ধর্ম

পুরূরবা এবং উর্বশীর প্রেমকথা

পুরূরবা ছিল চন্দ্রপুত্র বুধ এবং মনুর কন্যা ইলার পুত্র। চন্দ্রের নাতি হিসাবে সে ছিল প্রথম চন্দ্রবংশীয় রাজা। সে রাজা হিসাবে যেমন বিখ্যাত ছিল, তার চেয়েও বেশি তাকে আমরা চিনি উর্বশীর প্রতি তার নিখাদ প্রেমের জন্য। পুরূরবা এবং উর্বশীর প্রেমকথা মহাভারতের প্রেম কথাগুলোর মধ্যে অনন্য। এই প্রেম অপ্সরা এবং মানবের, এই প্রেম অকল্পনীয় ভাবে নিখাদ এক প্রেম। এই প্রেম থেকেই জন্ম নিচ্ছে মহাভারতের সমস্ত বিখ্যাত চরিত্র যেমন যযাতি, দুষ্মন্ত , ভরত, ভীষ্ম, কৃষ্ণ, পাণ্ডব কৌরবেরা।

স্বর্গলোকের সবচেয়ে জনপ্রিয় অপ্সরা উর্বশী। ইন্দ্র থেকে শুরু করে সকলেই বিমোহিত হয়ে থাকে উর্বশীর রূপে আর নাচে। কিন্তু একদিন মিত্র ও বরুণ দেবতার অভিশাপে উর্বশী স্বর্গচ্যুত হয়ে বসবাসের জন্য মর্ত্যে আসে। তার এই মর্ত্যে আসার ফলেই এক নতুন কাহিনীর শুরু হয়। সেখানে তার সাক্ষাৎ হয় রাজা পুরূরবার সাথে। প্রথমবার তাকে দেখেই রাজা  জগৎ ভুলে যায়। হবে নাই না কেন, স্বর্গের সেরা অপ্সরা সে। তাকে দেখে যে কেউ সব ভুলে যাবে। কিন্তু রাজা শুধুই তার রূপে কামমোহিত হয়নি,  যাকে বলে প্রথম দর্শনেই প্রেম, রাজা পুরূরবা যেমন উর্বশীকে দেখে মুগ্ধ একইসাথে উর্বশীও তাকে দেখে সমান মুগ্ধ।দুজনেই দুজনের প্রেমে পড়ল তারা।

রাজা প্রেম নিবেদন করল উর্বশীকে, “আমি তোমাকে চাই।আমাদের ভালোবাসা হোক চিরন্তন।”

উর্বশী লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল। সেও যে রাজাকে চায় জানাল। তবে পুরূরবাকে সে বিয়ের আগে তিনটি শর্ত দিল

১। উর্বশীর পুত্রস্নেহে লালন করা দুটি মেষশাবক তার বিছানার দুই দিকে বাঁধা থাকবে। তাদের সরালে হবে না।
২। মিলনের সময় ছাড়া উর্বশী যেন রাজাকে কখনো নগ্ন অবস্থায় না দেখে।
৩। একমাত্র ঘি’ই হবে উর্বশীর খাদ্য, এছাড়া আর কিছু সে খাবে না।

এসব শর্ত পালনে ব্যর্থ হলে কিন্তু রাজাকে ছেড়ে সে চলে যাবে। রাজা রাজি হল। তার জীবনে উর্বশীকে পেয়ে রাজার মনে হল তার সব পাওয়া হয়ে গেছে।  বহুকাল ধরে দুজন দুজনের সাথে থেকে তারা সব দুঃখ ভুলে পরম সুখে সুখী দাম্পত্য জীবন কাটাচ্ছিল।

এদিকে উর্বশীকে পেয়ে পুরূরবার সুখে দিন কাটলেও সুখে ছিল না দেবরাজ ইন্দ্র, সুখে ছিল না তার সভাসদগণ। সর্বশ্রেষ্ঠ অপ্সরাকে হারিয়ে তাদের মন বিষণ্ণ। কিন্তু চাইলেই কি আর ফিরিয়ে আনা যায় নাকি। উর্বশীও সেখানে সুখে আছে। তারা বললেই আসবে কেন। একটাই উপায়! রাজাকে উর্বশী যে শর্তগুলো দিয়েছিল সেগুলো যদি ভেঙে দেওয়া যায়। তাহলে উর্বশী নিজেই রাজাকে ছেড়ে দেবে।

ফন্দি এঁটে একরাতে যখন গন্ধর্বেরা পুরূরবার রাজপ্রাসাদের বাইরে এল, পুরূরবা তখন সদ্য উর্বশীর সাথে মিলনের পর বস্ত্রহীন শুয়ে আছে, মনে তার পরম প্রশান্তি। এই সুযোগ! গন্ধর্বেরা প্রবেশ করল তাদের ঘরে। তারা উর্বশীর একটি মেষশাবককে তুলে নিয়ে পালাল। উর্বশীর প্রথম শর্ত ভঙ্গ হল। সেই মেষশাবকের আওয়াজে ব্যাপারটা টের পেয়ে উর্বশী চিৎকার করে উঠল। কিন্তু রাজা তার চিৎকার শুনেও উঠল না।  কারণ যদি তাকে উর্বশী নগ্ন দেখে ফেলে। সে বিছানায় মুখ গুঁজে পড়েই থাকল। এই সুযোগে গন্ধর্বেরা উর্বশীর অন্য মেষশাবককেও তুলে নিল। উর্বশী তখন কান্নায় ভেঙে পড়ল। রাজার আর সহ্য হল না। নগ্ন অবস্থাতেই সে উঠে এল হাতে অস্ত্র নিয়ে। এই সময় গন্ধর্বেরা আকাশে বিদ্যুতের ঝলক ঘটিয়ে দিতেই রাজাকে নগ্নরূপে দেখে ফেলল উর্বশী। আর কাজ হয়ে গেছে দেখে গন্ধর্বেরা মেশশাবক দুটোকেই ওখানে রেখে পালাল। রাজা তাদের নিয়ে যখন ফিরল, তখন উর্বশী নেই। সে রাজার শর্তভঙ্গ হওয়ার কারণে তাকে রেখে চলে গেছে। রাজা তাকে পাগলের মত খুঁজতে লাগল।

উর্বশীকে হারিয়ে রাজা পুরূরবা পাগলপ্রায় হয়ে গেল। রাজকার্য ভুলে সে শুধু উর্বশীর কথাই ভাবে। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে বেড়ায় তার সন্ধানে। অবশেষে একদিন রাজা দেখা পেল  উর্বশীর। কিন্তু তাকে দেখেই উর্বশী সেখান থেকে চলে যেতে চাইছিল। পুরূরবা তাকে বাধা দিয়ে জিজ্ঞেস করল,  “কেন তুমি এমন করছ? এত নিষ্ঠুর কিভাবে হয়ে গেলে তুমি?”

উর্বশী তাকে ফিরে যেতে বলল, “তুমি ফিরে যাও আমার কাছ থেকে। তুমি কেন বুঝতে চাইছোনা যে আমি আর তোমার সাথে থাকতে পারবো না। আমি ঊষার মতোই মুছে গেছি তোমার জীবন থেকে। তুমি ফিরে যাও।”

পুরূরবা বলল, “তাহলে আমার জীবনটাই মুছে যাক। তুমি বিনা কি করব আমি?”

তার দশা দেখে উর্বশী খুব কষ্ট পেল। রাজাকে বলল, “ফিরো যাও রাজা। ! কিন্তু আমার গর্ভে তো তোমার সন্তান আছে। এক বছর পর আবার আমি  আসব, তোমার সন্তানকে তোমার হাতে তুলে দেব। আর তুলে দেব  একটা রাত, যেখানে আমরা আবার একসাথে কাটাবো।”

পুরূরবা ফিরে এল প্রাসাদে। সেই রাতটার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। এই অপেক্ষা কিন্তু শুধুই যৌন মিলনের জন্য নয়, এই অপেক্ষা তার ভালোবাসাকে কিছু সময়ের জন্য পাওয়ার।

এক বছর পর সত্যিই রাজা আবার উর্বশীকে পেল। উর্বশী রাজার প্রথম  সন্তান আয়ুকে তার হাতে তুলে দিল। পরবর্তী কালে এই আয়ুর উত্তরপুরুষই হল যযাতি যার বংশধরদের থেকে মহাভারতের বিখ্যাত সব বংশ যেমন যাদব, পাঞ্চাল বা কৌরবদের উৎপত্তি।

পুরূরবা উর্বশীকে পাওয়ার পর তাকে তার সাথে থাকার জন্য অনেক অনুনয়, অনেক কান্নাকাটি করল। কিন্তু উর্বশী রাজাকে ভালোবাসলেও সেও যে অসহায়। স্বর্গের নিয়ম, দেবতাদের বিধিনিষেধ  এইসব ত্যাগ করে এত সহজে রাজার কাছে সে ধরা দিতে পারবে না। এই বাস্তব সে কিছুতেই তার ভালোবাসায় অন্ধ রাজাকে বোঝাতে পারছিল না। কিন্তু তারপরও একরাত করে পাঁচ বছর রাজার কাছে এসেছিল সে। আর রাজার মোট ছয় পুত্রের জননী হয়েছিল।

পুরূরবা এবং উর্বশীর প্রেমকথা নিয়ে কালিদাস লিখেছে তার বিখ্যাত সংস্কৃত নাটক, বিক্রমোর্বশীয়। পুরাণের পন্ডিতেরা বলে থাকে পুরূরবা হল সূর্যের প্রতীক এবং উর্বশী হল ঊষার প্রতীক। সূর্যোদয় হলে যেমন ঊষা কেটে যায়, পুরূরবা এবং উর্বশীর প্রেমকথাও তাই।

তথ্যসূত্র


  1. "মহাভারতের অষ্টাদশী", আনন্দ পাবলিশার্স, চতুর্থ মুদ্রণ - নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী, অধ্যায়ঃ উর্বশী, পৃষ্ঠাঃ ১-২৫
  2. http://ritsin.com/the-love-story-of-urvashi-and-pururva-or-puroorva-indian-mythology.html/
  3. https://thegreatindianepic.com/2013/06/19/3-pururava-and-urvashi-a-tragic-love-story/

১ Comment

1 Comment

  1. Pingback: পুরূরবার বংশধর | সববাংলায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!