সববাংলায়

ময়নাগুড়ি

পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত জলপাইগুড়ি জেলার একটি প্রাচীন জনপদ হল ময়নাগুড়ি(Maynaguri)। ময়নাগুড়িকে ‘ডুয়ার্সের প্রবেশ দ্বার’ বলা হয়ে থাকে। ভৌগোলিক দিক থেকে দেখলে ময়নাগুড়ি ২৬.৫৭° উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৮.৮২° পূর্ব দ্রাঘিমাংশ বরাবর অবস্থান করছে। ময়নাগুড়ির একদিক দিয়ে বয়ে চলেছে তিস্তা নদী(পুরাণে যেটি পরিচিত ছিল ত্রি স্রোতা নামে)। অন্যপাশ দিয়ে বয়ে চলেছে জলঢাকা। ময়নাগুড়ির পাশেই অবস্থান করছে গরুমারা জাতীয় উদ্যান।

ময়নাগুড়ি » সববাংলায়

প্রাচীনত্বের দিক থেকে দেখলে ময়নাগুড়ি বেশ প্রাচীন একটি জনপদ। আজকের ময়নাগুড়ি একসময় প্রাগজ্যোতিষপুর, কামরূপ ও কামতা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীকালে ১৭১৫ থেকে ১৮৬৪ অবধি ভুটানের অধীনে ছিল। ১৮৬৪ সালে ইংরেজ ভুটান যুদ্ধের পর ময়নাগুড়ি পশ্চিম দুয়ার অঞ্চলের ‘সদর মহকুমা’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ঐতিহাসিকদের মতে একসময়ের প্রাচীন বাণিজ্যপথ যা সিল্ক রুট নামে পরিচিত তা এই ময়নাগুড়ির মধ্যে দিয়েই বিস্তৃত ছিল। সেই সময় অবশ্য এই এলাকাটি ময়নাগুড়ি নামে পরিচিত ছিল না। তখন এর নাম ছিল চাপগড় পরগণা। এই চাপগড় পরগণা তখন ছিল কার্জি রাজাদের অধীনে। এই কার্জি বংশের শেষ রাজা ছিলেন বজ্রধর কার্জি। এখানকার – রাজবংশী, মেচ, মালপাহাড়ী প্রভৃতি জনজাতির অবস্থান এখানে কিরাত বা ইন্দো মঙ্গোলয়েড জনগোষ্ঠীর বসবাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।

এতো গেল প্রাচীন ইতিহাসের কথা। আধুনিক ময়নাগুড়ির কথা বললে বলতে হয় জলপাইগুড়ি থেকে উত্তর পূর্বে ১০কিমি এবং শিলিগুড়ি থেকে প্রায় ৫০ কিমি দূরে অবস্থান এই ময়নাগুড়ির। ময়নাগুড়ি সাধারণত পাঁচটি সড়ক দ্বারা যুক্ত।

১. শিলিগুড়ি,জলপাইগুড়ি(পশ্চিম)
২. আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার(পূর্ব)
৩.চ্যাংড়াবান্ধা, মাথাভাঙা (দক্ষিণ)
৪.মালবাজার, লাটাগুড়ি (উত্তর)
৫. রামসাই (উত্তর পশ্চিম)

কেবল প্রাকৃতিক এবং ঐতিহাসিক ঐতিহ্যে পুষ্ট নয়, শিক্ষা ক্ষেত্রেও ময়নাগুড়ি যথেষ্ট সমৃদ্ধ। এখানকার উল্লেখযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পড়ে ময়নাগুড়ি কলেজ, ময়নাগুড়ি গভ: পলিটেকনিক কলেজ, ময়নাগুড়ি সুভাষনগর হাইস্কুল। ময়নাগুড়ি সুভাষনগর হাইস্কুল থেকেই ২০১৬ সালে সঞ্জয় সরকার উচ্চ মাধ্যমিকে রাজ্যে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিল।

ময়নাগুড়ি প্রধানত বিখ্যাত তার চা বাগান ও জঙ্গলের জন্য হলেও এখানকার অন্যতম দর্শনীয় স্থানের মধ্যে জল্পেশ মন্দির ও জটিলেশ্বর মন্দির বিখ্যাত।

জল্পেশ মন্দির: এটি ময়নাগুড়ির সবথেকে বড় আকর্ষণ। কালিকাপুরাণ, স্কন্দপুরাণে উল্লেখিত এই মন্দির উত্তর পূর্ব ভারতের সবথেকে বিখ্যাত শৈবতীর্থ। প্রতি বছর প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ পুণ্যার্থী এখানে ভিড় জমান। এই মন্দিরটির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে জর্দা নদী। ঐতিহাসিকদের মতে এই মন্দির প্রায় দুহাজার বছর প্রাচীন। আদি মন্দিরটি ভুমিকম্পে নষ্ট হলে ১৬৩২ সালে একই স্থানে নতুন শিব মন্দির প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করান কোচবিহারের রাজা প্রাণ নারায়ণ যা তাঁর তাঁর ছেলে মেদ নারায়ণ ১৬৬৫ সালে শেষ করেন।

জটিলেশ্বর মন্দির: এটিও জল্পেশের মতই গুরুত্বপূর্ণ একটি শৈব তীর্থ যা পাল যুগে নির্মিত।

ময়নামাতা: ময়নাগুড়ি তান্ত্রিক ধর্মের অন্যতম পীঠস্থান। ময়নাগুড়ির অন্যতম একটি তান্ত্রিক পীঠস্থান হল এই ময়নামাতার মন্দির। এই ময়নামাতাকে কোনো কোনো ঐতিহাসিক তান্ত্রিক দেবী হিসেবে গণ্য করে থাকেন। আবার ঐতিহাসিক রাজমোহন নাথের ‘কোদলী রাজ্য’ গ্রন্থ অনুসারে প্রাচীন কামপরূপের পাল রাজা ধর্মপালের বোন ছিলেন ময়নামতী। আবার কারও মতে ময়নামতী হলেন কোচ বংশের মহিলা এক সামন্ত প্রভু বিবাহ পরবর্তীকালে যিনি পরিচিত হন – ‘মইনামাতা’ নামে। কারও মতে আবার ইনি আসলে এক গ্রাম দেবতা। ময়নাগুড়ির কাউয়াকাব এলাকায় ময়নামাতা গ্রামদেবী হিসেবেই পূজিত হন।

ময়নাগুড়ির বার্ণিশে বনবিবির পুজো হয়। জনশ্রুতি অনুযায়ী দেবী দুর্গা কৈলাস যাত্রাকালে এই গ্রামে রাত্রিবাস করেছিলেন। দেবী দুর্গার এই আগমনকে স্মরণ করে এখানে বনবিবির পুজা হয়।

এখানকার আরেকটি উল্লেখযোগ্য মন্দির হল পেটকাটি কালীর মন্দির। ময়নাগুড়ির ব্যাঙ্কান্দি গ্রামের পেটকাটি কালী বা পেটকাটি মাও কষ্টি পাথরে নির্মিত দশভূজা । দেবীর পেট কাটা বলে এই দেবী পেটকাটি মাও নামে পরিচিত। তবে পেটকাটি কালী মুর্তি হলেও ইনি ধূমাবতি হিসেবেই পূজিত হন।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. ঐতিহাসিক পুরাকীর্তি মন্দিরময় ময়নাগুড়িঃ জিতেশ চন্দ্র রায়
  2. http://epaper.sangbadpratidin.in/
  3. https://www.anandabazar.com/
  4. https://www.anandabazar.com
  5. https://bengali.abplive.com/
  6. https://bengali.abplive.com/
  7. https://ebela.in/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading