সববাংলায়

মোৎসার্ট মৃত্যু রহস্য

বিভাগঃ ,

বিশ্ব সঙ্গীতের ইতিহাস নাড়াঘাঁটা করলে যেসব যুগান্তকারী সঙ্গীতসাধকের নাম উঠে আসে মোৎসার্টের মতো শিল্পী যে সেই তালিকায় নিঃসন্দেহে উপরদিকে অবস্থান করবেন, তা নিয়ে সংশয় নেই কোনো। ১৭৯১ সালের ৫ ডিসেম্বর মাত্র ৩৫ বছর বয়সে যখন আকস্মিকভাবে এই কিংবদন্তী সঙ্গীতজ্ঞের মৃত্যু হয় তখন তাকে কেন্দ্র করে নানা রহস্য ঘনীভূত হয়ে ওঠে। বিশ্ব জুড়ে তোলপাড় ফেলে দেয় মোৎসার্ট মৃত্যু রহস্য। মৃত্যুর প্রায় একসপ্তাহ পর সংবাদপত্রে লেখা হয়েছিল তাঁকে বিষপ্রয়োগ করে হত্যা করা হয়, যদিও এই তথ্যের অসত্যতা প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিল। এরপর বহু চিকিৎসক মোৎসার্টের মৃত্যুর কুলকিনারা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করে গেছেন। এসব তদন্ত থেকে উঠে আসা যক্ষ্মা, পারদের বিষক্রিয়া, সিফিলিস, বাতজ্বর, ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি, স্ট্রেপ সংক্রমন, গ্লোমেরুলোনফ্রাইটিসের কারনে কিডনির নিষ্ক্রিয়তা, ট্রাইচিনোসিস, শুকরের মাংস ভক্ষণের ফলে হওয়া জ্বর, ইত্যাদি নানান কারণ মোৎসার্টের মৃত্যুকে আরও রহস্যঘন করে তুলেছিল।  কিন্তু আজও এই বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পীর মৃত্যুর কারণ অস্পষ্টতার অন্তরালেই রয়ে গেছে।

মোৎসার্টের মৃত্যুর কারণ হিসেবে প্রাথমিকভাবে ‘জ্বর এবং ফুসকুড়ি’র কথা লেখা হয়েছিল রেকর্ডে। এই জ্বর এবং ফুসকুড়ি দেখে মোৎসার্টের ব্যক্তিগত চিকিৎসক টমাস ফ্রাঞ্জ ক্লোসেট মনে করেন, যে, মোৎসার্ট হিটজিগেস ফ্রিসেলফিবার বা তীব্র মিলারি জ্বরে মারা গেছেন। এই সিন্ড্রোমের উপসর্গগুলির মধ্যে প্রধান হল, ভীষণমাত্রায় জ্বর এবং ত্বকজুড়ে বাজরার বীজের মতো লাল ফুসকুড়ি।

মোৎসার্টের দেহাবসানের বহু বছর পর তাঁর মৃত্যুর প্রত্যক্ষদর্শীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন। মোৎসার্টের ভগ্নীপতি সোফি হাইবেল ৩৩ বছর পর স্মরণ করেছিলেন, যে, মৃত্যুর আগে, জল জমার ফলে তাঁর শরীর এতটাই ফুলে গিয়েছিল যে তিনি বিছানাতে পর্যন্ত যেতে পারতেন না। সেসময় মোৎসার্ট সারা শরীরে ব্যথার কথা, জ্বর এবং ফুসকুড়ির কথাও নাকি জানিয়েছিলেন। সোফি বলেন, মৃত্যুর আগের দিন অর্থাৎ ৪ ডিসেম্বর তিনি তাঁর রচিত রিকোয়েমের কিছু অংশ গাইবার জন্য নিজের বন্ধুদের আমন্ত্রণ জানান তাঁর বিছানার পাশে। জীবনের শেষদিনটিতে তাঁর শ্বাসকষ্ট হওয়ার কথা নয়, কারণ রিকোয়েমের কিছু অংশ গেয়েছিলেন একজন অস্ট্রিয়ান সুরকার ফ্রাঞ্জ সুসমায়ার। সোফি এও জানিয়েছিলেন যে, মৃত্যুর দুঘন্টা আগেও সচেতন ছিলেন মোৎসার্ট। শেষমেশ জ্ঞান হারিয়ে ৫ ডিসেম্বর অস্ট্রিয়ার ভিয়েনাতে নিজের বাড়িতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন এই মহান সঙ্গীতশিল্পী।

মোৎসার্ট মৃত্যু রহস্য কে ঘিরে যেসব তত্ত্ব, জল্পনা দানা বেঁধেছিল তারমধ্যে অন্যতম হল, হত্যার তত্ত্বটি। বার্লিনের সংবাদপত্রে মৃত্যুঘটনার এক সপ্তাহ পরে মোৎসার্টের মৃত্যু যে আসলে হত্যা, এমন সংবাদ ছাপা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে এই গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে, আন্তোনিও সালিয়েরি নামক ভিয়েনার একজন প্রতিভাবান সঙ্গীতজ্ঞ, যিনি মোৎসার্টের প্রতিভায়, সাফল্যে ঈর্ষান্বিত ছিলেন বলা যায়, মোৎজার্টকে বিষপ্রয়োগ করে হত্যা করেছিল৷ যদিও এই তত্ত্বের সত্যতা প্রমাণিত হয় না, কারণ মোৎসার্টের শরীরে বিষক্রিয়ার তেমন নিদর্শন মেলে না৷ আসলে মোৎসার্টের ছেলে কার্ল পরে স্মরণ করেছিলেন যে, মৃত্যুর সময় মোৎসার্টের শরীর ফোলা এবং নরম ছিল, যা সাধারণত বিষক্রিয়ার ফলে মৃত দেহের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। এছাড়াও মোৎসার্টের নিজের কারণেও এই হত্যার তত্ত্ব নিয়ে এত জলঘোলা হয়েছিল। কারণ, মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি তাঁর স্ত্রী কনস্টানজেকে বলেছিলেন, কেউ তাঁকে অ্যাকোয়া তোফানা নামক এক স্লো-অ্যাক্টিং আর্সেনিক বিষ দিয়েছে এবং তাঁর মৃত্যুর দিন গুনছে। এইসব কারণেই আরও বেশি মোৎসার্টের মৃত্যুকে আসলে হত্যা বলে মনে করেছিলেন অনেকেই। আবার পাশাপাশি মোৎসার্টের হত্যার তত্ত্বে হত্যাকারী হিসেবে ফ্রাঞ্জ হফডেমেল নামে অন্য আরেক ব্যক্তির নাম উঠে আসে। এই হফডেমেলের স্ত্রী ম্যাগডালেনা পিয়ানো অধ্যয়ন করতেন মোৎসার্টের সঙ্গে। তখন এক জল্পনা তৈরি হয় এই ম্যাগডালেনা এবং মোৎসার্টের অবৈধ সম্পর্ক নিয়ে, ফলে হফডেমেলকে হত্যাকারী হিসেবে মনে হওয়া স্বাভাবিক। যদিও প্রমাণের অভাবে গবেষকরা এই মৃত্যুকে হত্যাকান্ড বলে মানেননি।

মোৎসার্টের মৃত্যুর পর থেকেই তাঁর এই আকস্মিক দেহাবসানের কারণ নিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের চিকিৎসকেরা দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছেন৷ তাঁর মৃত্যুর পর প্যারিশ রেজিস্টারে মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হয়েছিল তীব্র মিলারি জ্বর। এই মোৎসার্ট সারাজীবনই প্রায়, গুটিবসন্ত , টনসিলাইটিস , ব্রঙ্কাইটিস , নিউমোনিয়া , টাইফয়েড জ্বর , বাত এবং মাড়ির রোগে ভুগেছিলেন। যদিও তাঁর মৃত্যুতে এগুলির কোনো ভূমিকা ছিল কিনা তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। ‘নিউরোলজি’তে ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে অনুমান করা হয় যে, মোৎসার্ট হয়তো-বা সাবডুরাল হেমাটোমায় মারা গিয়েছিলেন। এই সাবডুরাল হেমাটোমা মাথার খুলির অভ্যন্তরে চাপ বৃদ্ধির কারণ হতে পারে, যার ফলে সূক্ষ্ম মস্তিষ্কের টিস্যুর সংকোচন ও ক্ষতি হতে পারে। তীব্র সাবডুরাল হেমাটোমা প্রাণঘাতী হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ১৭৯০ ও ১৭৯১ সালে মোৎসার্টের দুর্বলতা, মাথাব্যথা, এবং অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার কারন হতে পারে এই সাবডুরাল হেমাটোমা।

আবার ২০০০ সালের একটি প্রকাশনায় ফেইথ টি. ফিটজগেরাল্ড, ফিলিপ এ. ম্যাকোউইক এবং একজন সঙ্গীতবিদ নিল জাসলা  ঐতিহাসিক প্রমাণ পর্যালোচনা করেন এবং মোৎসার্টের মৃত্যুর জন্য বাতজ্বরকে দায়ী করেন। ২০০১ সালে জান ভি হির্শম্যান আবার ট্রাইচিনোসিসকেই মৃত্যুর কারণ বলে মনে করেছিলেন। আরেকটি মতানুযায়ী, মোৎসার্ট হাইপোকন্ড্রিয়াসিস এবং অ্যান্টিমনিযুক্ত পেটেন্ট ওষুধ গ্রহণের প্রবণতার ফলে মারা গিয়েছিলেন।

এতরকম অনুমানের পরে মহামারী সংক্রান্ত একটি তত্ত্ব মোৎসার্ট মৃত্যুরহস্যকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল৷ যুক্তরাজ্যের একটি মেডিকেল জার্নালে ২০০৬ সালের একটি নিবন্ধে তাঁর কয়েকটি চিঠির ওপর ভিত্তি করে, সিফিলিস এবং অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী রোগকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে মানেনি, খারিজ করে দিয়েছে।

প্রাথমিকভাবে তাঁর মৃত্যুর রিপোর্টে যে জ্বর এবং লাল ফুসকুড়ির কথা লেখা হয়েছিল, সেই রোগটি সেসময় স্থানীয় বহু বাসিন্দাকে আক্রমণ করেছিল, সকলের লক্ষণ ছিল প্রায় সমান, কখনও কখনও এই রোগ মারাত্মক রূপও ধারণ করত। সেই কারণে উক্ত নিবন্ধের উপসংহারে এই সংক্রামক অসুস্থতাকেই মোৎজার্টের মৃত্যুর জন্য দায়ী করা হয়। ২০০৯ সালে ব্রিটিশ, ভিয়েনিজ এবং ডাচ গবেষকরা মোৎসার্টের মৃত্যুর সময় ভিয়েনায় ঘটে যাওয়া অন্যান্য মৃত্যুর কারণগুলির অধ্যয়নের মাধ্যমে একত্রে মহামারী সম্ভাবনার উল্লেখ করেন। এখানে উল্লেখ্য যে, মোৎসার্টের মৃত্যুর সময়, ১৭৯১-৯২ সালের মধ্যে শীতকালে ভিয়েনায় অল্পবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে শোথ বা শরীর ফুলে গিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি ছিল, যা এক মহামারীরই সংকেত দেয়। সেই গবেষণার সিদ্ধান্তে তাঁরা জানিয়েছিলেন যে, হয়তো স্ট্রেপ্টোকক্কাল সংক্রমণের কারণেই, (যার ফল ছিল গ্লোমেরুলোনফ্রাইটিস নামে কিডনির ব্যর্থতাজনিত রোগ) মোৎসার্টের মৃত্যু হয়েছিল।

১৭৯১ সালের অগাস্ট মাসে মোৎসার্ট তাঁর নতুন অপেরা ‘লা ক্লেমেনজা ডি টিটো’-এর পারফরম্যান্স তত্ত্বাবধান করতে প্রাগে আসেন যখন তখন আগে থেকেই বেশ অসুস্থ ছিলেন তিনি। মোৎসার্ট সেপ্টেম্বরে প্রাগ থেকে ভিয়েনায় ফিরে আসেন এবং ৩০ সেপ্টেম্বর তাঁর ‘দ্য ম্যাজিক ফ্লুট’-এর স্কোর সম্পূর্ণ করে সেটির প্রিমিয়ার পরিচালনা করেন। এছাড়াও তিনি অস্ট্রিয়ার বাডেন পরিদর্শনে গিয়েছিলেন, সেখানে রিকোয়েম রচনা করা শুরু করেছিলেন। সেখানে অবশ্য তাঁর শরীর যথেষ্ট সবল এবং সুস্থ ছিল। ভিয়েনায় ফেরার পর ক্রমে খুবই অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকেন মোৎসার্ট। এরপর ২০ নভেম্বর শরীর ফুলে যায় তাঁর, প্রচন্ড ব্যথা ও বমিতে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন তিনি। একজন সবল সুস্থ মানুষের আকস্মিকভাবে রোগে জর্জরিত হয়ে পড়ার ঘটনাটিও বেশ রহস্যজনকই বটে।

‘দ্য অ্যানালস অব ইন্টারনাল মেডিসিন’-এর ১৮ অগাস্ট সংখ্যায় গবেষকরাও মহামারী সংক্রান্ত বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে, মোৎসার্ট স্ট্রেপ্টোকোকাল সংক্রমণের শিকার ছিলেন, যা তাঁর মৃত্যুর কারণও হতে পারে। এমনই কিছু অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে মোৎসার্ট মৃত্যু রহস্য । আজও এত পুঙ্খানুপুঙ্খ গবেষণার পরও কিংবদন্তী মহান এই সঙ্গীতশিল্পী মোৎসার্টের মৃত্যুর কারণ অস্পষ্টতার অন্ধকারেই রয়ে গেছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading