দার্জিলিং হিমালয়ের পূর্বদিকে ১৩০০ মিটার উচ্চতায় কালিম্পং অবস্থিত। ভারতের পূর্বদিকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের একেবারে উত্তরে এর অবস্থান। দার্জিলিং হিল স্টেশন থেকে কালিম্পং-এর দূরত্ব ৫৩ কিলোমিটার। কালিম্পং ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সুন্দর করতে কালিম্পং-এর দর্শনীয় স্থানগুলো (Places to Visit in Kalimpong ) সবকটা ঘুরে দেখুন। কালিম্পং-এ কী দেখবেন সেই স্থানগুলোর বর্ণনা নিচে বিস্তারিত দেওয়া হল।
ডেলো পাহাড়
কালিম্পং-এর দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হল ডেলো পাহাড়। প্রায় ২০০০ মিটার উচ্চতায় এই পাহাড় অবস্থিত। এই পাহাড়ের ওপর থেকে গোটা কালিম্পং শহরের এক অসাধারণ মনোমুগ্ধকর দৃশ্য চোখে পড়ে। এই পাহাড়ের ওপর থেকে সূর্যোদয় কিংবা সূর্যাস্ত দেখবার অভিজ্ঞতা অতুলনীয়। সূর্যোদয় কিংবা সূর্যাস্ত দেখবার জন্য পাহাড়ের ওপরে নির্দিষ্ট ভিউ পয়েন্টও রয়েছে। ডেলো পাহাড় ভ্রমণের খুঁটিনাটি জানতে এখানে ক্লিক করুন।
কালিম্পং সায়েন্স সেন্টার
ডেলো পাহাড়ের কাছে অবস্থিত কালিম্পং সায়েন্স সেন্টারটি কালিম্পং-এর দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি বিশেষত ছোটদের জন্য খুবই উপভোগ্য। ভিতরে এবং বাইরে দুইজায়গাতেই বিজ্ঞান সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ের প্রদর্শনী এখানে দেখা যায়। এছাড়াও এর ভিতরে একটি থ্রীডি মুভি থিয়েটার রয়েছে। বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র শুধু ঘুরে দেখবার জন্য ১০টাকা প্রবেশমূল্য এবং মুভি থিয়েটারের জন্য লাগে ৩০টাকা। সোমবার এই বিজ্ঞানকেন্দ্র বন্ধ থাকে।
মঙ্গলধাম
কালিম্পং-এর রেলিরোডে অবস্থিত একটি হিন্দু মন্দির হল এই মঙ্গলধাম। এই মন্দিরটি গুরুজী শ্রী মঙ্গলদাসজী মহারাজের স্মৃতিতে নির্মিত। এখানকার প্রধান আরাধ্য দেবতা হলেন শ্রীকৃষ্ণ। মন্দিরে গুরুজীর সমাধি রয়েছে। মন্দিরের ভিতরে কৃষ্ণলীলার বিভিন্ন দৃশ্যও চিত্রিত রয়েছে দেখা যায়। মন্দির সংলগ্ন একটি সুদৃশ্য ফুলের বাগান রয়েছে, যেখানে ঘুরে বেড়াতে দারুণ লাগে।
পাইন ভিউ নার্সারি
পাইন ভিউ নার্সারি হল কালিম্পং-এর তিস্তা নদীর তীরে অবস্থিত একটি জনপ্রিয় ক্যাকটাস নার্সারি। এটি সমগ্র এশিয়ার মধ্যে ক্যাকটাসের বৃহত্তম সংগ্রহ। একটি বৃহৎ গ্রীনহাউসে বিভিন্ন ধরনের ক্যাকটাসের প্রজাতি সেখানে দেখতে পাওয়া যায়। ২ একর জমি জুড়ে প্রায় ১৫০০ প্রজাতির ক্যাকটাস রয়েছে এখানে। ৪০ বছর ধরে সারা বিশ্ব থেকে এগুলি সংগ্রহ করা হয়েছে। এখানে প্রবেশমূল্য মাথাপিছু ২০টাকা করে। তবে বিকেল চারটে পর্যন্ত এটি খোলা থাকে।
নেচার ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার
এই কেন্দ্রটি পরিবেশের ওপর মানুষের কার্যকলাপের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করে। এই কেন্দ্রটি বনবিভাগ দ্বারা গঠিত। এখানে জাদুঘরে পরিবেশ সংক্রান্ত তথ্য, ছবি, আলোকচিত্রের প্রদর্শনী দেখা যাবে। পাওয়া যাবে পরিবেশ বিষয়ক বইও।
থার্পা চোয়েলিং গোম্পা
১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত থার্পা চোয়েলিং মনাস্ট্রিটি কালিম্পং-এর তিরপাই পাহাড়ে অবস্থিত। এটি এখানকার প্রাচীনতম গোম্পাগুলির মধ্যে একটি। এই মঠে বেশকিছু প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ ও সাহিত্যের গ্রন্থও সংরক্ষিত রয়েছে।
দুরপিন দারা পাহাড়
দুরপিন দারা পাহাড় থেকে কালিম্পং শহরের মনোরম দৃশ্য, পশ্চিম সিকিমের তুষার-ঢাকা হিমালয় পর্বতমালা, তিস্তা নদী এবং এর উপত্যকা দারুণভাবে উপভোগ করা যায়। সেই পাহাড়ের ওপরে একটি গল্ফ কোর্স রয়েছে, জাং ধোগ পালরি মঠ রয়েছে এবং রয়েছে একটি বোটানিক্যাল গার্ডেন।
মরগ্যান হাউস
মিস্টার এবং মিসেস মরগান ১৯৩০-এর দশকে মর্গান হাউস নামে পরিচিত বাড়িটি তৈরি করেছিলেন। এটি কালিম্পং-এর ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের একটি নিদর্শন। এই বাড়িটিকে ঘিরে আবার কিছু ভুতুড়ে গল্পও গড়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগম এটি পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে।
নেওরা ভ্যালি ন্যাশানাল পার্ক
নেওরা ভ্যালি ন্যাশনাল পার্কে না যাওয়া পর্যন্ত কালিম্পং ভ্রমণ যেন ঠিক সম্পূর্ণ হয় না। এই ন্যাশানাল পার্কটি বিপন্ন লাল পান্ডা এবং কালো এশিয়াটিক বিয়ারের আবাসস্থল। এছাড়াও অন্যান্য বন্যপ্রাণী তো প্রচুর রয়েছেই, সেইসঙ্গে বিরল প্রজাতির অনেক পাখিও দেখা যায় এখানে। পার্কের সর্বোচ্চ পয়েন্ট রাচেলা পাস যা সিকিম এবং ভুটানের সাথে একটি সীমান্ত তৈরি করে। পার্কে প্রবেশের জন্য ফরেস্ট রেঞ্জ অফিস থেকে পারমিট নিতে হবে। পার্কটি জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্ধ থাকে।
জেলেপ্লা ভিউপয়েন্ট
এটি কালিম্পং-এর অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ। ভারতীয় সেনাবাহিনী জেলেপ্লা ভিউপয়েন্ট রক্ষণাবেক্ষণ করে। জেলেপ্লা পাস তিব্বতের সাথে বাণিজ্যের জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল। এখান থেকে তুষারাবৃত কাঞ্চনজঙ্ঘার দুর্দান্ত দৃশ্য চোখে পড়ে।
লেপচা জাদুঘর
কালিম্পং-এর মূল শহর থেকে দুই কিলোমিটার দূরে এই লেপচা জাদুঘর অবস্থিত। লেপচা জনজাতির সাংস্কৃতিক ইতিহাসটিকে এখানে গেলে খুব ভাল বোঝা যেতে পারে। এখানে তাদের উপাসনার বিভিন্ন সামগ্রী, বাদ্যযন্ত্র এবং পোশাক রয়েছে। সোম থেকে শুক্র সকাল ১০.৩০টা থেকে বিকেল ৪.৩০টে পর্যন্ত এবং শনিবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এটি খোলা থাকে।
ম্যাকফারলেন মেমোরিয়াল চার্চ
১৮৯০-এর দশকে একজন স্কটিশ ধর্মপ্রচারক দ্বারা নির্মিত ম্যাকফারলেন মেমোরিয়াল চার্চটি কালিম্পং-এর অন্যতম একটি আকর্ষণ। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এই গির্জা খোলা থাকে। গির্জার ভিতরে ফটোগ্রাফি, খাদ্যদ্রব্য ও পানীয় গ্রহণ নিষেধ।
শহীদ পার্ক
শহীদ পার্ক ১২০০ গোর্খাদের স্মরণে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যাঁরা ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৮ সালের মধ্যে গোর্খাল্যান্ডের জন্য লড়াই করে মারা গিয়েছিলেন। এখানকার স্থানীয় ইতিহাসের একটুকরো যেন পার্কে সংরক্ষিত করা রয়েছে।
ড. গ্রাহামস হোম
রেভারেন্ড ডঃ জন অ্যান্ডারসন গ্রাহাম ১৯০০ সালে এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রায় ৫০০ একর জমি জুড়ে বিস্তৃত এই স্কুল দেওলো পাহাড়ের নীচের ঢালে অবস্থিত। এর ভিতরকার জাদুঘর এবং লাইব্রেরিতে পর্যটকেরা ঘুরে আসতে পারবেন।
প্রতিমা দেবীর বাড়ি (ঠাকুরবাড়ি)
১৯৪৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। ঠাকুরবাড়ির ঐতিহ্যের এক নিদর্শন হিসেবে এই বাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে আজও। জড়িয়ে আছে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিও।
ক্রুকটি হাউস
ক্রুকটি হাউসে বিখ্যাত রাশিয়ান দার্শনিক এবং লেখক হেলেনা রোরিচ তার জীবনের শেষ ৭ বছর অতিবাহিত করেছিলেন। এই বাড়িটি কালিম্পং-এর আকর্ষণীয় পর্যটন স্থানগুলির মধ্যে একটি। এই বাড়িটিতে ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন লক্ষ করা যায়।
থংসা গোম্পা
থংসা গোম্পা অবশ্যই কালিম্পং-এর দর্শনীয় স্থানের তালিকায় থাকা উচিত। এই অঞ্চলের প্রাচীনতম মঠগুলির মধ্যে এটি একটি। এখানকার শান্ত, নির্মল ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ মনকে শান্তিতে ভরিয়ে দেবে। এই গোম্পায় ২১৯টি প্রার্থনার চাকা রয়েছে।
হনুমান মন্দির
ডেলো পাহাড়ের পথে অবস্থিত কালিম্পং-এর হনুমান মন্দির এখানকার আরেকটি উল্লেখযোগ্য স্থান। পূর্ব ভারতের সবচেয়ে উঁচু হনুমানের মূর্তিটি আছে এখানেই। সকাল ৬টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এই মন্দির খোলা থাকে।
সেন্ট থেরেসা ক্যাথলিক চার্চ
স্থানীয় কারিগরদের দ্বারা নির্মিত এই চার্চটি একটি ভুটানি গোম্পা (মঠ)-এর মত এবং এটি তিব্বতি স্থাপত্য নকশায় নির্মিত। বাইবেলের বিভিন্ন দৃশ্য থেকে আঁকা ছবি এবং শিলালিপি দিয়ে এই গির্জার দেওয়াল শোভিত।
সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৫
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- নিজস্ব সংকলন


আপনার মতামত জানান