নো ফ্লাই জোন - বিশ্বের যে স্থানগুলির ওপর দিয়ে প্লেন ওড়ে না

নো ফ্লাই জোন – বিশ্বের যে স্থানগুলির ওপর দিয়ে প্লেন ওড়ে না

প্লেন চড়ে ঘুরতে যাওয়ার শখ আমাদের সকলেরই থাকে। কেবল এই কারণেই নয় যে পাখির চোখে আমাদের জগৎটাকে দেখা যায় কিংবা অত্যন্ত কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়া যায় আমাদের প্লেনে চড়ার আরও একটি কারণ নতুন নতুন জায়গা দেখার এবং নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হওয়ার সুযোগ পাওয়া যায় এতে যা কিনা ১০০ বছর আগে কল্পনারও অতীত ছিল।  এখন আমরা শুধু একটি প্লেনে পৃথিবীর যেকোন প্রান্তে পৌঁছে যেতে পারি। এটা ঠিক তাত্ত্বিকভাবে আমরা পৃথিবীর যেকোন স্থানে প্লেনে চেপে ভ্রমণ করতে সক্ষম হলেও বাস্তবটা কিন্তু অন্যরকম। আমরা পৃথিবীর সব জায়গায় পেলেন চেপে যেতে পারি না। এই পৃথিবীতে এমন কিছু জায়গা রয়েছে যেখানে বিভিন্ন কারণে কোনো বিমান উড়তে পারে যে অঞ্চলগুলি নো ফ্লাই জোন (No fly Zones) নামে পরিচিত। এই নো-ফ্লাই জোন অঞ্চলগুলি ধর্মীয় স্থান থেকে শুরু করে পরিবেশগত থেকে ঐতিহাসিক বা এমনকি রাজনৈতিক সংবেদনশীল অঞ্চল হতে পারে। প্রায় প্রতিটি দেশেই বেশ কিছু নো ফ্লাই জোন রয়েছে। আমরা এখানে সেগুলির মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য স্থান নিয়ে আলোচনা করব। আসুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক এই নো ফ্লাই জোন অঞ্চলগুলি কি কি এবং কেন এর ওপর দিয়ে বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। 

প্রাকৃতিক কারণে যে যে স্থানগুলির ওপর দিয়ে বিমান চলাচল করেনা 

১. তিব্বত: তিব্বতে বেশ কিছু বিমানবন্দর থাকলেও তিব্বতের ওপর দিয়ে সাধারণত বাণিজ্যিক বিমান পরিবহন সংস্থাগুলি বিমান চলাচল এড়িয়ে চলে । এর কারণ মূলত তিব্বতের পরিবেশ। সাধারণত একটি বাণিজ্যিক বিমান মাটি থেকে ৩৫০০০ ফুট উঁচুতে ভ্রমণ করে। কিন্তু তিব্বতে অবস্থিত  পর্বতগুলি এর থেকেও বেশি উঁচু। সমুদ্রতল থেকে মাউন্ট  এভারেস্টের উচ্চতা ২৯০০০ ফুটেরও বেশি। যার ফলে বিমানকে উড়তে এভারেস্টের থেকে বেশি উচ্চতায় উড়তে হবে। কিন্তু সমস্যা কি এতে ? বিমান তো এমনিতেই ৩৫০০০ ফুট উচ্চতায় ওড়ে।  সমস্যা অন্যখানে। ভূমি থেকে এত উচ্চতায় বাতাস সাধারণত অত্যন্ত লঘু হয় ফলত বায়ুচাপও অত্যন্ত কম হয়। প্লেনের ভেতর এই বায়ুচাপকে নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রাখা হয়। কিন্তু কোন আপৎকালীন পরিস্থিতিতে প্লেনকে দ্রুত অবতরণ করতে হলে ১০০০০ ফুটের নিরাপদ উচ্চতায় নামিয়ে আনতে হয়।  এর ফলে কেবিনের নিয়ন্ত্রিত বায়ুচাপের তারতম্য হয় যাকে ডিকম্প্রেশন বলা হয়।  কেবিনে দ্রুত ডিকম্প্রেশনের ক্ষেত্রে, বেশিরভাগ বিমানে যাত্রীদের জন্য মাত্র ২০ মিনিট চালিয়ে দেওয়ার মত অক্সিজেন থাকে। এত অল্প সময়ের মধ্যে এতখানি উচ্চতা থেকে অবতরণ যাত্রী সুরক্ষার ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরী করে।  এত গেল বায়ুচাপের সমস্যা।  কিন্তু এই যে ১০০০০ ফুটের নিরাপদ উচ্চতায় প্লেনকে নামতে হবে তিব্বতের পর্বতসঙ্কুল পরিবেশে এটা প্রায় অসম্ভব। কারণ তিব্বতের অধিকাংশ পর্বতের গড় উচ্চতাই ২০০০০ ফুটের ওপর। সুতরাং আপৎকালীন পরিস্থিতিতে দ্রুত বিমান অবতরণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে এই অঞ্চলে।  মূলত এই সব কারণেই সাধারণত বাণিজ্যিক বিমান পরিবহন সংস্থাগুলি বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে তিব্বতকে এড়িয়ে চলে। 

২. প্রশান্ত এবং আটলান্টিক মহাসাগর : মহাদেশগুলিকে আলাদা করেছে এরকম দুটি মহাসাগর হল প্রশান্ত মহাসাগর এবং আটলান্টিক মহাসাগর।  এই দুই মহাসাগরের ওপর  দিয়ে সাধারণত খুব কম বাণিজ্যিক বিমান সংস্থা তাদের বিমান চালনা করে থাকে। যদিও অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড বা হাওয়াইতে উড়ে যাওয়ার মতো ব্যতিক্রম রয়েছে, তবুও বেশিরভাগ বাণিজ্যিক বিমান সংস্থাই এই দুই মহাসাগরকে এড়িয়ে চলে।  কিন্তু এর কারণটা কি ? একটি সমতল 2D মানচিত্র যদি দেখি দেখব আমরা সরাসরি প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে সান ফ্রান্সিসকো থেকে টোকিওর দূরত্ব বেশ কম বা একইভাবে আটলান্টিকের ওপর দিয়ে  শিকাগো থেকে প্যারিসের দূরত্ব সবচেয়ে কম। কিন্তু আমাদের পৃথিবী সমতল নয়, এটি উপবৃত্তাকার বা তির্যক গোলক, এবং সবচেয়ে কম দূরত্বটি সোজা নয়, এটি বাঁকা। বিমান পরিবহন সংস্থাগুলি এই বক্ররেখা অনুসরণ করে, অর্থাৎ যাতায়াতের জন্য যেকোন দুটি দূরবর্তী অবস্থানের মধ্যে সবচেয়ে কম দূরত্বের বক্র পথটি অনুসরণ করে।, বিমানগুলি তাই প্রশান্ত মহাসাগর বা আটলান্টিকের উপর দিয়ে সরাসরি উড়ে যাওয়া এড়িয়ে সময় এবং জ্বালানী বাঁচাতে কানাডা এবং আলাস্কার উপর দিয়ে উত্তরের দিকে বাঁক নিয়ে উড়ে যায়।  এছাড়া এই বিশাল দুই মহাসমুদ্রের কাছাকাছি কোন বিমানবন্দরও থাকেনা যেখানে প্রয়োজনে জরুরি অবতরণ করা যাবে। 

৩. উত্তর এবং দক্ষিণ মেরু : দক্ষিণ মেরুর ওপর দিয়ে কোন বিমান চলাচল করে না যদিও উত্তর মেরুর ওপর দিয়ে কিছু কিছু করে। তবে বেশিরভাগ বিমান পরিবহন সংস্থাই এই দুই মেরুকে এড়িয়েই যায় যাতায়াতের জন্য।  কারণও আছে অবশ্য।  দুই মেরুর কাছে অক্ষরেখাগুলির মধ্যেকার দূরত্ব কমতে কমতে একে অপরের সাথে মিশে যায় একেবারে। সুতরাং সোজা পথ বরাবর বিমান চালনা এখানে সহজ নয় ক্রমাগত প্লেনের অভিমুখ পরিবর্তন করতে হয় বিমানকে গন্তব্যমুখী করতে। এই দুই মেরুতেই এত পরিমাণ চুম্বকীয় মাত্রার পরিবর্তন হয় যে কম্পাস প্রায় কাজই করে না।  ফলে বিমান চালনা করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। এর সাথে যোগ হয় অকল্পনীয় ঠান্ডা।  দুই মেরুতেই এই চরম শীতল আবহাওয়া বিমানের  জ্বালানিকে জমিয়ে দিতে পারে। এই অবস্থা এড়াতে হলে পাইলটদের হয় গতি বাড়াতে হবে না হয় দশ হাজার  ফুটের কম উচ্চতায় উড়তে হবে। প্লেনের উইন্ডো স্ক্রিনে বরফ জমা থেকে শুরু করে বায়ুচাপের পরিবর্তন বিমান চালনার ক্ষেত্রে প্রবল সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এই কারণেই বিমান বিমান সংস্থাগুলি মেরু অঞ্চল এড়িয়েই চলে।   

আপনার মতামত জানান