সববাংলায়

মেহেদী হাসান

গজল গানের জগতে সম্রাটের অভিধায় ভূষিত বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী মেহেদী হাসান (Mehdi Hassan)। ভারতে জন্ম হলেও দেশভাগের সময় তাঁর পরিবার পাকিস্তানে চলে যায় এবং তখন থেকে বাকি জীবনটা পাকিস্তানেই কাটিয়েছেন তিনি। উর্দু ভাষা ও উর্দু কবিতার প্রতি আগ্রহ ও আকর্ষণ থেকেই মেহেদী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পাশাপাশি গজল গাইতে শুরু করেছিলেন। পাকিস্তানের কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের লেখা গানে সুরারোপ করে গেয়েই বিখ্যাত হয়েছেন তিনি। লতা মঙ্গেশকর তাঁর গান ও কণ্ঠ সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘স্বয়ং ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর’। তাঁর স্বতন্ত্র গায়নরীতি, সুমিষ্ট পুরুষালী কণ্ঠস্বর এবং প্রাণঢালা আবেগের জন্য প্রতিটি গানে আপামর শ্রোতার হৃদয় স্পর্শ করেছেন তিনি। তাঁই মেহেদী হাসানকে ‘শাহেনশা-ই-গজল’ অর্থাৎ গজল-সম্রাট উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তাঁর ব্যারিটোন কণ্ঠস্বর সকল শ্রোতার আকর্ষণের মুল কারণ। পাকিস্তানের চলচ্চিত্র জগতে অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্লে-ব্যাক গায়ক ছিলেন তিনি। বলা হয় প্রায় তিনশোটিরও বেশি ছবিতে গান গেয়েছেন মেহেদী হাসান।

১৯২৭ সালের ১৮ জুলাই অবিভক্ত ভারতের রাজস্থানের ঝুনঝুনু জেলার লুনা গ্রামের এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে মেহেদী হাসানের জন্ম হয়। তাঁর পরিবারে এক দীর্ঘ ধ্রুপদী সঙ্গীত চর্চার ধারা ছিল। আর সেই ধারার ষোড়শ প্রজন্ম ছিলেন মেহেদী হাসান। তাঁর বাবা বিখ্যাত ধ্রুপদী সঙ্গীতশিল্পী ওস্তাদ আজিম খানের কাছেই শৈশবে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের জগতে তাঁর হাতেখড়ি হয়। তাঁর কাকা ওস্তাদ ইসমাইল খানও তাঁকে সঙ্গীতশিক্ষা দিয়েছিলেন। কৈশোর থেকেই তাঁর প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটতে থাকে এবং ঐ সময়েই তিনি গানের অনুষ্ঠান করতে শুরু করেন। প্রথমবার তাঁর দাদার সঙ্গে অবিভক্ত পাঞ্জাবে ফজিলকা বাংলোতে ধ্রুপদ ও খেয়াল গেয়েছিলেন মেহেদী হাসান। তাঁর দাদা ওস্তাদ গুলাম কাদির তাঁকে যথেষ্ট উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিতেন। অনেকে বলে থাকেন, মাত্র আট বছর বয়সে বরোদার মহারাজের দরবারে টানা চল্লিশ মিনিট বসন্ত রাগ পরিবেশন করে উপস্থিত শ্রোতাদের বিস্মিত করেছিলেন মেহেদী হাসান। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পরে পাকিস্তান নামে মুসলিম-অধ্যুষিত একটি পৃথক রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। মাত্র কুড়ি বছর বয়সেই পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে সব জিনিসপত্র গুছিয়ে পাকিস্তানে চলে আসতে বাধ্য হন মেহেদী হাসান। চিচাবত্নিতে আত্মীয়স্থানীয়া এক দিদার বাড়িতে এসে ওঠেন তাঁরা। সেই সময় চরম দারিদ্র্যের সম্মুখীন হয় তাঁর পরিবার।

দারিদ্র্য দূর করতে বাধ্য হয়ে মাত্র কুড়ি বছর বয়সেই একটি সাইকেলের দোকানে সাইকেল মেরামতির কাজ করতে শুরু করেন মেহেদী হাসান । চিচাবত্নীর কাছে সেই সাইকেলের দোকানের নাম ছিল মুঘল সাইকেল হাউজ। ক্রমে মোটরগাড়ি আর ডিজেল ট্র্যাক্টর সারানোর কাজে দক্ষ হয়ে ওঠেন তিনি। কিন্তু এত দারিদ্র্য, এত কষ্টের মধ্যেও সঙ্গীতচর্চা থেকে বিরত হননি তিনি। প্রত্যহ নিয়ম করে রাগালাপ অভ্যাস করে গিয়েছেন তিনি। গানই সেই কষ্টের দিনে তাঁর বেঁচে থাকার প্রেরণা হয়ে ওঠে। ১৯৫৭ সালে প্রথম রেডিও পাকিস্তানে সঙ্গীত পরিবেশনের সুযোগ পান মেহেদী হাসান। বিভিন্ন ঘরানার শাস্ত্রীয় সঙ্গীত গেয়ে রেডিওর বিচারকদের মুগ্ধ করেন তিনি। এরপর প্রথম সারির একজন ঠুমরি গায়ক হিসেবে ৩৫ টাকা সাম্মানিকে রেডিও পাকিস্তানে গান গাইতে শুরু করেন মেহেদী হাসান। একদিকে অর্থকষ্ট কমতে শুরু করে আর অন্যদিকে সঙ্গীতের জগতে তাঁর পরিচিতি বাড়তে থাকে। ধ্রুপদী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত গাইলেও উর্দু কবিতার প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল বেশ গভীর। এই আকর্ষণের কারণেই গজল গান গাওয়ার প্রতি ঝুঁকে পড়েন তিনি। মাঝেমধ্যে গজল গান গেয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে থাকেন মেহেদী হাসান। রেডিওতে এই পরীক্ষামূলকভাবে গজল গান গাওয়া দেখে রেডিওর কর্মকর্তা জেড. এ. বুখারি এবং রফিক আনসারও তাঁকে উৎসাহিত করতে থাকেন গজল গাওয়ার জন্য। ১৯৫২ সালে প্রথম রেডিও পাকিস্তানে আনুষ্ঠানিকভাবে গান পরিবেশন করেন। তাঁর কিছু বিখ্যাত গজলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ‘ম্যায় হোঁশ মে থা ফির’, ‘রাফতা রাফতা ও মেরি হাসতি কা সামান হো গ্যয়ি’, ‘মহব্বত করনে ওয়ালে’, ‘বাত কারনি মুঝে মুশকিল’, ‘আব কি বিছরে’, ‘খুলি জো অঙ্গা ও থা’ ইত্যাদি গানগুলি। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত আর গজলই হয়ে ওঠে তাঁর একমাত্র সঙ্গী। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের চলচ্চিত্রে প্রথম প্লে-ব্যাক গায়ক হিসেবে কাজ করেন মেহেদী হাসান। ‘শিকার’ নামের সেই ছবিতে তাঁর গাওয়া প্রথম গানটি ছিল ‘নজর মিলতে হি দিল কি বাত কা চর্চা না হো যায়ে’। কবি ইয়াজদানি জলন্ধরী এই গানটি লিখেছিলেন এবং এতে সুর দিয়েছিলেন আসগর আলি. এম. হুসেন। এরপরে ১৯৬২ সালে উর্দুভাষী আরেকটি ছবিতে তাঁর গাওয়া ‘জিসনে মেরে দিল কো দর্দ দিয়া’ গানটি শ্রোতাদের দ্বারা খুবই প্রশংসিত হয়। ১৯৬৪ সালে ‘ফরঙ্গী’ ছবিতে তাঁর গাওয়া একটি গজল ‘গুলোঁ মে রঙ্গ ভরে, বাদ-এ নৌবাহার চলে’ তাঁকে উপমহাদেশের সঙ্গীত জগতে বিখ্যাত করে তোলে। বিখ্যাত পাকিস্তানি কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ এই গানটি লিখেছিলেন এবং এতে সুর দিয়েছিলেন রশিদ আত্রে। এরপর আর তাঁকে ফিরে তাকাতে হয়নি। এই গানটি এত জনপ্রিয় হয় যে, স্বয়ং কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ মুশায়েরাগুলিতে এই শায়েরটি পাঠ করা বন্ধ করে দেন এবং শ্রোতারা শুনতে উৎসাহী হলে তাঁদের মেহেদী হাসানের কন্ঠে গানটি শুনতে অনুরোধ করেন। মাঝেমধ্যে ফয়েজ আহমেদ মজার ছলে বলতেন তাঁর লেখা সেই গজলটি এখন আর তাঁর নিজের নেই, বরং জনপ্রিয় হবার পরে তা মেহেদী হাসানের হয়ে গেছে। তিন শতাধিক পাকিস্তানের চলচ্চিত্রে প্লে-ব্যাক গায়ক হিসেবে গান গেয়েছেন মেহেদী হাসান।

১৯৮৫ সালে বাংলাদেশে আয়োজিত সার্ক সম্মেলনে প্রথম মেহেদী হাসান উপস্থিত ছিলেন এবং গান পরিবেশন করেছিলেন। ঐ সফরে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনায় ‘জান্নাত দোজখ’ চলচ্চিত্রের জন্য একটি বাংলা গানও রেকর্ড করেছিলেন। শুধুই উর্দু গান নয়, বাংলা গানও তাঁর ব্যারিটোন কণ্ঠের জাদুতে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল। মাসুদ করিমের কথা এবং এ. হামিদের সুরে ‘তুমি আমার ভালোবাসা’, ‘সুখেরই স্বপ্ন কে ভেঙে দিল’ ইত্যাদি গানে মেহেদী হাসানের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়েছিলেন বাংলাদেশের দুই বিখ্যাত গায়িকা সাবিনা ইয়াসমিন ও রুনা লায়লা। এছাড়াও বাংলায় গাওয়া তাঁর অন্যতম বিখ্যাত গানগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ‘হারানো দিনের কথা’, ‘এত ভালো লাগে কেন’, ‘ঢাকো যত না নয়ন কথা’ ইত্যাদি। তাঁর কিছু উল্লেখযোগ্য অ্যালবামের মধ্যে রয়েছে – ‘ক্যাহনা উসে’, ‘ইন কনসার্ট’, ‘মাহফিল’, ‘খুলি জো আঙ্গ’, ‘নজরানা’, ‘লাইভ অ্যাট রয়েল অ্যালবার্ট হল’, ‘আন্দাজ-ই-মাস্তানা’, ‘শাম-ই-গজল’, ‘রিমেমবারিং মেহেদি হাসান’ ইত্যাদি। ২০১০ সালের অক্টোবর মাসে এইচএমভি থেকে তাঁর সর্বশেষ অ্যালবাম ‘সারহাঁদে’ প্রকাশ পায়। উর্দু, বাংলা, পাঞ্জাবি মিলিয়ে প্রায় কুড়ি হাজারেরও বেশি গান গেয়েছেন তিনি। ‘সারহাঁদে’ অ্যালবামে তাঁর এবং লতা মঙ্গেশকরের যৌথভাবে গাওয়া ‘তেরা মিলনা’ গানটি শ্রোতামহলে বিশেষ সমাদৃত হয়। এই গানটিতে ফারহাদ শাহজাদের কোথায় সুর দিয়েছিলেন মেহেদী হাসান স্বয়ং।    

পাকিস্তানের চলচ্চিত্রে প্লে-ব্যাক হিসেবে অসংখ্য গান গাওয়ার স্বীকৃতি হিসেবে বহুবার তিনি অর্জন করেছেন ‘নিগার অ্যাওয়ার্ড’। সংখ্যার হিসেবে ১৯৬৪ থেকে শুরু করে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত মোট দশটি নিগার অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছেন মেহেদী হাসান। এছাড়া ‘প্রাইড অফ পারফরম্যান্স’ (১৯৮৫) উপাধি এবং পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে ‘তঘমা-ই-ইমতিয়াজ’, (১৯৮৫) ‘নিশান-ই-ইমতিয়াজ’ (২০১২) ইত্যাদি পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন তিনি। ১৯৭৯ সালে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে মেহেদী হাসানকে ‘সায়গল অ্যাওয়ার্ড ইন জলন্ধর’ পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। ভারতীয় উপমহাদেশে গজল গায়ক হিসেবে সবথেকে বেশি পারিশ্রমিকভোগী শিল্পী ছিলেন মেহেদী হাসান। ১৯৮৩ সালে নেপাল সরকারও তাঁকে ‘গোর্খা দক্ষিণা বাহু’ উপাধিতে ভূষিত করে।

২০১২ সালের ১৩ জুন করাচির এক হাসপাতালে ৮৪ বছর বয়সে মেহেদী হাসানের মৃত্যু হয়। ২০১৮ সালের ১৮ জুলাই গুগল মেহেদী হাসানের ৯১তম জন্মদিন উপলক্ষে ডুডল নির্মাণ করে শ্রদ্ধা জানায়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading