ইতিহাস

পূর্ণিমা সিনহা

পূর্ণিমা সিনহা (Purnima Sinha) একজন স্বনামধন্য বাঙালি পদার্থবিজ্ঞানী ছিলেন। তিনিই প্রথম বাঙালি মহিলা যিনি পদার্থবিদ্যায় ডক্টরেট (Ph.D.) ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন।তাঁর গবেষণার মূল বিষয় ছিল মেটে খনিজর এক্সরে ক্রিস্টালোগ্রাফি ( X-ray crystallography of clay minerals)।

১৯২৭ সালে ১২ অক্টোবর কলকাতায় একটি প্রগতিশীল পরিবারের পূর্ণিমা সিনহার জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম ডাক্তার নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত। নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত পেশায় একজন উকিল ছিলেন। তাছাড়াও তিনি প্রায় ৬৫ টি বই লিখেছিলেন। তাঁর লেখা বাংলা এবং ইংরেজি প্রবন্ধ তখনকার বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হত। তিনি নারী শিক্ষা এবং নারী পুরুষের  সমান অধিকার বিষয়ে অনেক লেখালেখি করেছিলেন।  চার বোনের মধ্যে  পূর্ণিমা সবথেকে ছোট ছিলেন। পূর্ণিমার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় কলকাতার লেক স্কুল ফর গার্লস (Lake School for Girls) এ। এই বিদ্যালয়টি তার দিদি সুষমা সেনগুপ্ত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এরপর তিনি আশুতোষ কলেজ, স্কটিশ চার্চ কলেজ এবং সব শেষে রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ থেকে পড়াশুনা শেষ করেন। ১৯৫৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পদার্থবিদ্যায় পিএইচডি করেন। তাঁর আগে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর কোন ছাত্রী পদার্থবিদ্যায় ডক্টরেট করেনি, পূর্ণিমা সিনহাই প্রথম ছাত্রী যিনি পদার্থবিদ্যায় ডক্টরেট করেন। তিনি এই সময় প্রখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বোসের অধীনে ডক্টরেট করেছিলেন। তিনি তাঁর ডক্টরেটের জন্য প্রয়োজনীয় এক্স-রে সরঞ্জাম কলকাতার ফুটপাথে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত বাতিল সাজসরঞ্জামের মধ্যে অনেক কিছু খুঁজে খুঁজে জোগাড় করেছিলেন।

পূর্ণিমার বিবাহ হয় সুরজিৎ চন্দ্র সিনহার সঙ্গে। সুরজিৎ পেশায় একজন নৃতত্ত্ববিদ এবং অধ্যাপক ছিলেন। একটা সময় সুরজিৎ শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। তিনি ভারতীয় উপজাতি এবং আদিবাসীদের নিয়ে বেশ কিছু কাজ করেছিলেন। পূর্ণিমা এবং সুরজিৎ এর দুটি কন্যা সন্তান হয়েছিল। তাদের নাম সুপর্ণা এবং সুকন্যা, দুজনেই পদার্থবিজ্ঞানী।

পূর্ণিমা সিনহা অনেক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার কাজ করেন। বিভিন্ন ধরনের মাটি নিয়ে তিনি বেশ কিছু গবেষণামূলক কাজ করেছিলেন। তার মধ্যে মেটে খনিজ এক্সরে ক্রিস্টালোগ্রাফি বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই গবেষণার জন্য তিনি আসাম অয়েল কোম্পানি (Assam Oil Company) থেকে সাহায্য পেতেন, যা কিনা সেই সময় একটি অভিনব ঘটনা ছিল কারণ সে যুগে গবেষণা ও শিল্পের এই ধরণের যোগ খুব একটা ছিল না। ১৯৬৩ সালে তিনি স্ট্যান্ডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে (Standford University) বায়োফিজিক্স বিভাগের (Biophysics Department) সাথে যুক্ত হন। এখানে তিনি “জীবনের উৎস” (Origin of life)  প্রকল্পের সাথে যুক্ত ছিলেন। এরপর দেশে ফিরে  তিনি  জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (Geological Survey of India) এবং জে  সি  বোস  ইনস্টিটিউটের (J.C.Bose Institute) সাথে যুক্ত হন। তাঁর জীবনের শেষ দিকে তিনি সেন্ট্রাল গ্লাস এন্ড সেরামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (Central Glass and Ceramic Research Institute) যোগ দিয়েছিলেন। এখানে তিনি মেটে খনিজ এবং সেরামিকের রং সম্পর্কিত কাজ করেন।

বাংলা এবং ইংরেজি দুই ভাষাতেই তিনি সমানভাবে লেখালেখির কাজ করে গেছেন। সত্যেন্দ্রনাথ বোসের কর্তৃক প্রকাশিত বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষৎ পত্রিকায় “জ্ঞান ও বিজ্ঞান” নামক একটি কলম তিনি নিয়মিত লিখতেন। পরে এই পত্রিকা তাঁকে বিশেষ সম্মানে সম্মানিত করে তাঁর লেখার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বিজ্ঞান সম্পর্কে আগ্রহ গড়ে তোলার জন্য। ১৯৭০ সালে তিনি অ্যান্ অ্যাপ্রোচ  টু দ্য স্টাডি অফ ইন্ডিয়ান মিউজিক (An approach to the study of Indian music) নামক একটি বই লেখেন। এই বইটি  বাংলা তথা ভারতের  লোকসংগীত বিষয়ক বই। ১৯৯০ সালে তিনি আরভিন শ্রোডিঙ্গার (Erwin Schrodinger) এর “মাইন্ড এন্ড ম্যাটার” (Mind and Matter) বইটি বাংলায় অনুবাদ করেন। তাছাড়াও তিনি কামেনেতস্কির (Kamenetskii) “আনরিভিলিং  ডিএনএ: দা মোস্ট ইম্পর্টেন্ট মলিকিউল অফ লাইফ” (Unrevealing DNA: The most important molecule of life) লেখাটিও অনুবাদ করেন বাংলায়। তিনি অনেক পত্রপত্রিকায় ভারতীয় সঙ্গীত নিয়ে লেখালেখি করেছিলেন। তাছাড়াও সত্যেন্দ্রনাথ বসু সম্পর্কে তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ লেখা লিখেছিলেন যার মধ্যে অন্যতম হল “বিজ্ঞান সাধনার ধারায় সত্যেন্দ্রনাথ বোস” এবং “সত্যেন বোসের ব্যক্তিত্ব ও মননের ধারা”। “আমার কথা” নামক একটি আত্মজীবনীও তিনি লিখেছিলেন। 

লেখালিখি এবং বিজ্ঞান চর্চা ছাড়াও তিনি একজন কণ্ঠশিল্পী ছিলেন। ভারতীয় রাগ সঙ্গীতে তাঁর দক্ষতা ছিল অতুলনীয়। তিনি তাঁর সংগীতের তালিম নিয়েছিলেন তখনকার দিনের প্রখ্যাত শিল্পী যামিনী গাঙ্গুলীর কাছ থেকে। তাছাড়াও তিনি কিংবদন্তি শিল্পী পন্ডিত জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের কাছে তবলার তালিম নিয়েছিলেন। মেয়ে হিসেবে তবলা শেখাও সে যুগের ক্ষেত্রে এক অভিনব ব্যাপার। এছাড়া তিনি ছবি আঁকতে, ভাস্কর্য তৈরি করতে এবং বই পড়তে খুব ভালবাসতেন। বিখ্যাত চিত্রশিল্পী গোপাল ঘোষের কাছ থেকে তিনি আঁকা শিখেছিলেন। তাঁর বাড়িতে প্রচুর দুষ্প্রাপ্য বই এবং পত্রিকা ছিল, অবসর সময়ে তিনি বই পড়তেই বেশি ভালোবাসতেন। অবসর নেওয়ার পরে তিনি শান্তিনিকেতনে চলে যান এবং সেখান বিশ্বভারতীর সংগীত ভবনে সঙ্গীত এবং পদার্থবিদ্যা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। তাছাড়াও বিশ্বভারতীর উপাচার্যের থাকার জায়গায় তিনি একটি অসাধারণ ম্যুরাল (mural) তৈরি করেন।

পূর্ণিমা সিনহার ২০১৫ সালে ১১ জুলাই মৃত্যু হয়।পূর্ণিমা সিনহা একজন বিদুষী নারী ছিলেন। এই বহুগুণা সম্পন্না মানুষটিকে বাঙালি তথা ভারতবাসী চিরকাল মনে রাখবে।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।