ইতিহাস

জাকির হুসেন

ভারতের অন্যতম বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবং তৃতীয় রাষ্ট্রপতি ছিলেন ডঃ জাকির হুসেন (Zakir Husain)। তিনি ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি যিনি রাষ্ট্রপতিত্বের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কর্মস্থলে মারা যান৷ 

১৮৯৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি উত্তরপ্রদেশের কাইমগঞ্জের ফারুকাবাদে জাকির হুসেনের জন্ম হয়৷ তাঁর বাবার নাম ফিদা হুসেন খান এবং মায়ের নাম নাজনিন বেগম৷ তাঁদের পরিবার ছিল পাঞ্জাবের পশতুন মুসলমান যাঁরা জাতিতে ছিলেন খেসগি এবং আফ্রিদি উপজাতির। জাকির হুসেন যখন ছোট ছিলেন তাঁদের পরিবার হায়দরাবাদ থেকে কাইমগঞ্জে চলে আসে। তাঁর ছোটোবেলা থেকে বড় হয়ে ওঠা কাইমগঞ্জেই৷ জাকির হুসেন ছিলেন তাঁর সাত ভাইদের মধ্যে দ্বিতীয়৷ জাকির হুসেনের যখন মাত্র দশ বছর বয়স তাঁর বাবার মৃত্যু হয়। তাঁর বাবার মৃত্যুর মাত্র তিন বছরের মধ্যেই তাঁর মা’ও মারা যান৷ তাঁর বড়ভাই ইউসুফ হুসেন একজন শিক্ষাবিদ ছিলেন। জাকির হুসেনের নাতি সালমান খুরশিদ একজন প্রভাবশালী কংগ্রেস নেতা যিনি কংগ্রেসের শাসনকালে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। ভাইপো মাসুদ হুসেন ছিলেন একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ। জাকির হুসেনের আর এক ভাই মাহমুদ হুসেন পাকিস্তান আন্দোলনে যোগ দেন এবং পরবর্তীকালে পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রীও হয়েছিলেন। তাঁর ভাইপো আনোয়ার হুসেন পাকিস্তান টেলিভিশনের পরিচালক হিসেবে খ্যাত হন। ১৯১৮ সালে মাত্র আঠারো বছর বয়সে শাহজাহান বেগমের সঙ্গে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয়। তাঁদের দুটি কন্যাসন্তান, যাঁদের একজনের নাম সায়ীদা খান ও অন্যজনের নাম সাফিয়া রেহমান।

জাকির হুসেনের প্রাথমিক পড়াশোনা ইসলামিয়া হাই স্কুল থেকে সম্পন্ন হয়৷ এরপর ক্রিশ্চিয়ান ডিগ্রী কলেজ থেকে তিনি অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন ও তারপর অ্যাংলো মহামেডান কলেজে ভর্তি হন যার বর্তমান নাম আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি। কলেজে পড়াকালীনই তিনি রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন।

মাত্র তেইশ বছর বয়সে জাকির হুসেন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিয়ে জাতীয় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। পাঁচ বছর পরে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি দিল্লির জামিয়া নগরে স্থানান্তরিত হয়৷ ১৯২০ সাল থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত তিনি জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন৷ ১৯২৬ সালে তিনি জার্মানি যান এবং বার্লিনের ফ্রেডেরিক উইলিয়াম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন৷ জার্মানিতে থাকাকালীন তিনি বিখ্যাত ঊর্দু কবি গালিবের কবিতা সংকলন প্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। জার্মানি থেকে ভারতে ফিরে আসার পর তিনি গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯২৭ সালে তিনি জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রায় প্রতি পদের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ছিল।

জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার সাধন ও পুনর্বিন্যাসে জাকির হুসেন আত্মনিয়োগ করেছিলেন। শিক্ষার প্রতি তাঁর কঠোর নিষ্ঠা দেখে মহম্মদ আলী জিন্নাহও প্রশংসা না করে পারেননি। ১৯৫৭ সালে জাকির হুসেন বিহারের রাজ্যপাল হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৬৭ সালের ১৩ মে জাকির হুসেন ভারতের তৃতীয় রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। তাঁর রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ ছিল ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়৷ তিনি রাষ্টপতি থাকাকালীন সেই সময়ের উপ রাষ্ট্রপতি ছিলেন বরাহগিরি ভেঙ্কট গিরি এবং প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন তিনি জনগনের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে সচেতন এবং সকলের প্রতি সদয় ও স্নেহশীল ছিলেন। তিনি হাঙ্গেরি, যুগোস্লাভিয়া, ইউএসএসআর এবং নেপালে চারটি রাষ্ট্রীয় সফরের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে উন্নত শিক্ষা এবং উৎসাহমূলক গবেষণার  দ্বারাই দেশের সর্বাধিক উন্নয়ন হতে পারে। 

উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে এবং ডঃ জাকির হুসেনের সম্মানার্থে ১৯৭০ সালে ইলিয়ানগুড়িতে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের নামকরণও ডঃ জাকির হোসেনের নামে নামান্তরিত হয়। ১৯৫৪ সালে জাকির হুসেনকে ‘পদ্মবিভূষণ’ দ্বারা সম্মানিত করা হয়। এরপর ১৯৬৩ সালে তাঁকে ‘ভারতরত্ন’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। 

১৯৬৯ সালের ৩ মে বাহাত্তর বছর বয়সে ডঃ জাকির হুসেনের মৃত্যু হয়।। 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন