ইতিহাস

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Abanindranath Tagore) ছিলেন ‘ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্ট’- এর প্রধান চিত্রশিল্পী যিনি ভারতীয় শিল্পে প্রথম স্বদেশী ভাবধারার প্রবর্তন করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনিই ছিলেন সেই প্রথম পথিকৃৎ শিল্পী যাঁর হাত ধরে ভারতীয় চিত্রকলায় নবজাগরণ এসেছিল। দেশীয় ও প্রাচ্য ঐতিহ্যের বিস্তারে তিনি গড়ে তুলেছিলেন নব্য-বঙ্গীয় বা নব্য-ভারতীয় ধারা। একাধারে ‘বেঙ্গল স্কুল অব আর্ট’ এরও প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। কেবল চিত্রশিল্পী নয়, শিশু সাহিত্যের লেখক হিসেবেও ভীষণ জনপ্রিয় ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ। বাংলা সাহিত্যে তিনি ‘অবন ঠাকুর’ নামেই বেশি পরিচিত।

১৮৭১ সালের ৭ আগস্ট  কলকাতার জোড়াসাঁকোতে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম গুনেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মায়ের নাম সৌদামিনী ঠাকুর। তিনি ছিলেন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাগ্নে। অবনীন্দ্রনাথের স্ত্রীয়ের নাম সুহাসিনী দেবী। তাঁদের এক পুত্র অলোকেন্দ্রনাথ এবং দুই কন্যা সুরূপা আর উমা।  

ছবি আঁকাতে অবনীন্দ্রনাথের হাতেখড়ি হয় ন’বছর বয়সে। বড়দাদা গগনেন্দ্রনাথ আঁকার পাঠ নিয়েছেন সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে। ভাল পোর্ট্রেট আঁকতে পারতেন কাকা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। দাদা সমরেন্দ্রনাথের আবার হাতির দাঁতের কারুকাজের ওপর ঝোঁক ছিল। বাড়ির এই ছবি আঁকার আবহেই অবনীন্দ্রনাথের বেড়ে ওঠা। প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করে অবনীন্দ্রনাথ ১৮৮০ সালে সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হন শিল্প নিয়ে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে। এরপর কুড়ি বছর বয়সে তিনি ক্যালকাটা স্কুল অফ আর্টসে ভর্তি হন। ১৮৯২ সাল থেকে ১৮৯৫ পর্যন্ত ওলিন্টো গিলার্দি ও চার্লস পামার-এর কাছে তিনি ছবি আঁকা শিখেছিলেন। 


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


১৮৯০ সালের গোড়ার দিকে সাধনা পত্রিকা, চিত্রাঙ্গদা এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্যান্য রচনায় অবনীন্দ্রনাথের আঁকা অলংকরণ (illustrations) প্রকাশিত হয়। তিনি তাঁর নিজের বইয়ের জন্যও প্রতিকৃতি বানিয়েছিলেন। ১৮৯৭ সাল নাগাদ তিনি গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্টের উপাধ্যক্ষের কাছ থেকে ইউরোপীয়ান অ্যাকাডেমি পদ্ধতি বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন বিশেষ করে জলরঙের ওপর। এই সময়ে তাঁর আঁকায় তিনি মুঘল শিল্পের প্রভাব আনতে শুরু করেন। মুঘল-প্রভাবিত রীতিতে কৃষ্ণের জীবন অবলম্বনে প্রচুর ছবি তিনি তৈরি করেছিলেন এই সময়ে।

অবনীন্দ্রনাথ অনুধাবন করেছিলেন পাশ্চাত্য শিল্পের চরিত্র অনেকবেশী বস্তুবাদী। সেখানে আধ্যাত্মিক মূল্যবোধগুলি পুনরুদ্ধারের জন্য ভারতের নিজস্ব ঐতিহ্যগুলিকে বিকশিত করা প্রয়োজন৷ এই নিরিখে অবনীন্দ্রনাথকে নব্য বঙ্গীয় চিত্ররীতির জনক হিসেবে ধরে নেওয়া যায় এবং একই সঙ্গে তাঁকে আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার পুরোধাও বলা চলে।

ইউরোপীয় রীতির পাশাপাশি ভারতীয় প্রাচ্য শিল্প রীতির যে একটা বিরাট ভূমিকা চিত্রকলার ইতিহাসে রয়েছে তা প্রথম অবনীন্দ্রনাথের তুলিতেই ধরা পড়েছিল। তিনি ব্রিটিশ-ঔপনিবেশিক আগ্রাসন থেকে চিত্রকলাকে উদ্ধার করে ভারতীয় ঐতিহ্যের শিকড়ে যুক্ত করে আধুনিকতার স্বতন্ত্র পথ নির্মাণ করেছিলেন। 

প্রথমদিকে তিনি ড্রয়িং, প্যাস্টেল, অয়েল পেন্টিং এবং জলরঙের কাজ শিখলেও পরবর্তীকালে তিনি আইরিশ ইলিউমিনেশন এবং মুঘল মিনিয়েচারের প্রতি আকৃষ্ট হন। মূলত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপদেশেই বৈষ্ণবপদাবলীকে বিষয় করে তিনি চিত্রকলার চর্চা শুরু করেন। রাজা রাজেন্দ্র মল্লিকের বাড়িতে এক মিস্ত্রির থেকে ছবির ফ্রেমে সোনা লাগানোর পদ্ধতি শিখেছিলেন। বৈষ্ণব পদাবলী, কৃষ্ণলীলা, আরব্য রজনী, শাহজাহানের মৃত্যু, ভারতমাতা প্রভৃতি কালজয়ী ছবিগুলি তাঁরই অসামান্য প্রতিভার ফসল।  

‘শ্বেতঅভিসারিকা’র বিখ্যাত ছবিটি আঁকার পর তিনি কৃষ্ণলীলা সিরিজ শুরু করেন। এই সিরিজ আঁকতে গিয়ে ১৮৯৭ সালেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় ঘটে প্রখ্যাত ইংরেজ শিল্পী তথা শিল্পতাত্ত্বিক এবং গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজের অধ্যক্ষ ই বি হ্যাভেলের। হ্যাভেল একপ্রকার বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে অবনীন্দ্রনাথকে আর্ট কলেজের উপাধ্যক্ষের পদে বসিয়েছিলেন। এই দুই জনের যৌথ প্রয়াসে কলকাতায় নব্য-ভারতীয় ধারার ভিত্তি স্থাপিত হয়। ১৮৯৭ সালে তাঁর আঁকা ‘রাধাকৃষ্ণ চিত্রমালা’ ছবিটির হাত ধরেই ভারতীয় আধুনিকতার এক নতুন দিগদর্শনের সূচনা হয়েছিল।

অবনীন্দ্রনাথের জীবনে হ্যাভেল সাহেবের প্রভাব ছিল কতটা সেই প্রসঙ্গে তিনি লিখেছিলেন, “ভাবি সেই বিদেশী-গুরু আমার হ্যাভেল সাহেব অমন করে আমায় যদি না বোঝাতেন ভারত শিল্পের গুণাগুণ, তবে কয়লা ছিলাম কয়লাই হয়তো থেকে যেতাম, মনের ময়লা ঘুচত না, চোখ ফুটত না দেশের শিল্প সৌন্দর্যের দিকে।” এরপর ওকাকুরার সান্নিধ্যে এসে জাপানি প্রকরণের প্রতি তিনি আকৃষ্ট হন। ১৯০২ সালে তিনি আঁকেন ‘বঙ্গমাতা’র ছবি। ১৯০৫-এ স্বাদেশিকতার আবহাওয়ায় যা ‘ভারতমাতা’-র ছবি হিসেবে পূজিত হয়েছিল৷ ১৯০৬ সাল থেকে ১৯১০ সালের মধ্যে আঁকা ‘রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম’ চিত্রমালায় তিনি গড়ে তুলেছিলেন একান্ত নিজস্ব আঙ্গিক পদ্ধতি। এর পরের ধারায় তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল মুখোশ-চিত্রমালা এবং ১৯৩০-এর ‘আরব্য-রজনী’ চিত্রমালা।

অবনীন্দ্রনাথের প্রধান দক্ষতা ছিল জলরঙে ‘ওয়াশ’ পদ্ধতিতে চিত্র রচনায়। তাঁর আঁকা বিখ্যাত ছবিগুলি হল ‘কচ ও দেবযানী’ (ম্যুরাল), ‘ভারতমাতা’, ‘অশোকের রানী’, ‘কাজরীনৃত্য’, ‘দেবদাসী’ ইত্যাদি। ‘অন্তিম শয্যায় শাহজাহান’ ছবিতে দেখা যায় বৃদ্ধ ও অসহায় সম্রাট তাজমহলের দিকে তাকিয়ে আছেন। ছবিটিতে দিনান্তের আলোর ব্যবহারে একটি বিষাদগ্রস্ত রূপ ফুটে উঠেছে। তাঁর ছোট মেয়ের প্রাণ ছিনিয়ে নিয়ে গেছিল মহামারী প্লেগ। তিনি ‘অন্তিম শয্যায় শাহজাহান’ ছবির প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ”মেয়ের মৃত্যুর যত বেদনা বুকে ছিল সব ঢেলে দিয়ে সেই ছবি আঁকলুম।” অবনীন্দ্রনাথের বেশ কিছু ছবি রয়েছে কলকাতার ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম, দিল্লির ন্যাশনাল গ্যালারি, শান্তিনিকেতনের কলাভবন এবং এ ছাড়াও দেশ-বিদেশে বহু ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংগ্রহে। এছাড়া তাঁর তৈরী কুটুম কাটাম অন্যতম শিল্পপ্রতিভার নিদর্শন।  অবনীন্দ্রনাথের ছবি দেখে বিখ্যাত চিত্রশিল্পী রবি বর্মা খুব খুশি হয়েছিলেন। এমনকি লর্ড কার্জনও নাকি একবার তাঁর আঁকা ছবি কিনতে চেয়েছিলেন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল চিত্রকলাতেই নয় সাহিত্যসৃষ্টিতেও তাঁর পারদর্শিতার পরিচয় রেখে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উৎসাহেই তাঁর লেখালেখির শুরু। তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘শকুন্তলা’ লিখে তিনি রবীন্দ্রনাথের প্রশংসা পেয়ে উৎসাহিত হয়ে লিখেছিলেন ‘ক্ষীরের পুতুল’, ‘রাজকাহিনী’, ‘বুড়ো আংলা’ ইত্যাদি। তবে রবীন্দ্র-প্রভাব থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখতে পেরেছিলেন তিনি। সৃষ্টি করেছিলেন নিজস্ব এক ভাষা।

এ সবের পাশাপাশি অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন একজন এসরাজ বাদক এবং অভিনেতাও। নিজের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, “কর্মজীবন বলে আমার কিছু নেই, অতি নিষ্কর্মা মানুষ আমি। নিজে হতে চেষ্টা ছিল না কখনও কিছু করবার, এখনও নেই। তবে খাটিয়ে নিলে খাটতে পারি, এই পর্যন্ত।” তাঁর লেখা আরও কিছু প্রকাশিত গ্রন্থ হল, ‘ভারত শিল্প’ (১৯০৯), ‘রাজকাহিনী’ (১৯০৯), ‘ভূত পত্রীর দেশ'(১৯১৫), ‘নালক’ (১৯১৬), ‘বাংলার ব্রত’ (১৯১৯), ‘খাজাঞ্জির খাতা'(১৯২১), ‘প্রিয় দর্শিকা'(১৯২১), ‘চিত্রাক্ষর’ (১৯২৯), ‘বসন্তের হিমালয়’, ‘বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী’ (১৯২৯),’ জোড়াসাঁকোর ধারে’ (১৯৪৪) প্রভৃতি৷ 

১৯৫১ সালের ৫ ডিসেম্বর অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু হয়৷ 

তথ্যটি ভিডিও আকারে দেখুন এখানে

তথ্যসূত্র


  1. বাংলাভাষা ও শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির ইতিহাস - ৩৭ পৃ
  2. https://www.anandabazar.com/
  3. https://www.anandabazar.com/
  4. https://en.m.wikipedia.org/
  5. https://www.anandabazar.com/

1 Comment

1 Comment

  1. Pingback: কাদম্বরী দেবী : রবি ঠাকুরের প্রিয় বউঠান কেন আত্মহত্যা করেছিলেন?

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

মহাশ্বেতা দেবীকে নিয়ে জানা-অজানা তথ্য দেখুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন অজানা এই তথ্য