সববাংলায়

নিউক্লীয় বিভাজন বিক্রিয়া ।। নিউক্লিয়ার ফিশন রিঅ্যাকশন

মহাবিশ্বে নক্ষত্রের অভ্যন্তরে যে নিউক্লীয় সংযোজন বিক্রিয়া সংঘটিত হয় তার ঠিক বিপরীত প্রক্রিয়া হল নিউক্লীয় বিভাজন বিক্রিয়া (Nuclear Fission Reaction)। এই প্রক্রিয়ার সাহায্যেই পরমাণু বোমা নির্মাণ করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে কোনও একটি মৌলের পরমাণুর নিউক্লিয়াস বিভাজিত হয়ে দুটি পৃথক মৌলের নিউক্লিয়াস উৎপন্ন করে এবং সেই সঙ্গে নির্গত হয় প্রচুর পরিমাণ শক্তি। একে অনেকে শৃঙ্খল বিক্রিয়াও (Chain Reaction) বলে থাকেন।

যে বিশেষ নিউক্লীয় বিক্রিয়ায় কোনও ভারী মৌলের নিউক্লিয়াস বিভাজিত হয়ে মোটামুটি সমান ভরের দুটি ভিন্ন নিউক্লিয়াসে বিভক্ত হয় এবং বিক্রিয়ার ফলে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়, তাকেই নিউক্লীয় বিভাজন বিক্রিয়া বলা হয়। ইউরেনিয়াম বা প্লুটোনিয়ামের মত ভারী মৌলের নিউক্লিয়াসকে ধীরগতির একটি নিউট্রনের সাহায্যে আঘাত করলে ভারী নিউক্লিয়াসটি ভেঙে দুটি নিউক্লিয়াস যথাক্রমে বেরিয়াম ও ক্রিপটনে বিভাজিত হয় এবং প্রচুর পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়। ইউরেনিয়াম মৌলের নিউক্লিয়াসের তুলনায় এই বেরিয়াম কিংবা ক্রিপটনের নিউক্লিয়াসের ভরের সমষ্টি সামান্য হালকা। এই বিক্রিয়ায় শক্তি নির্গমনের পাশাপাশি অনেকগুলি নিউট্রনও নির্গত হয় যা পরবর্তীকালে নিকটস্থ অন্য কোনও ভারী মৌলের নিউক্লিয়াসকে পুনরায় বিভাজিত করতে পারে। এর ফলে এই বিক্রিয়া ক্রমান্বয়ে চলতেই থাকে। এই কারণে নিউক্লীয় বিভাজন বিক্রিয়াকে বিজ্ঞানীরা অনেকেই ‘শৃঙ্খল বিক্রিয়া’ বলে থাকেন। এই বিক্রিয়াটির সমীকরণ হল –

92U235 + 0n1  →   56Ba141 + 36Kr92 + 30n1 + 200 MeV

নিউক্লীয় বিভাজনের ফলে উৎপন্ন পদার্থগুলির মোট ভর মূল ইউরেনিয়াম পরমাণুর নিউক্লিয়াস ও বিক্রিয়ক নিউট্রনের ভর অপেক্ষা কম হয়। এখানে আইনস্টাইনের ভর ও শক্তির নিত্যতা সূত্র E = mc2 সূত্রানুসারে হ্রাসপ্রাপ্ত ভর শক্তিতে পরিণত হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন ১ গ্রাম ইউরেনিয়ামের প্রতিটি পরমাণু বিভাজিত হলে তা থেকে ৭.৬ × ১০১০ জুল শক্তি উৎপন্ন হয় যা প্রায় ৩০০০ টন কয়লা পোড়ালে যা শক্তি পাওয়া যায় তার সমান। পরমাণুর নিউক্লিয়াসের মধ্যে প্রোটনগুলি একে অপরকে কুলম্ব বল দ্বারা বিকর্ষণ করে এবং স্বল্প দূরত্বের নিউক্লীয় বলের আকর্ষণের জন্য কোনওরকমে একত্রিত থাকে। একেকটি প্রোটন অপর প্রোটনকে প্রায় ২০ নিউটন বল প্রয়োগ করে দূরে ঠেলার চেষ্টা করে। এর ফলে পরমাণুর বিদারণের সময় এই বল ভেঙে যায় এবং তার জন্য প্রভূত শক্তি নির্গত হয়। এ কারণে মৌলটির ভরও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। পরমাণু বিভাজন শুরুর সময় ভারী মৌলের নিউক্লিয়াসের যে ভর ছিল তার তুলনায় বিভাজিত নিউক্লিয়াসের ভর অনেক কম হয়। এই হারিয়ে যাওয়া ভরকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ভর ত্রুটি’ (Mass Defect)। হাইড্রোজেন ছাড়া সকল মৌলের নিউক্লিয়াসেই একটি বন্ধন শক্তি থাকে। ফলে নিউক্লিয়াসকে বিভাজিত করার জন্য এই বন্ধন শক্তির থেকেও বেশি বল প্রয়োগ করতে হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন যদি এই ধরনের নিউক্লীয় বিভাজন বিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রিত আকারে কোনও নিউক্লিয় চুল্লিতে পরিচালনা করা যায়, তাহলে এ থেকে উৎপন্ন প্রভূত তাপশক্তি মানবকল্যাণে কাজে লাগানো যেতে পারে। আর অনিয়ন্ত্রিতভাবে এই বিক্রিয়া চলতে থাকলে তা পরমাণু বোমার মত বিধ্বংসী বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। এই নিউক্লীয় বিভাজন বিক্রিয়া উদ্ভাবনের ফলে পৃথিবীতে শুরু হয় ‘পরমাণু যুগ’ (Atomic Age)।

১৯১১ সালে আর্নেস্ট রাদারফোর্ড পরমাণুর মডেল আবিষ্কারের পরে নিউক্লিয়াসস্থিত প্রোটন ও নিউট্রন এবং নিউক্লিয়াসের বাইরে থাকা ইলেকট্রন নিয়ে আরও অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলেছে। পরবর্তীকালে বিজ্ঞানী জর্জ বেকারেল, মাদাম কুরি ও পিয়ের কুরি প্রত্যেকেই তেজস্ক্রিয়তা বিষয়ে গবেষণা করতে গিয়ে বুঝতে পারেন যে কিছু কিছু মৌলের পরমাণু থেকে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ঘটে এবং তার ফলে ধীরে ধীরে সেই মৌলটি অন্য কোনও মৌলে পরিণত হয়। বিজ্ঞানী মেইটনার এবং ফ্রিশ এই নিউক্লীয় বিভাজন বিক্রিয়া আবিষ্কার করেন। ১৯৩৪ সালে বিজ্ঞানী ফার্মি ইউরেনিয়ামকে নিউট্রন দ্বারা আঘাত করে বিটা রশ্মি (β) নির্গমনের ধারণা পান। অন্যদিকে বিজ্ঞানী অটো হান ও স্ট্রাসম্যান দেখান যে এই বিক্রিয়ার ফলে নিশ্চিতভাবে ল্যান্থানাম (La) ও বেরিয়াম (Ba) উৎপন্ন হয়। ফার্মি তো এই বিক্রিয়ার মাধ্যমে ইউরেনিয়ামের সুস্থিত নিউক্লিয়াস থেকে ইউরেনিয়ামোত্তর মৌলের নিউক্লিয়াস উৎপাদনের প্রমাণ দিয়েছিলেন। কিন্তু মেইটনার ও ফ্রিশই প্রথম উদাহরণ সহ প্রমাণ করেন যে সুস্থির ইউরেনিয়াম নিউক্লিয়াস একটি নিউট্রন অধিগ্রহণের ফলে অস্থির হয়ে প্রায় সমান ভরের দুটি নিউক্লিয়াস তৈরি করে। ১৯৩২ সালে বিজ্ঞানী জেমস স্যাডউইক যখন নিউট্রন কণা আবিষ্কার করেন, সেই সময় থেকেই ফার্মি ও অন্যান্য বিজ্ঞানীরা এই নিস্তড়িৎ কণাটিকে কাজে লাগিয়ে অন্য কোনও মৌলকে আঘাত করার পারমাণবিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিলেন। পরবর্তীকালে এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত হয় তেজস্ক্রিয়তার ধারণা। ১৯৩৪ সালে জার্মান রসায়নবিদ ইডা নোডাকই প্রথম নিউট্রনের সাহায্যে আঘাত করে হালকা মৌলের নিউক্লিয়াস উৎপাদনের কথা বলেছিলেন। প্রাথমিকভাবে সাধারণ ইউরেনিয়াম মৌলকেই (U235) নিউট্রন দ্বারা আঘাত করে পরীক্ষা করা হয়েছিল, কিন্তু পরে দেখা গেল ইউরেনিয়ামের আরেকটি আইসোটোপ U238-কেও নিউট্রন দ্বারা আঘাত করে বিভাজিত করলে ১ MeV শক্তি বেশি উৎপন্ন হয়। এছাড়া থোরিয়াম (Thorium) ও প্রোট্যাক্টিনিয়ামের (Protactinium) মত ইউরেনিয়ামোত্তর মৌলগুলিও নিউট্রন দ্বারা বিদারণযোগ্য বলে প্রমাণিত হয়। ১৯৪২ সালে ফ্রেডরিক জোলিয়ট কুরি, হান্স ভন হ্যালবান এবং লিউ কাওয়াসাকি একত্রে বিশ্বের প্রথম নিউক্লীয় চুল্লি পরিচালনা করেন। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের মধ্যেই ‘পাইল’ (Pile) নামক এই চুল্লিটি নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছিল। সবথেকে বড়ো বিষয় হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলা গোপন ম্যানহাটন প্রজেক্টে এই পদ্ধতিতেই বানানো হয়েছিল বিধ্বংসী পরমাণু বোমা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে এই প্রকল্প গড়ে উঠেছিল এবং ১৯৪৫ সালে সেখানেই প্রথম ‘ট্রিনিটি’ নামে একটি পরমাণু বিস্ফোরক তৈরি করা হয় যার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটানো হয় নিউ মেক্সিকোর মরুভূমিতে। এতে ইউরেনিয়ামের বদলে ব্যবহৃত হয়েছিল প্লুটোনিয়াম। পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আরও দুটি বিধ্বংসী পরমাণু বোমা তৈরি করে, একটি হল ইউরেনিয়াম-২৩৫ বোমা ‘লিটল বয়’ এবং অন্যটি হল একটি প্লুটোনিয়াম বোমা ‘ফ্যাট মান’। লিটল বয় বোমাটির ওজন ছিল প্রায় চার টন এবং তা দৈর্ঘ্যে ১১ ফুট লম্বা ছিল যার বিস্ফোরণ শক্তি প্রায় ১৫ কিলো টন টিএনটি (TNT)-র বিস্ফোরণের সামিল। জাপানের হিরোসিমা ও নাগাসাকি শহরে এই দুটি বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছিল যার বিধ্বংসী প্রভাবে দুটি শহরই একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। প্রবল তেজস্ক্রিয়তার কারণে আজও সেই অঞ্চলের বহু শিশু প্রজন্মবাহিত হয়ে বিকলাঙ্গতা বহন করে চলেছে।

নিউক্লীয় বিভাজন বিক্রিয়া সংক্রান্ত প্রায়োগিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে পরমাণু বোমা নির্মাণের কথাই বলতে হয়। নিউক্লীয় বিভাজন প্রক্রিয়ার ফলে নিত্য-নতুন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি সম্ভব হয়েছে যা মূলত বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলি আত্মরক্ষার তাগিদে বানিয়ে রাখে। দ্বিতীয়ত নিউক্লীয় চুল্লিতে এই বিভাজন বিক্রিয়ার নিয়ন্ত্রিত সংঘটনের ফলে মানবকল্যাণের নানা কার্যসাধন সম্ভব। ‘ক্রিটিক্যাল ফিশন রিঅ্যাক্টর’ (Critical Fission Reactor)-এর সাহায্যে নিয়ন্ত্রিতভাবে পরমাণুর নিউক্লিয়াসের বিদারণ ঘটানো হয় এবং তার ফলে উদ্ভূত শক্তিকে কাজে লাগানো হয় নানাভাবে। এছাড়াও আরেক ধরনের রিঅ্যাক্টর রয়েছে যাদের বলা হয় সাব-ক্রিটিক্যাল ফিশন রিঅ্যাক্টর। এক্ষেত্রে মৌলের তেজস্ক্রিয় বিকিরণকে কাজে লাগিয়ে বিভাজনকে ত্বরান্বিত করা হয়। মূলত তিনটি প্রাথমিক উদ্দেশ্যে এই ক্রিটিক্যাল রিঅ্যাক্টরগুলি তৈরি করা হয় –

  • শক্তি চুল্লি (Power Reactor) – নিউক্লীয় শক্তি উৎপাদনের জন্য তাপশক্তি তৈরি করা হয় এখানে। নিউক্লীয় সাবমেরিনের মত জায়গায় এই নিউক্লীয় চুল্লির শক্তিকে এভাবে কাজে লাগানো হয়।
  • পরীক্ষামূলক চুল্লি (Research Reactor) – এই ধরনের চুল্লির সাহায্যে চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রকৌশলীবিদ্যা কিংবা অন্যান্য যে কোনও বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজে নিউট্রন উৎপাদন করা হয়।
  • সংমিশ্র চুল্লি (Breeder Reactor) – নিউক্লীয় বিভাজনের জন্য প্রধান যে ভারী মৌলের নিউক্লিয়াস প্রয়োজন তা এই ধরনের চুল্লির সাহায্যে প্রকৃতিতে একেবারে দুর্লভ নিউক্লিয়াস থেকে প্রয়োজনীয় মৌলের নিউক্লিয়াস তৈরি করা যায়। প্রকৃতিতে একেবারে কম পাওয়া যায় ইউরেনিয়াম-২৩৮ মৌলটি, এই চুল্লিতে সেই মৌলের নিউক্লিয়াস থেকে প্লুটোনিয়াম (Plutonium) তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।  

শুধু তাই নয়, নিয়ন্ত্রিত নিউক্লীয় বিভাজনের সাহায্যে উদ্ভূত তাপের সাহায্যে স্টিম টারবাইন চালিয়ে বিদ্যুৎশক্তিও উৎপাদন চলছে। জীবাশ্ম নির্ভর জ্বালানি যেহেতু কমে আসছে তাই অনেক দেশই পারমানবিক শক্তি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে, ভারতেও ১৯৬৯ সাল থেকে পারমানবিক চুল্লি ব্যবহার হচ্ছে ও বর্তমানে ২০ টির বেশি পারমানবিক চুল্লির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। পারমানবিক চুল্লির দ্বারা বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে প্রচুর পরিমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব এবং দূষণ হারও কম। তবে যেহেতু তেজস্ক্রিয় বস্তু ব্যবহার করা হয় তাই সুরক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে কারণে এই পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেশ ব্যয়বহুল। ১৯৮৬ সালে চেরনোবিল দুর্ঘটনার ফলে সেই এলাকা এখনও তেজস্ক্রিয়তার জন্য বর্জিত হয়ে আছে। তবে যথাযথ সুরক্ষাবিধি মেনে এই পদ্ধতিতে শক্তির জোগান বাড়াতে পারলে পৃথিবীর শক্তি সংকটের সুরাহা সম্ভব।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading