে বসে নানা কথা ভাবতে ভাবতে সন্ধ্যা নেমে আসে, তিনি পাড়ে বেঁধে রাখা নৌকায় আশ্রয় নেন। নানা ভাবনা ভাবতে ভাবতে কখন যে চোখ লেগে গিয়েছিল তা তিনি টের পাননি। চোখ খুলে দেখেন আবারও তিনি কাদায় ডুবন্ত অবস্থায় এবং একটি বৃদ্ধ তাকে সেই কাদা থেকে টেনে তোলার চেষ্টা করছে। অবশেষে ডাঙায় পৌছে ক্লান্ত বৃদ্ধটি তাঁকে যা গল্প শোনায় তা শুনে মানিক অবাক হয়ে যান। বৃদ্ধটি বলে আপনার মতই একটি বাচ্চা ছেলেকে অনেক বছর আগে আমি ডুবন্ত কাদা থেকে এইভাবেই বাঁচিয়ে ছিলাম। শিশুটি খুশি হয়ে আমাকে অনেক গুলো টাকা বকশিস দিয়ে গিয়েছিল। মানিকের মনে পড়ে যায় সব ঘটনা যার খোঁজে তাঁর এখানে আসা। ছোট বেলায় হাঁটতে শেখার পর বাড়ির আঁশবটিতে তিনি একবার নিজের পেট কেটে দুফালা করে ফেলেছিলেন। আবার একবার উনুন থেকে জ্বলন্ত কয়লা তুলে খেলতে গিয়ে নিজের পায়ের চামড়া পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। একবার ভাইদেরকে সঙ্গে নিয়ে কালী পুজোয় বোমা বাঁধতে গিয়ে বড় বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিলেন। বিস্ফোরণে কাঁচের শিশি ফেটে সবার শরীরে গেঁথে গিয়েছিল। ছোট বেলার তাঁর দুরন্তপনার শেষ ছিলো না। এখানে একটা বলার বিষয় হাজার যন্ত্রণায় তিনি কাঁদতেন না, উল্টে গান গাইতেন। তাই কোনো বিপদ ঘটলে শুরুতে বাড়ির লোকের বুঝতে বেশ অসুবিধা হতো। এই রকমই ছিলেন মানিক  বন্দ্যোপাধ্যায়।

প্রেসিডেন্সিতে পড়ার সময় কলেজের ক্যান্টিনে বসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাজি ধরেন ‘বিচিত্রা’ পত্রিকায় তিনি তাঁর লেখা ছাপিয়ে দেখাবেন। মানিক  লেখা শুরু করেন ও তিনদিনের মধ্যে জীবনের প্রথম গল্প ‘অতসী মামী’ লিখে সোজা ‘বিচিত্রা’ পত্রিকার অফিসে গিয়ে ছাপার জন্য জমা করে আসেন। বিচিত্রা পত্রিকায় সেই গল্প প্রকাশ হতে পাঠকমহলে তোলপাড় শুরু হলো। সবাই তাঁর লেখার প্রশংসা করলেন। বিচিত্রা পত্রিকার সম্পাদক উপেন্দ্রনাথ মানিকের বাড়ি খুঁজে লেখার সাম্মানিক হিসাবে কুড়ি টাকা দিলেন সঙ্গে অনুরোধ করলেন আরও গল্প লিখে জমা দেবার জন্য। শুরু হলো মানিকের গল্প লেখা। পড়াশোনা আর সম্পূর্ন করা হলো না, লেখাই তাঁর পেশা ও নেশা হয়ে দাঁড়াল।

তাঁর লেখা গল্প ও উপন্যাসগুলি বিচিত্রা, বঙ্গশ্রী, পূর্বাশা, দেশ, যুগান্তর, আনন্দবাজার পত্রিকায় ছাপা হতে শুরু করে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন কঠোর বাস্তববাদী।  কোন সৌন্দর্য ছাড়াই রূঢ় বাস্তবকে তিনি গল্পে রূপায়িত করতেন। পূর্ববঙ্গের গ্রাম্য জীবন ও সমাজের ভন্ডামি নিয়ে লেখা  উপন্যাস ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’, মধ্যবিত্ত সমাজকে নিয়ে লেখা ‘দিবা-রাত্রির কাব্য’ এবং মাঝিদের জীবন অবলম্বনে রচিত তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘পদ্মানদীর মাঝি’ বাংলা সাহিত্যের অমর সম্পদ।

১৯৩৪ সালে তিনি নবারুণ পত্রিকার সম্পাদক হয়ে কিছুকাল কাজ করেছিলেন। ১৯৩৭-১৯৩৮ সালে বাংলা সাহিত্য ম্যাগাজিন ‘বঙ্গশ্রী’-তে সহকারী সম্পাদক হয়ে কাজ করেছিলেন। ১৯৩৯ সালে ভাইয়ের সাথে মিলে ছাপাখানা ও প্রকাশনা সংস্থার ব্যবসা শুরু করেন। তবে লাভের মুখ না দেখায় কিছু সময় পর সেটি বন্ধ হয়ে যায়। মার্ক্সবাদ দ্বারা তিনি যথেষ্ট প্রভাবিত ছিলেন ও ছাত্রকালীন সময়েই তিনি কমিউনিস্ট রাজনীতিতে যোগদান করেন।

১৯৫০ সালে সরকার ধরপাকড় শুরু করলে পত্রিকাগুলোতে মানিকের লেখা ছাপা বন্ধ হয়ে যায়। তিনি শ্রমজীবি মানুষের কষ্ট, দরিদ্র সমাজ, সমাজের অত্যাচার, ভন্ডামি, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনের উপর ভিত্তি করে গল্প উপন্যাস রচনা করতেন। পদ্মানদীর মাঝি লেখার আগে তিনি মাঝিদের জীবন যাত্রা দেখার জন্য তাদের সাথে বেশ কিছু সময় বসবাস করেছিলেন। এই রকমই বাস্তববাদী ছিলেন তিনি। শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাস মানিককে যথেষ্ট প্রভাবিত করেছিল। কিশোর বয়সেই শরৎচন্দ্রের সবকটি উপন্যাস তাঁর পড়া হয়ে গিয়েছিল। তিনি ছিলেন শরৎচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের ভক্ত। তিনি রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনতে  ভালোবাসতেন। বই পড়তে ভালোবাসতেন। বাঁশি বাজাতে ভালোবাসতেন, নিজের মনে নির্জন স্থানে বাঁশি বাজিয়ে বেড়াতেন।

মানিক  বন্দ্যোপাধ্যায় জীবনে দারুন অর্থকষ্টের সম্মুখীন হয়েছিলেন। শেষের দিকে তিনি তাঁর লেখা ছাপাবার জন্য অনেক প্রকাশকদের দরজায় ঘুরে বেরিয়েছেন। পয়সা না থাকায় কখনো শুকনো মুড়ি খেয়ে কাটিয়ে দিয়েছেন। ভাঙা টেবলে চেয়ারে বসে রাত দিন লিখে গিয়েছেন। একটাই আশা ভালো লেখা জমা দিতে পারলে পারিশ্রমিক পাবেন তাহলে সংসারের ডাল-ভাত যোগার করতে পারবেন। রাতদিন লেখায় মনোনিবেশ করে নিজের শরীরের দিকে খেয়াল করতেই ভুলে গিয়েছিলেন। না খাওয়া, রাত দিন জাগা, পথে ঘাটে ঘুরে বেড়ানো ও অত্যধিক পরিশ্রমে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯৩৫ সালে তাঁর মৃগী রোগ ধরা পরে এরপরও সেইভাবে শরীরের যত্ন করতে পারেননি। বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা, বউ ছেলে সবার মুখে অন্ন তুলে দেবার দায়িত্ব ছিল তাঁর। তিনি আর পেরে উঠছিলেননা। টাকার অভাবে নিজের ঠিকমতো চিকিৎসাও করাতে পারেননি। আস্তে আস্তে তাঁর শরীর ক্ষয় হতে শুরু করে। যৌবনে শরীরচর্চা করতেন কুস্তির আখড়ায় গিয়ে, শরীর ছিল পুরুষালি ও লোহার মতো শক্ত। শেষের দিকে খাদ্যের অভাবে ও মৃগী রোগে তাঁর শরীর শেষ হয়ে গিয়েছিল। তিনি আর পেরে উঠছিলেন না। ভাগ্যের খেলায় তিনি হেরে গিয়েছিলেন।

সমগ্র জীবনে তিনি ৩৬টি উপন্যাস ও ২৫০ টি ছোট গল্প রচনা করে গেছেন। উল্লেখযোগ্য কতগুলি উপন্যাস: জননী (১৯৩৫), দিবারাত্রির কাব্য (১৯৩৫), পদ্মানদীর মাঝি(১৯৩৬), পুতুলনাচের ইতিকথা (১৯৩৬), জীবনের জটিলতা (১৯৩৬), অমৃতস্য পুত্রাঃ (১৯৩৮) ইত্যাদি। তাঁর লেখা ছোটগল্পের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, অতসী মামী ও অন্যান্য গল্প (১৯৩৫), প্রাগৈতিহাসিক (১৯৩৭), মিহি ও মোটা কাহিনী (১৯৩৮), সরীসৃপ (১৯৩৯), ছোট বকুলপুরের যাত্রী(১৯৪২), আজ পরশুর গল্প(১৯৪৬)।

১৯৫৬ সালের ৩ ডিসেম্বর মানিক  বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাত্র ৪৮ বছর বয়সে মৃগীরোগে  আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।