জাতীয় আইন সেবা প্রাধিকরণ বনাম ভারত সরকার মামলা

জাতীয় আইন সেবা প্রাধিকরণ বনাম ভারত সরকার মামলা

পুরুষ এবং স্ত্রী ব্যতীত অন্য লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষকে কয়েকদিন আগে পর্যন্তও ভারতে অপমান, হেনস্থা ও অসম্মানের শিকার হতে হত। বিশেষত তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের দেশের নাগরিক বলেই মনে করা হত না, তাঁদের কোনও ভোটাধিকার ছিল না, ছিল না মৌলিক অধিকার আদায়ের স্বাধীনতা। সম্প্রতি তৃতীয় লিঙ্গ এবং রূপান্তরকামীদের জন্য মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে ভারত সরকার। তাঁদের আইনি সুরক্ষা, নিরাপত্তার ভার নিয়েছে রাষ্ট্র এবং যে কোনও মানুষকে ভারত আইনি নির্দেশবলে স্বাধীনতা দিয়েছে নিজের লিঙ্গ পরিচয় নিজে নির্ধারণ করার। জৈবিকভাবে পুরুষ অথবা মহিলা ছাড়াও অন্য যে কোনও লিঙ্গ পরিচয়কে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাদের মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। যে যুগান্তকারী মামলার রায়ের ফলাফল এই সাফল্য তার নাম জাতীয় আইন সেবা প্রাধিকরণ বনাম ভারত সরকার মামলা (National Legal Services Authority v. Union of India)।

২০১২ সালে ভারতের জাতীয় আইন সেবা প্রাধিকরণ পুরুষ ও নারীর লিঙ্গ পরিচয়ের বাইরে বৃহন্নলাদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য সুপ্রিম কোর্টে এই মামলা দায়ের করে। এই মামলার বিচারপতি ছিলেন কে এস রাধাকৃষ্ণান এবং এ কে সিক্রি। এছাড়াও এই মামলার অন্যান্য বাদীপক্ষের মধ্যে ছিল স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘পূজ্যমাতা নাসিব কৌর জি ওমেন ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’ এবং সহায়তা করেছিলেন বৃহন্নলা সম্প্রদায়ের কল্যাণে সক্রিয় কর্মী লক্ষ্মীনারায়ণ ত্রিপাঠী। ২০১৩ সালে শুরু হয় জাতীয় আইন সেবা প্রাধিকরণ বনাম ভারত সরকার মামলা এবং ২০১৪ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করে।  

ভারতের সনাতন সমাজ তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের ‘হিজড়ে’ হিসেবেই পরিচয় দিয়েছে এবং তাদের যন্ত্রণা, বেদনা, মানসিক অনুভূতির ধার ধারে না সমাজ। তাদের জৈবিক লিঙ্গ পরিচয়ের সঙ্গে যে তাদের মন ও শরীরের সঙ্গতি নেই, তা বুঝতে চায় না কেউই। রেল স্টেশনে, বাস স্ট্যান্ডে, স্কুলে, কর্মক্ষেত্রে, বাজারে এমনকি হাসপাতালেও তাদেরকে সমাজ একপ্রকার অস্পৃশ্য করে রেখেছে। পুরুষ এবং মহিলা এই দ্বৈত পরিচয়ের বাইরে অন্য যা কিছু তাদের এখনও ভারতীয় সমাজ মেনে নিতে পারেনি। ভারতের রূপান্তরকামী সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টের কাছে নিজেদের লিঙ্গ পরিচয়ের একটি আইনি স্বীকৃতি দাবি করা হয়, কারণ তারা ভারতের নাগরিক হয়েও আইনি স্বীকৃতি পায়নি এতদিন যা কিনা ভারতীয় সংবিধানের ১৪ ও ২১ নং ধারাকে লঙ্ঘন করে। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ হিসেবে লক্ষ্মীনারায়ণ ত্রিপাঠী তার নিজের অভিজ্ঞতার কথা আদালতের কাছে তুলে ধরেন এই মামলায়। তিনি বলেন যে, তিনি নিজে একজন পুরুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মধ্যে নারীর স্বভাব দেখা যায় এবং তার বয়সের অন্যান্য ছেলেদের থেকে তিনি ভিন্ন হয়ে পড়তে থাকেন। এর ফলে তার এই মেয়েলি স্বভাবের কারণে অনেক অল্প বয়সেই ঘরের মধ্যে এবং ঘরের বাইরেও নানা সময় যৌন হয়রানি, নির্যাতন ও শ্লীলতাহানির সম্মুখীন হতে হয়েছে তাঁকে। সমাজে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ একা, নিজের মনের কথা ভাগ করে নেওয়ার মত কেউ ছিল না তাঁর। প্রায় সময়ই তাঁকে ছক্কা, হিজড়া ইত্যাদি বলে অপমান করা হত রাস্তায়। কৈশোরের পরে সমাজে তিনি মেয়েদের মতোই পোশাক পরতে শুরু করেন এবং পরে মুম্বাইয়ের হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হলে সেখানেই তিনি স্বস্তি খুঁজে পান। তিনি অচিরেই বুঝতে পারেন যে রূপান্তরকামী বা তথাকথিত ‘হিজড়া’দের কোনও আইনি পরিচয়ের স্বীকৃতি না থাকার কারণেই সমাজে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে বহু মৌলিক অধিকার থেকে তাঁরা বঞ্চিত হন। অন্য এক রূপান্তরকামী শচীনও তাঁর সপক্ষে আদালতকে জানান যে তিনিও মনে করতেন তিনি নিজে একজন নারী এবং বহু দিন ধরেই বাড়িতে মাকে গৃহস্থালির সব কাজে সাহায্য করতেন তিনি। এর জন্যেও তাঁকে সমাজে নানা কুকথা শুনতে হয়েছে। এমনকি আত্মহত্যার চিন্তাও তাঁর মনে এসেছে।

এই তৃতীয় লিঙ্গ বা রূপান্তরকামী শব্দটি এমন ব্যক্তিদেরকে বর্ণনা করার জন্য ব্যবহৃত হয় যাদের লিঙ্গ পরিচয় বা আচরণ জৈবিক লিঙ্গ পরিচয়ের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ নয়। এমনকি নপুংসক ব্যক্তিদেরও এই নামের অধীনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকে। হিজড়া বা বৃহন্নলারা শারীরবৃত্তীয়ভাবে বা মানসিকভাবে পুরুষ নয়, এমনকি নারীর মত ঋতুস্রাব হয় না তাঁদের কিংবা নারীর জৈবিক প্রজননতন্ত্র তাঁদের মধ্যে অনুপস্থিত হওয়ায় তাঁরা জৈবিকভাবে নারীও নয়। তাই পুরুষ কিংবা নারী কারও মতোই প্রজননক্ষমতা না থাকায় তাঁদের তৃতীয় লিঙ্গ বলা যুক্তিযুক্ত। আবার এই বৃহন্নলাদের মধ্যেও কয়েকজন পুরুষ আছেন যারা পুং-জননাঙ্গ ছেদ করেছেন। অন্যদিকে রূপান্তরকামী বলতে বোঝানো হয় যারা লিঙ্গ-পুনর্গঠন চিকিৎসার (Sex Reassignment Surgery) সাহায্যে নিজেদের জৈবিক পরিচয়ের বাইরে বলপূর্বক পুরুষ কিংবা নারীতে রূপান্তরিত করেন নিজেদের। এই মামলার বিচারকালে সুপ্রিম কোর্ট এই তৃতীয় লিঙ্গ ও রূপান্তরকামীদের ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক অস্তিত্বের আলোচনাও করেছেন যেখানে রামায়ণ, মহাভারত এবং বিভিন্ন জৈন সাহিত্যে তাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালে ‘ক্রিমিন্যাল ট্রাইবস অ্যাক্ট, ১৮৭১’ নামে একটি আইন পাশ করা হয় যার অধীনে সকল রূপান্তরকামী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের স্বভাবতই অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়। এমনকি তাঁদের কোনও রকম ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেপ্তার করা যেত এবং শাস্তি হিসেবে দুই বছরের কারাবাস ভোগ করতে হত তাঁদের। পরে যদিও এই আইন ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ে স্বাধীন ভারতে। ভারতের রূপান্তরকামী সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্ট একটি অভিযোগপত্র জমা নিয়েছে এই মর্মে যে দেশের নাগরিকের দ্বৈত-লিঙ্গ পরিচয়ের বাইরে অন্য কোনও লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশের অধিকার দিতে হবে যা কিনা নাগরিকের মৌলিক অধিকার তথা মত প্রকাশের স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধেই দেশের সরকার তৃতীয় লিঙ্গের পরিচয়কে আইনি স্বীকৃতি দিতে তৎপর হয়। এর মাধ্যমেই ভারত সরকার এই তৃতীয় লিঙ্গ সংক্রান্ত সকল প্রকার সামাজিক কলঙ্ক দূর করা, রূপান্তরকামীদের স্বাস্থ্য-সুরক্ষা সম্পর্কে কর্মসূচি চালু করা এবং তাদের সমানাধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার কাজে অগ্রণী হয়েছে। এই মামলার রায় ঘোষণার আগে দেশের সুপ্রিম কোর্ট ভারত ব্যতীত ইউনাইটেড কিংডম, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রূপান্তরকামীদের কীরূপ অধিকার দেওয়া হয়, তা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছে। ভারত সরকার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কনভেনশনের নীতিগুলি বিচারপূর্বক এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে ভারতে রূপান্তরকামী সম্প্রদায়ের সদস্যদের অধিকার রক্ষার জন্য আইনের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। ভারতীয় সংবিধানের ১৪ নং ধারায় বলা হয়েছে যে ভারতের ভূখণ্ডের মধ্যে যে কোনও রাজ্যের সকল নাগরিককে আইন সমান সুরক্ষা দেবে। ফলে দেশের অন্য নাগরিকরা যে যে সুবিধা ও স্বাধীনতা পেয়ে থাকে, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদেরও একই সুবিধা ও স্বাধীনতা দিতে হবে। কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য-পরিষেবা কিংবা শিক্ষা সবক্ষেত্রেই তাদের সমান নাগরিক অধিকার বজায় রাখতে হবে বলেই মনে করে সুপ্রিম কোর্ট।     

জাতীয় আইন সেবা প্রাধিকরণ বনাম ভারত সরকার মামলা সমাপ্ত হয় ২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে। আদালত সমস্ত রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেয় এর পর থেকে বাধ্যতামূলকভাবে পুরুষ, নারী অথবা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ সকলের লিঙ্গ পরিচয়কে আইনি স্বীকৃতি দিতে হবে। এছাড়াও, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের মৌলিক অধিকারকে স্বীকৃতি দেয় আদালত। বিবাহ, দত্তক গ্রহণ কিংবা বিবাহ-বিচ্ছেদের মত দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় আইনে বৈষম্য ছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। রূপান্তরকামীদের ক্ষেত্রে তাঁদের জৈবিক লিঙ্গ পরীক্ষার বদলে মানসিক দিক থেকে তাঁরা কোন লিঙ্গ পরিচয়ে স্বচ্ছন্দ সেদিকটা ভেবে দেখার সিদ্ধান্ত নেয় সুপ্রিম কোর্ট এবং লিঙ্গ পরিবর্তনের শর্ত হিসেবে সেক্স রি-অ্যাসাইনমেন্ট সার্জারির উপর জোর দেওয়াকে বে-আইনি ঘোষণা করে আদালত। সমস্ত রাজ্য সরকারি হাসপাতালগুলিতে যাতে চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই ধরনের নাগরিককে কোনও সমস্যা বা বৈষম্যের শিকার না হতে হয়, তার ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেয় আদালত। তাছাড়া সামাজিক স্তরে তাদের নিয়ে অপমান-অসম্মানজনক পরিবেশ দূর করা, তাদের কর্মসংস্থান ও শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার কথাও বলেছে সুপ্রিম কোর্ট।

আপনার মতামত জানান