পেশাদার টেনিসের জগতে কিংবদন্তী মহিলা টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্ববন্দিত মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা (Martina Navratilova)। মাত্র চার দশকের ক্রীড়া জীবনে অসংখ্য রেকর্ড করেছেন তিনি। ৯টি উইম্বলডন সিঙ্গেলস চ্যাম্পিয়নশিপ, ৫৯টি গ্র্যাণ্ড স্ল্যামের শিরোপা রয়েছে তাঁর মুকুটে। মোট ১৬৭টি সিঙ্গলস ম্যাচ এবং ১৭৭টি ডাবলস টেনিস ম্যাচ খেলেছেন মার্টিনা। টেনিসের জগতে তাঁর সবথেকে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ক্রিস এভার্টের সঙ্গে তাঁর লড়াই আপামর টেনিস দর্শক উপভোগ করেছে। ডব্লিউ.টি.এ(WTA) সাতবার তাঁকে ‘বছরের সেরা খেলোয়াড়’ হিসেবে নির্বাচিত করেছে, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস তাঁকে সর্বকালের সেরা চল্লিশ ক্রীড়াবিদদের মধ্যে অন্যতম হিসেবে ঘোষণা করে। ২০০৪ সালের অলিম্পিক গেমসে অংশগ্রহণ করেন তিনি। ফিটনেস, আবেগ, আগ্রাসন এবং শক্তি দিয়ে নিজেকে একজন শ্রেষ্ঠ টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে প্রমাণ করেছিলেন তিনি। ‘ওয়ার্ল্ড টেনিস অ্যাসোসিয়েশন’-এর পক্ষে একজন রাষ্ট্রদূত হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি এবং উইম্বলডনে বিবিসি ও টেনিস চ্যানেলের নিয়মিত ধারাভাষ্যকার হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। টেনিস থেকে অবসর নিয়ে ২০১৯ সালে নেটফ্লিক্সে ‘দ্য পলিটিশিয়ান’ নামের একটি ছবিতেও অভিনয় করেছেন মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা।
১৯৫৬ সালের ১৮ অক্টোবর চেকোশ্লোভাকিয়ার প্রাগে মার্টিনা নাভ্রাতিলোভার জন্ম হয়। তাঁর যখন মাত্র তিন বছর বয়স, তখনই তাঁর বাবা-মায়ের বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটে। তাঁর মা তাঁকে নিয়ে চলে আসেন রেভনিসে। তাঁর মা নিজেও একজন দক্ষ অ্যাথলিট, টেনিস খেলোয়াড় এবং জিমন্যাস্ট ছিলেন। ১৯৬২ সালে তাঁর মা জেনা বিবাহ করেন মিরোস্লাভ নাভ্রাতিলকে যিনি মার্টিনার প্রথম টেনিস প্রশিক্ষক ছিলেন। তাঁর ঠাকুরমা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে চেকোশ্লোভাক ফেডারেশনে টেনিস খেলতেন। চার বছর বয়সে একটি দেওয়ালে টেনিস বলকে আঘাত করে টেনিস খেলার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং সাত বছর বয়স থেকেই নিয়মিত টেনিস খেলতে শুরু করেন মার্টিনা । ১৯৭২ সালে পনেরো বছর বয়সে চেকোশ্লোভাকিয়া টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপ জয় করেন মার্টিনা। এর পরের বছরই ইউনাইটেড স্টেটস লন টেনিস প্রফেশনাল ট্যুর-এ যোগ দেন তিনি। কিন্তু ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত পেশাদারি টেনিস জগতে পদার্পণ করেননি মার্টিনা। ফ্রেঞ্চ ওপেনে সেইবারই তিনি প্রথম খেলতে নামেন। ফাইনালে পৌঁছানোর জন্য ছয়বার চেষ্টা করতে হয় তাঁকে। ইভোন গোলাগং এবং হেলগা ম্যাশথফের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা। ফলে একবারে ফাইনালে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি তাঁর পক্ষে। ১৯৭৪ সালে ১৭ বছর বয়সে ফ্লোরিডার অরল্যাণ্ডোতে মার্টিনা তাঁর প্রথম পেশাদারি সিঙ্গেলস জেতেন। ১৯৭৫ সালে অস্ট্রেলিয়ান ওপেন এবং ফ্রেঞ্চ ওপেনের মতো দুটি প্রধান সিঙ্গেলসে রানার-আপ হন মার্টিনা। সেপ্টেম্বর মাসে ইউএস ওপেনে ইভার্টের কাছে পরাজিত হওয়ার পরে নিউ ইয়র্কের ইমিগ্রেশন অফিসে যান মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা এবং জানান যে কমিউনিস্ট শ্লোভাকিয়া থেকে তিনি স্থায়ীভাবে মার্কিন প্রদেশে থাকতে চান। এক মাসের মধ্যে গ্রিন কার্ড পেয়ে যান মার্টিনা এবং ১৯৮১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দা হন মার্টিনা। ১৯৭৫ সালেই ইভার্টের সঙ্গে একত্রে ফ্রেঞ্চ ওপেন ওমেন্স ডাবলসে জয়লাভ করেন তিনি এবং তারপরে ১৯৭৮ সালে উইম্বলডনের ওমেন্স ডাবলসেও জয়লাভ করেন মার্টিনা। সেই ম্যাচে তিনটি সেটে তিনি ইভার্টকে পরাজিত করে প্রথমবার ওয়ার্ল্ড টেনিস অ্যাসোসিয়েশনের নিরিখে বিশ্বের ১ নং খেলোয়াড়ের মর্যাদায় উন্নীত হন। ১৯৭৯ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁকে হারিয়ে ইভার্ট পুনরায় এই শিরোপা অধিকার করে এবং ঐ বছরই শেষের দিকে আবার একটি ম্যাচে ইভার্টকে হারিয়ে মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা পুনরায় বিশ্বের ১ নং খেলোয়াড়ের শিরোপা অধিকার করেন। ১৯৮১ সালে আমেলিয়া দ্বীপে আয়োজিত ওয়ার্ল্ড টেনিস অ্যাসোসিয়েশন চ্যাম্পিয়নশিপে ইভার্টের কাছে পরাজিত হন মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা। ঐ বছরই অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে পুনরায় ইভার্টকে হারিয়ে মার্টিনা তাঁর তৃতীয় প্রধান সিঙ্গেলস জয়ের খেতাব অর্জন করেন। ১৯৮৩ সালের ফ্রেঞ্চ ওপেনেই তিনি প্রথম পরাজিত হন। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি মোট ছয়টি ম্যাচে পরাজিত হন। ১৯৮৪ সালে ফ্রেঞ্চ ওপেন জেতার মাধ্যমে মোট চারটি প্রধান সিঙ্গলস জয়ের শিরোপা পান তিনি যাকে ‘গ্র্যাণ্ড স্ল্যাম’ বলে চিহ্নিত করা হয়। একই বছরে তিনটি সমতলে মাটিতে, ঘাসে এবং শক্ত পিচের উপর খেলে জয়লাভের শিরোপা অর্জন করেছেন মার্টিনা। ১৯৮৪ সালেই ডানহাতি প্যাম শ্রিভারের সঙ্গে একত্রে ডাবলস খেলে গ্র্যাণ্ড স্ল্যাম জয় নিশ্চিত করেছিলেন বাঁ-হাতি খেলোয়াড় মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা। তাঁর সবথেকে উল্লেখযোগ্য স্ট্রোক ছিল স্লাইস ফোরহ্যাণ্ড। ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৭ সালের মধ্যে মোট ১১টি বড় বড় টুর্নামেন্টে ৮টিতেই জয়লাভ করেছিলেন তিনি। তাছাড়া ১৯৮২ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে মোট নয়বার উইম্বলডন ওপেনের ফাইনালে পৌঁছেছিলেন তিনি। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৭ সালের মধ্যে মোট ৫ বার ইউএস ওপেনের ফাইনালে এবং ১৯৮২ থেকে ১৯৮৭ সালের মধ্যে ফ্রেঞ্চ ওপেনে মোট ৫ বার ফাইনালে পৌঁছেছিলেন তিনি। আগ্রাসী সার্ভ এবং ভলির কৌশলের জন্যেই তিনি বিখ্যাত। মিরোস্লাভ নাভ্রাতিল, জর্জ পার্মা, রেনে রিচার্ডস, ক্রেগ কার্ডন, মাইক এস্টেপ প্রমুখ প্রশিক্ষকের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন মার্টিনা। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে তিনি নিজেও প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন। ১৯৯২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নেভাদার সিজারস প্যালেসে ৩৫ বছর বয়সী নাভ্রাতিলোভা ৪০ বছর বয়সী জিমি কনরসের সঙ্গে তাঁর খেলোয়াড় জীবনের শেষ ম্যাচটি খেলেন।
‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ পত্রিকার ক্রীড়া সাংবাদিক জর্জ ভেসির সঙ্গে একত্রে মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা একটি আত্মজীবনী লেখেন ১৯৮৫ সালে যার নাম ‘মার্টিনা ইন দ্য ইউএস অ্যাণ্ড বিইং মাইসেলফ ইন দ্য রেস্ট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’। এর আগে ‘টেনিস মাই ওয়ে’ নামে একটি বইও তিনি লিখেছিলেন ১৯৮২ সালে মেরি ক্যারিলোর সঙ্গে যৌথভাবে। জনেট হাওয়ার্ড তাঁর ‘দ্য রাইভ্যালস’ বইতে মার্টিনা এবং ইভার্টের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে তুলে ধরেছেন।
ব্যক্তিগত জীবনে একজন সমকামী আন্দোলনকারী ছিলেন তিনি। তাছাড়া মানবাধিকার প্রচারের তরফ থেকে তিনি ন্যাশনাল ইকুয়ালিটি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। ডব্লিউ.টি.এ সাতবার তাঁকে ‘বছরের সেরা খেলোয়াড়’ হিসেবে নির্বাচিত করেছে, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস তাঁকে সর্বকালের সেরা চল্লিশ ক্রীড়াবিদদের মধ্যে অন্যতম হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৯৬ সালে ডব্লিউ.টি.এ-র তরফ থেকে ডেভিড গ্রে পুরস্কারে সমাম্নিত হন মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা। ওমেন্স স্পোর্টস ফাউণ্ডেশনের পক্ষ থেকেও তাঁকে ফ্লো হাইম্যান পুরস্কারে সম্মানিত হন তিনি। ২০০৪ সালে অলিম্পিক গেমসে অংশগ্রহণ করেন তিনি। ২০০৫ সালে ‘টেনিস’ পত্রিকা তাঁকে ১৯৬৫ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে স্টেফি গ্রাফের রেকর্ডকেও অতিক্রমকারী সর্বশ্রেষ্ঠ টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে ঘোষণা করেছে। ২০১১ সালে টাইমস পত্রিকা মার্টিনাকে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যের তিরিশ জন টেনিস কিংবদন্তীর অন্যতম বলে বিবেচনা করে। ‘ওয়ার্ল্ড টেনিস অ্যাসোসিয়েশন’-এর পক্ষে একজন রাষ্ট্রদূত হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি এবং উইম্বলডনে বিবিসি ও টেনিস চ্যানেলের নিয়মিত ধারাভাষ্যকার ছিলেন মার্টিনা।
সম্প্রতি টেনিস থেকে অবসর নেওয়ার পরে ২০১৯ সালে নেটফ্লিক্সে ‘দ্য পলিটিশিয়ান’ নামের একটি ছবিতেও অভিনয় করেছেন মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


Leave a Reply to সেরেনা উইলিয়ামস | সববাংলায়Cancel reply