ইতিহাস

মাতা হারি

১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির হয়ে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির কারণে ফরাসি ফায়ারিং স্কোয়াডে মাতাহারিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। জনপ্রিয় নর্তকী এবং গুপ্তচরবৃত্তির জন্যই মাতা হারির নাম ইতিহাসের পাতায় স্থান পেয়েছে।

মাতা হারির (Mata Hari) আসল নাম মার্গারেটা গিরট্রুইডা জেলে (Margaretha Geertruida Zelle)। ১৮৭৬ সালের ৭ আগস্ট নেদারল্যান্ডের (Netherlands) লিউয়ারডেন (Leeuwarden) প্রদেশে মাতা হারির জন্ম‌ হয়। তাঁর বাবার নাম এডাম জেলে( Adam Zelle) এবং মায়ের নাম এন্টজে ভ্যান ডার মুলেন (Antje van der Meulen)। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। প্রথমদিকে তাঁর  বাবার একটি টুপির দোকান ছিল। কিন্তু ‌পরবর্তী সময়ে তিনি তেল শিল্পে বিশাল অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করে যথেষ্ট সম্পদশালী হন। তাই ছোটবেলা থেকে মার্গারিটা বেশ বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি খুব ব্যয়বহুল স্কুলে লেখাপড়া করেন। কিন্তু ১৮৮৯ সালে মার্গারিটার বাবা দেউলিয়া হয়ে যান। এর ফলে তাঁর বাবা এবং মায়ের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। ১৮৯১ সালে তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়। ১৮৯৩ সালে তাঁর বাবা সুসান্না ক্যাথারিনাকে (Susanna Catharina) বিয়ে করেন। মার্গারিটা তাঁর গডফাদার মিস্টার ভিসারের (Mr. Visser) কাছে থাকতে শুরু করেন। এখানে তিনি একজন শিশু শিক্ষিকা হওয়ার জন্য পড়াশুনা শুরু করেন। কিন্তু ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ায় তাঁর গডফাদার বিরক্ত হয়ে তাকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন। এই ঘটনার কিছুদিন পর তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে হেগ (Hague) শহরে তাঁর কাকার বাড়িতে চলে যান। মার্গারিটার যখন ১৮ বছর বয়স, তখন ডাচ সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি পাত্রী চাই বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়ে একজন ডাচ সামরিক কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন রুডলফ ম্যাকলেওডকে (Rudolf MacLeod)  বিয়ে করেন। বিয়ের পর ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ উপনিবেশে (বর্তমানে ইন্দোনেশিয়া) বসবাস শুরু করেন। ১৮৯৫ সালের ১১ জুলাই আমস্টারডামে (Amsterdam) তাদের বিয়ে হয়। ক্যাপ্টেন রুডলফকে বিয়ে করার জন্য তিনি তৎকালীন ডাচ সমাজের অভিজাত শ্রেণিতে মেলামেশা করার সুযোগ পান।বিয়ের পর তারা পূর্ব জাভা দ্বীপের মালাঙে (Malang) চলে যান। সেখানে তাদের দুই সন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু তাদের বিয়ে সুখের ছিল না। ম্যাকলিওড মদ্যপ ছিলেন। বয়সের দিক থেকে তিনি মার্গারিটার চেয়ে ২০ বছরের বড় ছিলেন। তাছাড়া ক্যাপ্টেন ম্যাকলিওড প্রায়ই তাঁর স্ত্রীকে প্রহার করতেন। তাঁর ধারণা ছিল, মার্গারিটার কারণেই সামরিক বাহিনীতে তাঁর পদোন্নতি হচ্ছে না। অধিকাংশ ডাচ পুরুষদের মতো তাঁর একজন প্রকাশ্য রক্ষিতাও ছিল। সেই সময়ের ডাচ ইস্ট ইন্ডিজে একজন রক্ষিতাঁর সাথে সম্পর্ক রাখা ছিল সাধারণ ব্যাপার। এই অসুখী, অশান্তিময় দাম্পত্যের জন্য মার্গারিটা তাকে সাময়িকভাবে ত্যাগ করে ভ্যান রিড (Van Rheedes) নামে অপর একজন ডাচ সামরিক অফিসারের কাছে চলে যান। এই সময় মার্গারিটা কয়েকমাস ধরে  ইন্দোনেশিয়ান রীতিনীতি শেখেন এবং একটি নাচের কোম্পানিতে যোগদান করেন। ১৮৯৭ সালে তিনি “মাতা হারি”  নাম নেন। মালয় ভাষায় যার অর্থ ‘সূর্য’ বা ‘দিনের চক্ষু’।এরপর মাতাহারি আবার স্বামীর কাছে ফিরে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের সংসার স্থায়ী হয়নি। কিছুদিনের মধ্যেই অসুস্থ হয়ে তাদের পুত্রসন্তানের মৃত্যু হয় এবং কন্যা সন্তানও খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। অবশেষে ১৯০২ সালের ৩০ আগস্ট থেকে তারা আলাদা থাকতে শুরু করে এবং ১৯০৬ সালে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। তাদের কন্যা সন্তানের দায়িত্ব নেন মার্গারিটার স্বামী। যদিও মাত্র ২১ বছর বয়সে এই সন্তানেরও মৃত্যু হয় ।১৯০৩ সালে মাতা হারি প্যারিসে আসেন, সেখানে একটি সার্কাসে তিনি লেডি ম্যাকলিওড (Lady MacLeod) নামে ঘোড়শওয়ার হিসেবে কাজ করেন। তবে ১৯০৫ সালে থেকে তিনি সফল নর্তকী হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেন। নাচের মঞ্চে শরীর প্রদর্শনের মাধ্যমে মাতা হারি খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। তিনি নিজেকে জাভার এক রাজকুমারী হিসাবে জাহির করতেন। তাঁর সাহসী, খোলামেলা শরীরী উপস্থাপনা ছিল দর্শক আকর্ষণ করার প্রধান হাতিয়ার। মাতা হারির নৃত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল নৃত্যরত অবস্থায় একে একে শরীরের সমস্ত বস্ত্র বিসর্জন দেওয়া। নগ্নতাকে তিনি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেলেন। ইরোটিক নাচের সঙ্গে মিশিয়ে দিলেন মিথ, আধ্যাত্মিকতাও। এই সময় বহুবার তাঁর নগ্ন অথবা প্রায় নগ্ন ছবি তোলা হয়েছে।
১৯১২ সালের পর মাতা হারির জনপ্রিয়তা হ্রাস পেতে শুরু করে। ফলস্বরূপ তিনি পুরুষ সঙ্গীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। শরীর ও সাহচর্যের বিনিময়ে রাশিয়া, জার্মানি, ফ্রান্সের উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসার আর ধনী পুরুষদের কাছ থেকে অর্থ উপার্জন করতে লাগলেন মাতা হারি। ১৯১৫ সালের ১৩ মার্চ শেষবারের মতো মঞ্চে ওঠেন তিনি। 
১৯১৪ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নেদারল্যান্ডস নিরপেক্ষ থাকায় স্বাধীন ডাচ নাগরিক হিসাবে ইউরোপের সব জায়গায় যাতায়াত করতে পারতেন মাতা হারি। এই সময় একটা শো করতে জার্মানিতে যান তিনি। কিন্তু বার্লিনে তাঁকে আটকে দেওয়া হয়। এমনকি তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সিজ করা হয়, টাকাপয়সা-গয়না সব আটকে দেয় জার্মান অফিসাররা। ফিরে যেতে হয় মাতা হারিকে। এই সময়েই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হল কার্ল ক্রোমার (Karl Cromar) নামে এক জার্মান কনসালের। তিনি মাতা হারিকে জার্মানির হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির প্রস্তাব দেন। তিনি মাতা হারির সঙ্গে দিলেন কোড নেম, H-21 ও ২০,০০০ ফ্রাঁ।  মাতা হারি অনায়াসে সেই টাকা নেন। কারণ তাঁর মনে হয়েছিল যে, তাঁর যে সমস্ত জিনিসপত্র আর টাকা জার্মানি আটক করেছে, তাঁর বদলে এই অর্থ তাঁর প্রাপ্য। তবে গুপ্তচর হওয়ার কোনও অভিপ্রায় তাঁর ছিল না বলেই অনুমান করা হয়। ব্রিটেন হয়ে ফ্রান্সে ফেরার সময় ব্রিটিশ গোয়েন্দারা তাকে আটকে তল্লাশি করে, কিন্তু সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায় না। ফ্রান্সে ফেরার পর তিনি আবার  বিলাসবহুল জীবন যাপন করতে শুরু করেন। কিন্তু তিনি জানতেন না যে, তিনি পুলিশের নজরবন্দি। এই সময় ২৩ বছরের রাশিয়ান পাইলট ভাদিম মাসলভের (Captain Vadim Maslov)  প্রেমে পড়েন মাতা হারি। প্রেমিক  মাসলভ-এর সঙ্গে বারবার দেখা করতে লাগলেন রাশিয়ার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে। ১৯১৬ সালে যুদ্ধক্ষেত্রে মাসলভ গুরুতর আহত হয় এবং অন্ধ হয়ে যায। আহত প্রেমিকের পাশে পৌঁছতে মরিয়া মাতা হারি দেখা করলেন ফ্রান্সের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার এক অফিসারের সঙ্গে। অফিসার জানালেন, ফ্রান্সের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির শর্তে যদি মাতাহারি রাজি হয়, তবেই সে যাওয়ার অনুমতি পাবে।নিরুপায় মাতা হারি রাজি হলেন। বিনিময়ে চাইলেন ১০ লক্ষ ফ্রাঁ। 
হল্যান্ডে যাওয়ার পথে স্পেনে আটকে দেওয়া হল মাতা হারিকে। সেখানেও এক জার্মান গোয়েন্দাকর্তাকে রূপ আর যৌনতাঁর অপ্রতিরোধ্য টোপ দিয়ে উত্তর আফ্রিকায় জার্মান রণকৌশল সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নিলেন। বিনিময়ে তাঁকে ফ্রান্সের কিছু গুরুত্বপূর্ণ খবর দেওয়ার ভান করলেন। মাতাহারি ভেবেছিলেন দাবি অনুযায়ী তিনি এ বার টাকা পেয়ে যাবেন। কারণ তিনি কথা মতোই কাজ করেছেন। অন্য দিকে সেই জার্মান গোয়েন্দাকর্তাটি বার্লিনে এক রেডিয়ো-বার্তা পাঠালেন, জার্মান গুপ্তচর H-21 তাঁকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। ইচ্ছে করে জার্মান গোয়েন্দা এমন কোডে বার্তাটি পাঠালেন, যে কোডের অর্থ অনেক আগেই ফ্রান্স উদ্ধার করে ফেলেছে। জার্মানদের পরিকল্পনা অনুযায়ী অবধারিত ভাবে বার্তাটি ফ্রান্সের হাতে এসে পড়ল। বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে ফরাসি কর্তারা বুঝলেন, H-21 আসলে আর কেউ নয়, মাতা হারি।
১৯১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মাতা হারিকে এলিসি প্যালেস (Elysée Palace) নামের একটি হোটেল থেকে গ্রেফতাঁর করা হয়। ২৪ জুলাই গুপ্তচর বৃ্ত্তির দায়ে তাঁর বিচার শুরু হয়। দিনের পর দিন জেরা চলল। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য নানা জায়গায় অজস্র চিঠি লিখলেন মাতা হারি। কিন্তু কোন কাজ হল না। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, গোপন সংবাদ পাচারের মাধ্যমে ৫০,০০০ ফরাসি সৈন্যকে হত্যার ঘটনায় জার্মানিকে সহায়তা করার।  ১৯১৭ সালের ১৫ অক্টোবর তাঁর মৃত্যুদন্ড কার্য়কর করা হয়। এ সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৪১ বছর। ফায়ারিং স্কোয়াডে মাতা হারিকে বেঁধে রাখা হয়নি। এমনকি তিনি চোখ বাঁধতেও রাজি হননি। মৃত্যুর আগে তিনি ফায়ারিং স্কোয়াডের ১২ জন সৈন্যের দিকে উড়ন্ত চুম্বন ‍ছুঁড়ে দেন। মৃত্যুদন্ড কার্যকরের পর কেউ তাঁর দেহ নিতে আসেনি। কাজেই দেহটা দিয়ে দেওয়া হয়েছিল প্যারিসের চিকিৎসা শাস্ত্রে অধ্যায়নরত ছাত্রদের প্রশিক্ষণে ব্যবহার করার জন্য।
তাঁর মাথাটা প্যারিসের এ্যানাটমি মিউজিয়ামে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময় দেখা যায়, সেটা নিখোঁজ। 
মাতাহারি মৃত্যুর পর তাঁর জীবন নিয়ে বহু সিনেমা ও মঞ্চাভিনয় হয়েছে। নেদারল্যান্ডসে Frisian museum  মিউজিয়ামে মাতাহারি নামে একটি ঘর রয়েছে। তাঁর মূর্তিও রয়েছে। তার‌ বাড়ি পুনর্নির্মাণ করে সংরক্ষিত করা হয়েছে।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।