ইতিহাস

নিয়েলস হেনরিক আবেল

নিয়েলস হেনরিক আবেল (Niels Henrik Abel) হলেন নরওয়ের একজন গণিতবিদ। আধুনিক গণিতশাস্ত্রের বিভিন্ন শাখার উন্নয়নের পিছনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। স্বল্পায়ু এই গণিতবিদের কর্মজীবনের মাত্র ছয় সাত বছরের আবিষ্কার বিশ্বের গণিতবিদ্যার এক অমূল্য ভান্ডার স্বরূপ হয়ে আছে। আবেলের সম্মানার্থে প্রত্যেক বছর নরওয়ে সরকারের পক্ষ থেকে গণিত বিভাগে অসামান্য পারদর্শিতার জন্য নোবেল প্রাইজের সমতুল “আবেল প্রাইজ দেওয়া হয়।

নিয়েলস হেনরিক আবেল ১৮০২ সালের ৫ আগস্ট নরওয়ের স্টেভানজারের নিকটবর্তী ফিনোয় দ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন। সোরেন জিয়র্গ আবেল এবং এনি ম্যারি সিমোনসেন এর পাঁচ সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন আবেল। আবেলের ভাই বোনদের নাম হল- হ্যান্স ম্যাথিয়াস, থমাস হ্যামন্ড, পেডের মান্ডরূপ টুক্সেন এবং এলিজাবেথ মাগডালেন। আবেলের বাবা একজন দরিদ্র লুথেরান মন্ত্রী ছিলেন যাঁর দর্শন ও ধর্মতত্ত্বে অগাধ পান্ডিত্য ছিল। নরওয়ের রাজনৈতিক স্বাধীনতার পিছনে তাঁর যথেষ্ট অবদান ছিল। ১৮১৪ সালে যখন নরওয়ের নতুন সংবিধান লেখা হয় তখন সেই কমিটিতে আবেলের বাবা যুক্ত ছিলেন। কিন্তু সহকর্মীদের বিরুদ্ধে কিছু মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার জন্য তাঁর রাজনৈতিক জীবন শেষ হয়ে যায়। হেনরিকে আবেলের জন্মের অব্যবহিত পরেই আবেলের বাবা দক্ষিন পশ্চিম নরওয়ের একটি শহর রাইসরে সপরিবারে স্থানান্তরিত হন। এনি ম্যারির মা রাইসরের সবচেয়ে ধনী ব্যবসাদার ছিলেন। অনেকগুলি বাণিজ্য জাহাজের মালিক ছিলেন তিনি। খুব উচ্চবিত্ত পরিবারের জন্ম ও দুই সৎমার কাছে বেড়ে ওঠার জন্য এনি অল্প বয়স থেকেই উৎশৃঙ্খল এবং মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। বিবাহের পরেও তাঁর এই স্বভাব থেকে যায়। সন্তানদের ঠিকমত প্রতিপালনের কোন সদিচ্ছাই তাঁর ছিল না। হেনরিক আবেল ও তাঁর ভাইবোনেরা বাবার কাছে হস্তলিখিত পুঁথির মাধ্যমে প্রাথমিক পড়াশুনা শুরু করেন ১৮১৫ সালে অসলোর ক্যাথিড্রাল স্কুলে আবেল ভর্তি হন। ১৮১৭ সালে তাঁর গণিতের অসামান্য প্রতিভা প্রথমে নজরে আসে ক্যাথিড্রাল স্কুলের গণিতের নতুন শিক্ষক বার্ন্ট মাইকেল হলোম্বোর। তিনি গণিতশাস্ত্রের বিভিন্ন বই আবেলকে পড়তে এবং নানা ধরনের গণিতের সমাধান করতে দেন।

গবেষণার প্রয়োজনে আবেল দেশ বিদেশের গণিতজ্ঞদের রচনাগুলি একের পর এক মনোযোগ সহকারে পড়তে থাকেন। এদের মধ্যে রয়েছেন সপ্তদশ শতকের ইংরাজ পন্ডিত স্যার আইজ্যাক নিউটন, অষ্টাদশ শতকের জার্মান গণিতবিদ লিওনহার্ড ইউলার, ফ্রেঞ্চম্যান জোসেফ লুইস ল্যাগরেঞ্জ এবং জার্মান নাগরিক কার্ল ফ্রাইডরিচ গাউস।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


আবেলের বাবা ১৮২০ সালে মারা গেলে আবেলের পরিবার চরম দারিদ্রের সম্মুখীন হয়। এইসময় ছাত্র দরদী শিক্ষক হলোম্ব তাঁর মেধাবী ছাত্রের পাশে এসে দাঁড়ান। তাঁরই অর্থানুকূল্যে আবেল ১৮২১ সালে অসলোতে অবস্থিত খ্রীষ্টিয়ানা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন।১৮২২ সালে আবেল ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক ডিগ্ৰী হন। ১৮২২ সাল থেকে হলোম্বুর আর্থিক সাহায্য ব্যাতিরেকে স্বাধীনভাবে তিনি পড়াশুনা চালিয়ে যেতে থাকেন। ১৮২৩ সালে তিনি প্রথম তাঁর গবেষণা পত্র প্রকাশ করেন। তিনিই প্রথম ইন্টিগ্রাল ইকুয়েশনের সূত্র আবিষ্কার করেন এবং তার সমাধানও করে দেখান। তাঁর বন্ধুরা নরওয়ে সরকারের কাছে আবেদন রাখে যাতে তিনি জার্মানি ও ফ্রান্সে উচ্চ শিক্ষার জন্য স্কলারশিপ পান। এই সময়” ফিফথ ডিগ্ৰী” সমন্বিত জেনারেল ইকুয়েশনের বীজগণিতের নিয়মে যে সমাধান করা যে সম্ভব নয় তা প্রমান করেছিলেন। সরকারি স্কলারশিপ মনজুর হওয়ার পূর্বে নিজের খরচাতে তিনি তা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি আশাবাদী ছিলেন এই আবিষ্কার তাঁকে স্বীকৃতি দেবে। আবেল তাঁর আবিষ্কারের পুস্তিকাটি গাউসকে পাঠান। কিন্তু উপযুক্ত ও পর্যাপ্ত তথ্য প্রদানের অভাবে গাউস তাঁর এই আবিষ্কারকে প্রত্যাখ্যাণ করেন। ১৮২৫সাল থেকে ১৮২৬ সাল তিনি নরওয়ের বন্ধুদের সাথে বার্লিনে কাটান। এইসময় তাঁর সাথে পরিচয় হয় অগাস্ট লিওপোল্ড ক্রিলের। পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার অগাস্ট লিওপোল্ড ক্রিল গণিতের প্রতি খুব আগ্রহী ছিলেন। তাই স্বল্প সময়ের মধ্যেই আবেল এবং ক্রিলের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব হয়ে যায়। আবেলের অনুপ্রেরণায় ক্রিল গণিত বিষয়ক একটি জার্নাল বের করেন। এর নাম ছিল ” জার্নাল ফর পিওর এন্ড অ্যাপ্লায়েড ম্যাথমেটিক্স”।” ক্রিল’স জার্নাল” নামেই এটি অধিক পরিচিত হয়। ১৮৬৬ সালে জার্নালের প্রথম খন্ডটি প্রকাশিত হয়। এই খন্ডে আবেলের “কুইনটিক ইকুয়েশন”(Quintic Equation) সংক্রান্ত কাজটি বিস্তারিত ভাবে প্রকাশিত হয়।অন্যান্য প্রকাশিত বিষয় গুলির মধ্যে ছিল ইকুয়েশন থিওরি, ক্যালকুলাস এবং তাত্ত্বিক বলবিদ্যা(থিওরিটিক্যাল মেকানিক্স)। পরবর্তী খন্ডগুলিতে আবেলের এলিপ্টিক ফাঙ্কশন(Elliptic Function) থিওরিটি প্রকাশিত হয়। এটি ত্রিকোনমিতির ফাঙ্কশনকে সাধারণ ভাবে বুঝতে সাহায্য করে।

১৮২৬ সালে আবেল প্যারিসে যান। এখানে “আলজেব্রিক ফাঙ্কশনের”, “থিওরি অফ ইন্টেগ্রালস”ওপর তাঁর গবেষণা শেষ করেন। ওয়ার্ল্ড সেন্টার ফর মাথেমেটিক্সের পক্ষ থেকে তাঁকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গণিতবিদ আখ্যা দেওয়া হয়। আবেলের এই গবেষণার ফলাফল আবেলের উপপাদ্য(Abel’s Theorem) হিসাবে পরিচিত হয়।এই উপপাদ্যটি আবেলের পরবর্তী থিওরিগুলি যেমন আবেলিয়ান ইন্টিগ্রাল, আবেলিয়ান ফাঙ্কশন, এলিপ্টিকাল ফাঙ্কশন থিওরি সহ বিভিন্ন থিওরি বুঝতে সাহায্য করে। প্যারিস যাওয়ার উদ্যেশ্য সফল হয় নি। প্যারিসে তিনি কোন চাকরি পেলেন না। শুধু তাই নয় ফ্রেঞ্চ একাডেমী অফ সায়েন্সে তিনি তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা ও গবেষণা সংক্রান্ত যে বৃত্তান্ত জমা করেছিলেন তা দুর্ভাগ্যবশত হারিয়ে যায়।

বিফল মনোরথ আবেল জন্মভূমি নরওয়েতে ফিরে আসেন। ঋণে জর্জরিত আবেল যক্ষায় আক্রান্ত হলেন। কোনরকমে ছাত্র পড়িয়ে কষ্টের মধ্যে দিয়ে দিন গুজরান করছিলেন। ক্রিস্টিয়ানিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে সামান্য কিছু অনুদান পাচ্ছিলেন। ১৮২৮ সালে অস্থায়ী শিক্ষক পদে যোগ দেন। কিন্তু অসুস্থ শরীর বা দারিদ্র্য কোনো কিছুই তাঁর সৃষ্টির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে নি। এই সময় তিনি প্রচুর গবেষণা পত্র লেখেন। তাঁর লেখার বিষয় মূলত ছিল “ইকুয়েশন থিওরি” ও ”এলিপ্টিক ফাঙ্কশন।” আবেলিয়ান গ্রুপ” সমন্বিত “থিওরি অফ পলিনমিয়াল ইকুয়েশন” ও তাঁর এই গবেষণা পত্রে স্থান পায়। জার্মান গণিতজ্ঞ কার্ল গুস্তাভ জাকোভি ও আবেলের মধ্যে “থিওরি অফ এলিপ্টিক ফাঙ্কশন” বিষয়টির গবেষণা নিয়ে তুমুল প্রতিযোগিতা শুরু হয়। আবেল দ্রুত গতিতে গবেষণা চালিয়ে কার্ল গুস্তাভ জাকোভির পূর্বেই তাঁর থিওরিটি জনসমক্ষে আনেন। এই আবিষ্কারের ফলে তাঁর খ্যাতি বিশ্বের সমস্ত গণিত গবেষণা কেন্দ্রে পৌঁছে যায়। ফ্রেঞ্চ একাডেমির একদল সদস্য খুব চেষ্টা করতে থাকেন যাতে আবেল তাঁর অপরিসীম জ্ঞানের মর্যাদা পান এবং গণিতের জগতে একটি সুযোগ্য স্থান অর্জন করতে পারেন। আবেলের এই সমস্ত শুভাকাঙ্খীরা নরওয়ের রাজা বারনাদতের কাছে তাঁর হয়ে দরবার করতে থাকেন। ক্রিল ও আবার চেষ্টা করতে থাকেন বার্লিনে যাতে আবেলের জন্য অধ্যাপনার একটি চাকরি জোগাড় করা যায়।আবেল গণিতের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন –‘ আবেল’স বাইনমিয়াল থিওরেম’, ‘আবেল ইকুয়েশন’,’আবেলিয়ান এক্সটেনশন’,’আবেল ফাঙ্কশন’,’আবেলিয়ান গ্রুপ’,’আবেল’স আইডেন্টিটি’,”আবেল’স ইনইকুয়ালিটি”, “আবেল’স ইরিডিউসিবিলিটি থিওরেম”, “আবেল-জ্যাকোবি ম্যাপ”,”আবেল-প্লান ফর্মুলা”,”আবেল-রুফিনি থিওরেম”, “আবেলিয়ান মিন্স”, “আবেল’স সামেশন ফর্মুলা”,”আবেলিয়ান এন্ড টাউবেরিয়ান থিওরেম”, “আবেল’স টেস্ট”, “আবেল’স থিওরেম”,”আবেল ট্রান্সফরমেশন”,”আবেলিয়ান ভ্যারাইটি”,”আবেলিয়ান ভ্যারাইটি অফ সিএম-টাইপ”, “ডুয়াল আবেলিয়ান ভ্যারাইটি” র মত অনবদ্য আবিষ্কারের জন্য। কর্মজীবনের ছয় থেকে সাত বছরের মধ্যেই তিনি এই অসাধারণ আবিষ্কারগুলি করেছিলেন। ফ্রেঞ্চ গণিতবিদ চার্লস হার্মিটের মতে আবেলের এইসমস্ত কাজ বিশ্বের গণিতবিদদের আগামী পাঁচশো বছর অব্দি ব্যস্ত রাখবে।

১৮২৮ সালের শেষ ভাগে আবেল ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর অবস্থার অবনতি হতে থাকে। বড়দিনের সময় প্রেমিকার সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে তিনি ফ্রল্যান্ডে যান। এটাই ছিল তাঁর অন্তিম যাত্রা।

১৮২৯ সালের ৬ এপ্রিল মাত্র ২৭ বছর বয়সে নরওয়ের ফ্রল্যান্ডে আবেলের মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর দুই দিন পর বার্লিনের একটি ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপক পদে যোগদানের জন্য একটি নিয়োগপত্র আসে। ১৮৪১ সালে ফ্রেঞ্চ একাডেমি তাঁর গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। নরওয়ে সরকারের পক্ষ থেকে ২০০৩ সাল থেকে প্রত্যেক বছর গণিতে অসাধারণ পান্ডিত্যের জন্য একজনকে ‘আবেল প্রাইজ’ প্রদান করা হয়। নিয়েলস হেনরিক আবেল -এর নামাঙ্কিত এই পুরস্কারের অর্থমূল্য ৭.৫ মিলিয়ন নরওয়েজিয়ান ক্রনার। গণিতের ক্ষেত্রে এই পুরস্কার নোবেল পুরস্কারের সমতুল্য।

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যার জনক পঞ্চানন মাহেশ্বরীকে নিয়ে জানুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ভিডিও