সববাংলায়

নিষ্প্রভ এক নীল বিন্দু

‘নিষ্প্রভ নীল বিন্দু’ – পৃথিবী থেকে প্রায় ৩৭০ কোটি মাইল দূর থেকে তোলা মহাজাগতিক সৌরতলে ভাসমান সূর্যের বিকিরিত আলোকচ্ছটায় দীপ্তিমান পৃথিবীর ছবি। অতি ক্ষুদ্র, প্রায় অলক্ষ্যণীয়, নিষ্প্রভ এই নীল বিন্দুবৎ পৃথিবীর ছবি বিজ্ঞানের গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব না রাখলেও দীর্ঘ দীর্ঘ বছরের মানব সভ্যতার রণ-রক্ত-সফলতার এক দার্শনিক তাৎপর্য বহন করে। এই ছবির গুরুত্ব সেদিন বুঝেছিলেন মহাকাশবিজ্ঞানী কার্ল সাগান। আর তাই তাঁরই নির্দেশে ১৯৯০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘ভয়েজার ১’ মহাকাশযান থেকে অলঙ্ঘ্য দূরত্ব পেরিয়ে বহু ঝুঁকি নিয়েই তোলা হয়েছিল এই ছবি – নিষ্প্রভ নীল বিন্দু। বিপুল, বিশাল অসীম শূন্যে ভাসমান এক পিক্সেলের থেকেও নগণ্য আকারের পৃথিবীর সেই ছবি যে মহৎ তাৎপর্য বহন করে তা লিখেছেন কার্ল সাগান তাঁর বইতে, ১৯৯৪ সালে লেখা তাঁর ‘পেল ব্লু ডট : এ ভিশন অফ দ্য হিউম্যান ফিউচার ইন স্পেস’ বইতেই তিনি প্রথম নিষ্প্রভ নীল বিন্দু (Pale Blue Dot) এই শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেন।

ভয়েজার-১ মহাকাশযানের মূল উদ্দেশ্য কিন্তু পৃথিবীর ছবি তোলা ছিল না, সৌরজগতের বাইরের মহাজাগতিক রহস্য উদ্‌ঘাটন এবং বৃহস্পতি আর শনি এই দুটি সবথেকে বড়ো গ্রহের সম্পর্কে বিশদে তথ্য আহরণই ছিল এর উদ্দেশ্য। সেই কারণেই ১৯৭৭ সালে নাসা মহাকাশে পাঠায় এই ‘ভয়েজার-১’কে। এই ‘ভয়েজার ১’-ই ছিল পৃথিবীর প্রথম মহাকাশযান যা ঐ দুই বিশালাকায় গ্রহের সম্পর্কে বিস্তৃত অনুসন্ধান করে এবং তাদের প্রধান চাঁদগুলি সম্পর্কেও অনুসন্ধান চালায়। অন্যদিকে এই মহাকাশযানই ছিল পৃথিবীর প্রথম মানব-নির্মিত যন্ত্র যা সৌরজগতের বাইরে যেতে সক্ষম হয়, প্রায় চল্লিশ হাজার মাইল গতিবেগে ধাবমান ‘ভয়েজার ১’-ই প্রথম পৃথিবী থেকে বহু বহু দূরত্বে চলে যেতে পেরেছিল। সৌরজগতের সীমানা সম্পর্কেও বিশদে অনুসন্ধান করে এই মহাকাশযান। ১৯৮১ সালে শনি গ্রহের সবথেকে বড়ো চাঁদ টাইটানের একেবারে কাছ দিয়ে চলে যাওয়ার সময় জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সাগান প্রস্তাব দেন একবারের জন্য পিছনে ফিরে গোটা সৌরজগতের একটা ছবি তোলা দরকার। এত দূর থেকে ভয়েজারের ক্যামেরায় পৃথিবীর কোনো বৈশিষ্ট্যই আলাদা করে চোখে পড়বে না ঠিকই, কিন্তু বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব না থাকলেও এই ছবিটি একদিন মহাবিশ্বের মাঝে মানবসভ্যতার অস্তিত্বের এক অন্যতর অর্থ বহন করবে। ১৫০০ মিমি ন্যারো অ্যাঙ্গেল হাই রিসোলিউশন ক্যামেরায় তোলা পৃথিবীর সেই ছবি তোলার সময় কার্ল সাগানকে সাহায্য করেছিলেন মহাকাশবিজ্ঞানী ক্যাণ্ডি হ্যানসেন। পৃথিবীর কক্ষতল অপেক্ষা ৩২ ডিগ্রি উঁচু থেকে তোলা সেই ছবির আকার এক পিক্সেলের থেকেও কম, নাসার প্রতিবেদন অনুযায়ী ০.১২ পিক্সেল। ছবিতে দেখা যায় সূর্যরশ্মির বিস্তৃত ছটার মধ্যে নিষ্প্রভ নীল বিন্দুর মতো পৃথিবী ভাসমান। পৃথিবীর চারপাশের ঐ আলোকছটা আসলে সূর্যালোকের বিচ্ছুরণ যা ক্যামেরায় প্রতিফলিত হয়ে ঐরকম আভা তৈরি করেছিল। ছবিটি তুলতে ঝুঁকিও কম নিতে হয়নি। সূর্যালোকের প্রাবল্যে ক্যামেরার কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যেতে পারতো। তাছাড়া ছবি তোলার পাশাপাশি অন্যান্য যান্ত্রিক কাজেও যে বিদ্যুৎ-সরবরাহ দরকার ছিল তাতে ঘাটতি পড়তে পারতো। সেই কারণে শুধুমাত্র শেষবারের মতো পৃথিবীর সেই ছবি তোলার ৩৪ মিনিট পরই ক্যামেরা বন্ধ হয়ে যায় ভয়েজার ১-এর। প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘন্টা সময় নিয়ে তোলা সেই ছবি নিয়ে কার্ল সাগান ঠিক কী ভেবেছিলেন দেখে নেওয়া যাক।

নিষ্প্রভ এক নীল বিন্দু » সববাংলায়

১৯৯৪ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘পেল ব্লু লাইট : এ ভিশন অফ দ্য হিউম্যান ফিউচার ইন স্পেস’ বইতে নিষ্প্রভ, নীল বিন্দুর মতো দৃশ্যমান সেই পৃথিবীর ছবির এক দার্শনিক তাৎপর্যের কথা লিখছেন কার্ল সাগান। যুগ যুগ ধরে বাহিত মানবসভ্যতার ধারায় এর একটা বিশেষ অর্থ আছে তা বিশ্বাস করতেন সাগান। তবে কেন পৃথিবীর এই রকম রঙ দেখা গেল তার কারণ সম্পর্কে তিনি জানাচ্ছেন, এই নীল রঙের কিছুটা এসেছে আকাশ থেকে আর বাকিটা এসেছে সাগর-মহাসাগরের জন্য। তাছাড়া পৃথিবীর উপরে বায়ুমণ্ডল রয়েছে যা স্বচ্ছ হলেও পুরোপুরি স্বচ্ছ নয়। যার ফলে যতদূরে যাওয়া যায় পৃথিবীর থেকে তত প্রতিফলিত আলোকরশ্মির মধ্যে শুধু নীল বর্ণের আলোকরশ্মিই দৃশ্যমান হয়। আর এটাই সেই নীল গ্রহ- আমাদের পৃথিবী- আমাদের ঘর- প্রাণের ঘর। এই পৃথিবীর উপরেই আমাদের থাকা-আমাদের চলাচল-আমাদের ভালোবাসা-মৃত্যু-যুদ্ধ, আমাদের গোটা জীবনটা বেঁচে চলা এই পৃথিবীরই উপরে। এই পৃথিবীটা আসলে আমরা নিজেরাই। ঐ ক্ষুদ্র নিষ্প্রভ নীল বিন্দুর মতো এই অসীম বিপুল মহাশূন্যে ভাসমান। প্রতিটি মানুষ এই পৃথিবীতেই তাঁদের জীবন কাটিয়েছে, ভোগ করেছে এর অপার সম্পদ। আমাদের আগে যারা ছিল, আমাদের পরে আরো যারা আসবে, সবার অতি প্রিয় আশ্রয় এই পৃথিবী। আমাদের হাসি-কান্না, কষ্ট-বেদনা, রণ-রক্ত-সফলতার দীর্ঘ ইতিহাস সবই এখানে, এই মাটিতে। শত সহস্র ধর্ম, শত সহস্র আদর্শ, পন্থা, সহস্র অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য, প্রত্যেক শিকারী আর শিকার, নায়ক এবং ভীরু, প্রতিটি পিতা-মাতা, প্রতিটি আশান্বিত শিশু, প্রত্যেক আবিষ্কারক-পর্যটক, সমস্ত শিক্ষক, সমস্ত দূর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ, প্রত্যেক ‘সুপারস্টার’, প্রত্যেক অবিসংবাদী নেতা, একইসঙ্গে ইতিহাসের সকল সন্ত এবং পাপী সবাই সবাই এই পৃথিবীরই মানুষ – মহাশূন্যে উজ্জ্বল সূর্যরশ্মির ছটার মধ্যে ভাসমান তুচ্ছ বিন্দুবৎ এই পৃথিবীর অস্তিত্বের আরো ক্ষুদ্রতম অংশ তারা, এক কণা ধুলোর মতো। বিশাল এই মহাজাগতিক প্রেক্ষাগৃহে পৃথিবীর ছোট্ট মঞ্চটি কত অসহায়! ভাবলে অবাক লাগে এই সামান্য তুচ্ছতম মঞ্চে কত কত রাজা, কতশত সম্রাটের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, জয়-পরাজয়ের মুহূর্ত সবই ঐ বিন্দুর মধ্যেই নিবেশিত। ঐ এক পিক্সেলের থেকেও কম আয়তনে এক দল মানুষ অপরের বিরুদ্ধে কত তুচ্ছ কারণে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ঘৃণা ছড়িয়ে দিচ্ছে, যুদ্ধ হাঁকছে, সামান্য ভুল বোঝাবুঝিতে একে অপরকে হত্যা করতেও পিছপা হচ্ছে না।

আমাদের নিজেদের কল্পনার ‘আমি’কে আমরা এত বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছি, আমরা ভেবেই নিয়েছি যে এই মহাবিশ্বে আমাদের মতো উন্নততর প্রাণী আর নেই। আর এই ধারণাটাই ধাক্কা খায় এসে ঐ নিষ্প্রভ আলোকবিন্দুর কাছে। আমরা কতটা উজ্জ্বল? কতটা ক্ষমতাবান? কত বৃহৎ আমাদের অস্তিত্ব? মহাবিশ্বের সমুদ্রে আসলে আমরা নুড়িমাত্রও নই। তাই নিয়েই যত মিথ্যা গর্ব, মিথ্যা অহঙ্কারে উত্তপ্ত করে তুলছি পৃথিবীকে। বিশাল মহাগতিক আগ্রাসী অন্ধকারে আমাদের এই পৃথিবী তুচ্ছ একাকী একটা আলোকবিন্দুর মতো। এই পৃথিবীতেই একমাত্র প্রাণ আছে বলে জানা গেছে। মহাবিশ্বে আর কোথাও নিকট ভবিষ্যতে মানুষ অভিবাসিত হতে পারবে না। হয়তো ঘুরে আসতে পারে, কিন্তু থেকে যাওয়া কখনোই নয়। ফলে এই পৃথিবী আমাদের ভালো লাগুক বা না লাগুক, এটাই আমাদের একমাত্র দাঁড়াবার জায়গা, আমাদের পায়ের নীচের শক্ত ভূমি।

কার্ল সাগান বলছেন জ্যোতির্বিজ্ঞান আসলে মানুষকে বিনয়ী করে তোলে, তার চরিত্রকে উন্নত করে তোলে। সম্ভবত মানুষের মিথ্যা অহংকারকে আয়নায় প্রতিবিম্বিত করার মতো এই অতি দূরে ক্ষীণ আলোকবিন্দুর মতো পৃথিবীর ছবিটি ছাড়া আর কোনো ভালো দৃষ্টান্ত হতে পারে না। এই ছবিটি আমাদের শেখায় মানুষের আরো কাছাকাছি আসতে, তার দায়িত্ব নিতে, তাকে ভালোবাসতে আর এই সুন্দর পৃথিবীকে সুরক্ষিত রাখতে কারণ সবকিছুর পরে এই পৃথিবীই আমাদের বাড়ি-ঘর।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. Carl Sagan, ‘Pale Blue Dot: A vision of The Human Future in Space’, Ballantine Books Edition, Sept. 1997, Pg. 10-13
  2. https://en.wikipedia.org/
  3. https://solarsystem.nasa.gov/
  4. https://www.nationalgeographic.com/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading