ইতিহাস

নচিকেতা চক্রবর্তী

নচিকেতা চক্রবর্তী (Nachiketa Chakraborty) একজন ভারতীয় বাঙালি গায়ক,  সুরকার ও গীতিকার। তিনি আধুনিক বাংলা গানের জীবনমুখী ধারার এক অগ্রগণ্য শিল্পী। ১৯৯৩ সালে ‘এই বেশ ভাল আছি’ অ্যালবাম প্রকাশের পর তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। নিজের গান ছাড়াও তিনি বহু বাংলা সিনেমার গানও রচনা করেছেন এবং সুরারোপ করেছেন।

১৯৬৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর কলকাতার মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটের বাড়িতে নচিকেতার জন্ম হয়। তাঁর পৈতৃক বাড়ি বাংলাদেশের বরিশালের পিরোজপুর জেলাতে। পড়াশোনা করেছেন উত্তর কলকাতার শ্যামবাজারে অবস্থিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র কলেজে। কলেজে পড়ার সময় থেকেই গান লেখা ও নিজস্ব ভঙ্গিতে গানের চর্চা শুরু করেন। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম অ্যালবাম ‘এই বেশ ভালো আছি’। প্রথম প্রকাশেই এই অ্যালবাম প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। বাংলা জীবনমুখী গানের জগতে তিনি নচিকেতা নামে পরিচিত হন। এরপর তাঁর একের পর এক গান জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে এবং তিনি সফল গায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। নিজের লেখা গানের মধ্যে তাঁর সবথেকে প্রিয় গান ‘নীলাঞ্জনা’। 

সঙ্গীতের জগতে ছাড়াও সাহিত্যের জগতেও তিনি সফল। জ্যাক লন্ডন-এর লেখা তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে। এ ছাড়া মহাভারতের কৃষ্ণ চরিত্রও তাঁকে প্রভাবিত করে। তিনি বেশ কিছু গল্প লিখেছেন। এছাড়াও ‘জন্মদিনের রাত’ ও ‘ক্যাকটাস’ নামক দুটি উপন্যাস রচনা করেছেন। নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি ও শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, হুমায়ূন আহমেদ তাঁর প্রিয় লেখকদের তালিকায় অন্যতম। সুনীল চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, রুনা লায়লা, বব ডিলান ও মাইকেল জ্যাকসনের গান তাঁর প্রিয়।

১৯৯৩ সালে তাঁর প্রথম অ্যালবাম ‘এই বেশ ভালো আছি’ মুক্তি পায়। প্রথম পর্যায়ে তিনি তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও ধীরে ধীরে তিনি সব বয়সের শ্রোতাদের স্পর্শ করেছেন। তিনি সচেতনভাবেই তাঁর গানে চলিত ভাষাকে ব্যবহার করেছেন। তিনি তাঁর জীবনমুখী গানের মাধ্যমে নব্বইয়ের দশকের বাংলা সঙ্গীতের জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। তবে বাংলা গানের ক্ষেত্রে প্রথম জীবনমুখী গানের সূচনা হয় কবীর সুমনের মাধ্যমে। কবীর সুমন (সুমন চট্টোপাধ্যায়) এবং নচিকেতা বাংলা গানের প্রাচীন ধারণাকে পরিবর্তন করে নতুন ধারার সূচনা করেন। নিজের সঙ্গীত চর্চা বিষয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমার বাড়িতে সংগীতচর্চার জন্য আলাদা কোনো রুম নেই। পাড়ার রকে বসেই অনেক গান রচিত হয়েছে। পাড়ায় পালা করে আমরা নাইট ডিউটি দিতাম। বিখ্যাত হওয়ার পর এখনও তেমনই আছি।’

শুধুমাত্র গানের ধরন নয় তাঁর সাজ পোশাকও ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের।  দীর্ঘদিনের না ছাঁটা চুল, মুখ ভর্তি দাড়ি, ছিপছিপে গড়ন, আশ্চর্য তীক্ষ্ণ চোখ আর পরনে ঢিলেঢালা শার্ট আর স্কিন টাইট জিন্স। সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের এই প্রকাশ সহজেই তরুণ প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। অন্যায় অবিচার, শাসনের নামে শোষণের বিরুদ্ধে, খেটে খাওয়া, বঞ্চিত জনতার কথা ফুটে উঠেছে তাঁর গানের কথায়। বেকার যুবকের হতাশা ও তাদের স্বপ্ন এবং বাস্তবতার কাঠিন্য তাঁর গানে এনে দিয়েছিল নতুন ভাবনা ও ভাষা। তাঁর কয়েকটি বিখ্যাত গান হল-‘অন্তবিহীন পথ চলাই জীবন’, ‘এই বেশ ভাল আছি’, ‘যখন সময় থমকে দাঁড়ায়’, ‘নীলাঞ্জনা’, ‘এ মন ব্যাকুল যখন তখন’, ‘ইটস এ গেম’, ‘এক বোকা বুড়োর গল্প শোন’, ‘এরই নাম হল বেঁচে থাকা’ ইত্যাদি।

এছাড়াও তিনি হিন্দি ও অন্যান্য ভাষায়ও বেশ কয়েকটি গান গেয়েছেন। একক অ্যালবাম ছাড়াও তিনি যৌথ অ্যালবাম এবং সিনেমার গান গেয়েছেন এবং জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। এই ধরনের চলচ্চিত্রের বা সিনেমার গানের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় ‘হঠাৎ বৃষ্টি’  ছায়াছবির কথা। ১৯৯৮ সালে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হয়েছিল চলচ্চিত্রটি। এই ছবিটিতে তিনি সংগীত পরিচালক হিসেবে এবং সংগীত শিল্পী হিসেবে কাজ করেছিলেন। এই ছবির প্রতিটি গানই বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। এছাড়াও বেশ কয়েকটি ছবিতে অভিনেতা হিসেবেও কাজ করেছেন। যেমন- ‘কাটাকুটি’, ‘খেলাঘর’, ‘এই বেশ ভালো আছি’, ‘কে যায়’ ও ‘কুয়াশা যখন’ ইত্যাদি। বিশাল ভরদ্বাজ পরিচালিত ‘ওমকারা’ ও বলিউডের বেশ কিছু চলচ্চিত্রে নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে যোগদান করেছেন নচিকেতা। তাঁর এককভাবে সম্পাদিত অ্যালবামগুলি হল- ‘এই বেশ ভালো আছি’ (১৯৯৩), ‘কে যায়?’ (১৯৯৪), ‘কি হবে?’ (১৯৯৫)
‘চল যাবো তোকে নিয়ে’ (১৯৯৬)’কুয়াশা যখন’ (১৯৯৭), ‘আমি পারি’ (১৯৯৮), ‘দলছুট’ (১৯৯৯), ‘দায়ভার’ (২০০০), ‘একলা চলতে হয়’ (২০০২) ‘এই আগুনে হাত রাখো’ (২০০৪), ‘আমার কথা’, ‘আমার গান’ (২০০৫)’তির্যক’ (২০০৭), ‘এবার নীলাঞ্জন’ (২০০৮), ‘হাওয়া বদল’ (২০১০) ‘সব কথা বলতে নেই’ (২০১২), ‘দৃষ্টিকোন’ (২০১৪), ‘আয় ডেকে যায়’ (২০১৫)।

সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন- ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ (১৯৯৮), ‘সমুদ্র সাক্ষী’ (২০০৪), ‘হোম – দ্য ইউনিটি’ (অপ্রকাশিত) (২০০৯), ‘গো ফর গোল’ (২০০৯), ‘কাটাকুটি’ ( ২০১২) ইত্যাদি চলচ্চিত্রে।‌ এছাড়াও ‘তুমি আসবে বলে’ (২০১৪) এবং ‘স্বপ্ন দেখে মন’ (২০১৭) টিভি সিরিয়ালে সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন।

নেপথ্য গায়ক হিসেবে গান গেয়েছেন
‘হঠাৎ বৃষ্টি’ (১৯৯৮), ‘খেলাঘর’ (১৯৯৯), ‘The BONG CONNECTION’ (২০০৬), ‘খেলা’ (২০০৮), ‘MADLY বাঙালি’ (২০০৯) ‘পোস্ত’ (২০১৭), ‘জ্যাকপট’ (২০০৯), ‘জুলফিকার’ (২০১৬), ‘মিশন চায়না’ (২০১৭), ‘মহানায়িকা’ (২০১৬), ‘Netaji Subhas Chandra Bose: The Forgotten Hero’ (২০০৫) ইত্যাদি চলচ্চিত্রে।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি স্ত্রী রুমকির সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। তাঁদের কন্যার নাম ধানসিঁড়ি।

২০২০ সালে করোনা ভাইরাস অতিমারীরূপে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। এই দুঃসময়ে নচিকেতা করোনা নিয়ে কবিতা লিখেছেন। কবিতার শিরোনাম দিয়েছেন ‘করোনা’। নিজের ফেসবুক পেজে কবিতাটি আবৃত্তি করেছেন তিনি। নচিকেতার এই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। ফেসবুকে এটি দেখা হয়েছে ১৬ লাখের বেশিবার। শেয়ার হয়েছে ৫১ হাজারের বেশি। আর ২০ ঘণ্টায় লাইক পড়েছে ৩৮ হাজার, মন্তব্য লেখা হয়েছে ২ হাজারের বেশি।

নীলাঞ্জনাকে নিয়ে চারটি গান আছে নচিকেতার। একটি গল্পের মতই রচিত হয়েছে এই গানগুলি। গানগুলিকে সিনেমার উপযোগী করে ছবি পরিচালনা করার পরিকল্পনা করেছেন নচিকেতা। ‘সে প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা’ গানের লাইন দিয়েই ছবির নাম হবে। চিত্রনাট্য লেখার কাজ করছেন অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়। এই ছবিতে নীলাঞ্জনার কন্ঠে গান গাইবেন নচিকেতা-কন্যা ধানসিঁড়ি।

একটি সাক্ষাৎকারে, ‘একজন শিল্পীর সব চেয়ে বড় সম্পদ কী?’ এ কথার উত্তর দিতে গিয়ে নচিকেতা বলেছেন, ‘বিশ্বাস। শিল্পী নিজে যা করছেন তার প্রতি বিশ্বাস থাকাটা খুব জরুরি। এটাই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখে।’

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।