ইতিহাস

তুলসী গৌড়া

স্বনামধন্য পরিবেশবিদ তুলসী গৌড়া (Tulsi Gowda) নিঃসন্দেহে বর্তমান সময়ের এক বিস্ময়। পরিবেশের সঙ্গে তাঁর অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। গাছপালার নাড়িনক্ষত্র তাঁর নখদর্পণে অথচ কোনোদিনই তথাকথিত বিদ্যায়তনিক শিক্ষার সংস্পর্শ লাভ করেননি তিনি। গাছপালা সম্বন্ধে অগাধ জ্ঞান থাকার কারণে তাঁকে ‘অরণ্যের বিশ্বকোষ’ (Encyclopedia of the Forest) আখ্যাও দেওয়া হয়েছে। মাত্র ১২ বছর বয়স থেকে নিরলসভাবে প্রায় তিরিশ হাজার গাছ লাগিয়েছেন তিনি, ওষধি গাছ লাগিয়েছেন প্রায় তিনশো রকমের, করেছেন কর্ণাটকের বন দপ্তরের স্বেচ্ছাসেবকের কাজও। বর্তমানে পরিবেশের এই সংকটকালে তুলসী গৌড়ার মতো মানুষ যেভাবে নিঃশব্দে রক্ষা করে চলেছেন অরণ্যের প্রাণ, সে তো দেশসেবারই নামান্তর। ভারত সরকার তাই এমন একজন মানুষকে সম্মান জানাতে কার্পণ্য করেনি। সম্প্রতি ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত করা হয় কর্ণাটকের তুলসী গৌড়াকে।

১৯৪৯ সালে কর্ণাটক রাজ্যের উত্তর কান্নাড় জেলার আঙ্কোলা তালুকের অন্তর্গত হোন্নালি গ্রামে হালাক্কি সম্প্রদায়ভুক্ত আদিবাসী পরিবারে তুলসী গৌড়ার জন্ম হয়। তাঁর নামের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে একটি ওষধি গাছের নাম – তুলসী যা হিন্দু ধর্মবিশ্বাসেও পবিত্র বলে মানা হয়। মাত্র দুই বছর বয়সে তুলসী নিজের বাবাকে হারান। পরবর্তীকালে নিজের মা এবং বোনের সঙ্গে স্থানীয় নার্সারিতে শ্রমিকের কাজ শুরু করেন তিনি। সেই কারণে তুলসীর বিদ্যায়তনিক শিক্ষার আর অবসর মেলে না। আজীবন তাঁকে এই নিরক্ষরতা বয়ে বেড়াতে হয়েছে। একেবারে কৈশোরে হয়তো ১০-১২ বছর বয়সে তুলসীর সঙ্গে বিবাহ হয়েছিল গোবিন্দে গৌড়া (Govinde Gowda) নামের একজন বয়স্ক ব্যক্তির। যদিও অনতিকাল পরেই, তুলসীর যখন ১৭ বছর বয়স, তিনি নিজের স্বামীকেও হারিয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। সেইসময় তাঁর নিঃসঙ্গতার সঙ্গী হয়েছিল গাছপালা আর প্রকৃতি।

বাবার মৃত্যুর পর মায়ের সঙ্গে স্থানীয় নার্সারিতে কাজ করার সূত্রেই উদ্ভিদের প্রতি একটা টান জন্মায় তুলসীর। মাত্র ১২ বছর বয়স থেকেই তিনি বৃক্ষরোপণ করা শুরু করেছিলেন। কর্ণাটক বনদপ্তরের অধীনে উত্তর কন্নড় জেলার হোন্নালি গ্রামের মাস্তিকাট্টি রেঞ্জে ক্রমাগত বনসৃজনের যে প্রচেষ্টা তারই অংশ হিসেবে বন বিভাগের আগাসুর নার্সারিতে তুলসী অক্লান্তভাবে পরিশ্রম করতেন। সেখানে আগাসুর বীজতলার রক্ষণাবেক্ষণের কাজে বহাল ছিলেন তিনি। তুলসী তাঁর মায়ের সঙ্গে অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে প্রায় ৩৫ বছর কাজ করেছেন বন বিভাগের নার্সারিতে। উদ্ভিদের প্রতি ভালোবাসা, উদ্ভিদ সংরক্ষণে তাঁর অসামান্য দক্ষতা বন দপ্তরের নজর কাড়ে এবং তাঁকে বন বিভাগের একজন স্থায়ী কর্মচারীরূপে নিযুক্ত করা হয়। তারপর একটানা ১৫ বছর তিনি নার্সারিতে কাজ করেন স্থায়ী কর্মচারী হিসেবে। স্থায়ী এবং অস্থায়ী কর্মচারী হিসেবে মোট ৬০ বছর তুলসী কর্ণাটক বন বিভাগের হয়ে কাজ করেছেন। এই ছয় দশকে তিনি মোট তিরিশ হাজার বৃক্ষচারা রোপণ করেছিলেন। একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী সমগ্র কর্ণাটকে একান্ত নিজের প্রচেষ্টায় প্রায় এক লক্ষ বৃক্ষরোপণ করেছিলেন তিনি। তাঁর একটি অন্যতম বিস্ময়কর গুণ হল, যে কোনো প্রজাতির গাছের মাতৃগাছ (Mother Tree) কোনটি তা সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারা। অর্থাৎ মূল কোন গাছ থেকে তার উৎপত্তি সেই গাছটি সহজেই চিনে ফেলতে পারতেন তুলসী। তিনি প্রায় তিনশোটিরও বেশি প্রজাতির গাছ এবং তাদের ফুল শনাক্ত করবার ক্ষমতা রাখেন। কর্ণাটকের বন বিভাগের কাজ থেকে ৭০ বছর বয়সে অবসর নিয়েছিলেন তুলসী গৌড়া। কিন্তু উদ্ভিদের প্রতি ভালোবাসা, নিয়ত অনুসন্ধান এবং তাদের যত্ন করতে তাঁর উদ্যম আজও অম্লান।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


বর্তমানে তিনি তরুণ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের গাছকে ঘিরে তাঁর বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারের সাহায্যে অরণ্য এবং প্রকৃতির রক্ষণাবেক্ষণ কতটা জরুরি, সেই শিক্ষাদানের ওপর জোর দিচ্ছেন, শেখাচ্ছেন কীভাবে গাছের বীজ সংগ্রহ করতে হয় এবং তাঁদের যত্ন নিতে হয়। কেবল গাছপালা, প্রকৃতিই নয়, নিজের গ্রামে তুলসী মেয়েদের অধিকার রক্ষার জন্যেও লড়াই করেছেন। এক তুমুল ঝামেলার পরে একজন হালাক্কি মহিলাকে যখন বন্দুক দেখিয়ে হুমকি দেওয়া হয় তখন সেই রমণীর সাহায্যার্থে এগিয়ে আসেন তুলসী গৌড়া। আসল অপরাধীর শাস্তি না হলে তিনি প্রতিবাদ করবেন বলে ঘোষণাও করেন।

কর্ণাটক বন বিভাগে বীজ উন্নয়ন (Seed Development) এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তুলসী গৌড়াকে পুরস্কারে, সম্মানে ভূষিত করা হয়। ১৯৮৬ সালে তিনি ‘ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী বৃক্ষমিত্র পুরস্কার’ (Indira Priyadarshini Vrikshamitra Award বা IPVM) লাভ করেছিলেন। এই পুরস্কার পতিত ভূমি উন্নয়ন এবং বনসৃজনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে প্রদান করা হয়। ১৯৮৬ সালেই প্রথম এই পুরস্কার প্রদান করা শুরু করে ভারত সরকারের পরিবেশ ও বনমন্ত্রক। প্রতিবছর ৭টি আলাদা আলাদা বিভাগের জন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করা হয়। প্রথম বছরেই তুলসী গৌড়া এই পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন। ১৯৯৯ সালে তুলসী গৌড়াকে ‘কর্ণাটক রাজ্যোৎসব পুরস্কার’ (Karnataka Rajyotsava Award) প্রদান করা হয়। এই পুরস্কার ‘কর্ণাটক রায়জ্যোৎসব পুরস্কার’ নামেও পরিচিত। এটি কর্ণাটক রাজ্যের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার। কর্ণাটক রাজ্যের যেসব নাগরিকের বয়স ৬০ বছরের অধিক, ব্যক্তিগত কৃতিত্বের জন্য তাদেরকে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়। ১৯৯৯ সালে তুলসী গৌড়া এই পুরস্কার প্রাপ্ত ৬৮জনের মধ্যে একজন ছিলেন এবং পরিবেশ সংক্রান্ত কাজের জন্য যে দুজন প্রবীণ এই পুরস্কার লাভ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন অন্যতম। এছাড়াও তিনি পরিবেশ সুরক্ষার জন্য ‘কবিতা মেমোরিয়াল’-এর মতো পুরস্কারেও সম্মানিত হয়েছেন। ২০২০ সালের ২৬ জানুয়ারি ৭১তম প্রজাতন্ত্র দিবসে ভারত সরকার সামাজিক কাজের জন্য তুলসী গৌড়াকে ভারতবর্ষের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কারে ভূষিত করেন। রাষ্ট্রপতি কার্যালয় থেকে মোট ৬১ জনকে পদ্মশ্রী সম্মানের জন্য নির্বাচন করা হয় ২০২০ সালে, তুলসী গৌড়া তাঁদের মধ্যে অন্যতম। এই ঘোষণার পরে রাষ্ট্রপতি ভবনে ২০২১ সালের ৮ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের হাত থেকে এই পুরস্কার গ্রহণ করেন তুলসী গৌড়া। পুরস্কার নেওয়ার সময় খালি পায়ে, নিজের চিরাচরিত পোশাকেই হাজির হয়েছিলেন তুলসী ঠিক যেন এক অরণ্যচারী মানুষ আর এই ঘটনাতে আলোড়িত হয়েছে সমগ্র ভারত। সেই অনুষ্ঠানে ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন, উপস্থিত ছিলেন আরও অনেক গণ্যমান্য মানুষ। এত জনপ্রিয়তার পরেও তাঁর জীবনাচরণে কোনো পরিবর্তন আসেনি। আজও তিনি কর্ণাটকের একটা কুঁড়েঘরে থেকে দিনযাপন করছেন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পেয়েও উদ্ভিদ সম্পর্কে তুলসী গৌড়ার এই বিপুল জ্ঞান যেমন বিস্ময়ের তেমনই একটা প্রশ্নও বটে, যে এই অসাধ্যসাধন ঘটল কীভাবে! এ সম্পর্কে তুলসী গৌড়াকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন যে, কেমন করে এটা সম্ভব হয়েছে তা তিনি জানেন না, তবে অরণ্যের ভাষা বলতে এবং বুঝতে পারেন তিনি। অদ্ভুতভাবে তাঁর নামের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে একটি উপকারী গাছের নাম, তুলসী।

তুলসী গৌড়ার কাজ তাঁর সম্প্রদায়ের মানুষকে প্রভাবিত করেছিল বিস্তর। ইয়েল্লাপ্পা রেড্ডি নামের এক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং পরিবেশবিদ জানিয়েছেন গৌড়া প্রায় তিনশো রকমের ঔষধি গাছ রোপণ করেছেন, যেসব গাছ গ্রামের মানুষের চিকিৎসায় কাজে লাগে। এছাড়াও নিজের সম্প্রদায়ের প্রতি তুলসীর দীর্ঘ প্রতিশ্রুতিরও প্রসংশা করেছেন তিনি। উত্তর কন্নড় জেলার নাগরাজা গৌড়া (Nagaraja Gowda) নামের একজন ব্যক্তি যিনি হালাক্কি উপজাতির কল্যাণের জন্য কাজ করেন, তুলসী গৌড়া সম্পর্কে বলেছিলেন তুলসী তাঁদের সম্প্রদায়ের গর্ব এবং অরণ্য এবং ওষধি বৃক্ষ সম্বন্ধে তাঁর জ্ঞান অগাধ, কিন্তু কেউ তাঁর কাজকে বিস্তারিতভাবে নথিভুক্ত করেনি এবং নিরক্ষরতার কারণে যোগাযোগ স্থাপনের ক্ষমতা নেই বলেই তাঁর কাজ স্বচক্ষে না দেখলে তুলসীর অবদান বোঝা যাবে না। কেবলমাত্র ‘অরণ্যের বিশ্বকোষ’ই নয়, তিনি তাঁর সারাজীবনব্যপী কাজের জন্য পেয়েছেন আরও কিছু অভিধা। কোথাও তিনি ‘তুলসাজ্জি’ নামেও পরিচিত। তাঁর উপজাতির মানুষেরা তাঁকে ‘বৃক্ষদেবী’ আখ্যা দিয়েছেন।

৭২ বছর বয়সে আজও অরণ্যের সমৃদ্ধি, প্রকৃতির উন্নতির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন ‘অরণ্যের বিশ্বকোষ’ নামে খ্যাত তুলসী গৌড়া।

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যার জনক পঞ্চানন মাহেশ্বরীকে নিয়ে জানুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ভিডিও