সববাংলায়

১১ ফেব্রুয়ারি | বিজ্ঞানে আন্তর্জাতিক মহিলা ও বালিকা দিবস

প্রতি বছর প্রতি মাসের নির্দিষ্ট কিছু দিনে বিভিন্ন দেশেই কিছু দিবস পালিত হয়। ঐ নির্দিষ্ট দিনে অতীতের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে স্মরণ করা বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতেই এই সমস্ত দিবস পালিত হয়। আন্তর্জাতিক স্তরে পালনীয় সেই দিবসগুলির মধ্যে একটি হল বিজ্ঞানে আন্তর্জাতিক মহিলা ও বালিকা দিবস (International Day of Women and Girls in Science)।

প্রতি বছর ১১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলিতে মূলত রাষ্ট্রসংঘের উদ্যোগেই বিজ্ঞানে আন্তর্জাতিক মহিলা ও বালিকা দিবস পালিত হয়। ইউনেস্কো এবং ইউএন ওমেনের যৌথ উদ্যোগে পালিত এই বিশেষ দিনের মুখ্য উদ্দেশ্য হল বিজ্ঞানের জগতে নারীর অংশগ্রহণের পূর্ণ ও সমান প্রবেশাধিকারের বার্তাটি প্রচার করা। লিঙ্গ সমতা রক্ষা এবং নারীর ক্ষমতায়নকে গুরুত্ব দিতেই সমগ্র বিশ্ব জুড়ে এই বিশেষ দিনটি পালন করা হয়।

২০১১ সালের ১৪ মার্চ নারীর অবস্থা সংক্রান্ত কমিশন তার পঞ্চান্নতম অধিবেশনে একটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানায় শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নারীর অধিকার স্থাপন এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও নারীর পূর্ণ সমতা রক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। কাজের ক্ষেত্রেও তাঁদের সমান অধিকার এবং শালীনতা বজায় রাখা জরুরি। ২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে উন্নয়নের জন্য বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, আবিষ্কারের ক্ষেত্রে লিঙ্গ নির্বিশেষে মহিলা ও বালিকাদের ক্ষমতায়নকে মাথায় রেখে আগামী দিনে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে ঘোষণা করা হয়।

২০১৫ সালের ২২ ডিসেম্বর প্রথম রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নারীর অবদান ও গুরুত্বকে তুলে ধরতে ১১ ফেব্রুয়ারি বিজ্ঞানে আন্তর্জাতিক মহিলা ও বালিকা দিবস পালন করার প্রস্তাব পাশ হয়। সেই প্রস্তাব অনুযায়ী ২০১৬ সাল থেকে এই দিনটি নিয়মিতভাবে পালিত হয়ে আসছে। পরবর্তীকালে ইউএন ওমেন এবং সিভিল সোসাইটি সহায়কের পাশাপাশি ইউনেস্কোর উদ্যোগে একত্রে এই দিনটি পালিত হতে থাকে। রাষ্ট্রসংঘের পক্ষ থেকে নেওয়া আগামী ২০৩০ সালের জন্য  স্থিতিশীল উন্নয়নের লক্ষ্যপূরণের জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির পাশাপাশি সমগ্র বিশ্বে লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণ আশু প্রয়োজন। বিগত কয়েক দশক ধরে বিশ্বে মহিলা ও বালিকাদের বিজ্ঞানচর্চায়, বিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষায় অনুপ্রাণিত করে আসছে।

বিজ্ঞানে মহিলা ও বালিকাদের গুরুত্বকে মাথায় রেখে, শুধুমাত্র বিজ্ঞানের উন্নতির সুবিধাভোগী হিসেবেই নয়, সমগ্র বিশ্বে পরিস্রুত জল ও নিকাশি ব্যবস্থার উন্নয়নের দিকে প্রতিটি ধাপে মহিলা ও বালিকাদের অন্তর্ভুক্তি প্রয়োজন। বিজ্ঞানের এই বিশেষ ক্ষেত্রটিকে ‘এসডিজি-৬’ (SDG 6) নামে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সমগ্র বিশ্বেই বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কিংবা গণিত চর্চার ক্ষেত্রে মহিলা ও বালিকাদের জন্য স্পষ্টত একটি বৈষম্যের বাতাবরণ ছিল এতদিন, লিঙ্গ বৈষম্যের ব্যাপারটিও লক্ষ্য করা যেত এতদিন। আর রাষ্ট্রসংঘের সামনে এই লিঙ্গ বৈষম্য দূর করাই সবথেকে সমস্যাজনক ছিল। কিন্তু লিঙ্গ সমতা এবং নারী ও মেয়েদের ক্ষমতায়নকে গুরুত্ব দিলে তা দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে। সমীক্ষায় দেখা গেছে অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষ সহকর্মীদের তুলনায় মহিলাদের গবেষণার ক্ষেত্রে অনেক কম পরিমাণ অনুদান দেওয়া হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গবেষণার জগতে যখন মোট গবেষকদের প্রায় ৩৩.৩৩ শতাংশই মহিলা গবেষক, সেখানে জাতীয় বিজ্ঞান অ্যাকাডেমির সদস্যদের মধ্যে মাত্র ১২ শতাংশ মহিলা সদস্য। আশ্চর্যজনক তথ্য হল বর্তমান প্রযুক্তির দুনিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মত অত্যাধুনিক ক্ষেত্রগুলিতে প্রত্যেক পাঁচ জন পেশাদারের মধ্যে মাত্র একজনই মহিলা থাকেন, শতাংশের হিসেবে যা মাত্র ২ শতাংশ।

সমগ্র বিশ্বে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবকে চালিত করতে প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে কম দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও ২৮ শতাংশ মহিলা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক উত্তীর্ণ হন এবং কম্পিউটার ও বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায় প্রায় ৪০ শতাংশ মহিলা উত্তীর্ণ হন। উচ্চমানের পত্র-পত্রিকা কিংবা অন্য ক্ষেত্রে আজও মহিলাদের একটু খাটো করেই দেখা হয়, শুধুমাত্র প্রচারমূলক কাজেই তাঁদের সবথেকে বেশি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যাণ্ড ডেভেলপমেন্ট-এর সদস্যদের বৈশ্বিক গড়ের নিরিখে প্রকৌশলীবিদ্যায় স্নাতক উত্তীর্ণ মহিলাদের সংখ্যা খুবই কম।

বিশ্বের কিছু দেশের দিকে তাকালে দেখা যাবে মহিলাদের অংশগ্রহণের মাত্রা অস্ট্রেলিয়ায় ২৩.২ শতাংশ, কানাডায় ১৯.৭ শতাংশ, চিলিতে ১৭.৭ শতাংশ, ফ্রান্সে ২৬.১ শতাংশ, জাপানে ১৪ শতাংশ, কোরিয়ায় ২০.১ শতাংশ, সুইজারল্যাণ্ডে ১৬.১ শতাংশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তা ২০.৪ শতাংশ। সমীক্ষায় দেখা গেছে আরবি দেশগুলিতে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উত্তীর্ণ মহিলাদের সংখ্যা এবং কর্মসংস্থানে সংযুক্ত হওয়ার মাত্রা অনেক বেশি। মহিলাদের ডিজিটাল অর্থনীতির অংশ করে তুলতে গেলে নতুন প্রজন্মের শিল্পবিপ্লবে লিঙ্গ বৈষম্যকে দূরীভূত করতে হবে।

২০২১ সালের বিজ্ঞানে আন্তর্জাতিক মহিলা ও বালিকা দিবসকে উদ্দেশ্য করে ইউনেস্কো তাদের বিজ্ঞান প্রতিবেদনে একটি বিশেষ অধ্যায় সংযুক্ত করেছে ‘ডিজিটাল বিপ্লবের উন্নয়নের জন্য অন্তর্ভুক্তি প্রয়োজন’ এই শিরোনামে যা ২০২১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ পেয়েছে। ঐ বছরই এই বিশেষ দিনের উদ্‌যাপনে একটি আলোচনা সভা আয়োজিত হয় অনলাইন মাধ্যমে যার মুখ্য উপজীব্য বিষয় ছিল ‘সীমানা পেরিয়ে : সমাজের জন্য বিজ্ঞানে সমতা’।

বিজ্ঞানে আন্তর্জাতিক মহিলা ও বালিকা দিবসের থিম বা প্রতিপাদ্য

  • ২০২৫ – বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং গণিতে ক্যারিয়ার: বিজ্ঞানে মহিলা ও বালিকাদের কণ্ঠস্বর (Unpacking STEM Careers: Her Voice in Science)
  • ২০২৪ – বিজ্ঞান নেতৃত্বে মহিলা ও বালিকা -স্থিতিশীলতার জন্য নতুন যুগ (Women and Girls in Science Leadership – a New Era for Sustainability)
  • ২০২৩ – উদ্ভাবন করা, প্রদর্শন করা, উন্নীত করা, অগ্রসর হওয়া এবং টিকিয়ে রাখা (Innovate. Demonstrate. Elevate. Advance. Sustain – I.D.E.A.S.)
  • ২০২২ – সমতা, বৈচিত্র্য এবং অন্তর্ভুক্তি : জলই আমাদের ঐক্যবদ্ধ করে (Equity, Diversity, and Inclusion: Water Unites Us)
  • ২০২১ – কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে লড়তে একেবারে সামনের সারিতে মহিলা বিজ্ঞানীরা’ (Women Scientists at the forefront of the fight against COVID 19)
  • ২০২০ – অন্তর্ভুক্তিমূলক সবুজ উন্নয়নের লক্ষ্যে বিজ্ঞানে মহিলা ও বালিকাদের যোগদান (Investment in Women and Girls in Science for Inclusive Green Growth)

সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading