বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে গদ্য সাহিত্য রচনায় এক উজ্জ্বল নাম প্যারীচাঁদ মিত্র (Peary Chand Mitra)। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে হিন্দু কলেজের অন্যতম ছাত্র এবং ইয়ং বেঙ্গল দলের অন্যতম নেতা ছিলেন তিনি। বাংলা সাহিত্যে তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন বাংলা ভাষায় প্রথম উপন্যাস ‘আলালের ঘরের দুলাল’ উপন্যাসের রচয়িতা হিসেবে। তিনি টেকচাঁদ ঠাকুর ছদ্মনামেও বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন।
১৮১৪ সালের ২২ জুলাই কলকাতায় প্যারীচাঁদ মিত্রের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম রামনারায়ণ মিত্র। রামনারায়ণ মিত্র ও কোম্পানির কাগজ আর হুন্ডির ব্যবসা করতেন। অর্থনৈতিক দিক থেকে প্যারীচাঁদের পরিবার স্বচ্ছল ছিল। তাঁদের আদি নিবাস ছিল বর্তমান হুগলী জেলার পানিশেওলা গ্রামে। প্যারীচাঁদের ভাই কিশোরীমোহন মিত্র একজন লেখক ও সিভিল সারভেন্ট ছিলেন।
প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর প্যারীচাঁদ মিত্র হিন্দু কলেজে ভর্তি হন যেখানে তিনি ইংরেজি ভাষা শেখেন। এখানে ভর্তির আগেই অবশ্য তিনি ফারসি ভাষা রপ্ত করেছিলেন। হিন্দু কলেজে পড়াকালীন তিনি ডিরোজিওর সংস্পর্শে আসেন এবং ক্রমশই ইয়ংবেঙ্গল গোষ্ঠীর অন্যতম নেতা হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
এক নজরে প্যারীচাঁদ মিত্রের জীবনী:
- জন্ম: ২২ জুলাই, ১৮১৪
- মৃত্যু: ২৩ নভেম্বর, ১৮৮৩
- কেন বিখ্যাত: প্যারীচাঁদ মিত্র বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম। তিনি ডিরোজিওর ছাত্র ও ইয়ং বেঙ্গল দলের অন্যতম নেতা। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা “আলালের ঘরের দুলাল”, “মদ খাওয়া বড় দায় জাত থাকার কি উপায়”, “রামারঞ্জিকা”, “আধ্যাত্মিকা “, “বামাতোষিণী”, “কৃষিপাঠ”, “যৎ কিঞ্চিৎ”, “ডেভিড হেয়ারের জীবন চরিত” ইত্যাদি।
- স্বীকৃতি: বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাসের স্রষ্টা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। জেমস লং সাহেব প্যারীচাঁদ মিত্রকে বলেছিলেন ‘বাংলার চার্লস ডিকেন্স’।
প্যারীচাঁদ মিত্রের প্রাথমিক কর্মজীবন শুরু হয় ১৮৩৬ সালে কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরির গ্রন্থাগারিক হিসেবে। শুরুতে কলকাতার এসপ্ল্যানেডে স্ট্রং সাহেবের বাসভবনে এই গ্রন্থাগারটি প্রতিষ্ঠিত হলেও পরে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে স্থানান্তরিত হয়। তিনি প্রথমে গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিক হিসেবে যোগদান করেন, ক্রমে সচিব এবং শেষপর্যন্ত কিউরেটর পদে উত্তীর্ণ হন এবং অবসরের আগে পর্যন্ত তিনি এই পদেই ছিলেন। গ্রন্থাগারের প্রতি প্যারীচাঁদের দায়িত্ববোধ সম্পর্কে অনুমান করা যায় ‘ইন্ডিয়ান মিরর’ পত্রিকার লেখা থেকে, “Peary Chand toiled from morning to eve with laudable zeal and energy in getting subscriptions for the building…”।
প্যারীচাঁদ মিত্র বাংলা, ফারসি ও ইংরেজি ভাষায় যথেষ্ট দক্ষ ছিলেন। বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় তিনি বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন৷ বিভিন্ন সমাজ কল্যাণকর কাজের সঙ্গে প্যারীচাঁদ আজীবন যুক্ত ছিলেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেটের অন্যতম সদস্য ছিলেন। এছাড়া ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটির সচিব পদে তিনি বেশ কিছু সময় ছিলেন। এগ্রিকালচারাল সোসাইটির সদস্য থাকাকালীন কৃষি সম্পর্কিত বইগুলি ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করার জন্য একটি সংস্থাও প্রতিষ্ঠা করেন। উনিশ শতকের কলকাতায় এমন কোনও সক্রিয় সংস্থা ছিল না, প্যারীচাঁদ যার সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন না। সাধারণ জ্ঞানোপার্জিকা সভা, বেথুন সোসাইটি, দ্য ক্যালকাটা সোসাইটি ফর দ্য প্রিভেনশন অব ক্রুয়েলটি টু অ্যানিম্যালস (পশুক্লেশনিবারণী সভা), দ্য ডিস্ট্রিক্ট চ্যারিটেবল সোসাইটি, দ্য বেঙ্গল সোশ্যাল সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন, বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভা, স্কুল বুক সোসাইটি সবেতেই তিনি ছিলেন। রাধাকান্ত দেব, প্রসন্নকুমার ঠাকুর বা গিরিশচন্দ্র ঘোষের নামে স্মারক সমিতি গড়া হলে সেখানেও তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। তিনি থিওসফিক্যাল সোসাইটির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
তাঁর ইংরেজি ভাষায় রচিত লেখাগুলি ছাপা হত ইংলিশম্যান, ইন্ডিয়ান ফিল্ড, ক্যালকাটা রিভিউ, হিন্দু প্যাট্রিয়ট, ফ্রেন্ড অফ ইন্ডিয়া প্রভৃতি পত্রিকায়। প্যারীচাঁদ মিত্র মূলত জনকল্যাণের জন্যই কলম ধরেছিলেন । স্ত্রী সমাজের উন্নতিই ছিল তাঁর প্রধান লক্ষ্য। তিনি বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের বিরোধী ছিলেন। বাংলা ভাষায় নারী-বিষয়ে গ্রন্থ-রচনায় তিনি অন্যতম পথিকৃৎ। নর ও নারীর মধ্যে বিভেদ তিনি মানতে চাননি; নারীকে তিনি পুরুষ-নিরপেক্ষ করতে চেয়েছিলেন। নারী-পুরুষের ব্যাপারে প্যারীচাঁদের ভাবনায় মানবাধিকার, সাম্য ও পরস্পর সহযোগিতা প্রাধান্য পেয়েছিল। বর্তমান সময়ে নারীবাদী ভাবনার বীজ শতাধিক বছর আগে প্যারীচাঁদের হাতেই রোপিত হয়েছিল।
প্যারীচাঁদ মিত্র রচিত ‘আলালের ঘরের দুলাল’কে বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস বলা হয়। যদিও এটিকে প্রথম উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া নিয়ে বিতর্ক আছে। ‘আলালের ঘরের দুলাল’ রচনার জন্য প্যারীচাঁদ মিত্র বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন। ‘আলালের ঘরের দুলাল’ উপন্যাসটি কিন্তু প্রথমে বই হিসেবে প্রকাশ পায়নি। ১৮৫৭ সালে প্যারীচাঁদ মিত্র এবং রাধানাথ শিকদার সম্মিলিতভাবে একটি মাসিক পত্রিকা শুরু করেছিলেন যেখানে সর্বসাধারণের জন্য সহজ সরল ভাষায় লেখা হত। এখানেই ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়েছিল ‘আলালের ঘরে দুলাল’। এই পত্রিকার উপরের পাতায় লেখা ছিল “এই পত্রিকা সাধারণের বিশেষতঃ স্ত্রীলোকদের জন্যে ছাপা হইতেছে, যে ভাষায় আমাদিগের সচরাচর কথাবার্ত্তা হয়, তাহাতেই প্রস্তাব সকল রচনা হইবেক। বিজ্ঞ পণ্ডিতেরা পড়িতে চান পড়িবেন, কিন্তু তাঁহাদিগের নিমিত্তে এই পত্রিকা লিখিত হয় নাই।’’
অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে নগরজীবনের উচ্ছৃঙ্খলতা ও অধঃপতিত সমাজের চিত্র প্যারীচাঁদ মিত্র এই গ্রন্থে ফুটিয়ে তুলেছেন। জমিদার রামরামবাবুর পুত্র মতিলাল কীভাবে অতিরিক্ত আদরে এবং সঙ্গদোষে খারাপ হয়ে যায় আবার দুঃখ-দুর্দশার মধ্য দিয়ে কীভাবে মতিলালের স্বভাব পরিবর্তন হয় তাও লেখক দেখিয়েছেন। মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ এর অভাবে গ্রন্থটি উপন্যাস হয়ে উঠতে পারেনি তবে সেই সময়কার কলকাতার নগরজীবনের কথা উপন্যাসে ধরা পড়েছে। প্যারীচাঁদ মিত্র সেই সময়কার সমাজ জীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে গুরুগম্ভীর সংস্কৃত ভাষার পরিবর্তে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেছেন। কলকাতায় ব্যবহৃত চলতি ভাষার ব্যবহার “আলালের ঘরে দুলাল”কে আরও বেশি বাস্তবের কাছাকাছি এনে দিয়েছে। প্যারীচাঁদ মিত্রের গদ্যকে “আলালি গদ্য” বলা হয়ে থাকে। মধুসূদন দত্ত এই ভাষাকে জেলেদের ভাষা বলে অভিহিত করলেও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘বঙ্গদর্শন’-এ প্যারীচাঁদের লিখিত ভাষার প্রশংসা করে লিখেছিলেন, “তিনিই প্রথমে দেখাইয়াছিলেন যে, সাহিত্যের প্রকৃত উপাদান আমাদের ঘরেই আছে ; তাহার জন্য ইংরাজি বা সংস্কৃতের কাছে ভিক্ষা চাহিতে হয় না। তিনিই প্রথম দেখাইলেন যে, যেমন জীবনে তেমনই সাহিত্যে ঘরের সামগ্ৰী যত সুন্দর, পরের সামগ্ৰী তত সুন্দর হয় না। তিনিই প্রথমে দেখাইলেন যে, যদি সাহিত্যের দ্বারা দেশকে উন্নত করা বায়, তবে বাঙ্গলাদেশের কথা লইয়াই সাহিত্য গড়িতে হইবে। প্রকৃত পক্ষে আমাদের জাতীয় সাহিত্যের আদি “আলালের ঘরের দুলাল”।”
তবে প্যারীচাঁদ মিত্রের লেখায় ছোট ছোট বাক্য ব্যবহারের প্রবণতা সাহিত্যের রস গ্রহণে বাধা দেয়। তাছাড়া প্যারীচাঁদ মিত্রের ভাষায় ফারসি শব্দের অতিরিক্ত ব্যবহার দেখা যায়। ভুল ত্রুটি সত্ত্বেও বাংলা গদ্যকে সহজ করে তোলার চেষ্টায় তাঁর অবদান ছিল। প্যারীচাঁদ মিত্রের লেখা অন্যতম ব্যঙ্গাত্মক গদ্য রচনা হল, “মদ খাওয়া বড় দায় জাত থাকার কি উপায়”(১৮৫৯)। এছাড়া তিনি কথোপকথন ও গল্পমূলক রচনা লিখেছেন, যেমন “রামারঞ্জিকা” (১৮৬০), “আধ্যাত্মিকা ” (১৮৮০), “বামাতোষিণী” ( ১৮৮১) ইত্যাদি। প্যারীচাঁদ মিত্র যে সমস্ত প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল “কৃষিপাঠ” (১৮৬১), “যৎ কিঞ্চিৎ” (১৮৬৫), “ডেভিড হেয়ারের জীবন চরিত” (১৮৭৮)।
প্যারীচাঁদ মিত্রের লেখা ” কৃষিপাঠ” এ কৃষি বিষয়ক রচনা পাওয়া যায়। সিপাহি বিদ্রোহেরও আগে, ১৮৫৪-৫৫ সালে তিনি লিখেছিলেন ‘ফুলকপি জন্মাইবার প্রণালী’। এছাড়াও লিখেছিলেন ‘কলিকাতার বাগানে উত্তর হিন্দুস্থানীয় তর্মুজ ইত্যাদি চাষ করিবার ধারা’, ‘কানপুর অঞ্চলে স্ট্রবেরির চাষ করিবার ধারা’, ‘খেজুর গাছ রোপণ এবং তাহার রস হইতে ইউরোপীয় ধারানুসারে চিনি প্রস্তুতকরণ’ নিয়ে। এই সব কিছু একত্রে প্রকাশিত হয় “কৃষিপাঠ” এ । ”অভেদী” ও “আধ্যাত্মিকা”-তে মানবতার স্বরূপ ও ঈশ্বর মহিমার কথা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে “রামারঞ্জিকা” গ্রন্থটিতে সংলাপময় কুড়িটি অধ্যায় রয়েছে। “যৎ কিঞ্চিৎ” ঈশ্বর তথ্যমূলক একটি দার্শনিক প্রবন্ধ গ্রন্থ। তিনি বাংলা সাহিত্যে চলিত ভাষার প্রবর্তন করলেও প্রবন্ধগুলি সাধু ভাষায় লিখেছেন। জেমস লং সাহেব প্যারীচাঁদ মিত্রকে বলেছিলেন ‘বাংলার চার্লস ডিকেন্স’।
প্যারীচাঁদ মিত্র বিদ্যাচর্চার পাশাপাশি একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তিনি গ্রেট ইস্টার্ন হোটেল কোম্পানি লিমিটেড, পোর্ট ক্যানিং গ্র্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো, এবং হাওড়া ডকিং কোং এর মতো সংস্থার অংশীদার এবং পরিচালক ছিলেন।
১৮৮৩ সালের ২৩ নভেম্বর প্যারীচাঁদ মিত্রের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস – ডঃ দেবেশ কুমার আচার্য – পৃঃ৭১
- https://en.wikipedia.org/
- https://www.anandabazar.com/
- https://www.thestatesman.com/


আপনার মতামত জানান