বাংলার সমৃদ্ধশালী লোকসংস্কৃতির ধারায় যেসব লোকসঙ্গীতের অবস্থান, ভাটিয়ালি গান (Bhatiali Song) তাদের মধ্যে অন্যতম। মূলত নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশেই এই গানের বিপুল প্রচলন ও জনপ্রিয়তা। এই গান আসলে নদীর গান, নদীকে অবলম্বন করে বেঁচে থাকা মাঝিমাল্লা এবং নদীনির্ভর মানুষদের গান এই ভাটিয়ালি। বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চল বা নিম্নভূমিগুলিতে এই গানের ব্যাপক চর্চা রয়েছে। বাউলদের গানে যেমন দেহতত্ত্ব প্রাধান্য পেয়ে থাকে, তেমনই ভাটিয়ালি গানের মূল কেন্দ্রবিন্দু হল প্রকৃতিতত্ত্ব। প্রকৃতি বলতে মূলত নদীকেন্দ্রিক প্রকৃতিই প্রধানত মুখ্য এইসব গানে, যদিও আরও নানা বিষয়ও লক্ষিত হয়। নদী-তীরবর্তী মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখ, কখনও নদীর রূপ কখনও আবার ক্রুরতা, ইত্যাদি সমস্ত কিছুই ভাটিয়ালি গানের ভিতরে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। অনেক দূরে নৌকায় পাড়ি জমিয়ে মাঝি গলা ছেড়ে এই গান ভাসিয়ে দেয় বিস্তীর্ণ নদীর বুকে, হাওয়ায় হাওয়ায়। এই গানগুলিকে বিশ্লেষণ করলেই নদীকেন্দ্রিক জীবনের একটি স্পষ্ট ধারণা করতে পারা যাবে।
ভাটিয়ালি শব্দটির মধ্যেই নদীর সঙ্গে সংযুক্ত ‘ভাটি’ শব্দটি ঢুকে রয়েছে, যার অর্থ নদীর নিম্নাঞ্চল। আশুতোষ ভট্টাচার্য ‘ভাটি’ শব্দের অর্থ স্পষ্ট করে বলেছেন যে, “বাংলাদেশের নিম্নভূমি অর্থাৎ সাধারণত যে সকল অঞ্চল বর্ষায় জলমগ্ন হইয়া যায়, তাহাই ভাটি বলিয়া পরিচিত”।
এই ভাটিয়ালি গানের নামকরণ প্রসঙ্গে কেউ কেউ বলে থাকেন যে, নদীর ভাটির স্রোতের টানে নৌকা ভাসিয়ে মাঝিরা যে গান গেয়ে থাকেন, তাকেই বলে ভাটিয়ালি। আশরাফ সিদ্দিকী এমনই একটা কথা লিখেছিলেন তাঁর ‘লোকসাহিত্য’ গ্রন্থের দ্বিতীয় খন্ডে। সেখানে তিনি লেখেন, “নদীর ভাটি দিয়ে নৌকা বেয়ে যেতে সাধারণত নৌকার মাঝিগণ যে গান গাইত তাকেই ভাটিয়ালি বলা হত।” কেউ আবার বলেন যে, বাংলাদেশের ভাটি-অঞ্চলের মাঝিদের যে গান, তাই-ই হল ভাটিয়ালি গান।
নির্মলেন্দু ভৌমিক ভাটিয়ালি গানের উদ্ভব প্রসঙ্গে ‘অবসর’-এর কথা বলেছেন। তাঁর মতে, “ভাটির টানে নৌকা ছেড়ে দিলে বিনা আয়াসে নৌকা চলতে থাকে। এই ‘অনায়াস’ এবং তজ্জাত ‘অবসর’ই ভাটিয়ালির রচনাগত উৎস।”
এই অবসরের কথা আশুতোষ ভট্টাচার্যও লিখেছিলেন ‘বাংলার লোকসাহিত্য’ গ্রন্থের তৃতীয় খন্ডে।
ভাটিয়ালিকে একটি রাগের নাম হিসেবে পাওয়া যায় ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যে, সুফি ও বৈষ্ণব পদে এমনকি ‘সেক শুভোদয়া’র মতো গ্রন্থেও। বাংলাদেশে বহু প্রচলিত ভাটিয়ালি সুর থেকেই আসলে এই গানের জন্ম হতে পারে বলে অনেকে মনে করেন৷ সিরাজউদ্দীন কাসিমপুরী লিখেছিলেন, “ভাটিয়ালি একটি সুর — কথার বাঁধনে কোন বিশেষ গান নহে বলিয়াই আমার ধারণা”।
গবেষক আশুতোষ ভট্টাচার্য এই ভাটিয়ালি গানকে মূলত বাংলাদেশের ভাটি বা নিম্নভূমি অর্থাৎ ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট ও ত্রিপুরার পশ্চিমাংশের গান বলেছেন৷ যদিও তাঁর মতে, ফরিদপুর, বরিশাল, খুলনা অর্থাৎ নিম্নবঙ্গও ভাটি নামে পরিচিত এবং সেইসব অঞ্চলেও এই গানের ব্যাপক প্রচলন রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেন যে, সুন্দরবন অঞ্চলের অরণ্যসঙ্কুল নিম্নভূমিও ভাটি নামে পরিচিত। যুক্তি হিসেবে তিনি দেখান সেখানে বাঘের দেবতা দক্ষিণরায় ‘ভাটীশ্বর’ বা ‘আঠার ভাটির অধিপতি’ হিসেবে পরিচিত। যদিও কেবলই পূর্ববঙ্গের মধ্যেই যে ভাটিয়ালি গান সীমাবদ্ধ তাও নয়। পশ্চিমবঙ্গেরও বিভিন্ন নদী-তীরবর্তী অঞ্চলে এই গান শুনতে পাওয়া যায়। তবে আশুতোষ ভট্টাচার্যের মতে, পূর্ববঙ্গের মাঝিমাল্লারাই এপার বাংলায় সেই গান বহন করে এনেছেন। পশ্চিমবঙ্গের ভাটিয়ালি গানগুলির মধ্যেও পূর্ববঙ্গের গানের ভাষার প্রভাব থেকেই তা স্পষ্টত বুঝতে পারা যায়।
ভাটিয়ালি গানের উদ্ভবকাল প্রসঙ্গে বলতে গেলেই বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ থেকে শুরু করতে হয়। বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের সেই সাধনসঙ্গীত সংকলনে ‘বঙ্গাল রাগ’-এ রচিত একটি গান রয়েছে। আশুতোষ ভট্টাচার্য মনে করেন এই বঙ্গাল রাগই হল ভাটিয়ালি সুর। অবশ্য এ-বিষয়ে দ্বিমত রয়েছে, কারণ বঙ্গাল রাগ কথাটির সঙ্গে ভাটিয়ালি শব্দটির সাদৃশ্য প্রায় নেই বললেই চলে, তাছাড়া চর্যাপদের উক্ত গানে নদী, নৌকা বা মাঝির উল্লেখ নেই। হলায়ুধ মিশ্রের লেখা ‘সেক শুভোদয়া’ গ্রন্থেও ভাটিয়ালি রাগের কথা আছে। গবেষকের মতে, যদি হলায়ুধ মিশ্র সেন বংশের রাজা লক্ষ্মণ সেনের সভাকবি হয়ে থাকেন, তবে সেক শুভোদয়ায় উল্লিখিত গানকেই ভাটিয়ালির প্রাচীনতম নিদর্শন বলতে হবে। যদিও এই গ্রন্থটির প্রাচীনতা নিয়েও সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। কোন কোন গবেষকের মতে, ষোল শতকের আগে এই গ্রন্থ রচিত হয়নি। চর্যাপদের পর, আদি মধ্যযুগের সাহিত্য-নিদর্শন ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যের অনেকগুলি ভাটিয়ালি গান রয়েছে। আসলে মধ্যযুগের অধিকাংশ কাব্যেই রয়েছে ভাটিয়ালি রাগ।
বৈষ্ণবধর্মের প্রভাবে এবং পরবর্তীকালে চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের ফলে ভাটিয়ালি গানের মধ্যে রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা অন্তর্ভুক্তি লাভ করে কিন্তু লৌকিক ভাটিয়ালি গানগুলি আরও প্রাচীন। সেইসব প্রাচীন গানগুলিতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৈষ্ণব প্রেমলীলার মতো আরও অনেক কিছুই সংযুক্ত হয়েছে। এই ভাটিয়ালি গানেরই একরকম পরবর্তী সংস্করণ বলা হয় মুর্শিদী গানকে। সুফীদের মধ্যস্থতায় ভাটিয়ালি গানের মধ্যে ইসলামী প্রাণ-সঞ্চারের ফলে মুর্শিদী গানের জন্ম হয়েছিল। আজকালকার ভাটিয়ালি সঙ্গীতকারেরা বর্তমান কালের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিক নানা সুরের চলন ও উপাদানও ভাটিয়ালি গানের মধ্যে অনায়াসে মিশিয়ে নিয়ে তা পরিবশন করে থাকেন।
আহমদ শরীফ তাঁর ‘রাগতালনামা’ গ্রন্থে ভাটিয়ালি বিষয়ক যে মোট ছয়টি রাগের উল্লেখ করেন সেগুলি হল: করুণা ভাটিয়াল, নাগোধা ভাটিয়াল, আকুমারী ভাটিয়াল, কামোদ ভাটিয়াল, বেউরপুরী ভাটিয়াল এবং ভাটিয়াল বৈরাগী। এছাড়াও ‘বঙ্গ ভাটিয়াল’ ও ‘দক্ষিণ ভাটিয়াল’ নামে আরও দুই সুরের কথা জানা যায়। অন্যদিকে ক্ষিতিশচন্দ্র মৌলিক আবার অঞ্চলভেদে ভাটিয়ালি সুরের মোট যে পাঁচটি ধাঁচের উল্লেখ করেছেন, সেগুলি হল: সুষঙ্গী, ভাওয়াইল্যা, বিক্রমপুইর্যা, বাখরগঞ্জা এবং গোপালগঞ্জা। তবে সুরের নানা তারতম্য থাকলেও ভাটিয়ালি গান মূলত করুণ রসের গান। বিরহ-বিচ্ছেদ, ঈশ্বরকে না পাওয়ার হতাশা, বেদনা ইত্যাদিই প্রধানত ফুটে ওঠে ভাটিয়ালি গানের ছত্রে ছত্রে। ভাটিয়ালি গান গাওয়ার রীতি সম্পর্কে আশুতোষ ভট্টাচার্য লিখেছেন যে, “ইহার প্রথম কয়েকটি শব্দ একসঙ্গে গীত হইবার পর ইহার সর্বশেষ স্বরটি দীর্ঘায়িত হইয়া উচ্চারিত হইতে থাকে।” কতটা দীর্ঘ হবে সেটা অবশ্যই গায়নের ‘মেজাজ ও রুচি অনুযায়ী’ নিয়ন্ত্রিত হয়। এই র্যে একটা লম্বা টান, এটি ভাটিয়ালি গানের এক অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এই গান সমবেত নয়, বরং একক কন্ঠের গান এবং এর সঙ্গে কোন বাদ্যযন্ত্র বাজে না সাধারণত। নৌকা বাইতে বাইতে নদীর বুকে অবসর সময়ে মাঝি গলা ছেড়ে এই গান গেয়ে থাকেন।
বিভিন্ন গবেষক এবং সংগ্রাহক নানা সময়ে বিবিধ অঞ্চলের ভাটিয়ালি গান সংগ্রহ করেছে, সেগুলি প্রকাশিতও হয়েছে। কবি জসীমউদ্দিনও ছিলেন ভাটিয়ালি গানের একজন সংগ্রাহক। যোগেন্দ্র কিশোর রক্ষিত, গোপীনাথ দত্ত, গুরুসদয় দত্ত প্রমুখ সংগ্রাহকের নামও উল্লেখযোগ্য, যাঁরা ভাটিয়ালি গান সংগ্রহ করেছিলেন। আব্বাসউদ্দীনের গলায় রেকর্ড করা জনপ্রিয় ভাটিয়ালি গানও রয়েছে, যেমন “নদীর কুল নাই, কিনার নাইরে” ইত্যাদি।
ভাটিয়ালি গানের রচয়িতা ও গীতিকারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: বাউল শা, ফকির ফরমান আলি, নূর ইয়াছিন, রাধারমণ, ফকির উমেদ আলী, শাহ আবদুল করিম, রশিদউদ্দিন, জালাল খাঁ প্রমুখ। এছাড়াও বর্তমানের রঙ্গিলী বিশ্বাস ভাটিয়ালি গানের ব্যাখাকার ও পন্ডিত।
কিছু বিখ্যাত ও জনপ্রিয় ভাটিয়ালি গান হল: উকিল মুন্সির “আষাঢ় মাসে ভাসান পানি রে পূবালী বাতাস/ বাদাম দেইখ্যা চাইয়া থাকি আমারনি কেউ আসে রে” বা “আমার গায়ে যত দুঃখ সয়/ বন্ধুয়ারে করো তোমার মনে যত লয়”; শচীনদেব বর্মণের বিখ্যাত গান “কে যাস রে ভাটি গাং বাইয়া/ আমার ভাইধনরে কইও নায়র নিত বইলা/ তোরা কে যাস” ইত্যাদি।
বর্তমানে এই ঐতিহ্যশালী লোকসঙ্গীতের ধারাটি অত্যন্ত ক্ষীণভাবে প্রবাহিত হচ্ছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভাটিয়ালি গানের অনেকরকম আধুনিকীকরণ করা হয়েছে। শহরে চলচ্চিত্রে, বেতারে, যেসব ভাটিয়ালি শোনা যায় এখন, তাকে গবেষকরা বলেন নাগরিক ভাটিয়ালি। কখনও কখনও সরকার আয়োজিত বিভিন্ন লোকসঙ্গীতের আসরে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রসহ ভাটিয়ালি গান শুনতে পাওয়া যায়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- ‘বাংলা লোকসংগীত : ভাটিয়ালি গান’, ওয়াকিল আহমদ, লেখক সমবায়, ঢাকা, সেপ্টেম্বর, ২০০৯
- https://en.m.wikipedia.org/
- https://sandrp.in//
- https://www.indianetzone.com/
- https://www.bangladesh.com/
- https://www.muktoarts.org/


আপনার মতামত জানান