পাঁচমুড়া

পাঁচমুড়া – বাংলার টেরাকোটা শিল্পের পীঠস্থান

বাঁকুড়ার পোড়া মাটির ঘোড়া তো আমরা কমবেশি মোটামুটি সকলেই দেখেছি। অনেকের আবার বাড়ির ড্রইং রুমে সোফার দুপাশে পেল্লায় সাইজের দুটি বাঁকুড়ার ঘোড়া সাজিয়ে রাখাটা একটা অন্যতম শখ ও শৌখিনতার মধ্যে পড়ে। এই বাঁকুড়ার ঘোড়ার জন্মস্থান হল বাঁকুড়ার পাঁচমুড়া গ্রাম। পাঁচমুড়া গ্রামের এই টেরাকোটা ঘোড়া কেবল বাংলা নয় আজ সারা বিশ্বে বিখ্যাত। ২০১৮ সালে পাঁচমুড়া গ্রামের এই টেরাকোটা শিল্প জি.আই ট্যাগ লাভ করে। ভারত সরকারের সেন্ট্রাল কটেজ ইন্ডাস্ট্রিজ এম্পোরিয়াম এর লোগোতেও ভারতের হাজার হাজার হস্তশিল্পের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে এই ঘোড়া। এর আগে ১৯৫৭ সালে শিশুদিবস উপলক্ষে প্রকাশিত স্মারক ডাকটিকিটে বাঁকুড়ার ঘোড়ার ছবি ছাপা হয়।  আজ পাঁচমুড়ার এই টেরাকোটা শিল্প নিয়েই আমরা আলোচনা করব। 

বাঁকুড়ার খাতড়া সাব ডিভিশনের তালড্যাংরা পঞ্চায়েত সমিতির অন্তর্গত একটি গ্রাম পাঁচমুড়া। সারা বিশ্বে এই গ্রামের খ্যাতি প্রধানত তার টেরাকোটা শিল্পের জন্য। খুব সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে এই গ্রামে তৈরী পোড়ামাটির ঘোড়ার জন্য। বর্তমানে বাংলা ও ভারতের গন্ডী পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই টেরাকোটার ঘোড়া সমাদৃত হয়েছে। পোড়ামাটির ঘোড়া ছাড়াও এই গ্রামের শিল্পীদের তৈরী পোড়ামাটির হাতি যা ‘বোঙা হাতি’ নামে খ্যাত সেটিও যথেষ্ট বিখ্যাত। পোড়ামাটির এই ঘোড়া এবং হাতিগুলি মূলত গ্রামীণ ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের জন্য নির্মিত হলেও এখন তা ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পের এক অপরিহার্য প্রতীকে পরিণত হয়েছে। টেরাকোটার এই ঘোড়া ও হাতি পাঁচমুড়া ছাড়াও রাজাগ্রাম, সোনামুখী ও হামিরপুর গ্রামে হয়ে থাকে। প্রত্যেক শিল্পকেন্দ্রের স্বতন্ত্র ধাঁচ ও শৈলী রয়েছে। এগুলির মধ্যে পাঁচমুড়ার ঘোড়াগুলিকে চারটি ধাঁচের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম বলে মনে করা হয়।পাঁচমুড়ার বিখ্যাত পোড়ামাটির ঘোড়াগুলি সাধারণত দুই রকম রঙের হয়ে থাকে – লাল ও কালো। ঘোড়াগুলি ভেতরে ফাঁপা থাকে। এই ফাঁপা শরীর উনুনের মতো ব্যবহার করে এগুলিকে পোড়ানো হয়। অনেক সময় ঘোড়ার গায়ে ছোট গর্ত রাখা থাকে, যাতে পোড়ানোর সময় ধোঁয়া বাইরে বেরোতে পারে। এইভাবে পোড়ালে ঘোড়ার গায়ের রঙ হয় লাল। কিন্তু এই গর্তগুলির মুখ আটকে দিয়ে পোড়ালে ঘোড়াগুলি কালো রঙের হয়ে যায়।

একটা সময় ছিল যখন টেরাকোটার হাতি বানিয়ে এখানকার আদিবাসী সাঁওতালরা তাঁদের উপাস্য দেবতা সিং বোঙার কাছে উৎসর্গ করত। মূলত সেই থেকেই ‘বোঙা হাতি’ নামটি এসেছে।পোড়ামাটি বা টেরাকোটার এই কাজে এই গরমের প্রায় ৪৫টি পরিবারের প্রায় ২৫০ জন ব্যক্তি নিযুক্ত রয়েছেন। গ্রাম্য ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের জন্য নির্মিত এই পোড়ামাটির সামগ্রীগুলি যে হস্তশিল্পের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে তা সম্পর্কে  কিন্তু এই গ্রামের শিল্পীদের কিন্তু কোন ধারণাই ছিল না।  ধারণা হল ১৯৬৯ সালে যখন স্বর্গীয় রাসবিহারী কুম্ভকারকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জাকির হোসেন রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে ভূষিত করলেন।  এই জাতীয় পুরস্কারের হাত ধরেই যেমন পোড়ামাটির এই শিল্পের কদর দেশজুড়ে বৃদ্ধি পেল তেমনি এই কাজের সাথে যুক্ত শিল্পীদেরও এই শিল্প সম্পর্কে চেতনার উন্মেষ ঘটল।টেরাকোটার কাজের বৈশিষ্ট্য হল চাকার সাহায্যে অথবা হাতের আঙ্গুলের কায়দায় নরম মাটির উপর চাপ দিয়ে যে কোনোও মূর্তিকে ফাঁপা করে তোলা হয় প্রথমে। এরপর সেই কাঁচা মূর্তিকে রোদে শুকানো হয়। রোদে শুকানোর পর মাটির সামগ্রীগুলিকে মসৃণ ও চকচকে করার জন্যে বিশেষ প্রকার মাটির রঙ ব্যবহার করা হয়। এই রঙগুলিকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়, যথা গাঁথ ও বনক। গাঁথ সাধারণত দুই প্রকারের, যথা ‘খারিয়া গাঁথ’ ও ‘ভাল গাঁথ’। মূর্তিগুলি প্রথমে রোদে শুকানোর পর তার গায়ে গাঁথ লাগানো তারপর লাগানো হয় বনক। এরপর রঙ লাগানো এই মূর্তিগুলিকে ভালো করে রোদে শুকিয়ে, তারপর ভাটিতে দেওয়া হয়। এরপর নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ছোট বড় মূর্তি বিভিন্ন মূর্তিগুলিকে পুয়ান বা ভাটিতে সাজিয়ে পোড়ানো হয়। টেরাকোটার কাজে ব্যবহৃত প্রধান উপাদান হল এঁটেল মাটি এবং এই শিল্পে ব্যবহৃত সমস্ত রঙই হল ভেষজ রঙ। মাটির সঙ্গে পাটের আঁশ, গোবর মিশিয়ে ভিজিয়ে রেখে তৈরি হয় কাঁচামাল। তার পর তা দিয়ে ঘোড়া, হাতি ইত্যাদি শিল্প সামগ্রী তৈরি হয়। তবে  ঘোড়া, হাতি ছাড়াও অন্যান্য জীবজন্তুর মূর্তি, মনসার প্রদীপ, মা ও ছেলে, দশ মাথার রাবণ, গণেশ, পোড়ামাটির নানারকম টালি এখানকার শিল্পীরা তৈরী করে থাকেন। 

আপনার মতামত জানান